স্বদেশ ভাবনা

ভোট প্রদানে ভোটাররা অনাগ্রহী কেন

প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আবদুল লতিফ মণ্ডল

ফাইল ফটো

২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন মেয়রের শূন্যপদে এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে (ডিএনসিসি) ১৮টি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে (ডিএসসিসি) ১৮টি নবগঠিত ওয়ার্ডে অর্থাৎ দুই সিটি কর্পোরেশন মিলে ৩৬টি নবগঠিত ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর এবং ১২টি সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল।

নির্বাচন কমিশন ঘোষিত চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী, এ নির্বাচনে প্রধান আকর্ষণ ডিএনসিসি মেয়র পদে নিবন্ধিত ভোটারদের ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট দিয়েছে। এদিকে ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার কম হওয়ার দায় নিতে অস্বীকার করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বলেছেন, ‘উপস্থিতি যে কম, এর দায় ইসির নয়; দায় প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোরই।’

আওয়ামী লীগ সরকার সিইসির বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচন কমিশন প্রধানের এ বক্তব্য এবং তার প্রতি সরকারের সমর্থন কতটা গ্রহণযোগ্য, তা আলোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও বিকাশের অন্যতম প্রধান শর্ত হল বহুদলীয় অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচন- সে নির্বাচন জাতীয় বা স্থানীয় যে পর্যায়েরই হোক। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার সাড়ে চার দশকের বেশি সময়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯১, ২০০৬ (জুন), ২০০১ ও ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনগুলো ছাড়া অন্য কোনো জাতীয় নির্বাচন একই সঙ্গে বহুদলীয় অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু হয়নি। স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।

স্বাধীনতার তিন বছর পার হতে না হতেই দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের স্থলে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণতন্ত্রের কণ্ঠ প্রায় রোধ করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর দু’জন সামরিক শাসক সামরিক ও বেসামরিক পোশাকে প্রায় ১৫ বছর দেশ শাসন করে। গণতন্ত্র প্রায় শৃঙ্খলিত হয়ে পড়ে। এ সময়কালে অনুষ্ঠিত হয় তিনটি জাতীয় নির্বাচন।

স্বাধীনতা-পরবর্তী দু’দশকের জাতীয় নির্বাচনগুলোয় অনিয়ম ঘটলেও এসব নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল মোটামুটি সন্তোষজনক। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ১৯৭৩, ১৯৭৯, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ জাতীয় নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল যথাক্রমে ৫০ দশমিক ৯, ৫১ দশমিক ৩, ৫৯ দশমিক ৩৮ ও ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ।

নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের গণদাবির মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর জাতীয় পার্টি সরকারের পতনের পর প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন অন্তরবর্তীকালীন সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ৫৫ দশমিক ৪ শতাংশ। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কেবল ক্ষমতাসীন বিএনপির অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার নেমে আসে ২১ শতাংশে। ১৯৯৬ সালের মার্চে বিএনপি সরকারের আমলে জাতীয় নির্বাচনের সময় সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ওই বছরের জুনে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার দাঁড়ায় ৭৫ শতাংশে।

নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত ২০০১ সালের অষ্টম এবং ২০০৮ সালের নবম জাতীয় নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার দাঁড়ায় যথাক্রমে ৭৪ দশমিক ৯৬ এবং ৮৭ দশমিক ১৩ শতাংশে। নবম জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটায়।

নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এবং সমমনা ৮টি দল ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় নির্বাচন বর্জন করে। অংশগ্রহণহীন এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসে। এ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার নেমে আসে ৪০ শতাংশে।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় নির্বাচন বহুদলীয় অংশগ্রহণমূলক হলেও মোটেই সুষ্ঠু হয়নি। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, যেমন- নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালটে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের অনুকূলে সিল মেরে রাখা, বুথ দখল করে প্রকাশ্যে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের অনুকূলে ব্যালটে সিল মারা, সরকারবিরোধী জোটের পোলিং এজেন্টদের ভোট কেন্দ্রে প্রবেশ করতে না দেয়া, সরকারবিরোধী দল বা জোটের প্রার্থীর সমর্থক ও নেতাকর্মীদের ভয়-ভীতি প্রদর্শন, হামলা, নির্বাচনী ক্যাম্প ভাংচুর করা ও পুড়িয়ে দেয়া ইত্যাদি। এসব অভিযোগ দেশ-বিদেশে এ নির্বাচনের ফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

এ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। তবে বাস্তবে ভোট দিতে পেরেছেন এমন ভোটারের উপস্থিতির হার ৩০ শতাংশের বেশি না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

এ বাস্তবতার আলোকে বলা যায়, নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে দৃঢ় হলে এবং সরকার এরূপ নির্বাচন অনুষ্ঠানে কমিশনকে সহায়তা করলে নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার বেশি হবে এবং নির্বাচন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনগুলো এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত সব নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষতার জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল।

২০১৫ সালের আগ পর্যন্ত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় নির্বাচন হয় নির্দলীয়ভাবে। আওয়ামী লীগ সরকারের ২০১৪-২০১৮ মেয়াদে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) (সংশোধন) আইন, ২০১৫; উপজেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন, ২০১৫; স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) আইন, ২০১৫ এবং স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) (সংশোধন) আইন, ২০১৫-এর মাধ্যমে কেবল নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল মনোনীত এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্য ঘোষণা করা হয়। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী পদে নির্দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের অবসান ঘটে।

এসব সংশোধিত আইনের অধীনে গত চার বছর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের কর্মী ও সমর্থকদের সন্ত্রাস, ভোট কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই ইত্যাদি অনৈতিক কাজ স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাছাড়া এসব নির্বাচনে ছোট দলগুলো অংশগ্রহণে তেমন আগ্রহ দেখায়নি।

আর যে বিষয়টি চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তা হল- সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার হিড়িক। বিরোধী দল মনোনীত এবং স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা দেয়া এবং জমা দেয়ার পর তা প্রত্যাহারে বাধ্য করাকে শাসক দল মনোনীত প্রার্থীদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন অভিযোগের প্রতিবাদে সংসদের বাইরে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এবং বিএনপির ছায়ায় গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ডিএনসিসি মেয়রের শূন্য পদে এবং ডিএনসিসি ও ডিএসসিসিতে মোট ৩৬টি নবগঠিত ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর এবং ১২টি সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে নির্বাচনে অংশগ্রহণে বিরত থাকে।

বহুদলীয় অংশগ্রহণমূলক না হওয়ায় এবং ভোটার উপস্থিতির হার খুব কম হওয়ায় এ নির্বাচনকে ‘নাতিশীতোষ্ণ নির্বাচন’, ‘জনগণের আস্থা হারানোর নির্বাচন’, ‘নিরুত্তাপ নির্বাচন’ ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়েছে।

১ মার্চ নির্বাচন কমিশন আয়োজিত ‘জাতীয় ভোটার দিবস’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ভোটার তালিকাভুক্তকরণের সঙ্গে সঙ্গে ভোটারদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কেও সচেতন করে তুলতে নির্বাচন কমিশনকে পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ভোটার সচেতনতা যত বাড়বে, নির্বাচনও তত সুষ্ঠু হবে। এখানে আরও উল্লেখ করা দরকার যে, ডিএনসিসি মেয়র নির্বাচনে সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে এবারই। ২০১৫ সালে ডিএনসিসি মেয়র নির্বাচনে ভোটের হার ছিল ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ। তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত দেশের অন্য সিটি কর্পোরেশনগুলোর নির্বাচনে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছিল।

২৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার কম হওয়ার দায় নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন সিইসি। তিনি এ দায় চাপিয়েছেন প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর।

এ প্রশ্নে যুগান্তর সম্প্রতি একটি অনলাইন জরিপ চালিয়েছে। এতে দেখা যায়, জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৭২ দশমিক ৬৬ শতাংশ সিইসির বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে। সুতরাং দুই সিটি নির্বাচনে কম ভোটার উপস্থিতির দায় সিইসি কর্তৃক প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা যুক্তিসঙ্গত হয়নি। এভাবে দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা নির্বাচনব্যবস্থায় সুফল বয়ে আনবে না।

আসলে মূলত দুটি কারণ ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোট প্রদানে ভোটারদের অনাগ্রহী করে তুলেছিল। এক. একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ভোটারদের ভোট প্রদানের অধিকার ছিনিয়ে নেয়াসহ সংঘটিত নানারকম অনিয়ম; দুই. দেশের দুটি বড় দলের একটি বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন বর্জন। সিইসি ও সরকার তাদের বক্তব্যে এ দুটি কারণের উল্লেখ ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাচ্ছেন।

সবশেষে বলতে চাই, সমগ্র নির্বাচনব্যবস্থার ওপর জনগণ যেভাবে আস্থা হারাচ্ছে, তা গণতন্ত্রের জন্য একটি অশনিসংকেত। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় হল জাতীয় পর্যায়ে এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় বহুদলীয় এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা। এ দায়িত্ব ক্ষমতাসীন সরকারের।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

[email protected]