চ্যালেঞ্জের মুখে দেশের ওষুধ শিল্প

  মুনীরউদ্দিন আহমদ ১৬ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চ্যালেঞ্জের মুখে দেশের ওষুধ শিল্প
চ্যালেঞ্জের মুখে দেশের ওষুধ শিল্প

বিশ্বের ৪৯টি স্বল্পোন্নত দেশের মধ্যে এখনও বাংলাদেশ একটি। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে ওষুধ শিল্পের দিক থেকে বাংলাদেশ একটি ভালো অবস্থানে রয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশের অন্তর্ভুক্ত বলে বাংলাদেশ প্রথমে ২০১৬ সাল পর্যন্ত যে কোনো পেটেন্টপ্রাপ্ত ওষুধ জেনেরিক ফর্মে উৎপাদন করার সুযোগ পেয়েছিল।

২০০১ সালের নভেম্বরে দোহায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মন্ত্রীপর্যায়ের এক সম্মেলনে ট্রিপস চুক্তি এবং ওষুধের সহজলভ্যতার প্রশ্নে এক ঘোষণা দেয়া হয়। দোহা ঘোষণায় ৪৯টি স্বল্পোন্নত দেশকে ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত পেটেন্টপ্রাপ্ত যে কোনো ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করার অধিকার দেয়া হয়েছিল। কিন্তু উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়।

২০১৫ সালের ৬ নভেম্বর জেনেভার ট্রেড রিলেটেড অ্যাসপেক্ট অব ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস (ট্রিপস) কাউন্সিলের এক বৈঠকে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে ২০৩৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ওষুধের মেধাস্বত্ব ছাড় দেয়ার ব্যাপারে এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

২০৩৩ সালের পরও মেধাস্বত্ব ছাড়ের মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ উন্মুক্ত থাকবে বলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা জানিয়েছিল। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মহাপরিচালক রবার্তো অ্যাজেভেদো বলেছিলেন, ট্রিপস কাউন্সিলের এ সিদ্ধান্তের ফলে প্রতীয়মান হল যে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য দেশগুলো সংস্থার দরিদ্রতম দেশগুলোর সদস্যদের চাহিদাকে গুরুত্ব দেয়।

আলোচনার এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য আরও ১০ বছর মেধাস্বত্ব ছাড় দেয়ার প্রস্তাব করে। কিন্তু স্বল্পোন্নত দেশগুলো সেই প্রস্তাব মেনে নিতে অস্বীকার করে। শেষ পর্যন্ত স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে এ সুবিধা দিতে রাজি হলেও বাংলাদেশের এ সুবিধা পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের সন্তোষজনক অগ্রগতির কারণে এ প্রশ্ন তোলা হয় এবং মেধাস্বত্ব ছাড়ের ব্যাপারে বিরোধিতা হয়। কিন্তু স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অনড় অবস্থানের কারণে বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত সব দেশের ওষুধ শিল্পের জন্য ছাড় দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র।

ট্রিপস চুক্তির আওতায় কোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান নতুন ওষুধ আবিষ্কার করে বাজারজাত করলে সেই ওষুধ পেটেন্টপ্রাপ্ত হয়। প্রোডাক্ট পেটেন্টপ্রাপ্তির যোগ্যতা বলে সেই কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানকে সরকার তার দেশে ২০ বছরের জন্য একচেটিয়া ব্যবসা করার সুযোগ প্রদান করতে বাধ্য।

২০ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার আগে পেটেন্টপ্রাপ্ত ওষুধ অন্য কোনো কোম্পানি প্রস্তুত ও বাজারজাত করার অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকে। এ সময় অতিবাহিত হয়ে গেলে যে কোনো কোম্পানি জেনেরিক নামে ওষুধটি উৎপাদন ও বাজারজাত করার অধিকার অর্জন করে।

জেনেরিক নামে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে ওষুধ প্রস্তুত ও বাজারজাত হলে ওষুধের দাম তীব্রভাবে হ্রাস পায় এবং এর ফলে সাধারণ মানুষ সস্তায় ওষুধ কিনতে পেরে ভীষণ উপকৃত হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে প্রথমে ১ জানুয়ারি ১৯৯৫ থেকে দশ বছরের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সময় মঞ্জুর করা হয়েছিল নিজ নিজ দেশে প্রোডাক্ট এবং প্রসেস পেটেন্ট অধিকার সম্পূর্ণ প্রয়োগ এবং বাস্তবায়নসহ আনুষঙ্গিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য।

৪৯টি স্বল্পোন্নত দেশের জন্য এই মেয়াদ ২০১৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। এ সময় অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার আগেই ট্রিপস চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য আরও ১৭ বছর সময় পাওয়া গেল।

২০৩৩ সাল পর্যন্ত মেধাস্বত্ব ছাড় পাওয়ার কারণে আমাদের খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার কোনো কারণ আমি দেখি না। আগেই বলা হয়েছে, ২০০১ সালের নভেম্বর মাসে দোহায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক সম্মেলনে ৪৯টি স্বল্পোন্নত দেশকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত পেটেন্টপ্রাপ্ত যে কোনো ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করার অধিকার দেয়া হয়েছিল। কিন্তু মেধাস্বত্ব ছাড়ের সুবিধা পেয়েও এক দশকেরও বেশি সময়ে তেমন কিছু করতে পারেনি বাংলাদেশ।

এ সময়ে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প সম্প্রসারিত হয়েছে এটা সত্যি। গড়ে উঠেছে নতুন নতুন কারখানা, প্রস্তুত হচ্ছে প্রায় ২৫ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের একটি মূল সমস্যা কাঁচামালের অপ্রতুলতা। ওষুধ উৎপাদনের জন্য স্থানীয় ওষুধ কোম্পানিগুলোকে এখনও কাঁচামাল আমদানির ওপর বহুলাংশে নির্ভর করতে হয়। কাঁচামালের আমদানির কারণে রফতানি আয়ের একটা বিরাট অংশ আমাদের হারাতে হচ্ছে।

এ কারণে ওষুধ শিল্প খাতে জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজনের হার তেমন পাচ্ছে না। আমাদের দেশে ওষুধ কোম্পানিগুলোর চাহিদা মেটাতে প্রতিবছর দেড় হাজার কোটি টাকার কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। এসব কাঁচামাল দেশে উৎপাদন করা গেলে আমদানি খাতে বিপুল অঙ্কের অর্থ বাঁচানো যেত এবং অন্যদিকে উদ্বৃত্ত কাঁচামাল রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যেত।

স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ হতে পারে কাঁচামাল (অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস) উৎপাদনের উৎকৃষ্ট স্থান। এত বছরেও সেই সম্ভাবনা আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় এপিআই বা অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস পার্কের কাজ এখনও শেষ না হওয়ায় ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনে ওষুধ কোম্পানিগুলো বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে।

এপিআই পার্কটি সম্পন্ন হলে কাঁচামাল উৎপাদনে উন্নত দেশগুলোর কারিগরি সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তিন দফা মেয়াদ বাড়ানোর পরও কাজের কাজ কিছুই হল না। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন পার্কটি স্থাপনের কাজ শুরু করে। ওষুধ শিল্পের জন্য যে সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত হয়েছিল দশ বছর আগে, তাকে কাজে লাগাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে সরকার ও ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।

সস্তায় ওষুধ উৎপাদন ও বিদেশে রফতানি করতে হলে দেশে কাঁচামাল উৎপাদনের কোনো বিকল্প নেই। এখন মনে হচ্ছে সে আশা আর পূর্ণ হওয়ার নয়।

গত ৯ ফেব্রুয়ারি সোনারগাঁও প্যান প্যাসিফিক হোটেলে অনুষ্ঠিত স্যামসন এইচ চৌধুরী মেমোরিয়াল কনফারেন্সে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ কোম্পানির মালিক ও ওষুধ শিল্প সমিতির কর্মকর্তারা অবলীলাক্রমে স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশে বর্তমানে মোট চাহিদার মাত্র ১৫ শতাংশ কাঁচামাল উৎপাদন হয়, যেখানে ভারতে এ উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ৮০ শতাংশ। বিদেশ থেকে আমদানি করা কাঁচামাল অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেশে উৎপাদিত কাঁচামালের চেয়ে দামে সস্তা। তাই কোম্পানিগুলো প্রস্তুত ওষুধের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখার কথা ভেবে দেশে উৎপাদিত কাঁচামালের চেয়ে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত কাঁচামাল দিয়ে ওষুধ উৎপাদনে আগ্রহী বেশি।

এ কারণেই বাংলাদেশে এপিআই বা অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস উৎপাদনে কোনো আগ্রহ বা গতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এবং তা সামনেও পরিলক্ষিত হবে বলে আমি অন্তত মনে করি না। কিন্তু বাংলাদেশ তার বিশাল ওষুধের বাজারের জন্য আর কতকাল কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভর করে থাকবে? ট্রিপস চুক্তি বাস্তবায়িত হয়ে গেলে পেটেন্টপ্রাপ্ত ওষুধ ও কাঁচামাল সুলভ মূল্যে আমদানি সহজ নাও হতে পারে।

বাংলাদেশের জেনেরিক মার্কেট প্রসারিত হলে বহির্বিশ্বে রফতানি ঠেকাতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য ভারত বা চীন আমাদের আর কাঁচামাল আমদানি করতে নাও দিতে পারে- সে কথাটিও আমাদের মনে রাখা দরকার।

বছর কয়েক আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক বৈঠকে বাংলাদেশ, ভারত ও নাইজেরিয়াকে নকল, ভেজাল ওষুধ তৈরির দেশ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। মানুষের আস্থা অর্জন এবং রফতানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে নকল, ভেজাল, ক্ষতিকর ও নিুমানের ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ প্রতিহত করতে হবে। বিদেশে রফতানির জন্য সব ওষুধের গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে।

এ জন্য কোম্পানিগুলোর ওপর সরকারের চাপ বাড়াতে হবে এবং ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরকে আরও সক্রিয় করে তুলতে হবে। অভিজ্ঞ লোকবল বাড়াতে হবে। ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবগুলোর আধুনিকীকরণসহ অভিজ্ঞ লোকবল বৃদ্ধি করতে হবে।

দেশে উৎপাদিত সিংহভাগ ওষুধের গুণগত মান নির্ণয় হয় না। উন্নত বিশ্বে রেজিস্ট্রেশনের জন্য প্রতিটি ওষুধের বায়োইকুইভ্যালেন্স (Bioequivalence) পরীক্ষা সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। এ পরীক্ষাটি বিদেশে করতে গেলে প্রচুর পয়সা খরচ হয়। শরীরে যথাযথ কার‌্যাবলি সম্পন্ন করার জন্য মূল ব্র্যান্ড ওষুধের সঙ্গে তুলনা করে জেনেরিক ওষুধের রক্তে পর্যাপ্ত প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষা চালানো হয়।

দেশে বায়োইকুইভ্যালেন্স টেস্ট সম্পন্ন করার সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি না হলে ওষুধের গুণগত মান নিয়ে দেশ-বিদেশে সব সময়ই প্রশ্ন থেকে যাবে এবং রফতানি বন্ধ হয়ে যাবে। সব ওষুধের গুণগত মান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন পরীক্ষাগার স্থাপনের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

নকল, ভেজাল, ক্ষতিকর ও নিুমানের ওষুধ নিয়ন্ত্রণ এবং এসব ওষুধ উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও বিক্রয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করা ও শাস্তি প্রদান করার দায়িত্ব ঔষধ প্রশাসনের। কিন্তু ঔষধ প্রশাসন এ ক্ষেত্রে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য নজির স্থাপন করতে পারেনি।

কারণ ঔষধ প্রশাসনের প্রচুর সমস্যা, দোষ-ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। রয়েছে জবাবদিহিতা, দায়বদ্ধতা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অভাব। ওষুধ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তি থেকে শুরু করে নিুপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্তব্যকর্মে অবহেলা, জবাবদিহিতার অভাব, নৈতিক অধঃপতনের জন্য এ পর্যন্ত কাউকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়নি।

আমরা মনে করি ঔষধ প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও কঠোর করতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের আদলে গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে মেধাস্বত্ব ছাড়ের সুযোগ সুযোগই থেকে যাবে, কাজের কাজ কিছুই হবে না। ১৯৮২ সালে যখন যুগান্তকারী ওষুধনীতি প্রণীত ও বাস্তবায়িত হয়, তখন বাংলাদেশের ওষুধের বাজার ছিল ১৭৩ কোটি টাকার। বর্তমানে বাংলাদেশে ওষুধের বাজার দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকায়।

বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো প্রায় ৩০ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ উৎপাদন করলেও কোনো ওষুধের মেধাস্বত্ব নেই। মেধাস্বত্ব ছাড়ের সুযোগ নিয়ে উন্নত বিশ্বে উদ্ভাবিত পেটেন্টপ্রাপ্ত ওষুধ কপি করে এ দেশে বাজারজাত ও বিক্রি করা হচ্ছে। কিছু ওষুধ রফতানিও করা হচ্ছে। বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি বিশাল ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, অথচ কোনো প্রতিষ্ঠানেরই পেটেন্টপ্রাপ্ত ওষুধ নেই কেন, তা নিয়ে এমনকি সরকারও কোনোদিন প্রশ্ন তোলেনি।

নতুন ওষুধ উদ্ভাবনে অর্থ বিনিয়োগের দরকার। বাংলাদেশের অনেক কোম্পানির সেই অর্থ বিনিয়োগের সামর্থ্য রয়েছে। কিন্তু এসব কোম্পানি গবেষণা ও উন্নয়ন খাতকে বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে, নতুন ওষুধ উদ্ভাবন ও পেটেন্ট প্রাপ্তির দিকে মনোযোগ না দিয়ে বছরের পর বছর অনুকম্পা, দান-খয়রাত, ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে উন্নত বিশ্বের পেছনে পেছনে দৌড়াতে ও মেধাস্বত্ব ছাড়ের আবদার নিয়ে দরকষাকষিতে বেশি সময় ব্যয় করছে। আর কত বছর দান-খয়রাত ও ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে এভাবে আমরা দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে মরব?

অনুকম্পা, দান-খয়রাত নিয়ে বেঁচে থাকায় সম্মান নেই। নিজের কাঁচামাল, নিজের ওষুধ নিজে তৈরি করে বাজারজাত ও বিক্রি করব, রফতানি করে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করব- এ ধরনের দৃঢ় মনোভাবের মধ্যে আত্মতৃপ্তি আছে, সম্মান আছে- এ কথাটি এখন থেকে ভাবতে শুরু করলে আগামী ১৭ বছর বাংলাদেশের জন্য অনেক উন্নতি ও সম্মান বয়ে আনতে পারবে ওষুধ কোম্পানিগুলো।

এ প্রসঙ্গে একটি পত্রিকা সম্পাদকীয়তে লিখেছে, নতুন করে ১৭ বছরের জন্য মেধাস্বত্ব ছাড় পাওয়া গেছে বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার কিছু নেই। কারণ নিুআয়ের দেশ থেকে নিুমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত বাংলাদেশ যেদিন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে সেদিন থেকেই মেধাস্বত্ব ব্যবহারের সুযোগ আর থাকবে না। তখন উচ্চমূল্যে মেধাস্বত্ব কিনে এনে ওষুধ প্রস্তুত ও বাজারজাত করতে হবে।

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ওষুধ কোম্পানিগুলো কী করছে বা কী করা যেত, এরকম প্রশ্ন এখন সামনে চলে আসার দরকার ছিল। এর উত্তর দেয়া কঠিন নয়। ২০০১ সালের পর থেকে আমরা ওষুধের কাঁচামালের জেনেরিক ভারসন তৈরির চেষ্টা করতে পারতাম। অন্ততপক্ষে ওষুধের কাঁচামালের জেনেরিক ভারসন তৈরির কাজটি সহজে করা যেত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ কোম্পানি ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সম্পাদিত গবেষণা কার্যক্রম এ দেশের উন্নয়নমূলক কাজে লাগছে না। অধিকাংশ গবেষক গবেষণা করেন শুধু গবেষণা প্রবন্ধের সংখ্যা বাড়ানো ও প্রমোশন লাভের জন্য। বাংলাদেশের অনেক গবেষণা কার্যক্রমে দেশের স্বার্থ প্রতিফলিত হয় না, যদিও এর পেছনে শত শত কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে। বাংলাদেশে ফার্মেসি শিক্ষা ও গবেষণার প্রসার ঘটেছে।

এ পেশায় অসংখ্য খ্যাতিমান গবেষক রয়েছেন। কিন্তু ওষুধ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে এসব গবেষক বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কোনো যোগসূত্র নেই। ওষুধ কোম্পানিগুলোতে যেসব ফার্মাসিস্ট কর্মরত আছেন, তারাও উন্নয়নমূলক গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তাহলে নতুন ওষুধ আসবে কোত্থেকে বা পেটেন্টপ্রাপ্তিই বা কীভাবে সম্ভব হবে তা আমার বোধগম্য নয়।

আমি মনে করি, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ ও তার কাঁচামাল সংশ্লেষণ ও উদ্ভাবনে ওষুধ কোম্পানি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ উদ্যোগে কাজ করাকে প্রাধান্য দিতে হবে। তাহলে হয়তো আমরা আগামী ১৭ বছরে কিছু ওষুধ উদ্ভাবন ও বাজারজাত করার সুযোগ পাব।

ট্রিপস চুক্তি চালু বা কার্যকর হওয়ার বেশ আগ থেকেই ভারতের মতো অনেক উন্নয়নশীল দেশ নতুন কার্যকর ওষুধের জেনেরিক ভারসন তৈরি করে পেটেন্ট সুবিধা লাভ করে। এখানে তৈরি ওষুধকে পেটেন্ট সুবিধা দেয়া হয়নি, দেয়া হয়েছে ওষুধ বা প্রোডাক্ট প্রস্তুত প্রণালিকে। আমরাও ঠিক সেই একই কাজটি বাংলাদেশে করতে পারি। এ প্রক্রিয়ায় ওষুধের প্রাপ্তি সহজলভ্য হয়, দামও সস্তা থাকে।

ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ : অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×