সত্য যে কঠিন

  ড. আবু সাইয়িদ ১৮ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সত্য যে কঠিন
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ফাইল ছবি

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, যিনি দুঃখী মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে সারাজীবন তপস্যায় দগ্ধ হয়েছেন, প্রতিষ্ঠা করেছেন বাংলাদেশ রাষ্ট্র, তিনি জাতিরাষ্ট্রের পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি জানতেন, স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে যাবে যদি আর্থ-সামাজিক মুক্তি না আসে। তিনি এটাও জানতেন, লক্ষ-কোটি অবহেলিত, বঞ্চিত, শোষিত মানুষের মুক্তির পথ সহজসাধ্য হবে না। জীবনের সমগ্রতা দিয়ে যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি, সেই রাষ্ট্র দর্শনের মর্মকথা ছিল অসাম্প্রদায়িক শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ, যেখানে জনগণ থাকবে মালিক।

সেই লক্ষ্যে তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের কাজ শেষ করে যখন সমাজ বদলের লক্ষ্যে অগ্রসর হয়েছিলেন তখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের এক পর্যায়ে তাকে হত্যা করা হয়। তার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে কেবল তার স্বপ্ন, সাধনা ও দর্শনকেই ধ্বংস করা হল না- মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত চেতনা ও মূল্যবোধ এবং নীতিকেও ধ্বংস করা হল। এক জাতিবৈরী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে পুরনো সাম্প্রদায়িক ধারার রাজনীতি, আর্থ-সামাজিক সূত্রগুলো পুনঃস্থাপন করে। বহু সংগ্রাম ও লড়াই শেষে গণঅধিকার প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্র চর্চা ও বিকাশের যে বাতাবরণ সৃষ্টি হয়েছিল তাও আজ রাষ্ট্রযন্ত্রের একাংশের নীতিহীন দৌরাত্ম্যে নিদারুণ বিপর্যয়ের মুখে।

২. এই দুঃসহ যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমি জন্মদিন পালন করি না। আমার জন্মদিনই কী, মৃত্যু দিনই কী! যে দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ না খেয়ে রাত কাটায়, যাদের কোনো অধিকার নেই, আমি সেই দুঃখী মানুষের কথা ভাবি, তারাই আমার জীবন। তাদের জন্মদিন বা মৃত্যুদিন নাই।’ তার সেই ভাবনার মানুষগুলো কেমন আছে? কেমন আছে তার দুঃখী মানুষ?

৩. কৃষকরা ফসল ফলান। খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ। সরকার সহায়তা দিচ্ছে। কিন্তু শ্রমের ন্যায্য মূল্য নেই। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন, ন্যায্য মূল্যের আড়ত। কিন্তু তা হয়নি। হয়নি কারণ এটা করতে গেলে প্রয়োজন সমবায় বা সামাজিক মালিকানা। কিন্তু বর্তমান আর্থিক নীতি এখন উল্টো পথে। জনসংখ্যার অনুপাতে পরাধীন পাকিস্তানি আমলে দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল প্রায় সাড়ে চার কোটি লোক। বর্তমানে হ্রাস পেয়ে হয়েছে তিন কোটি। পুষ্টির ঘাটতি। স্বাস্থ্যসেবার অগ্রগতি অব্যবস্থায় আটকে পড়েছে। শিক্ষা-সংকট সর্বগ্রাসী। সংখ্যায় হয়তো এগিয়ে যাচ্ছে- কিন্তু মানের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে। উন্নয়নের সঙ্গে বেড়েছে অসাম্য। কর্পোরেট হাউস আর সিন্ডিকেট মিলে ব্যাংক থেকে জনগণের টাকা লুট করেছে- আবার সেই ব্যাংক বাঁচাতে ভর্তুকি দিচ্ছে জনগণই। রাষ্ট্র এ অবস্থায় গরিব, দুঃখী মানুষের পাশে কার্যকর সক্ষমতা নিয়ে দাঁড়াতে পারেনি। সর্বত্রই বলা হচ্ছে, ‘জিরো টলারেন্স’। কিন্তু বাস্তবে তার প্রয়োগ কোথায়? পুলিশতন্ত্র, আমলাতন্ত্র দৃঢ় হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু বরাবর চেয়েছেন, তারা যেন জনগণের বন্ধু হয়। তারা বন্ধু হয়নি- তাদের কেউ কেউ হয়েছেন দুর্নীতি ও দুঃশাসনের চিত্রকল্প। আমলাদের দিয়ে আমলাতন্ত্র অপসারিত হবে না- সর্বত্র বিস্তৃত হবে। বিস্তৃতি হবে দুর্নীতি। এটা আর্থিক তত্ত্বের কথা। জবাবদিহিতা নেই। স্বচ্ছতা নেই। সরকারের প্রচেষ্টা যতই থাক। নির্দেশনা যা-ই থাক। যে গণমানুষের অধিকারের জন্য বঙ্গবন্ধু সংগ্রাম করেছেন, জীবনের স্বর্ণোজ্জ্বল দিনগুলো কাটিয়েছেন কারাগারে, সেই জনগণ শোষকদের কাছে, দুর্বৃত্ত, লুটেরা, বণিক-ধনিক গোষ্ঠীর হাতে বন্দি।

৪. কাউকে দোষারোপ করে লাভ নেই। দোষারোপের রাজনীতি স্থগিত করে দায় নিতে হবে। দায় নিতে গেলে দায়িত্ব এসে যায়। দায়িত্বের সঙ্গে অধিকার ও কর্তব্যের বিষয়টি সামনে আনতে হবে। ফুলানো-ফাঁপানো কথায় কাজ হবে না। হচ্ছে না। চালাকি করে মহৎ কিছু অর্জন হয় না। সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলতে হবে। সর্বোপরি সিস্টেম বদলাতে হবে। পুরনো মত, পুরনো পথ, প্রচলিত পদ্ধতি বহাল রেখে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শোষণমুক্ত সোনার বাংলা নির্মাণ করা যাবে না। কোটি বেকার ও ছদ্মবেকারের দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি মিলবে না। প্রচলিত পদ্ধতি বহাল থাকলে গ্রাম-শহরের দূরত্ব কমবে না। বাড়বে।

৫. জন্মদিনে বঙ্গবন্ধুর বেদিমূল ফুলে ফুলে ভরে দেয়া যাবে, সেটা হবে আনুষ্ঠানিকতা। আনুষ্ঠানিকতার দৃশ্যাবলী ক্যামেরায় বড় হয়ে উঠবে- অঙ্গীকার বা আন্তরিকতা নয়। কারণ আত্মজিজ্ঞাসা অনুপস্থিত। অথচ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে আত্মবিশ্লেষণ জরুরি। বাংলাদেশ আজ ‘উন্নতির রোল মডেল’। পাশাপাশি এটাও সত্য দেশে বিরাজ করছে একটা অস্বস্তিকর অবস্থা, নিরাপদ জীবনবোধ অনুপস্থিত। এই বোধ তখনই হয় যখন রাষ্ট্র ব্যক্তির অধিকার সংকুচিত করে। রাষ্ট্র যেখানে তাকে নিরাপত্তা দেবে- সেখানে রাষ্ট্রযন্ত্রের কোনো কোনো অংশ তার মালিকানা কেড়ে নেয়। এই মালিকানা, এই অধিকার প্রতিষ্ঠার বার্তা হবে আজকের মহত্তম অঙ্গীকার। কঠিন সত্যের মাঝেই জাতিরাষ্ট্রের পিতার বিশালত্ব অনুধাবন করা যাবে। অমলিন অমরত্বের সিংহদুয়ার আরও অবারিত হবে।

অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদ : গবেষক ও সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×