যেভাবে দুর্নীতি দমন হতে পারে

প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  এম এ খালেক

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছিল, তা নানা কারণেই ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা ছিল অভূতপূর্ব।

কারণ আমাদের দেশে যুগের পর যুগ দুর্নীতি চলে এলেও দুর্নীতিকে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী এজেন্ডায় পরিণত করার নজির কম। দুর্নীতি সমাজের সর্বস্তরে বিস্তার লাভ করেছে অনেকটা প্রতিকারবিহীনভাবেই।

কোনো সরকার আমলেই দুর্নীতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়নি। বরং দিন দিন এর বিস্তার সম্প্রসারিত হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) ধারণা সূচকে বাংলাদেশ ২০০১ সাল থেকে পরবর্তী ৫ বছর দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে। অর্থাৎ সেই বছরগুলোয় বাংলাদেশ ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর শীর্ষে। অবশ্য ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল প্রদত্ত দুর্নীতিবিষয়ক তথ্য নিয়ে কারও কারও আপত্তি রয়েছে।

তবে এটা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না যে, বাংলাদেশে দুর্নীতি একটি মারাত্মক জটিল সমস্যায় পরিণত হয়েছে। কোনোভাবেই দুর্নীতি হ্রাস পাচ্ছে না। অবস্থা এমন হয়েছে যে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ এখন প্রতিবাদ করতেও ভুলে গেছে। তারা মনে করছে, আমাদের দুর্নীতির সঙ্গে আপস করেই বসবাস করতে হবে। দুর্নীতির ব্যাপারে মানুষের মনোভাব এবং সামাজিক অবস্থাও ব্যাপক পরিবর্তিত হয়েছে। আগে দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে কেউ আত্মীয়তা করতে চাইত না, সে যত সম্পদের মালিকই হোক না কেন। এখন মানুষের মর্যাদা নিরূপিত হয় অর্থের মাপকাঠিতে।

রাষ্ট্রীয় অফিসে চলছে দুর্নীতির মহোৎসব। এসব প্রতিষ্ঠানে চার শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারী দেখতে পাওয়া যায়। একশ্রেণীর কর্মকর্তা আছেন যারা অত্যন্ত ট্যালেন্ট, তবে তারা ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ করতে চান না। তাদের নীতি হচ্ছে- ‘চাকরি করি বেতন পাই, কাজ করি ঘুষ খাই।’ আরেক শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারী দেখতে পাওয়া যায়, যারা কাজও করেন না, ঘুষও খান না।

আরেক শ্রেণীর কর্মকর্তা আছেন, যারা নিজেরা ঘুষ খান না, তবে অন্য কেউ খেলে তাতে বাধা সৃষ্টি করেন না। বরং পারলে সহযোগিতা করেন। সর্বশেষ শ্রেণীর কর্মকর্তারা নিজেরা যেমন ঘুষ খান না, তেমনি অন্যকেও ঘুষ-দুর্নীতি করতে দেন না। এরাই সবচেয়ে বিপদের মধ্যে আছেন। এদের নানাভাবে চরিত্র হননের চেষ্টা করা হয়। রাজনৈতিক কালার দিয়ে হেনস্তা করার চেষ্টা করা হয়।

সাধারণ মানুষ, যারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সেবা গ্রহণের জন্য যান, তাদের মাঝেও এমন একটি মনোভাব গড়ে উঠেছে যে, ‘কাজ করালে কিছু দিতেই হবে।’ কিন্তু তারা একবারও ভেবে দেখেন না, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তাকে সেবা দেবেন বলেই তো জনগণের ট্যাক্সের পয়সায় তাদের বেতন-ভাতা প্রদান করা হয়। সাধারণ মানুষ দুর্নীতির আবেশে এতটাই আবিষ্ট যে, তারা ভুলে গেছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সেবাপ্রাপ্তি তাদের মৌলিক অধিকার। এ অধিকার থেকে কেউ তাদের বঞ্চিত করতে পারে না।

বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের অঙ্গীকার করেছে, এটা খুবই কঠিন একটি প্রত্যয়। কেননা চাইলেই একটি সরকার দেশ থেকে দুর্নীতি দূরীকরণ করতে পারবে না।

কারণ দুর্নীতির শেকড় অত্যন্ত গভীরে প্রোথিত। সেই শেকড় উপড়ে ফেলা সহজ কাজ নয়। আর দুর্নীতি কখনই মুখের কথায় বন্ধ হবে না। প্রায়ই সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে, আমরা সরকারি কমকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রায় দ্বিগুণ করে দিয়েছি, তাহলে সরকারি কর্মকর্তারা দুর্নীতি করবে কেন? কথাটি সত্য, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ গত সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা যেভাবে বাড়ানো হয়েছে এটা ছিল অনেকটাই অকল্পনীয়।

প্রতিটি গ্রেডে বেতনের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ করে বাড়ানো হয়েছে। পে-কমিশন যে সুপারিশ করে, সরকার প্রায় হুবহু সেটাই বাস্তবায়ন করে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যে বেতন-ভাতা পাচ্ছে, তা দিয়ে তাদের সংসার খরচ চালানো তেমন কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। স্বল্প বেতন-ভাতাই যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতির একমাত্র কারণ হতো, তাহলে এভাবে বেতন বাড়ানোর পর রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের তো দুর্নীতিমুক্ত হওয়ার কথা। বাস্তবে কি তা হয়েছে? আমরা নিশ্চিত করেই বলতে পারি, দুর্নীতি কমেনি বরং বেড়েই চলেছে।

আসলে মানুষ দুর্নীতি করে অভাবে নয়, স্বভাবে। সহজ পথে বিত্তবৈভব গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে একশ্রেণীর মানুষ দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়। আমরা যদি সমাজ থেকে দুর্নীতির প্রভাব কমাতে চাই, তাহলে সবার আগে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তা যাতে দুর্নীতি করে কোনো অবস্থাতেই পার পেতে না পারে, তার ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোয় সুশাসন অনেকটাই গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি হলেও তা প্রতিরোধযোগ্য।

আমরা দেশকে পুরোপুরি দুর্নীতিমুক্ত করতে না পারলেও দুর্নীতিকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পারব, যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা সত্যিকার রাজনৈতিক অঙ্গীকার গ্রহণ এবং তা পালন করতে পারি। কেউ দুর্নীতি করে যাতে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পেতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে দিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের নিজ নিজ দলের অনুসারী যারা দুর্নীতিতে নিমজ্জিত তাদের বাছাই করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

কথায় বলে, ‘নিজে আচরি ধর্ম পরকে শেখাও।’ দুর্নীতিবাজ যেই হোক না কেন, দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) কোনো ধরনের অনুকম্পা ছাড়াই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। আমাদের দেশে একটি সাধারণ প্রবণতা লক্ষ করা যায়, যা হল কোনো একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হলেই তিনি যদি সরকারদলীয় সমর্থক হন, তাহলে তাকে বাঁচানোর জন্য মহলবিশেষ উঠেপড়ে লাগে। এটা বন্ধ করতে হবে।

রাষ্ট্রমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরির ক্ষেত্রে ঘুষ-দুর্নীতি এখন কার্যত বলতে গেলে ওপেন সিক্রেট। কেউ যদি উৎকোচ দিয়ে চাকরিতে প্রবেশ করে, পরবর্তী সময়ে তার কাছ থেকে সততা কীভাবে আশা করা যায়? কাজেই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে প্রবেশের জন্য যাতে কেউ কোনো ধরনের দুর্নীতির আশ্রয় নিতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে একশ্রেণীর কর্মকর্তাকে দলীয় রাজনীতির চর্চা করতে দেখা যায়। এটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। কারণ যারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় রাজনীতির চর্চা করে, তাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করলেও ব্যবস্থা নিতে পারে না। তারা দলীয় প্রভাব বিস্তার করে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে পার পেতে চেষ্টা করে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের দলীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। এটা চাকরিবিধির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কারণ যারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, সরকারের নীতি-আদর্শ বাস্তবায়নই তাদের মূল দায়িত্ব। তারা কোনোভাবেই দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হতে পারেন না।

এটা সম্পূর্ণ নৈতিকতাবিরোধী এবং এক ধরনের দুর্নীতিও বটে। এমনকি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে যারা অবসরগ্রহণ করেন, তাদেরও দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে বিধি-নিষেধ আরোপ করা যেতে পারে।

কারণ তারা অবসরে গেলেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে পেনশন বা অন্য ভাতা পেয়ে থাকেন। কাজেই তাদেরও দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া উচিত নয়। আর যদি তারা দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হতে চান, তাহলে পেনশন বা অন্য বেনিফিট সারেন্ডার করেই তা করা উচিত। ‘গাছেরটাও খাব আবার তলারটাও কুড়াবো’, তা হতে পারে না। সমাজের যেখানে বা যে পর্যায়ে দুর্নীতি সংঘটিত হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

প্রশ্ন হল, সমাজে বিদ্যমান ব্যাপক দুর্নীতির বিরুদ্ধে কীভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে? দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে দুদক একা কিছু করতে পারবে বলে মনে হয় না। কারণ তাদের লোকবল সংকট থেকে শুরু করে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের দুর্নীতির অভিযোগে আটক করার ক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ আইন প্রত্যাহার করা যেতে পারে। কারণ কোনো কর্তৃপক্ষই চাইবে না তার নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে প্রকাশ্যে আটকে নিয়ে যাওয়া হোক। এটা তার প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত লজ্জাকর। তাই এ আইনটি দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক নয় বলেই মনে হয়।

বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি রোধ করার জন্য দুদকের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা আলাদা কমিটি গঠন করা যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের যেসব কর্মকর্তা অবসরে গেছেন এবং চাকরি জীবনে যারা প্রশ্নাতীত সততার পরিচয় দিয়েছেন অর্থাৎ যাদের সততা পরীক্ষিত, তাদের সমন্বয়ে এ কমিটি গঠন করা হবে।

এমনকি চাকরিরত কর্মকর্তা যারা সৎ ও নিষ্ঠাবান হিসেবে পরীক্ষিত, তাদেরও এ কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তাদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের অসৎ ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের ভালোভাবে চিনবেন। কাজেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা সহজ হবে। কমিটির সদস্যরা সরাসরি দুদকের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন। তাদের যে বেতন-ভাতা প্রদান করা হবে, তা দুদকের তহবিল থেকে সংকুলান করা যেতে পারে।

কমিটিতে এমন সব ব্যক্তিকেই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যারা কখনোই সরাসরি দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হননি। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। যেসব কর্মকর্তা ইতিমধ্যেই অবসরে গেছেন তাদের ক্ষেত্রেও যদি দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

এমনকি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা যদি মারাও যান, তার বিরুদ্ধে মরণোত্তর বিচার করা যেতে পারে। আর বড় দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে আগে ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে এমন দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে অন্যরা তা দেখে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।

আমরা যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারি, তাহলে আগামী দিনে জাতির কাছে এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে। যেহেতু এটা বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম অঙ্গীকার। দুর্নীতি যদি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা যায়, তাহলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে। ত্বরান্বিত হবে জাতীয় উন্নয়ন।

এম এ খালেক : অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক