রুখতে হবে ভাষার মৃত্যু

প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  পবিত্র সরকার

একটা হল নিছক ঘটনা, শাসকের পুলিশের গুলিতে কিছু মানুষের মৃত্যু, তার মধ্যে তরুণ ছাত্রও ছিল বেশ কয়েকজন। এ উপমহাদেশে গত এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে এরকম ঘটনা বহুবার ঘটেছে। স্বাধীনতার জন্য, বন্দিমুক্তির জন্য, অত্যাচার আর শোষণের প্রতিবাদে, খাদ্য বা ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলনে, কোনো জনস্বার্থবিরোধী ব্যবস্থা বা আইনের বিরুদ্ধে, কলকারখানার অবৈধ লকআউট তোলার দাবিতে মানুষের মিছিলের ওপরে শাসকের পুলিশ গুলি চালিয়েছে বহুবার, তাতে বহু মানুষের মৃত্যুও ঘটেছে। কিন্তু ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকার ওই ঘটনাটার একটা নতুন অর্থ ছিল, যা তাকে আগেকার শাসকদের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডগুলো থেকে আলাদা করে দিয়েছিল। তা ঘটেছে আপাতদৃষ্টিতে একটি স্বাধীন দেশে, দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের পূর্ব অংশে- কিন্তু তখনই বোঝা যাচ্ছিল, পূর্ববঙ্গের জন্য ওই স্বাধীনতা এক প্রতারক চিহ্নমাত্র। তাকে পশ্চিম পাকিস্তানের একটি উপনিবেশে পরিণত করতে চায়। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠের (৫৪ শতাংশ) ভাষাকে, বাংলাকে, উপেক্ষা করে একটি সংখ্যালঘু ভাষা (৭ শতাংশ) উর্দুকে তারা সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে চায়। ১৯৪৮ সালের মার্চে পাকিস্তানের স্রষ্টা মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর প্রথম পূর্ববঙ্গ সফরে, তার ‘উর্দু, একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’- এই ঘোষণার পর থেকেই ছাত্রদের প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়েছিল। ১৯৫২-র ২১ ফেব্রুয়ারিতে তা এক তীব্রতার শীর্ষে পৌঁছাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের শোভাযাত্রায় পাকিস্তানি পুলিশের গুলিতে খুন হয় গেল আব্দুস সালাম, রফিকউদ্দিন, আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, সম্ভবত সালাউদ্দিন নামে আরেকজন। পরদিন, ২২ তারিখে পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হল সফিউর রহমান আর ওহিউল্লাহ নামে এক ন’বছরের বালকের।

এখন ঐতিহাসিক পশ্চাৎপ্রক্ষেপে বোঝা যায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই আরম্ভ, বা আরম্ভের আগেকার আরম্ভ। কিন্তু তার প্রতিক্রিয়া শুধু বাংলাদেশের সীমানায় আবদ্ধ রইলো না। সেই ঘটনা রইলো না শুধু একটি জাতির ইতিহাসের ভূমিকম্পন হিসেবে। তার অর্থ ছড়িয়ে গেল মানব-অস্তিত্বের সর্বত্র। কারণ মানুষমাত্রেরই ভাষা আছে, আর এই ভাষা তার মনুষ্যত্বের অভিজ্ঞান। ভাষা দিয়েই তার সমস্ত যাপন, শিক্ষাদীক্ষা, সংস্কৃতি-প্রবেশ, কর্ম, অগ্রগতি, সংগ্রাম। এই ভাষাতেই তার সুখ-দুঃখ-ঘৃণা-ভয়ের সংবাদ, এই ভাষাতেই তার বিপুল সৌন্দর্যময় এক প্রকাশ, যার নাম সাহিত্য। অর্থাৎ ভাষা তার সবরকম মানবিক অস্তিত্বের সূত্র। কাজেই ভাষা যখন ব্যাহত, অপমানিত বা বিধ্বস্ত হয় তখন তার অস্তিত্বের শিকড় ধরে টান পড়ে। তাই একুশে ফেব্রুয়ারি (বা পরে সিলেটের উনিশে মে) শুধু কোনো স্থান বা সময়ে আবদ্ধ বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, সমগ্র মানুষের জন্য একটি প্রতীক হিসেবে গৃহীত হওয়ার মতো ঘটনা। শেষ পর্যন্ত এই স্বীকৃতি এলো পৃথিবীর কাছ থেকে, ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে চিহ্নিত করার মধ্য দিয়ে। যা ছিল নিছক পূর্ববঙ্গের ভাষা-সংগ্রাম, যার এক সার্থকতা অর্জিত হয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন-সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠায়, তারই আরেক পরম সার্থকতা ঘটল এই ‘দিবস’-এর প্রতিষ্ঠায়। স্থানিক কণ্ঠস্বর, বাঙালির আর্ত ও ক্রুদ্ধ, প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠল সমগ্র মানুষের কণ্ঠস্বর- একইরকম আর্ত, ক্রুদ্ধ, প্রতিবাদী।

উঠল এমন এক সময়ে, যখন সমস্ত পৃথিবী মানুষের ভাষার ‘মৃত্যু’ নিয়ে উদ্বিগ্ন ও আতঙ্কিত। ওই ১৯৯৯ সালেই লিংগুইস্টিক সোসাইটি অব আমেরিকার মুখপত্র ‘এথনোলগ’ দেখিয়েছিল, পৃথিবীতে ৫১টি ভাষার বক্তা বেঁচে আছে মাত্র একজন করে, ৫০০ ভাষার বক্তা ১০০ জনের কম, ১০০০ ভাষার বক্তা ১০০০-এর বেশি নয়, তিন হাজার ভাষার বক্তা ১০ হাজারের কাছাকাছি, আর পাঁচ হাজার ভাষার বক্তা এক লাখের মতো। ভাষার সংখ্যাই যেখানে সাত হাজারের মতো, সেখানে এই হিসাব রীতিমতো আতঙ্কজনক। ভাষাবিজ্ঞানীরা এও অনুমান করেছেন যে, মানুষ যখন প্রথম ভাষা ব্যবহার করতে শুরু করল (আজ থেকে আনুমানিক পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ হাজার বছর আগে) তখন মানুষের ভাষার যে সংখ্যা ছিল আজ তার অর্ধেক টিকে আছে, আর এই একবিংশ শতাব্দীতে তারও অর্ধেক বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আর জীব বা উদ্ভিদের বৈচিত্র্যের বিলোপের মতোই ভাষা বিলোপও মানবসভ্যতার এক চরম ক্ষতি। ভাষা লোপের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায় একটা গোষ্ঠীর সমস্ত জ্ঞান, স্মৃতি, সাহিত্য, সঙ্গীত। এ তথ্য বহুল প্রচারিত যে, ইংল্যান্ডের কর্নিশ ভাষার শেষ বক্তী ডলি পেন্ট্রিথ মারা গেছেন ১৭৭৭ সালে, আর এই সেদিন ২০১০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি খবর বেরোলো আন্দামানের ‘বো’ ভাষার শেষ বক্তীও চলে গেছেন। মনে রাখতে হবে, একজন বক্তা থাকলেও ভাষা বেঁচে থাকে না, ভাষার কথোপকথনের জন্য দু’জনের দরকার হয়।

২.

আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারি উদ্যাপন তাই শুধু একটা শোক বা উৎসব পালন নয়, তা আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ ভাষার দিকে যদি চোখ না ফেরায়, যদি আমাদের ভাষাসংক্রান্ত আত্মজিজ্ঞাসায় উন্মুখ না করে, তাহলে এ দিনটি আমাদের কাছে কোনো সার্থকতা পায় না, নেহাতই অনুষ্ঠান হিসেবে আসে এবং চলে যায়। নিজেদের ভাষা নিয়ে আমাদের প্রশ্নগুলো ঠিক কী হওয়া উচিত? বহু সম্ভাব্য প্রশ্নের মধ্য থেকে কয়েকটিকে বেছে বলি, প্রথম প্রশ্ন : আমার ভাষার অবস্থান ঠিক কোথায়? সে কি নিজে বিপন্ন? হলে কতটা বিপন্ন, কোন্ কারণে কোন্ কোন্ ভাষার দাপটে বিপন্ন? আর যদি নিজে বিপন্ন না হয় (বা হয়ও), তারও দাপটে কি কোনো ভাষা বিপন্ন হচ্ছে?

হিসাব করলে দেখা যায়, পৃথিবীর বেশিরভাগ বড় ভাষা, বিশেষত আগেকার সাম্রাজ্যবাদ এবং পরে অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ পোষিত ভাষা অন্য অনেক ভাষার ওপর দাপট দেখিয়েছে, এখনও দাপট দেখিয়ে চলেছে। এসব ভাষার নিষ্ঠুর আধিপত্যে অনেক ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে, যে জন্য এগুলোকে killer language-ও বলা হয়। ভাষাধ্বংসের নাম কেউ কেউ (যেমন স্কুৎনাব কাঙ্গাস) দেন ‘ল্যাঙ্গুয়েজ মার্ডার’ বা ভাষাহত্যা। এই দাপুটে ভাষাগুলোর মধ্যে আছে ইংরেজি, স্প্যানিশ, আরবি, রুশ, পোর্তুগিজ এবং আরও কিছু ভাষা। এখন হয়তো সবাই সমান দাপুটে নেই, ইংরেজি সবার উপরে উঠে এসেছে। আর যেহেতু পৃথিবীর মাত্র ৪ শতাংশ লোক মোট চার হাজার ভাষা বলে, ওই সব ছোট ছোট ভাষাগোষ্ঠীর ভাষাগুলোই সবচেয়ে বেশি বিপন্ন, তারাই মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছে।

ভাষার হঠাৎ মৃত্যু হতেই পারে, যদি কোনো যুদ্ধে বা মড়কে সমস্ত ভাষাবক্তা উৎসন্ন হয়ে যায়। কিন্তু এগুলো তো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা নয়। সাধারণভাবে ভাষার মৃত্যু একটি ধীর ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। প্রথমে ভাষা দুর্বল হতে থাকে, যখন ভাষার বক্তারা নিজের ভাষা ছেড়ে অন্য দাপুটে ভাষাকে ধীরে ধীরে গ্রহণ করতে থাকে, ‘আমার ভাষাটা তেমন কোনো কাজের নয়, এ ভাষা নিয়ে আমি জীবনে খুব একটা দূর পৌঁছতে পারব না’- এ রকম একটা ধারণা বেশিরভাগ বক্তার মনে তৈরি হয়। তার ভাষায় সে শিক্ষা পায় না, চাকরিতে ব্যবসায় তার ব্যবহার সীমিত, দেশের রাজনৈতিক কাজ, প্রশাসন, আইন ইত্যাদি চলে অন্য কোনো দাপুটে ভাষায়, তখন সে এ রকম ভাবতেই পারে। বক্তারাই তখন নিজেদের ভাষাকে অবহেলা করতে থাকে। তাতে যত সাহিত্য থাক, সঙ্গীত থাক, নিজস্ব জ্ঞান থাক, আধুনিক পৃথিবীর অর্থ ব্যবস্থায় তার স্থান সংকুচিত হয়ে আসে। ফলে সে ভাষা বক্তাদের নিজেদের কাছেই অবহেলিত হতে থাকে। অল্প বিপন্নতা থেকে সে ভাষা ক্রমশ চরম বিপন্নতায়, এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুতে পৌঁছে যায়।

এরই বিরুদ্ধে রীতিমতো সংগ্রাম শুরু হয়েছে গত শতাব্দীর আশির বছরগুলো থেকে। ‘এন্ডেনজার্ড ল্যাঙ্গুয়েজেস’ সম্বন্ধে সমস্ত পৃথিবী সচেতন হয়ে উঠেছে, এবং পশ্চিমেও বহু সমিতি গড়ে উঠেছে ওইসব ক্ষুদ্র ভাষার মৃত্যু প্রতিরোধের লক্ষ্য নিয়ে। ইউনেস্কো ভাষার এই বিপন্নটার নানা মাত্রা স্থির করেছে। কিছু ভাষা দুর্বল (vulnerable), কিছু ভাষা নিশ্চিতভাবেই বিপন্ন (definitely endangered), কিছু ভাষা তীব্রভাবে বিপন্ন (critically endangered), কিছু ভাষা মুমূর্ষু (moribund), আর কিছু ভাষা মৃত (extinct)।

এসব বিপন্নতার নানা পর্যায় থেকে, এমনকি মৃত্যু থেকে ভাষাকে উদ্ধার করার নানা প্রকল্প ভাষাপরিকল্পকেরা হাতে নিয়েছেন। মৃত ভাষাকেও পুনর্জীবিত করা যায়, ইসরাইলের হিব্রু ভাষা তার প্রমাণ। এমনকি ইংল্যান্ডের সেই মৃত কর্নিশ ভাষা, জাপানের আইনু, আমেরিকার হাওয়াইয়ান ইত্যাদিসহ নানা ভাষা নাকি আবার জীবন ও বক্তা ফিরে পাচ্ছে, এই সুখবর আমরা পাচ্ছি। মৃত ভাষার যদি জীবন ফিরিয়ে দেয়া যায়, তাহলে ভাষাকে তার মৃত্যুর আগেকার অন্যান্য অবস্থা থেকে কেন তুলে আনা যাবে না? তাই ভাষার পুনর্জীবন শুধু নয়, পুনরুজ্জীবনেরও (revitalization) চেষ্টা চলছে। এ চেষ্টা কতটা সফল হবে তা নির্ভর করছে অনেক ঘটনার ওপর। বক্তারা কতটা চায় তাদের ভাষা পুনর্জীবিত বা পুনরুজ্জীবিত হোক? তাদের চাওয়া আবার নির্ভর কর এই ভাষা তাদের যাপনে, শিক্ষাদীক্ষায়, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উচ্চাশা পূরণে কতটা সহায়তা করতে পারবে তার ওপর।

এমন হতেই পারে যে, ‘সাফল্যে’র ভাষা শেখা ও ব্যবহারের পাশাপাশি তারা তাদের নিজেদের ভাষাও ছাড়তে চাইবে না। একাধিক ভাষা শেখা এবং তা নিয়ে কাজ করা মানুষের ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। কিন্তু যদি এমন হয় যে, তারা মাতৃভাষাকে চায় না, তখন ভাষার পুনরুজ্জীবনের কাজ কঠিন হয়ে যায়। ভরসার কথা এই যে, সব ভাষাতেই ‘না-চাওয়া’র প্রবণতা কমছে।

বাংলার ক্ষেত্রে কি আমরা সেই কথা নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি? একুশে ফেব্রুয়ারিতে সেই এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন।

পবিত্র সরকার : সাবেক উপাচার্য, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা