বিএনপির মুক্তবুদ্ধির নেতাকর্মীদের এগিয়ে আসতে হবে

  ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিএনপি
বিএনপি । ফাইল ছবি

হঠাৎই বলা যায় সংবাদটি ছড়িয়ে পড়েছে, জামায়াত বিএনপি ছাড়ছে। জামায়াতের কেউ কেউ একটি হালকা কারণও দেখিয়েছেন যে, বিএনপির সঙ্গে থেকে সরকারি পীড়নের অংশীদার তারা হতে চান না। বিএনপির কোনো কোনো নেতাও জামায়াত বিচ্ছিন্ন হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

সর্বশেষ লন্ডন থেকে জামায়াত নেতা ও আইনজীবী ব্যারিস্টার রাজ্জাকের জামায়াত পরিত্যাগের ঘোষণা চলমান আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে মনে হচ্ছে। তবে এ পর্যন্ত তথ্যে মনে হচ্ছে, বিএনপি নয়; জামায়াতই বিএনপিকে ছেড়ে যেতে চেয়েছে।

এতে নিশ্চয়ই বিএনপির একটি অংশ স্বস্তি প্রকাশ করছে আর অন্য অংশে শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আজকের লেখাটি অবশ্য এ নতুন সংবাদকে উপজীব্য করে নয়।

লেখাটির প্রেরণা জনাব আবদুল জব্বার। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারী। খুব বেশিদূর লেখাপড়া করতে পারেননি জব্বার সাহেব। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর সংসারের চাপে পড়া বন্ধ করে চাকরিতে ঢুকতে হয়। তার ভাষায় ‘ছোট চাকরি’ করে কোনোক্রমে সংসারধর্ম পালন করে যাচ্ছেন।

জনাব আবদুল জব্বার ঘোরতর বিএনপি সমর্থক। বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। ১৯৭৪ সালে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা ওদের জমি দখল করে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছ থেকে সুবিচার পাননি। সেই থেকে ওদের পরিবার আওয়ামী লীগের ওপর থেকে সমর্থন তুলে নেয়।

তরুণ জব্বারকে জিয়াউর রহমানের খালকাটা কর্মসূচি আকৃষ্ট করেছিল। তার বাবা এক সময় যেমন বঙ্গবন্ধুর ভক্ত ছিলেন, তিনি তেমনি জিয়াউর রহমানের ভক্ত। কথা বললে বোঝা যায়, দারুণ রাজনীতি সচেতন মানুষ তিনি। এ বিএনপি অন্তপ্রাণ জব্বার সাহেব পরিচয়ের সূত্রে একটি আবদার নিয়ে এসেছিলেন।

বললেন, স্যার; আমি সবসময় পত্রিকার রাজনৈতিক কলাম পড়ার চেষ্টা করি। আপনার লেখাও পড়ি। আমি হেসে বললাম, আমি তো সুযোগ পেলে আপনার দলের সমালোচনা করি। বিষয়টি নিশ্চয়ই আপনার ভালো লাগে না। একগাল হাসলেন জব্বার সাহেব।

হাসলে তার পান খাওয়া দাঁত বেরিয়ে আসে। বললেন, আপনি তো স্যার আওয়ামী লীগকেও ছাড়েন না। আপনারা তো স্যার দলগুলোর ভালোর জন্যই লেখেন। দলগুলোর বরঞ্চ আপনাদের ধন্যবাদ দেয়া উচিত। শুনে বেশ ভালো লাগল। আমাদের ‘ধন্যবাদ’ দেয়ার জন্য তাহলে জব্বার সাহেবদের মতো লোকও আছেন।

এবার জব্বার সাহেব সোজাসুজি বললেন, স্যার; আপনার কাছ থেকে একটি উপকার পাওয়ার জন্য এসেছি। আপনারা দয়া করে আমাদের দলটাকে বাঁচান। জব্বার সাহেবের আবেগ আমাকে স্পর্শ করল। তবে বিষয়টি বুঝে উঠতে পারলাম না। আমি সাধারণ একজন শিক্ষক।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করা ছাড়া কোনো দলের সঙ্গে আমার সংশ্লিষ্টতা নেই। এমন একজন ঢোঁড়াসাপ মার্কা কলাম লেখক কেমন করে বিএনপিকে বাঁচাবে!

আসলে জব্বার সাহেবের চাওয়া- আমরা যাতে বিএনপি নেতৃত্বকে সঠিক পথের দিশা দেখাই। তা না হলে তার প্রিয় দলটি নিঃশেষিত হয়ে যাবে। আমি খুব বিস্মিত হলাম। নেতাকর্মীরা না ভাবলেও সাধারণ সমর্থকদের মধ্যে যে মুক্তচিন্তার দলভক্ত মানুষ রয়েছেন, জব্বার সাহেবকে না দেখলে তা বিশ্বাস করা যেত না।

এরপর একজন স্বল্পশিক্ষিত দলঅন্তপ্রাণ জব্বার সাহেব যেভাবে নিজ দলের অন্তক্ষরণের বিচার করলেন, তাতে আমার মাথা নুয়ে এলো।

বারবার একটি দুঃখ আমরা করে থাকি- প্রত্যেক দলেই শিক্ষিত, মেধাবী মানুষদের অবস্থান আছে। যেমন বিএনপির কথাই যদি বলি, এখানে আছেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিকসহ নানা পেশাজীবী গোষ্ঠী।

স্বাভাবিকভাবে প্রত্যাশা করা হয়, এরা হবেন দলের গাইড-ফিলোসফার। দল ভুল পথে হাঁটলে তারা সতর্ক করে দেবেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, তারা বিনা প্রতিবাদে দলের সব কর্ম-অপকর্ম মেনে নেন।

জোট সরকারের আমলে বেগম জিয়ার ইচ্ছায় যখন সব সিনিয়র নেতার ঘাড় টপকে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব করা হল তারেক রহমানকে, তখন রাজনৈতিক নেতারা না হয় মেরুদণ্ড সংকটের কারণে নীরবতা বজায় রেখেছিলেন; কিন্তু দলের গাইড-ফিলোসফার বুদ্ধিজীবীরা কথা বলার মতো সাহসী হলেন না কেন?

ক্ষমতাবান হওয়ার পর পারিবারিক রাজনীতি পাকাপোক্ত করার জন্য কর্মীদের মুখে যখন তুলে দেয়া হল নতুন স্লোগান ‘আগামীর রাষ্ট্রনায়ক তারেক জিয়া’ তখনও তারা কেন মুখ খুলে বললেন না- এ তরুণের মাথা খারাপ করে দেয়া হচ্ছে। ঘাট ছেড়ে এখন আঘাটায় হাঁটা শুরু করে দেবে।

যখন হাওয়া ভবন হল, আরেক দুর্নীতির তীর্থভূমি তৈরি করা হল, তখন দলের বিবেকবানরা কেন নিশ্চুপ বনে গেলেন? বরঞ্চ তখন জাতীয়তাবাদী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নেতা, আইনজীবী নেতা থেকে শুরু করে অন্য জাতীয়তাবাদী পেশাজীবী নেতারা কি নানা ধরনের পদপ্রাপ্তির জন্য তারেক জিয়ার দরবারে ধরনা দিতেন না?

২০০৮-এর নির্বাচনে ভূমিধস পরাজয়ের পর তৃণমূলের নেতাকর্মীরা যখন নিজ দলের সন্ত্রাস, দুর্নীতি আর জামায়াতসংশ্লিষ্টতাকে দায়ী করলেন; তখনও নীরব থাকলেন বিএনপির বিবেক বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়।

নেতারা যখন আত্মশুদ্ধির পথে না গিয়ে গৎবাঁধা বুলিতে নির্বাচনে কারচুপি করে বা দেশি-বিদেশি চক্রান্তে বিএনপিকে হারিয়ে দিয়েছে ধরনের রেকর্ড বাজাচ্ছিলেন, তখনও সত্যকে মেনে নেয়ার কথা দলীয় বিবেকরা একবারও বললেন না।

সেসময় একদিন শিক্ষক লাউঞ্জে চায়ের কাপে ঝড় তুলতে তুলতে একজন জাতীয়তাবাদী শিক্ষক যখন দম দেয়া পুতুল রাজনৈতিক নেতাদের মতো করে বলছিলেন, নির্বাচনে ষড়যন্ত্র করে বিএনপিকে হারিয়ে দেয়া হয়েছে; তখন আমি চলমান বাস্তবতা মেনে নিয়ে খুব বিস্মিত হইনি।

সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে সহকর্মীকে যখন চেপে ধরলাম এবং বললাম, সেই নির্বাচনে আপনি তো আমার সঙ্গেই অনেক ভোট কেন্দ্র ঘুরে দেখেছেন। ব্যাপকভাবে নারী-পুরুষ ভোটারের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখে আমরা আপ্লুত হয়েছিলাম।

সর্বত্র নৌকার পক্ষে একটি জোয়ার বুঝতে পেরে আমি যখন মহাজোটের অভূতপূর্ব বিজয়ের সম্ভাবনার কথা বলছিলাম, আপনি প্রতিবাদ করেননি। বাস্তবতা মেনে কষ্টমাখা মুখ নিয়ে নীরব থেকেছেন। আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবেকবান শিক্ষক হয়ে কলের গান বাজানেওয়ালা দলীয় রাজনৈতিক নেতাদের মতো কথা বলতে আপনার বিবেক কি সায় দেয়? আমার সহকর্মীটি এদিনও প্রতিবাদ না করে নীরব থাকলেন।

আমি আমার সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক আছে এমন একজন উদারমনা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী নেতার কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম, বিএনপি ক্ষমতায় এলে ওপরের সারির এক-দু’জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হতে পারেন। তাই এ সম্ভাবনাময় নেতারা বেগম জিয়া ও তারেক রহমানের দৃষ্টিতে ও আস্থায় থাকার জন্য যা খুশি করতে পারেন, আপনারা কেন বিবেকবর্জিত হয়ে গড্ডলিকায় গা ভাসান? উত্তরে বললেন, ছোটখাটো চাওয়া-পাওয়ার চিন্তাও কম-বেশি সবারই আছে।

তাছাড়া রাজনীতির একটি মোহ আছে, যা সবাইকে অন্ধ করে দেয়। প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার আনন্দ পেতে চায় রাজনীতিসংশ্লিষ্টরা। এখনকার রাজনীতিতে সুপ্রিম নেতানেত্রীর বিরুদ্ধে কথা বলা মানা। দেখেছেন না, এক সময় অমন কথা বলে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা কেমন সাইজ হয়ে গিয়েছিলেন।

সম্ভবত ২০০৯ সালের কথা। বিএনপির মুক্তিযোদ্ধা সংবর্ধনা হয়েছিল ঢাকায়। সম্মেলন দেখে বোঝা গিয়েছিল, বিএনপিতে অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের বিএনপিকে সমর্থন করা দোষের কিছু নয়। কিন্তু জামায়াত ও মুক্তিযোদ্ধাদের তো একপাতে ভাত খাওয়া অসম্ভব। আমরা কি শুনেছি বা পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে যে, বিএনপির মুক্তিযোদ্ধারা দলীয় নেতাদের কাছে প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, জামায়াত-বন্ধুত্ব ত্যাগ করতে হবে?

কিন্তু না, বিএনপির সাধারণ সমর্থকরা অনেক বেশি যুক্তিবাদী। কোনো কিছু পাওয়ার লোভে নয়; প্রকৃত অর্থে দলকে ভালোবাসেন তারা। তাই সবকিছু সাদা চোখে দেখেন। ভালো-মন্দ বুঝতে পারেন তীক্ষ্ম বিশ্লেষণে। এদেরই প্রতিনিধি কলেজের গণ্ডি না পেরোনো, ‘ছোট চাকরি করা’ আবদুল জব্বার সাহেব।

অন্ধত্বের অঞ্জন যার চোখে নেই। দলের প্রতি ভালোবাসা থেকে তিনি দলের কল্যাণে সমালোচনা করতে চান। বিএনপি যে পথে হাঁটছে, তাতে পা পিছলে অন্ধকার গহ্বরে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। এ সত্য জব্বার সাহেবদের চোখে স্পষ্ট বলেই দলের প্রতি ভালোবাসা থেকে তারা আতঙ্কিত।

আর তাই যেন অনন্যোপায় হয়ে স্রোতের শ্যাওলার বিবেচনায় আমার মতো অজ্ঞাতকুলশীল কলাম লেখকের দ্বারস্থ হচ্ছেন। এ সরল মানুষগুলো শুধু এ সত্যটি বুঝতে চান না, আমাদের এসব ছাইপাশ লেখা তাদের নেতাদের কাছে পাঠের অযোগ্য।

তারপরও জব্বার সাহেবের অনুরোধ, আমি যেন লিখি ১. জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা থেকে বিএনপিকে বেরিয়ে আসতে হবে। জামায়াত-বন্ধুত্বের কারণে বিএনপির অনেক সমর্থক ক্রমে হতাশ হয়ে পড়ছেন; যা দলের ঐক্য নষ্ট করে ফেলবে, ২. তারেক রহমানের ইমেজ এখন আর বিএনপির জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না। বেগম জিয়া তারেক রহমানকে দিয়ে পারিবারিক রাজনীতি এগিয়ে নিতে চাইলে তা বিএনপিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তাই বিএনপিকে রক্ষা করতে হলে দলের ভেতর প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশপ্রেমিক সৎ নেতৃত্ব ছাড়া বিএনপির পুনর্গঠন সম্ভব নয়

৩. বাস্তবতা মেনে অভিমান না করে নির্বাচনগুলোতে সরকারকে ওয়াকওভার দেয়া যাবে না ৪. সংখ্যায় যাই হোক, বিএনপির নির্বাচিতদের সংসদে যাওয়া উচিত। এ জন্য নির্বাচনের মাঠে বিএনপিকে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। এখনও সময় আছে বিএনপির নিজেকে শোধরানোর।

আমি অবাক বিস্ময়ে আর শ্রদ্ধায় ঘোর বিএনপি সমর্থক জব্বার সাহেবের কথা শুনছিলাম। পাশাপাশি একটি নতুন উপলব্ধির কাছে পৌঁছতে পারলাম। বিএনপির রাজনৈতিক নেতা ও পেশাজীবী জাতীয়তাবাদী নেতাদের আচরণ দেখে দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন শঙ্কিত ছিলাম, তখন নতুন আশার আলো এনে দিলেন জব্বার সাহেব। যে দলে এমন মুক্তবুদ্ধির সমর্থক রয়েছে, সে দলের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ শতভাগই থাকে। শুধু প্রয়োজন জব্বার সাহেবের মতো সাহসী দল ও দেশপ্রেমিক মুক্তবুদ্ধির কর্মী-সমর্থকদের ঐক্যতান।

ড. একেএম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×