মসজিদে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের হামলা

  মোহাম্মদ এলমাসরি ২১ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মসজিদে হামলা

নিউজিল্যান্ডের মসজিদে অন্তত ৫০ জনকে হত্যা করা শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের ঘটানো হামলাগুলো শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী সন্ত্রাসবাদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের দীর্ঘ তালিকার সর্বশেষ উদাহরণ। ক্রমবর্ধমান ও অপরিবর্তনীয় হুমকি সত্ত্বেও পশ্চিমা সরকারগুলো শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের হুমকি পর্যাপ্তভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়েছে।

শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী সন্ত্রাসবাদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকাতে থাকবে ২০১৮ সালে পেনসিলভানিয়ার পিটর্সবার্গে একটি সিনাগগে ১২ জন ইহুদি প্রার্থনাকারীকে রবার্ট গ্রেগরি বোয়ার্স কর্তৃক হত্যা, ২০১৭ সালে কুইবেক সিটি মসজিদে আলেকজান্ডার বিসোনেটি কর্তৃক ৬ মুসলিমকে হত্যা, ২০১৫ সালে সাউথ ক্যারোলিনা চার্চে ডিলান রুফ কর্তৃক ৯ জন কৃষ্ণাঙ্গ খ্রিস্টান প্রার্থনাকারীকে হত্যা এবং ২০১১ সালে নরওয়েতে অ্যান্ডার্স বেহরিং ব্রেইভিক কর্তৃক ৭৭ জনকে খুনের ঘটনাগুলো।

সাউদার্ন পোভার্টি ল’ সেন্টারের তথ্যমতে, অন্তত ৩০ হাজার মানুষ হত্যার কিছু পরিকল্পনাসহ শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের বহু ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এই তো গত মাসে, কৃষ্ণাঙ্গ, উদার রাজনীতিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হামলার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী ও মার্কিন কোস্টগার্ডের লেফটেন্যান্ট ক্রিস্টোফার পল হ্যাসনকে গ্রেফতার করেছে।

১৯ ও ২০ শতকের শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের গণপিটুনিতে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের বিনা বিচারে হত্যা, আফ্রিকার ক্রীতদাস ব্যবসার যুগে লাখ লাখ কালো মানুষকে হত্যা বা পশ্চিমা উপনিবেশবাদের চূড়ান্ত সময়ে লাখ লাখ বাদামি মানুষকে হত্যার তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের কু ক্লাক্স ক্লানের ঘটানো (ককক, শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী সন্ত্রাসী সংগঠন) কৃষ্ণাঙ্গবিরোধী সহিংসতার অপরাধসহ শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী ইতিহাসের সাম্প্রতিক সময়ের এসব কর্মকাণ্ড তেমন কিছুই নয়। গবেষক ও বিশ্লেষকরা বারবার জোরালোভাবে বিতর্ক করে বলেছেন যে, আফ্রিকার দাস ব্যবসা ও পশ্চিমা উপনিবেশবাদ- উভয়ই সংঘটন করানো হয়েছিল শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের সেবার জন্য।

পশ্চিমা গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক এলিটরা যদিও ‘ইসলামী সন্ত্রাসবাদ’র আলোচনায় উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় করে, উগ্র ডানপন্থী ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী সন্ত্রাসবাদ তার চেয়েও বেশি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলার দুই-তৃতীয়াংশই করেছে উগ্র ডানপন্থি বিভিন্ন ব্যক্তি ও দল। যাহোক, সাউদার্ন পোভার্টি ল’ সেন্টারের গবেষণায় উঠে এসেছে যে, বেশিরভাগ উগ্র ডানপন্থী সহিংসতা দ্ব্যর্থহীনভাবে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের সঙ্গে সংযুক্ত।

শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ব সন্ত্রাসবাদের স্পষ্টত প্রতীয়মান ও চলমান হুমকি সত্ত্বেও, তর্কসাপেক্ষে পশ্চিমা সমাজ এ বিপদটিকে যেমনটি নেয়া উচিত তেমন সতর্কতার সঙ্গে নেয়নি। নিউইয়র্ক টাইমসের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলার কৌশল উগ্র ডান চরমপন্থার ক্রমবর্ধমান হুমকিকে এড়িয়ে গেছে’। এটিও পরিষ্কারভাবে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের সঙ্গে জড়িত বলে প্রতিবেদনটিতে নোট আকারে উল্লেখ করা হয়েছে।

শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বকে ঠেক দিয়ে রাখা : শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বকে যেমন স্পর্শকাতর হিসেবে নেয়া উচিত, কেন বেশিরভাগ পশ্চিমা সমাজ তেমনভাবে নেয়নি তা ব্যাখ্যা করার জন্য রাজনৈতিক আন্দোলনগুলো সহায়তা করতে পারে। আর তা হল বেশিরভাগ পশ্চিমা রাজনৈতিক নেতা নিজেরাই শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ।

ইউরোপ ও আমেরিকা- উভয় অঞ্চলের মূলধারার রাজনীতিতে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ সুনির্দিষ্টভাবে শেকড় গেঁড়ে বসেছে। ইউরোপে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ রাজনৈতিক শক্তি অর্জন করেছে এবং ২০১৬ সালে ব্রিটেনের ব্রেক্সিট গণভোটসহ নির্বাচন ও গণভোটগুলোকে প্রভাবান্বিত করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং অসংখ্য রিপাবলিকান রাজনীতিবিদ শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী ও সাবেক ককক ভেলকিবাজ ডেভিড ডিউক ব্যাখ্যা করেছেন কেন শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা ২০১৬ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছে এবং ডিউকের সমর্থনের বিষয়টি অস্বীকার করতে যখন ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তখন তিনি শিরোনামে জায়গা পেয়েছেন। ২০১৭ সালে ককক-র বিষয়ে কুখ্যাতভাবে দ্ব্যর্থতা তৈরি করেছেন ট্রাম্প এবং ভার্জিনিয়ার চার্লটসভাইলে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী বিক্ষোভকারীদের ‘ভেরি ফাইন পিপল’ বলে সম্বোধন করে। এই দশকের শুরুর দিকে প্রথম মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নাগরিকত্ব, স্তর ও বুদ্ধিমত্তাকে চ্যালেঞ্জ করে প্রচারণা ছড়িয়েছিলেন ট্রাম্প।

শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ সবসময় সহিংস নয়, অন্তত ব্যক্তিগত পর্যায়ে তা সহিংস নয়। শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের কিছু প্রভাব অনেক বেশি প্রতারণাপূর্ণ; কিন্তু অনেক বেশি বিস্তৃত ও স্বাভাবিক। সন্দেহাতীত পক্ষপাতিত্বের ওপর চালানো বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা যায় যে, শ্বেতাঙ্গ মানুষ কৃষ্ণাঙ্গদের বুদ্ধিগতভাবে তুলনামূলক নিকৃষ্ট মনে করে এবং অন্যান্য যে কোনো জিনিসের চেয়ে বেশি হুমকি মনে করে।

এমনকি সব জাতিবিদ্বেষহীন উপাদান নিয়ন্ত্রণে থাকার পরও কেন কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানরা চাকরি পেতে ও ঋণ পেতে বেশি কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়- সন্দেহাতীত পক্ষপাতিত্বের বিষয়টি তা ব্যাখ্যা করতে সহায়ক। গবেষণায় যা দেখা গেছে, তার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক সাম্প্রতিক নিউজিল্যান্ডে মুসলিমবিরোধী গণহত্যার বিষয়টি। সন্দেহাতীত পক্ষপাতিত্বের গবেষণা বলছে, পশ্চিমা সমাজের শ্বেতাঙ্গ মানুষের বড় ধরনের অংশ মুসলিম ও অন্যান্য বাদামি মানুষদের অসম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা পোষণ করে।

নিউজিল্যান্ডে গণহত্যার সঙ্গে আরেকটি সমস্যা সরাসরি সম্পৃক্ত, সেটি হল মিডিয়া কাভারেজ। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো মুসলিমদের নেতিবাচক কাভারেজ দেয়া ও উচ্চপর্যায়ের গৎবাঁধা এবং মামুলি হিসেবে উপস্থাপনের মনোভাবাপন্ন। মুসলিমদের ঘটানো সহিংস অপরাধগুলোকে প্রতিবেদনে অনেক বেশি হাইলাইট করা হয়, অন্যদিকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘটানো সহিংস অপরাধগুলোকে কম গুরুত্বের সঙ্গে দেখানো হয় বা এড়িয়ে যাওয়া হয়।

অনেক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মুসলিমদের ঘটানো সন্ত্রাসবাদ অমুসলিমদের ঘটানো সন্ত্রাসবাদের চেয়ে ৩৫৭ শতাংশ বেশি সংবাদ মনোযোগ পায়। এর বাইরে ‘সন্ত্রাসবাদ’ শব্দটি প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া হয় অমুসলিমদের সহিংসতার ক্ষেত্রে, অন্যদিকে মুসলিমদের অপরাধ বর্ণনার ক্ষেত্রে সন্ত্রাসবাদ শব্দটিকে বিশেষভাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

রাজনৈতিক এলিট এবং মিডিয়া কাভারেজের পর দুটি বিষয় মুসলিম, কৃষ্ণাঙ্গ, অভিবাসী এবং অন্য সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সমসাময়িক পশ্চিমা বিশ্বে নেতিবাচক মানসিকতার কারণ ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করছে। নিউজিল্যান্ডের মসজিদে হামলাকারীরা মুসলিম বা অন্য সংখ্যালঘুদের ঘৃণা করার মানসিকতা নিয়ে জন্ম নেয়নি। তাদের শেখানো হয়েছে, যেমনটি অন্য সব শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী সন্ত্রাসীদের শেখানো হয় অন্ধভক্তির মাধ্যমে, যা কিনা পশ্চিমা সমাজগুলোতে আধিপত্যবাদী মর্যাদা অর্জন করেছে।

আলজাজিরা থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম

ড. মোহাম্মদ এলমাসরি : দোহা ইন্সটিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর

ঘটনাপ্রবাহ : নিউজিল্যান্ডে মসজিদে এলোপাতাড়ি গুলি

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×