বিশ্বব্যাংক কতটা বৈশ্বিক

  সাজ্জাদ আলম খান ১১ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বব্যাংক কতটা বৈশ্বিক
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বব্যাংক বিভিন্ন রাষ্ট্রের মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। তবে এখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অসম কাঠামো রয়েছে। সমতার ভিত্তিতে ভোটাধিকার নেই। ‘একদেশ একভোট’ নীতি এখানে অনুপস্থিত। প্রতিটি রাষ্ট্রের ২৫০টি ভোট থাকে। তবে বাড়তি লগ্নিতে বেশি ভোট। বিশ্বব্যাংকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ভোট রয়েছে।

দেশটির ভোটের অংশ ১৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ। জাপানের ৬ দশমিক ৮৯, চীনের ৪ দশমিক ৪৫, জার্মানির ৪ দশমিক শূন্য ৩ এবং যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের ৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ করে। এ বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের মনোনীত প্রার্থীর প্রতি সমর্থন আদায়ে কেবল দশটি দেশকে প্রভাবিত করাই যথেষ্ট।

শিল্পোন্নত দেশগুলো ৬০ শতাংশ ভোটের অধিকারী। সংস্থার বিধি বলছে, এখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে অরাজনৈতিক ও কারিগরি দিক বিবেচনায় নিয়ে। কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বা ক্ষমতার প্রকৃতি বিবেচ্য হবে না। কার্যত তা মানা হচ্ছে না। সংস্থাটি ক্ষমতাশীল রাষ্ট্রের স্বার্থের বিষয়ে চুপচাপ থাকে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এককভাবে রয়েছে বেশিসংখ্যক ভোট। আর এর সফল প্রয়োগে মার্কিন অনুকূলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ চলছে বছরের পর বছর। বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করে থাকে বহুজাতিক বিভিন্ন সংস্থা। এর নেতৃত্বে আছে আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক।

সব ধরনের গুঞ্জনের অবসান ঘটিয়ে বিশ্বব্যাংকের নেতৃত্ব দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন ডেভিড মালপাস। এ নাম প্রস্তাব করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি আন্ডার সেক্রেটারি ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স হিসেবে কাজ করছেন তিনি। বহু বছর ধরে রিপাবলিকান রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ডেভিড মালপাস।

তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ট্রাম্প। যদিও ট্রাম্পের প্রশংসার স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের সমালোচক ট্রাম্প বলেন, বিশ্বব্যাংকের অর্থের কার্যকরভাবে এবং বিচক্ষণতার সঙ্গে ব্যয় করা হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ দেখবে এবং এ দেশের মূল্যবোধ রক্ষা করা হবে এমনটাই নিশ্চিত করবেন মালপাস। ট্রাম্পের এ মনোনয়ন বেশ বিতর্ক তৈরি করেছে। মালপাস যদি বিশ্বব্যাংকের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন, তবে সংস্থাটির ওপর গভীর চাপ প্রয়োগ করতে সফল হবেন ট্রাম্প, এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোয় বিশ্বব্যাংকের ঋণের প্রবাহ কমিয়ে দিতে বরাবরই চাপ দিয়ে আসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। দায়িত্ব পেলে মালপাস দরিদ্র দেশগুলোতে বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা কমানোর চেষ্টা করবেন।

হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা মনে করেন, মালপাস প্রবৃদ্ধি-পরবর্তী সংস্কারক হবেন। ২০১৬ সালের নির্বাচনের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্টের একজন সিনিয়র অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন মালপাস। ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি আন্ডার সেক্রেটারি ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। মালপাস চীনকে অতিরিক্ত ঋণ দেয়ার কঠোর সমালোচনা করেন। তার মতে, চীন ঋণ পাওয়ার যোগ্যতায় অনেক ধনী।

১৮৯ সদস্যের বিশ্বব্যাংক ১৪ মার্চ পর্যন্ত নাম গ্রহণ করবে। সাক্ষাৎকারের জন্য তিনজন প্রার্থীর সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করা হবে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম দ্বিতীয় দফার মেয়াদ শেষের বছর তিনেক আগেই জানিয়ে দিয়েছেন পদ ছাড়ার কথা। তার পদত্যাগ ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে। এরপর থেকেই শুরু হয় জল্পনা, কে হবেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট। এ ব্যাংকের অধিকাংশ শেয়ার রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। তাই বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট কে হবেন, তা কার্যত যুক্তরাষ্ট্রই ঠিক করে।

২০১২ সালেও জিম ইয়ং কিমকে বেছে নিয়েছিলেন তারা। ২০১৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে তার কিছু নীতিতে অসন্তোষ দেখিয়ে আসছিলেন ইয়ং কিম। বিশ্বব্যাংকের কার্যক্রমে অসন্তুষ্ট ছিলেন ট্রাম্পও। উন্নয়নে অর্থায়ন, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে মতবিরোধের মধ্যেই পদত্যাগ করেছেন কিম।

১৯৭৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ, আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক ত্রিপক্ষীয় সমঝোতায় উপনীত হয়ে ‘ওয়াশিংটন কনসেনশাস’ এ পৌঁছায়। এর প্রভাব পড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে।

১৯৭৭ সালে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার বাজার মৌলবাদী নীতি সংস্কার করেন; যা ইতিহাসে ‘থ্যাচারিজম’ নামে অভিহিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৮০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী রোনাল্ড রিগ্যান হুংকার তুললেন, ‘জনগণের কাঁধ থেকে সরকারের বোঝা নামাও’। জনসমর্থনের জোয়ারে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট কার্টারকে হারিয়ে দেন তিনি।

আট বছর প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ‘সাপ্লাই সাইড ইকোনমিকস’ বা ‘মুক্তবাজার অর্থনীতির’ নামে বাজার মৌলবাদীরা পুঁজিবাদের এ সর্বশেষ সংস্করণটি প্রতিষ্ঠা করার আগ্রাসন চালিয়ে গেছেন। সেজন্য এ সংস্কারগুলোর আরেকটা নামও চালু হয়ে গেছে ‘রিগ্যানোমিকস’। ‘ওয়াশিংটন কনসেনশাস’-এর অন্তর্ভুক্ত নীতি সংস্কারগুলো ১৯৭৯ সাল থেকেই বাংলাদেশের ওপর প্রয়োগ হতে শুরু করে।

ঋণের শর্ত অনুসারে ‘কাঠামোগত বিন্যাস কর্মসূচি’ শুরু হয়। ১৯৭৯ সালে সরকার ব্যালান্স অব পেমেন্টসের মারাত্মক ঘাটতি মেটানোতে শর্তের সাগরে ঝাঁপ দেয়। শর্তগুলো এতই কঠিন ছিল যে জিয়াউর রহমানের সরকার ওই পর্যায়ে তা বাস্তবায়নে ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। তাই প্রথম কিস্তির ২০ মিলিয়ন ডলার ছাড় করার পর পুরো ঋণটাই বাতিল করে দেয়।

২০০৮ সালে পুঁজিবাদী দেশগুলোতে ভয়াবহ মন্দাবস্থা শুরু হওয়ার পর বাজার মৌলবাদের জারিজুরি ফাঁস হতে শুরু করে। বাজার বনাম রাষ্ট্র বিতর্ক প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তবে এখনও বাজার মৌলবাদের ভূত চেপে বসে রয়েছে; কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরে ওয়াশিংটন কনসেনশাস প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আসছে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ ওয়াশিংটন কনসেনশাস থেকে সরে এসেছে। কার্যকর অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নে স্থানীয় সংস্কৃতি, সংবেদনশীলতা বৈষম্য দূরীকরণের বিষয় বিচেনায় নেয়া প্রয়োজন। এটি বিবেচনায় রাখতে হবে- যাতে দরিদ্ররা কণ্ঠহীন না হয়ে পড়ে।

আর ক্ষমতার অপব্যবহারে সম্পদশালীদের বেপরোয়া আচরণ যাতে রোধ করা যায়। দারিদ্র্য মুক্তির লড়াই চলছে দেশে দেশে। এর মধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি বৈষম্য জেঁকে বসছে। এ সময় শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একমাত্র বিবেচনায় আসতে পারে না বিশ্বব্যাংকের দৃষ্টিতে। এটা কতটুকু পারবেন ডেভিড মালপাস। বিশ্বব্যাংক যেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ভাবাদর্শ ও ধারণার প্রতি অনুগত না থাকে। ইউজেন মায়ার থেকে জিম ইয়ং কিম বিশ্বব্যাংকের প্রধান হিসেবে সবসময়ই আমেরিকান নাগরিক নির্বাচিত হয়েছেন। এবারও সে ধারা অব্যাহত রয়েছে। ডেভিড মালপাসের মনোনয়ন বৈশ্বিক পরিসরে অসন্তোষের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। মালপাস ট্রাম্পের অনুগত, যিনি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিয়ে এসেছেন।

ভাবনায় তিনি অনেকটাই রক্ষণশীল। বাংলাদেশের অর্থনীতি অনুদাননির্ভরতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান জিডিপির ২ শতাংশেরও নিচে। ‘সফট লোনের’ নামে অপমানজনক শর্তের জালে জাতিকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলার ষড়যন্ত্র ছিন্ন করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক ঋণের সুদের হার কম দেখিয়ে সরকারি নীতি গ্রহণের সার্বভৌমত্ব খর্বকারী হয়ে থাকে। যদিও এসব শর্ত সাধারণের মাঝে জানানো হয় না। এ ধারা থেকে বেরিয়ে আসার সময় এসেছে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাংক এখন বেশ সমালোচিত। সম্প্রতি গড়ে উঠছে বিকল্প বহুজাতিক অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠান। ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে যাত্রা শুরু করেছে ব্রিকসভুক্ত পাঁচটি উদীয়মান অর্থনীতির দেশের উদ্যোগে গঠিত নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো হচ্ছে- ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা। নতুন এ ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও এর উদ্যোক্তারা বলছেন, এটা কারও প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। বিদ্যমান কোনো ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করা উদ্দেশ্য নয়; বরং নিজস্ব আঙ্গিকে এ ব্যবস্থার উন্নয়নই লক্ষ্য। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে যথাযথ ভোটের অধিকার না দেয়ায় বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সমালোচনা করেছে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো।

এশিয়া অঞ্চলে গড়ে তোলা হয়েছে চীনের নেতৃত্বে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক। বিশ্ব অর্থনীতির পাশাপাশি প্রভাবশালী দেশগুলোতে ভিন্ন চিন্তাভাবনার উদ্রেক করেছে চীনা উদ্যোগ। ইউরোপের অনেক শক্তিশালী দেশ এ ব্যাংকে যোগ দিয়েছে। চীন এআইআইবি গঠনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির অঙ্গনে ভিন্ন এক মেরুকরণে সূচনা করেছে। বিনিয়োগের প্রবাহকে বহুপক্ষীয় করায় চীনের উদ্যোগকে অনেক দেশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েছে। চীন মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর মার্কিন নীতি অনুসরণের চেষ্টা করছে। ওই সময় উন্নয়নের তহবিলকে বহুপক্ষীয় করে তোলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়।

সাজ্জাদ আলম খান : অর্থনীতি বিশ্লেষক

[email protected]

আরও পড়ুন
--
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×