মিঠে কড়া সংলাপ

বাংলা একাডেমির প্রতি অনুরোধ

  মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলা একডেমি
বাংলা একডেমি

প্রতিবছরই অমর একুশে গ্রন্থমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণপত্র পেয়ে থাকি। কিন্তু এবারে সে পত্রটি অনুষ্ঠানের আগের দিন দুপুর পর্যন্ত না পেয়ে ভাবলাম সেখানে যাওয়া বুঝি হবে না। কিন্তু না, বিকাল বেলায় ঠিকই গুলশান পোস্ট অফিসের পিয়ন সাহেব পত্রটি পৌঁছে দিয়ে গেলেন। অতঃপর হাতে পেয়ে দেখলাম তা জিপিও’র জিইপি নং ৪১০, তারিখ ২৭.০১.১৯ এবং গুলশান পোস্ট অফিসের ২৯.০১.১৯ তারিখের সিলবিশিষ্ট।

পত্রটি অবশেষে ৩১.০১.১৯ তারিখ বিকাল বেলায় বাংলাদেশ ডাক বিভাগ আমার ঠিকানায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে! অর্থাৎ ঢাকার ভেতরেই একটি জিইপি পত্র প্রাপকের কাছে পৌঁছাতে তারা পাঁচ দিন সময় নিয়েছেন। যাক সে কথা।

এবার বাংলা একাডেমির কথায় ফিরে আসি। বাংলা একাডেমিও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ১ ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানের পত্রটি ২৭ জানুয়ারি ডাক বিভাগে পৌঁছে দিয়ে করিৎকর্মার পরিচয় দিয়েছে। এই বাংলা একাডেমিতেও যে কখন কী হচ্ছে তা বলা মুশকিল। সেখানে একটি নির্বাচিত পরিষদ কর্তৃক একাডেমির কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার কথা থাকলেও হচ্ছে তার উল্টোটি।

যুগ যুগ ধরে সরকারি আমলা দ্বারা পরিষদ গঠন করার ফলে সেখানকার নির্বাচন অনুষ্ঠানে গড়িমসি করা হচ্ছে। কোনো কোনো সাধারণ সভায় এ বিষয়ে অনেক সদস্য বক্তব্য রাখলেও সে সভা থেকে কর্তৃপক্ষের আশ্বাসবাণী শুনে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। নির্বাচন কবে হবে এবং আদৌ হবে কিনা সে বিষয়ে সদস্যরা আদৌ নিশ্চিত নন।

অথচ একটি নির্বাচিত পরিষদ দ্বারা পরিচালিত হলে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম আরও গতিশীল হতো। তা না করে সরকারি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কর্মকর্তাকে পরিষদের নির্বাহী সদস্যপদে বহাল রেখে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হওয়ায় ওইসব সরকারি কর্মকর্তা নির্ধারিত দিনে সেখানে এসে একটি সভা করে কিছু খানাপিনা সেরে উপস্থিতি ফি গ্রহণ করে বিদায় নিচ্ছেন। পরবর্তী সময়ে একাডেমির কার্যক্রমে তাদের ভূমিকা থাকে বলে মনে হয় না।

এ অবস্থায় অনতিবিলম্বে সেখানে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। কারণ গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বাংলা একাডেমি একটি নির্বাচিত প্রতিনিধি দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কথা। আমরা আশা করব, এ কাজটিতে আর বিলম্ব করা হবে না।

২.

বাংলা একাডেমিকে সরকার কর্তৃক যে ফান্ড দেয়া হয়, তা নিতান্তই অপ্রতুল। দেশের ১৬ কোটি মানুষের মেধা ও মননের বিকাশে এ প্রতিষ্ঠানটি অপরিসীম ভূমিকা রাখতে পারে। এ কথাটি মাথায় রেখে বাংলা একাডেমির বাজেট বরাদ্দে সরকারের উদার নীতি কামনা করা হল। দেশের শিল্পী, সাহিত্যিক, লেখক, কবি, ছড়াকারসহ বিভিন্ন শ্রেণীর পণ্ডিত ব্যক্তিদের পাণ্ডিত্য বিকাশে প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখার প্রয়োজনেই তা করা দরকার।

বছরে একবার মাত্র বইমেলাকে কেন্দ্র করে বাংলা একাডেমি সরব হয়ে উঠবে আর বাকি সময় তা নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকবে, এমনটি যেন না হয় সেদিকে সংশ্লিষ্ট সবারই দৃষ্টি আকর্ষণ করা হল। কারণ বর্তমানে একুশে গ্রন্থমেলা উদ্বোধন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর আগমনে তার বক্তৃতা এবং মঞ্চে উপবিষ্ট ব্যক্তিদের কিছু কথার দিকেই যেন সারা বছর চেয়ে থাকতে না হয়।

অর্থাৎ সারা বছরই কোনো না কোনো সময় বাংলা একাডেমি যেন সরব থাকে, সে বিষয়টিও জরুরি। বছরের বাকি সময়ে নির্ধারিত গণ্ডির মধ্যে বাংলা একাডেমির মতো একটি প্রতিষ্ঠানকে বেঁধে রাখার কোনো যুক্তি আছে বলে মনে হয় না। যুগ ও সময়ের প্রয়োজনে বাংলা একাডেমিকে এখন নতুন নতুন চিন্তা-চেতনার বিকাশ ঘটানোর জন্য গবেষণা ও কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।

দেশে নতুন নতুন কবি, লেখক, গবেষক, অনুবাদক, প্রাবন্ধিক, ছড়াকার, ঔপন্যাসিকসহ বিভিন্ন শ্রেণীর গুণী ব্যক্তি সৃষ্টির পথ প্রশস্ত করার কাজেও বাংলা একাডেমিকে এগিয়ে আসতে হবে। একমাত্র গ্রন্থমেলা অনুষ্ঠানই যেন বাংলা একাডেমির প্রধান কাজ বলে বিবেচিত না হয়। পাশাপাশি অন্যান্য কর্মকাণ্ডও যেন সমান গুরুত্ব পায়, সেদিকে দৃষ্টি দেয়াও এখন সময়ের দাবি।

৩.

বর্তমানে যে ধারার গ্রন্থমেলা অনুষ্ঠিত হয়, তাতে পুরনো লেখকদের পাশাপাশি প্রচুর নতুন লেখকের আগমন ঘটলেও গ্রন্থমেলার ভিড়ের প্রচণ্ডতায় নতুন কোনো লেখকের অনেক ভালো গ্রন্থও বিশেষায়িত হয়ে ওঠে না। অর্থাৎ নতুন লেখকের অনেক ভালো বইও ভিড়ে হারিয়ে যায়। তাই অন্য সময়ও বছরে অন্তত একবার সীমিত আকারে নতুন ছড়াকার, কবি, গদ্য লেখকদের জন্য বাংলা একাডেমি লেখা আহ্বান করে সেখান থেকে শ্রেষ্ঠ দু-একজনের বই প্রকাশ করতে পারে।

কিন্তু তা কখনও করা হয় না। ফলে নতুন লেখক সৃষ্টির দায়িত্ব একমাত্র গ্রন্থমেলাকেই গ্রহণ করতে হয়। যদিও গ্রন্থমেলার সময় নতুন লেখকদের প্রকাশক স্বল্পতাসহ বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হয়। কারণ সে সময়ে প্রকাশকসহ প্রচ্ছদ শিল্পী, প্রেস ইত্যাদি সবকিছুই খুব বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ায় নতুন লেখকদের পক্ষে বই প্রকাশ করা একটি দুরূহ কাজ হয়ে দাঁড়ায়। তাই গ্রন্থমেলা ছাড়া বছরের অন্য কোনো সময়ও নতুন লেখকদের দিকে বাংলা একাডেমির হাত বাড়িয়ে দেয়া উচিত।

৪.

অনেক সময় বাংলা একাডেমি কর্তৃক ফরমায়েশি বই, জীবনবৃত্তান্ত ইত্যাদি লেখার জন্য লেখক ঠিক করে সেসব লেখককে অগ্রিম অর্থ প্রদান করা হয়। অথচ সেসব লেখার জন্য অনেকে অগ্রিম গ্রহণ করে কাক্সিক্ষত বইটি লিখে বাংলা একাডেমিতে জমা দেন না বলে অভিযোগ আছে। আবার সে কাজের জন্য গৃহীত অগ্রিম অর্থও তারা ফেরত দেন না। এসব ক্ষেত্রে একাডেমি কর্তৃপক্ষের কঠোর হওয়া প্রয়োজন। কারণ বাংলা একাডেমির মতো একটি প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা নিয়ে চুক্তি অনুযায়ী কর্ম সম্পাদন না করার মতো গর্হিত কাজ করার সুযোগ দেয়া মানেই অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া।

৫.

প্রতিবছরই বাংলা একাডেমিতে যে সাধারণ সভা (এজিএম) অনুষ্ঠিত হয়, তার পেছনে বিস্তর অর্থ ব্যয় হয়ে যায়। যদিও বছরে একদিন এমন আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টির ফলে একাডেমির সাধারণ সদস্য, জীবন সদস্য এবং ফেলোরা একে অপরের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ পান এবং তাতে সারা দিন একাডেমি প্রাঙ্গণ মুখর থাকে এবং সে ক্ষেত্রে অর্থ ব্যয় অপরিহার্য। কিন্তু তারপরও দুপুরের খাবারে যে খরচ করা হয়, তা বেশি বলেই মনে হয়।

এ অবস্থায় খাবারের মেনুতে পরিবর্তন আনা যেতে পারে। যেমন বছরের পর বছর বার্মিজ রুইমাছ, পোলাও ভাত, মুরগির রোস্ট খাওয়ানোর পরিবর্তে সে ক্ষেত্রে অন্য কিছু করা যেতে পারে। কারণ সবাই কিন্তু পোলাও ভাত খেতে উৎসাহী নন। তাই সাদা ভাত/খিচুড়ি, মুরগি বা বিকল্প কিছু করে খাবারে বৈচিত্র্য আনলে তা মূল্যসাশ্রয়ীও হতে পারে। মোটকথা, এজিএমের দিনে দুপুরের খাবারের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভেবে দেখা যেতে পারে।

পাদটীকা : পরিশেষে বলব, বাংলা একাডেমির প্রতি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তথা সরকারের দৃষ্টি প্রদানের প্রয়োজন আছে। বর্তমান অবস্থায় মনে হচ্ছে, সরকার কর্তৃক সেখানে একজন কবি-সাহিত্যিককে ডিজি পদে নিয়োগ দিয়ে বছরে একবার বইমেলার আয়োজন করাতে পারলেই যেন বাংলা একাডেমির গুরুদায়িত্ব পালন শেষ হয়ে গেল। আসলে কিন্তু তা নয়।

বাংলা একাডেমির কার্যক্রমকে আরও ব্যাপক স্তরে নিয়ে যেতে হলে সেখানকার কার্যক্রমে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। সেখানকার বিভিন্ন চেয়ারে দেশের বরেণ্য সাহিত্যিক, জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের বসিয়ে একাডেমির কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করে সারা বাংলায় তার ব্যাপক প্রসার-পরিচিতি ঘটাতে হবে। বর্তমানে বাংলা একাডেমির কার্যক্রম একমাত্র ঢাকাকেন্দ্রিক। দেশের কোথাও এর কোনো শাখা নেই।

শিল্পকলা একাডেমির মতো বাংলা একাডেমিরও দেশের প্রতিটি জেলায় শাখা খোলার প্রয়োজন আছে কিনা, সে বিতর্কে না গিয়ে বলতে চাই- বাংলা একাডেমিকে শুধু ঢাকার বর্ধমান হাউসের মধ্যে আটকে রেখে সারা দেশের মানুষের কাছে এ প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্ব ও অবদান পৌঁছে দেয়া সম্ভব নয়। জেলায় জেলায় শাখা না খুলেও বিকল্প কিছু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের একাডেমির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়।

আপাতত প্রতিটি জেলায় বাংলা একাডেমির একটি পাঠাগার স্থাপন করে জেলা সদরে একাডেমির একটি উপকমিটি করা যায়। আর এমন একটি পাঠাগারকেন্দ্রিক জেলা কমিটি বা উপকমিটির মাধ্যমে নতুন মেধাও অন্বেষণ করা যায়। কারণ সারা দেশে এমন প্রচুর লেখক, সাহিত্যিক, গবেষক, অনুবাদক আছেন, যাদের পক্ষে পাণ্ডুলিপি হাতে নিয়ে ঢাকায় ঘোরাঘুরি করা সম্ভব নয়।

তাছাড়া এই শ্রেণীর মানুষ অধিকাংশই বয়স্ক এবং আর্থিকভাবে অসচ্ছল। তাই প্রতিটি জেলায় বাংলা একাডেমির একটি করে পাঠাগারকেন্দ্রিক কমিটি বা উপকমিটি থাকলে থানা, ইউনিয়ন ও গ্রামের মানুষ পর্যন্ত তাদের মেধা ও মনন বিকশিত করার সুযোগ পাবেন। এ বিষয়টিও ভেবে দেখার জন্য বাংলা একাডেমির প্রতি অনুরোধ জানানো হল।

মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×