পরিবারে মিনি গ্রন্থাগার গড়ে তুলুন

  মোহাম্মাদ আসাদুজ্জামান ১২ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গ্রন্থাগার।
গ্রন্থাগার। ফাইল ছবি

অজানাকে জানার আকাঙ্ক্ষা মানুষের একটি আদিম প্রবৃত্তি। জ্ঞান লাভ করার স্পৃহা চিরন্তন। এর প্রমাণ মেলে বিশ্বের প্রথম মানব-মানবীর আচরণ থেকেই। আল্লাহ হজরত আদম (আ.) ও বিবি হাওয়াকে তৈরি করে বেহেশতে স্থান দিলেন।

কিন্তু অনতিদূরে অবস্থিত একটি বিশেষ বৃক্ষের কাছে যেতে নিষেধ করলেন। আরও বললেন, যদি যাও তবে তোমরা জালেমদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে। কিন্তু আল্লাহর অবাধ্য শয়তান মানুষেরও চির দুশমন। সে বেহেশতবাসী আদম-হাওয়াকে কুমন্ত্রণা দিল এই বলে যে, ওই নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খেলে তারা ফেরেশতার মতো হবে এবং অমরত্ব লাভ করবে।

খ্রিস্টানদের বাইবেলেও প্রায় একই কথা বলা হয়েছে। মনে হয় অজানাকে জানার অদম্য কৌতূহল থেকেই তাদের এই পদস্খলন ত্বরান্বিত হয়েছিল।

অজানাকে জানার কৌতূহল, স্পৃহা বা বাসনা মানুষের চিরকালের। এ কৌতূহল থেকেই মানুষ যুগে যুগে নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে এবং প্রকৃতিকে নানাভাবে জয় করে চলেছে।

জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে অধ্যয়নের বিকল্প নেই। এ কথা সত্য, কিছু ব্যতিক্রম বাদে আজকাল নাগরিকদের জীবন ধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে এবং এর ফলে অবসরের অভাব প্রত্যেক মানুষের। কখনও একটু অবসর পাওয়া গেলেও পাবলিক লাইব্রেরিতে গিয়ে অধ্যয়ন করার মতো সময় পাওয়া যায় না।

সে ক্ষেত্রে প্রত্যেক পরিবারে একটি মিনি গ্রন্থাগার গড়ে তোলা সম্ভব হলে অল্প অবসর নিয়েও পছন্দমতো বই পাঠ করা যায়। অজানাকে জানার কৌতূহল থেকে বিজ্ঞজনরাও বইয়ের আশ্রয় নেন।

পারিবারিক মিনি গ্রন্থাগার

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের সমাজে বই পড়ার প্রতি বেশকিছুটা অনীহা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ধনের প্রাচুর্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সমাজে এক ধরনের অস্থিরতা ও প্রতিযোগিতা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এ প্রেক্ষাপটে প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের জন্য নিরাপদ জ্ঞান অর্জন কেন্দ্র হতে পারে তাদেরই হাতে গড়া পারিবারিক মিনি গ্রন্থাগার।

এ গ্রন্থাগার গড়ে তুলতে পরিবারের কর্তাকে খুব বেশি বেগ পেতে হবে না। শুধু সচেতন ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন হবে। আপনার সাংসারিক প্রয়োজনে আপনি সাধ্যমতো প্রতিনিয়ত অকাতরে অর্থ ব্যয় করে চলেছেন। স্বীকার্য যে, এ ব্যাপারে অবশ্যই সাংসারিক অপরিহার্যতা রয়েছে।

তবে এরপরও যেখানে অপরিহার্যতা নেই, সেখানেও অনেকে অকাতরে অর্থ ব্যয় করে থাকেন। তবে অনেকে নিজের জন্য তথা পরিবারের সদস্যদের জন্য ভুলেও সারা বছরে একটা বইও কেনেন না। ব্যতিক্রম ছাড়া বই কেনার কালচার বা সংস্কৃতি এ দেশের পরিবারগুলোতে এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি।

পারিবারিক গ্রন্থাগার গৃহের অলংকার

আপনার ঘরবাড়ি সাজানোর জন্য আপনি কিনা করছেন! খাট-পালঙ্ক, আসবাবপত্র, ক্রোকারিজ, বিছানা-বালিশসহ দেশি-বিদেশি নানা ধরনের ফিটিং বা উপকরণ কিনছেন। এ ব্যাপারে মাত্রাতিরিক্ত অর্থ ব্যয়েও অনেকে কার্পণ্য করেন না।

কিন্তু গ্রন্থও যে ঘর সাজানোর একটি চমৎকার আদর্শ উপকরণ, উপাচার বা অলংকার এবং সৌন্দর্য ও সুরুচির প্রতীক, এ কথা অনেকের মনেই হয় না। অথচ গ্রন্থরাজি পরিবারের সব সদস্যের জন্য একটি অপরিহার্য ও মূল্যবান সংগ্রহ হিসেবে পরিগণিত এবং তা গৃহের সৌন্দর্য ও গাম্ভীর্য শতগুণে বাড়িয়ে তোলে, এ কথা কে অস্বীকার করবে?

অধুনা বিশ্বের সর্বত্র বিভিন্ন উৎসব ও পালা-পার্বণকে কেন্দ্র করে মানুষ অকাতরে অর্থ ব্যয় করে থাকে। এ দেশে আমরাও বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে নানা আয়োজনে নানা দ্রব্য ক্রয় করে থাকি। এসব কেনাকাটা অবশ্যই একদিনেই আমরা করি না, আর তা সম্ভবও নয়।

বইও সেভাবে ধীরে ধীরে এবং বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে ক্রয় করা যেতে পারে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য যেমন বাজেট থাকে, তেমনি বই কেনার জন্যও একটি ছোট্ট বাজেট থাকতে পারে না কি?

গুড রিডিং বা সিলেকটিভ রিডিং

অনেকের মতে, উদ্দেশ্যহীন পড়াশোনা সময়ের অপচয় মাত্র। বিশ্বে এখন বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞানের ওপর রচিত ও প্রকাশিত কোটি কোটি বই গ্রন্থাগারে শোভা পাচ্ছে। প্রশ্ন হল, আপনি কোন বিষয়ের বই কিনবেন এই অফুরন্ত জ্ঞানভাণ্ডার থেকে? একজীবনে এসব গ্রন্থের কয়টা এবং কোনগুলো পড়বেন?

এর উত্তর দিতে বই পড়া নিয়ে ইংরেজি ভাষায় বেশকিছু বই পাওয়া যায়। এটাকে বলে ড়েড়ফ জবধফরহম বা ঝবষবপঃরাব জবধফরহম। আসলে বই পড়ার ক্ষেত্রে এটি একটি গাইডেন্স বা দিকনির্দেশনা, অর্থাৎ বাছাই করে বই পড়া। অগণিত গ্রন্থের মধ্য থেকে নিজস্ব প্রয়োজন, রুচি ও মেধানুযায়ী বাছাই করে বই পড়ার দায়িত্ব প্রত্যেক পাঠকের।

শিক্ষাবিদরা মনে করেন, আজকের পৃথিবীতে উদ্দেশ্যহীন, লক্ষ্যহীন পঠন-পাঠন সময়ের অপচয় মাত্র। এ সম্পর্কে মার্কিন লেখক মার্ক টোয়েনের একটি অতি মূল্যবান উক্তি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘The man who reads rubbish has no advantage over the man, who does not read at all.’ তাই পড়ার আগে একটি নির্দিষ্ট ছক বা গাইডলাইন তৈরি করে নেয়া যায়। এ প্রক্রিয়াকেই বোধহয় বলা হয়েছে Good Reading বা Selective Reading।

কোন ধরনের সমাজ চাই আমরা

বলাবাহুল্য, একটি সুন্দর পরিশীলিত সমাজ আমাদের কাম্য। আমরা চাই এবং একান্তভাবে কামনা করি, প্রতিটি সমাজে ঘরে ঘরে শিক্ষিত, স্বশিক্ষিত, প্রজ্ঞাবান, সংস্কৃতিবান, সুরুচিসম্পন্ন ও বিবেকবান মানুষ তৈরি হোক এবং এ কাজের অন্যতম প্রধান সোপান প্রতিটি পরিবারে মিনি গ্রন্থাগার গড়ে তোলা।

ধন উপার্জনের স্পৃহা বা আকাক্সক্ষা মানুষকে কীভাবে তাড়িয়ে বেড়ায়, তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। অথচ বইয়ের পাতায় নতুন নতুন জ্ঞান লাভের কী যে আনন্দ, তারা তা জানেন না।

আমার বিশ্বাস, একবার যদি কোনোক্রমে তাদের এই বিমল আনন্দের জগতে পৌঁছে দেয়া যেত, তাহলে তারা জীবনের জন্য বেঁচে যেতেন। এখন প্রশ্ন, কীভাবে এই মিনি গ্রন্থাগার গড়ে তোলা যায়? এ ক্ষেত্রে একজন রুশ লেখকের ‘বাজি’ এবং রূপকথার গল্প ‘পরশ পাথর’-এর কথা উল্লেখ করা যায়।

কীভাবে পারিবারিক গ্রন্থাগার গড়ে তোলা সম্ভব

সবকিছুর আগে প্রথমেই প্রয়োজন বই রাখার জন্য একটি একটি বুকশেলফ। এটি পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী বাঁশ, বেত, কাঠ, স্টিল বা অন্যকিছু দ্বারা তৈরি হতে পারে। অতঃপর ঈদ ও অন্যান্য উৎসব উপলক্ষে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে বলা যে, তার পক্ষ থেকে অন্তত একটি বই সংগ্রহ করে আনতে হবে।

এভাবে পরিবারের সমবেত চেষ্টার ফলে এই মিনি পারিবারিক গ্রন্থাগার দ্রুত গড়ে উঠতে পারে। গৃহের অন্যান্য সামগ্রীর সঙ্গে বইপত্রের অবস্থানও একটি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল সৃষ্টি করবে। পারিবারের ছোট সদস্যরাও আশৈশব বইপত্রের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে। তাদের উপযোগী বইপত্র, ছবি, কার্টুন ইত্যাদি দেখে দেখে তারাও শেখার অনুপ্রেরণা পাবে।

সমাজসেবী যুবক-যুবতীরা তাদের নিজস্ব গ্রামে কিংবা মহল্লায় সেবামূলক কাজের অংশ হিসেবে এই পারিবারিক গ্রন্থাগার গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সাহায্যের হাত বাড়াতে পারে।

প্রফেসর মোহাম্মাদ আসাদুজ্জামান : প্রবীণ শিক্ষাবিদ, মুক্তিযোদ্ধা, ২০১৭ সালে জনপ্রশাসনে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×