স্বদেশ ভাবনা

নির্বাচনব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ফেরাতে হবে

  আবদুল লতিফ মন্ডল ১৩ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বাচনব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ফেরাতে হবে

৮ মার্চ রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ (টিওটি) কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নুরুল হুদা বলেছেন, নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভর্তি বন্ধ করতে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) ব্যবহার শুরু করা হবে।

তিনি আরও বলেছেন, রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তির জন্য কারা দায়ী, কাদের কী করা প্রয়োজন, সেই শিক্ষা দেয়ার ক্ষমতা, যোগ্যতা কমিশনের নেই। কী কারণে, কাদের কারণে এগুলো হচ্ছে, কারা দায়ী তা বলারও কোনো সুযোগ নেই। পরিবেশ-পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে অবনতির দিকে যাচ্ছে বলেও তিনি জানান।

উল্লেখ্য, ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর থেকেই মাঠের বাইরে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, বাম গণতান্ত্রিক জোট ও ইসলামী আন্দোলন ভোটের আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভরে রাখার অভিযোগ করে আসছে। তাই সিইসির উপর্যুক্ত বক্তব্য ইতিমধ্যে ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’তে পরিণত হয়েছে।

সিইসির বক্তব্য নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে এবং এসব প্রতিক্রিয়া গণমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেছেন, সিইসি কোন প্রেক্ষাপটে এবং কোন অবস্থায় ওই কথা বলেছেন তা বিবেচনা না করে এবং তার পুরো বক্তব্য না শুনে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।

তবে তার মনে হয়, দেশে নির্বাচন হলেই যারা পরাজিত হয় তারা ব্যালট বাক্স ছিনতাই, কারচুপিসহ নানা ধরনের অভিযোগ করে। সিইসি হয়তো বলতে চেয়েছেন, ইভিএম হলে এ ধরনের অভিযোগ করার সুযোগ থাকবে না।

এরপরও বিতর্ক হতে পারে এমন বক্তব্য থেকে সিইসির বিরত থাকাই ভালো। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ও গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেছেন, সিইসি কৌশলে বুঝিয়েছেন যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, ৮ মার্চের বক্তব্যের মাধ্যমে সিইসি ২৯ ডিসেম্বর রাতে ‘ভোট ডাকাতির’ মাধ্যমে যে বাক্স ভরে রাখা হয়েছিল, তা স্বীকার করে নিলেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ৮ মার্চের বক্তব্যের মাধ্যমে সিইসি প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিলেন যে আগের রাতে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরে রাখার ঘটনা ঘটেছে।

ইভিএমে ভোট গ্রহণ করা হলে আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তির সুযোগ থাকবে না- এমন বক্তব্যে সিইসি সদ্যসমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনে অনিয়ম হওয়ার কথা প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিয়েছেন বলে মনে করেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, আরপিওতে অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অগাধ ক্ষমতা ইসিকে দেয়া হলেও ওই সময়ে আইনগত ব্যবস্থা নেয়নি কমিশন। তবে দেরিতে উপলব্ধি হলেও নির্বাচনে আগের রাতে ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভরে রাখার ঘটনার তদন্ত হওয়া জরুরি। ওই তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশের আলোকে ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশের ও গণতন্ত্রের স্বার্থে এবং আগামী দিনের সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে এ তদন্ত হওয়া দরকার বলেও মন্তব্য করেন তারা।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার সাড়ে চার দশকের বেশি সময়ে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় নির্বাচন এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০৬ (জুন), ২০০১ ও ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত যথাক্রমে সপ্তম, অষ্টম ও নবম জাতীয় নির্বাচন ছাড়া দলীয় সরকারের অধীনে ১৯৭৩, ১৯৭৯, ১৯৮৬, ১৯৮৮, ১৯৯৬ (ফেব্রুয়ারি), ২০১৪ ও ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, ষষ্ঠ, দশম ও একাদশ জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি এবং এসব নির্বাচনে কোনো দলীয় সরকার পরাজিত হয়নি। আবার এসব জাতীয় নির্বাচনের মধ্যে চতুর্থ, ষষ্ঠ, দশম নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ছিল না।

একাদশ জাতীয় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেও সুষ্ঠু হয়নি। এ নির্বাচনে যেসব অনিয়মের অভিযোগ ওঠে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালটে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের অনুকূলে সিল মেরে রাখা, বুথ দখল করে প্রকাশ্যে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের অনুকূলে ব্যালটে সিল মারা, সরকারবিরোধী জোটের পোলিং এজেন্টদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে না দেয়া, সরকারবিরোধী দল বা জোটের প্রার্থীর সমর্থক ও নেতাকর্মীদের ভয়-ভীতি প্রদর্শন, হামলা, নির্বাচনী ক্যাম্প ভাংচুর করা ও পুড়িয়ে দেয়া।

এসব অভিযোগ একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তাদের এক গবেষণা প্রতিবেদনে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোটে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য তুলে ধরে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ ও ত্রুটিপূর্ণ বলে মন্তব্য করে এবং বিচার বিভাগীয় তদন্তের পক্ষে মত দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা উইলসন সেন্টারের সিনিয়র স্কলার ও রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যথাযথ হয়নি বলে মন্তব্য করে জাতিসংঘ। এ অবস্থায় একটি ইতিবাচক ফলের জন্য রাজনৈতিক সব পক্ষকে নিয়ে অর্থপূর্ণ সংলাপের তাগিদ দেয় সংস্থাটি।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউস প্রকাশিত ‘ডেমোক্র্যাসি ইন রিট্রিট : ফ্রিডম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসেবে ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় নির্বাচনের অনিয়মগুলোর উল্লেখ করা হয়েছে।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর মধ্যে যেটি নজিরবিহীন সেটি হল নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালটে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের অনুকূলে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখা।

সিইসি খুব সম্ভবত এ অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েই বিবেকের তাড়নায় তার ৮ মার্চের বক্তব্যে বিষয়টি উত্থাপন করেছেন। ‘রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তির জন্য কারা দায়ী, কাদের কী করা প্রয়োজন, সেই শিক্ষা দেয়ার ক্ষমতা, যোগ্যতা কমিশনের নেই’- সিইসির এমন বক্তব্যের মধ্যে শুধু ঘটনার সত্যতাই প্রকাশ পায়নি, বরং এ অপরাধ দমনে কমিশনের অসহায়ত্বও ফুটে উঠেছে।

সিইসির এ বক্তব্যকে ভালোভাবে নেয়নি শাসক দল আওয়ামী লীগ। তাই দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বিতর্ক হতে পারে এমন বক্তব্য প্রদান থেকে বিরত থাকতে বলেছেন সিইসিকে। উল্লেখ্য, সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন প্রধানকে এরূপ অনুশাসন প্রদানের এখতিয়ার তার বা তার দলের আছে বলে মনে হয় না।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অনিয়ম এবং এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণে নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতার কারণে জনগণ নির্বাচনের ওপর আস্থা হারাতে শুরু করেছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়রের শূন্যপদে এবং ডিএনসিসি ও ডিএসসিসির (ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন) নবগঠিত ৩৬টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির নিু হার এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

ভোটার উপস্থিতির হার খুব কম হওয়ায় এ নির্বাচনকে ‘নাতিশীতোষ্ণ নির্বাচন’, ‘জনগণের আস্থা হারানোর নির্বাচন’, ‘নিরুত্তাপ নির্বাচন’ ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়েছে।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রভাব চলমান উপজেলা পরিষদ নির্বাচন এবং আগামীতে অনুষ্ঠেয় অন্যসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনেও পড়বে। ১০ মার্চ প্রথম ধাপে ৭৮টি উপজেলা পরিষদে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির হার হতাশাব্যঞ্জক ছিল বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

‘ভোট গ্রহণের দায়িত্বে ৩৬, ভোট পড়েছে ৬৭’ শিরোনামে ১১ মার্চ একটি দৈনিকে (প্রথম আলো) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জয়পুরহাটের সদর উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে জয়পুরহাট সরকারি বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট গ্রহণের দায়িত্বে ৩৬ কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১৪ জন সদস্য উপস্থিত থাকলেও ওই কেন্দ্রে সারাদিনে ভোট পড়ে ৬৭টি। এ কেন্দ্রে মোট ভোট ২ হাজার ৫৯১টি। আর ভোট পড়েছে ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রভাব পড়েছে দীর্ঘ ২৮ বছর পর ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল নির্বাচনের ওপর। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে শাসক দল আওয়ামী লীগের সমর্থক ও আদর্শানুসারী ছাত্রলীগ বাদে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিল অংশগ্রহণকারী সব প্যানেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।

একটি হলে বস্তাভর্তি ব্যালট পেপার উদ্ধারের মতো ঘটনাও ঘটেছে। এ ব্যালটগুলোয় ছাত্রলীগের প্রার্থীদের পক্ষে ভোট দেয়া ছিল বলে মিডিয়ার খবরে বলা হয়েছে।

নির্বাচনব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। দলীয় সরকারগুলোর অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন, বিশেষ করে দশম ও একাদশ জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতার আলোকে জাতীয় নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে।

১৯৯৬ সালে প্রবর্তিত এবং ২০১১ সালে বিলুপ্ত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আদলে জাতীয় নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের ব্যবস্থা নিতে হবে।

দুর্নীতিগ্রস্ত নির্বাচনব্যবস্থা থেকে মুক্তি পেতে জাতীয় নির্বাচনে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি বিবেচনা করারও সময় এসেছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দীর্ঘ ঐতিহ্যের অবসান ঘটিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী পদে দলীয় মনোনয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ২০১৫ সালের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হলে তা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনে স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ বন্ধসহ অন্যসব অনিয়ম বহুলাংশে দূরীকরণে সহায়ক হবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×