প্রতিমার্চনা ও বৈদিক সরস্বতী

  বলাই চন্দ্র দত্ত ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পূজা,

সনাতন ধর্মশাস্ত্রে দেবদেবীর প্রতিচ্ছবি নির্মাণের শাস্ত্রীয় বিধান রয়েছে। শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী প্রতিমায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। তখন তা জড়বস্তু হলেও দিব্যগুণসম্পন্ন হয়ে ওঠে। বৈদিক শাস্ত্রে বিগ্রহ নির্মাণ করে পূজা করার বিধান বর্ণিত হয়েছে। ঋগ্বেদের মন্ত্রের নির্দেশ- ‘যিনি বহুলোকের কীর্তনীয় বিষ্ণুকে হব্য দান করেন, যিনি যুগপৎ উচ্চারিত স্তোত্রের দ্বারা পূজা করেন এবং মনুষ্যগণের হিতকর বিষ্ণুর পরিচর্যা করেন, সে মর্ত্যধন ইচ্ছা করে শীঘ্র প্রাপ্ত হন (৭/১০০/১)।

বিগ্রহসেবা প্রসঙ্গে শ্রীমদ্ভাগবতের একাদশ স্কন্ধে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে- ‘ব্রাহ্মণের উচিত নিষ্কপটে প্রেম ও ভক্তিযুক্তভাবে উপযুক্ত উপকরণের মাধ্যমে উপাসকের হৃদয়ে উদিত আমার শ্রীবিগ্রহকে ইষ্টদেবরূপে আরাধনা করা।’ এখানে ভগবানের রূপ নির্মাণে আট রকম উপাদানের কথাও বলা হয়েছে।

দেববিগ্রহ নৈবেদ্য গ্রহণ করে। পঞ্চমহাভূত- ভূমি, জল, অগ্নি, বায়ু ও আকাশের তৈরি মহাজগতের সবকিছু তার থেকে প্রকাশিত হয় এবং প্রলয়কালে সবকিছু ধ্বংস হয়ে পুনরায় সূক্ষ্মরূপে তারই মধ্যে প্রবিষ্ট হয় (গীতা ৯/৭)। অন্যভাবে বিষয়টিকে সহজ করা যায়- ক্যামেরায় পাসপোর্ট সাইজের ছবি তুললে একজন মানুষের অর্ধাঙ্গ ছবি হয়, পূর্ণাঙ্গ হয় না।

ব্যক্তি তার নিজের অবস্থানে অবিকল থাকে। তেমনি সর্বশক্তিমান পরমেশ্বর ভক্তের নিবেদিত নৈবেদ্য অবিকৃত রেখে সূক্ষ্মভাবে গ্রহণ করে। অর্থাৎ দেবদেবীরাও ভগবান প্রদত্ত দিব্যশক্তির প্রভাবে শুধু দৃষ্টিপাতের দ্বারা অথবা সরাসরি নৈবেদ্য গ্রহণ করে।

ঋগ্বেদ সংহিতায় বিদ্যাদেবী সরস্বতীর মন্ত্রে বলা হয়েছে- ‘পাবকা নঃ সরস্বতী বাজেভির্বাজিনীবতী। যজ্ঞং বষ্টূ ধিয়াবসূঃ॥’ পবিত্রা, অন্নযুক্ত যজ্ঞবিশিষ্টা ও যজ্ঞফলরূপধনদাত্রী সরস্বতী আমাদের অন্নবিশিষ্ট যজ্ঞ কামনা করুন (১/৩/১০)। সরঃ অর্থ জল, সরস্বতীর প্রথম অর্থ নদী। আর‌্যাবর্তে সরস্বতী নামে যে নদী আছে তাই প্রথমে সরস্বতী দেবী বলে পূজিত হয়েছিলেন।

গঙ্গা যেমন হিন্দুদের উপাস্যা দেবী, প্রথমে হিন্দুদের পক্ষে সরস্বতী সেরূপ ছিলেন। অচিরে সরস্বতী বাগ্দেবীও হলেন। যাস্ক বলেছেন- ‘তত্র সরস্বতী ইতি এতস্য নদীবদ্বেতাবচ্চ নিগমা ভবন্তি।’ পুরাকালে সরস্বতী নদীতীরে যজ্ঞ সম্পাদন হতো এবং মন্ত্র উচ্চারিত হতো, ক্রমে সে সরস্বতী নদী পবিত্র মন্ত্রের দেবী ও বাগ্দেবী বলে পরিণত হলেন। ঋগ্বেদ-সংহিতার অন্যত্রে আছে- ‘শূচি এবং দেবগণে মধ্যস্থা হোমনিষ্পাদিকা ভারতী, ইলা এবং সরস্বতী (অগ্নির মূর্তিত্রয়) যজ্ঞের উপযুক্তা হয়ে কুশের ওপর উপবেশন করুন (১/১৪২/৯)। ভারতী স্বর্গস্থ বাক, ইলা পৃথিবীস্থ এবং সরস্বতী অন্তরীক্ষের বাক।

বেদে সরস্বতীকে ‘দেবীতমে’, ‘অম্বিতমে’ ও ‘নদীতমে’ অভিধায় আবাহন করা হয়েছে। সম্বোধিত পদে যথাক্রমে দেবীশ্রেষ্ঠা, মাতৃশ্রেষ্ঠা ও নদীশ্রেষ্ঠার অর্থ ধারণ করে। জ্ঞানপীযূষ দানে আমাদের ন্যায় অবোধ, অজ্ঞান, অসহায় সন্তানকে তিনি নিত্য প্রতিপালন করেন, আমাদেরকে তমসা থেকে আলোকদীপ্ত পথে যেতে শিক্ষা দেন, জননীর মতো আমাদের মূক কণ্ঠে ভাষা দেন, তাই তিনি অম্বিতমা।

বেদভাষ্যকার সায়ণাচার্য সরস্বতীর দ্বিবিধা- বিগ্রহবতী দেবীরূপা এবং তোয়াবতী নদীরূপা উল্লেখ করেছেন। বেদে ‘পাবকা’ অর্থে দেবীপক্ষে- যিনি পাপনাশ করে মানবহৃদয়কে জ্ঞানালোকে শুদ্ধ ও নিষ্কলুষ করেন, অর্থাৎ পাপনাশিনী। আর নদীপক্ষে বেদমাতা ‘বাজিনীবতী’ অর্থাৎ যার স্বচ্ছ ও নির্মল জলে অবগাহন করে মানুষ শরীর ও মন শীতল ও শুদ্ধ করে। আবার বাজিনীবতী মানে অন্নদাত্রী।

অন্ন উৎপন্ন হয় বর্ষণের দ্বারা, বর্ষণ হয় মেঘ থেকে, মেঘের সৃষ্টি যজ্ঞ দ্বারা এবং যজ্ঞের দাত্রী সরস্বতী। ঋগ্বেদে ‘যজ্ঞ দধে’ (১/৩/১১)- যজ্ঞের ধারণকর্ত্রী। প্রতি যজ্ঞে মন্ত্র, স্তুতি, অগ্নি ও হবিঃ প্রয়োজন হয়। বাগ্দেতারূপে সরস্বতীই মন্ত্র, জ্যোতিরূপে অগ্নি এবং হবিরূপে অন্নদাত্রী। তার সাহচর্য ছাড়া যজ্ঞ সম্পন্ন হওয়া অসম্ভব।

বৈদিক স্তুতির মধ্যে বেদমাতার দুটি রূপ- ‘দেবী’ ও ‘নদী’ প্রকাশিত হয়েছে। সাধক ও শিল্পীর শুদ্ধ মননশক্তির সিদ্ধ স্বরূপে দেবীর যে অপরূপ মূর্তি নির্মিত হয়েছে, বর্তমানেও মৃন্ময়ী প্রতিমায় সে মূর্তি ঘরে ঘরে পূজিত হয় বা হচ্ছে। তবে সে মূর্তিভাবনায় দেবী সরস্বতী ও নদী সরস্বতী- দু’ভাবই সংরক্ষিত। দেবজ্যোতি এবং নদী স্বচ্ছতার সমন্বয়ে বাগ্দেবী শ্বেতবর্ণা। তার বসন, ভূষণ, বাহনেও ওই রং- তাই সর্বশুক্লা।

নদীর কল্লোলধ্বনি শ্যামসঙ্গীতের মোহন বীণা দেবীর শ্রীকরকমলে। ঋষি, মুনি, বিদ্যার্থীর কলনিনাদের প্রতীক পুস্তক ও গ্রন্থ রচনার সহায়ক লেখনী ‘কলম’ তার হাতে। নদী সরস্বতীর দু’কূল আলোকিত করে ফুটে থাকে শত শত শ্বেত শতদল আর তার জলে বিহার করে অসংখ্য কলহংস। শতদল দেবীর আসন এবং হংস তার বাহন। জ্ঞানভাবে দেবীর মূর্তি তৈরি করলেও তিনি হয়ে ওঠেন নদীলক্ষণা।

শ্বেতবর্ণ সত্ত্বগুণের প্রকাশক রং। দেবী বীণাপাণিও শুদ্ধজ্ঞানময়ী, আলোকস্বরূপা। তাই তার সঙ্গে শুভ্রবর্ণের এত ঘনিষ্ঠতা। সত্ত্ব গুণাশ্রিত যিনি, জ্ঞানের আধার তিনি। জ্ঞানসাধনার সঙ্গে আত্মিক বিকাশ জড়িত। সরস্বতী পূজার সর্বোচ্চ লক্ষ্য হচ্ছে ক্ষদ্র ‘অহং’-এর মুকুলটিকে জ্ঞানতপনের আলোতে পদ্মের মতো প্রকাশ করা। যাতে সব তমঃ, জাড্য ও সংকোচনের অবসান হয়ে নববোধশক্তির জাগরণ ঘটে। এটিই জীবনের পরমপূর্ণতা।

আলস্য দূর করার কারণেই বাসন্তী পঞ্চমীতে বেজে ওঠে দেবীর বোধনশঙ্খ। শীত ঋতু জাড্যময়। দিবা অপেক্ষা রাতকাল অধিক। আটটি প্রহরের অধিকাংশ সময় পৃথিবী থাকে তমসাচ্ছন্ন ও কুহেলিকাময়। বসন্তের আগমনে জড়তা কেটে যায়। প্রকৃতি, প্রাণী ও জীবকুলে জাগে আনন্দের চঞ্চল লহরী। এ ঋতু দেবী সরস্বতীর আবাহন, পূজনের উপযুক্ত সময়। পূজাকালে দেবী মৃন্ময়ী প্রতিমায় অধিষ্ঠিতা হন। আমরা দেবীর কৃপা ও আশীর্বাদ লাভে ধন্য ও কৃতার্থ হই।

বলাই চন্দ্র দত্ত : শিক্ষক, কে এল জুবিলী স্কুল ও কলেজ

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×