মিঠে কড়া সংলাপ: এ যন্ত্রণা অসহনীয়!

  মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন ২৩ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মিঠে কড়া সংলাপ: এ যন্ত্রণা অসহনীয়!
ব্রেন্টন ট্যারেন্ট। ফাইল ছবি

প্রায় চল্লিশ বছর আগে এক ভদ্রমহিলা ধানমণ্ডিতে একটি বাড়ি নির্মাণ করবেন বলে আমার কাছে এসেছিলেন এবং আমিও তাকে যৎসামান্য বিদ্যাবুদ্ধি দিয়ে সহযোগিতা করেছিলাম। ওই সময়টাতে একদিন একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টে খেতে বসে তার কাছে লন্ডনে বসবাসের কথা শুনে যারপরনাই অবাক হয়েছিলাম।

তিনি বলেছিলেন, তার স্কুলপড়ুয়া ১৫ বছর বয়সী ছেলেকে স্কিন হেটাররা মারার জন্য তাড়া করায় ছেলেটি দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ি পর্যন্ত এসে প্রাচীর টপকে নিজেদের আঙিনায় ঢুকে প্রাণ বাঁচায়। সে সময় ব্রিটেনে বেশ কিছুদিন বর্ণবাদীদের উৎপাত চলেছিল। আর সেসব দেখে ভদ্রমহিলা ভয় পেয়ে লন্ডনের ঘরবাড়ি, রেস্টুরেন্ট বিক্রি করে দিয়ে নিজ দেশে চলে এসে ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকায় একটি প্লট ক্রয় করেছিলেন। যতদূর মনে পড়ে তিনি মানিকগঞ্জের লোক।

সেদিন তার মুখে সেসব শুনে আমি নিজে বা আমার পরিবারের কেউ ওইসব দেশে সেটেল না হওয়ার বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছিলাম। কিন্তু না, তা হয়নি। আমার কন্যাটি দেশে থেকে গেলেও পুত্রটি অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে সেটেল করেছে। আর সেই সুবাদে আমাকেও বারবার অস্ট্রেলিয়া যেতে হয়েছে। একেকবার সেখানে গিয়ে একনাগাড়ে মাসের পর মাস অবস্থানকালে যা দেখেছি, শুনেছি ও বুঝেছি তাতে করে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অস্ট্রেলিয়ানকে আমার কাছে রেসিস্ট বলে মনে হয়েছে!

একবার একটি দোকানে গিয়ে একশ’ ডলারের একটি নোট দিলে অস্ট্রেলিয়ান দোকানি আমাকে যেসব প্রশ্ন করেছিল, অন্য কোনো দেশের ইমিগ্রেশনেও আমাকে তা করা হয়নি। তার প্রশ্ন ছিল, বছরে আমি কতবার অস্ট্রেলিয়া আসি, দেশে কতদিন থাকি, দেশে কী করি ইত্যাদি। জবাবে আমিও তাকে বলেছিলাম, ‘দ্যাটস নান অব ইউর বিজনেস।’ প্রত্যুত্তরে সে যেন কী বলায় আমি আবারও বলেছিলাম, ‘ইন মাই প্লেস ইফ দেয়ার উড বি এনি ইউরোপিয়ান, আমেরিকান, কুড ইউ আস্ক হিম দিস কোশ্চেন!’ তারপর সে ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল।

বছরদুয়েক বাদে আরও একটি ঘটনায় আমার পুত্রের বাড়িসংলগ্ন অপর একটি বাড়ির সামনে গিয়ে বেশ বিপদেই পড়েছিলাম। সকালবেলার হাঁটা শেষে বাড়ি ফিরতে ঠিক পাশের সুন্দর বাংলোটি দেখে আমি সেই বাড়ির গাড়ি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ানো মাত্র প্রায় সাত ফুট লম্বা এবং সে রকম চওড়া এক অস্ট্রেলিয়ান এসে আমাকে প্রশ্ন করা শুরু করলেন, ‘তুমি এখানে কেন?’ তার বাড়িটা দেখে ভালো লেগেছে, তাই একটু কাছ থেকে দেখার উদ্দেশ্যে এসেছি বলার পরও তিনি জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রাখলেন। এ অবস্থায় পাশেই আমার ছেলের বাংলো দেখিয়ে বললাম, ‘দেখ আমি আমার পুত্রের বাসায় বেড়াতে এসেছি, আমার পুত্র তোমার নিকটতম প্রতিবেশী এবং সেও একজন অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক।’

জবাবে ভদ্রলোক আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, ‘সো হোয়াট?’ ভাগ্য ভালো আমার ছেলে সেই মুহূর্তে বাইরে এসে রিমোট কন্ট্রোল টিপে তার গ্যারেজের সাটার খোলায় সেই শব্দে আমি সেদিকে তাকিয়ে তাকে ডেকে আনি এবং সে স্বব্যাখায় বলে, ‘দেখ আমার পিতা একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, তোমার বাড়ির কনস্ট্রাকশন বিউটি তাকে অ্যাট্রাক্ট করায় তিনি কাছে এসে বাড়িটি দেখছিলেন।’ এ কথায় ভদ্রলোক আর কোনো কিছু না বলে ভেতরে চলে গেলে আমি ছেলের সঙ্গে তার গাড়িতে করে কিছু কেনাকাটা করতে স্টোরে চলে যাই।

সেদিনের সে ঘটনার পর আমি আর কোনোদিন কোনো অস্ট্রেলিয়ানের বাড়ির সামনে দাঁড়ানোর সাহস করিনি। হাঁটার সময় রাস্তার পাশে কোনো বাড়ি পড়লে দ্রুততার সঙ্গে তা পার হয়ে পার্কে ঢুকে পড়তাম। এসব ছাড়াও আরও দু-একটি ঘটনায় আমি যা প্রত্যক্ষ করেছি, তাতে করে মনে হয়েছে, অস্ট্রেলিয়ানদের একটি অংশ রেসিস্ট, যা আমেরিকায় আমার কাছে তেমন করে মনে হয়নি, এমনকি লন্ডনেও নয়। বিষয়টি আমার ছেলেকে বলেছি এবং ভবিষ্যতে কী ঘটতে পারে সে বিষয়ে আমার ধারণা তাকে জানিয়ে সম্ভব হলে অস্ট্রেলিয়া ত্যাগ করে দেশে চলে আসতে বলেছি।

বস্তুত বিভিন্ন সময়ে অস্ট্রেলিয়া গিয়ে সেখানে মাসের পর মাস কাটিয়ে আমার মনে এমন কিছু ধারণা তথা তিক্ততা জন্মেছে যে, ছেলেকে অনেক বুঝিয়েছি সেখান থেকে চলে আসতে। বলেছি, তুমি মেডিসিনে উচ্চতর ডিগ্রিধারী একজন ডাক্তার, সুতরাং দেশে তোমার ভাত-কাপড়, টাকা-পয়সার অভাব হবে না। কিন্তু সে উল্টো আমাকে বলেছে, ‘স্বাস্থ্যকর ভালো পরিবেশের দৃষ্টিকোণ থেকে সেই স্থানটি পৃথিবীর দ্বিতীয় সেরা নগরী, আর ঢাকা পৃথিবীর দ্বিতীয় নিকৃষ্টতম নগরী।’ আমি তার কথার জবাবে কিছু বলতে পারিনি বা বলিনি। কিন্তু সেই একমাত্র পুত্রটির কথা ভেবে আমি ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়েছি। কারণ আমার ছেলেটি প্রতি শুক্রবারে জুমার নামাজ আদায় করতে মসজিদে যায়।

সেখানকার বিরাট ও সুন্দর টার্কিশ মসজিদে গিয়ে তার সঙ্গে আমিও নামাজ পড়েছি। আমার কেবলই মনে হচ্ছে, ওই মসজিদে যদি কোনোদিন কেউ হামলা করে? তাছাড়া এ মুহূর্তে আমার ভীষণভাবে মনে হচ্ছে, ওইসব দেশে বর্ণবাদীদের অত্যাচার আরও বেড়ে যাবে। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার বিষয়ে আমার সন্দেহটা আরও বেশি। কারণ আদি অস্ট্রেলিয়ানদের (aboriginal) দমন করে যেসব ব্রিটিশ সেখানে গিয়ে রাজত্ব করছেন, তাদের অতীত ইতিহাস তেমন সুবিধার নয়। শত বছর আগে ব্রিটেনের যেসব লোকজন খুন, হত্যা, ধর্ষণ, ডাকাতি ইত্যাদি অসামাজিক ও বেআইনি কর্মকাণ্ড ঘটানোর অভিযোগে দণ্ডিত হতেন, তাদের কয়েদি হিসেবে নির্বাসিত করে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানো হতো।

বংশানুক্রমিক পরিবর্তনের ধারায় অতীতের সেসব অপকর্ম থেকে বের হয়ে বর্তমানে তারা সভ্যভব্য জীবনের অধিকারী হলেও তাদের রক্তেরই একজন ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে ঢুকে গুলি করে নামাজরত মুসলমানদের পাখির মতো হত্যা করেছে। এ ঘটনার নিন্দা করার ভাষা আমার জানা নেই। আর থাকলেও এখানে তা উল্লেখ করা শোভন হবে না। তবুও এখানে শুধু এটুকু বলতে চাই- ‘এই হত্যাকারী জানোয়ার অপেক্ষা নিকৃষ্ট।’ আর সে নাকি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বারা অনুপ্রাণিত।

তাছাড়া অস্ট্রেলিয়ার সিনেটর ফ্রেসার অ্যানিং এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে যে মন্তব্য করেছেন তা আরও মর্মান্তিক, আরও বেদনাদায়ক। তিনি বলেছেন, ‘মুসলিমরা নিউজিল্যান্ডে প্রবেশ করেছে বলেই সেখানে এ ঘটনা ঘটেছে।’ এতে আরও বেশি করে প্রমাণিত হয়, অস্ট্রেলিয়ানদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রেসিস্ট!

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যও কম কিছু নয়। তিনিও এ জঘন্য জঙ্গির নির্বিচার নরহত্যার মতো জঘন্য ঘটনার বিরুদ্ধে সরাসরি কিছু না বলে শুধু বলেছেন, ‘তিনি এ বিষয়ে নিউজিল্যান্ডকে সাহায্য করতে চান।’ অথচ পৃথিবীর কোথাও কোনো মুসলমান এমনটি ঘটালে তার চৌদ্দগোষ্ঠী তো উদ্ধার করা হতোই, এমনকি তাকে ধরার জন্য অভিযান পর্যন্ত চালানো হতো। যদিও আমরা কোনো প্রকারেই আকার-ইঙ্গিত-ইশারায় কখনও এমনটি বলি না যে, কোনো মুসলিম এভাবে কাউকে হত্যা করুক।

কারণ ইসলামের নামে কেউ এসব করলে বা করতে চাইলে তারা মুসলিম নয়। তারা পশ্চিমাদের এজেন্ট! তারা অন্যদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে, মোটিভেটেড হয়ে ইসলাম ধর্মের ক্ষতিসাধন করছে। আর ইসলাম ধর্মের সৌন্দর্যের কাছে পরাভূত হয়ে একশ্রেণীর ফ্যাসিস্ট শক্তি ব্রেনটন টেরেন্টের মতো জঘন্য জঙ্গি তৈরি করে নিরীহ মুসলিমদের হত্যা করছে।

বাজে অজুহাতে যেমনটি ইরাকে করা হয়েছিল এবং যার খেসারত এখনও মুসলিম জাহানকে দিতে হচ্ছে। এ ফ্যাসিস্ট শক্তি আরও একটি ইরাক, আরও একটি সিরিয়া তৈরি করতে না পেরে মসজিদের মতো পবিত্র স্থানে এজেন্ট দিয়ে বর্বরের মতো গুলি চালিয়ে নামাজরত নিরীহ মুসলমানদের পাখির মতো হত্যা করেছে। এ ঘটনা যে জঘন্যতম জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম, ঘৃণ্যতম তথা নিকৃষ্টতম অপরাধ সে কথা বলাই বাহুল্য।

আমরা অত্যন্ত কঠোরভাবে এ ঘটনায় নিন্দাজ্ঞাপনের পাশাপাশি এর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করছি। আশা করব, ওইসব দেশে অতীতে এ ধরনের অন্যান্য ঘটনার মতো এক্ষেত্রেও অপরাধীকে মানসিক ভারসাম্যহীন বা পাগল সাজানোর চেষ্টা করা হবে না। আরও আশা করব, মানবসমাজে এমন নিকৃষ্টতম ঘটনা, এমন বর্বরতা আর ঘটবে না। আমরা এমন বর্বরতা আর দেখতে চাই না। আমাদের কাছে এ যন্ত্রণা অসহনীয়।

মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

ঘটনাপ্রবাহ : নিউজিল্যান্ডে মসজিদে এলোপাতাড়ি গুলি

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×