গ্যাসের দামবৃদ্ধিতে জনদুর্ভোগ বাড়বে

  মুঈদ রহমান ২৪ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জনদুর্ভোগ

সরকার গ্যাসের দাম বাড়াতে যাচ্ছে। এ নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে নতুন করে ভীতির সঞ্চার হল, যা অসন্তোষে পরিণত হবে। কারণ দামবৃদ্ধির আপাত প্রভাব উৎপাদকের ওপর বর্তালেও তার সর্বশেষ দায় ভোক্তাকেই বহন করতে হয়। উৎপাদক তার উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির পুরো অংশ পণ্যের দাম বৃদ্ধি করে পুষিয়ে নেবেন।

আর ভোক্তা তা বেশি দামে কিনে ব্যয়ভার বহনের দায়িত্ব পালন করবেন। এ বাড়তি ভোগান্তির কারণেই সাধারণ মানুষের এত ক্ষোভ, এত রাগ-বিরাগ। কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) আহ্বায়ক মোবাশ্বের হোসেন এ বিষয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন, বাম জোট হরতালের হুমকি দিয়েছে।

সব পণ্যের দামবৃদ্ধির প্রভাব বাজারে সমানভাবে পড়ে না। সার্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের মূল্যস্ফীতি ঘটানোর ক্ষমতা সব পণ্য রাখে না। কোনো কোনো সময় দেখা যায় দুর্যোগের কারণে কাঁচামরিচের দাম ৪০ টাকা থেকে লাফিয়ে ১৮০, এমনকি ২০০ টাকা পর্যন্ত উঠে যায়। এটা সাময়িক এবং এতে করে সারা অর্থনীতি কেঁপে ওঠে না। সে সময় ভোক্তারা তাদের কাঁচা মরিচের ভোগ কিছুটা কমিয়ে দেন। তাই বলে ক্ষোভে-দুঃখে ফেটে পড়েন না। কিন্তু কিছু কিছু জিনিস আছে যার দামবৃদ্ধি পুরো অর্থনীতিকে কাঁপিয়ে দেয়, অর্থনীতির গায়ে জ্বর এসে যায়। এটা হয় ওই পণ্যের বহুমাত্রিক ব্যবহারের কারণে, অন্যান্য পণ্যের উৎপাদন নির্ভরতার কারণে এবং এর কোনো সহজ বিকল্প না থাকার কারণে। জ্বালানি তেল ও গ্যাস এমনই দুটি পণ্য। আমরা সহজেই গ্যাসের ওপর আমাদের নির্ভরতা কতখানি তা দেখতে পারি। আমাদের মোট গ্যাস উৎপাদনের ১২ শতাংশ ব্যবহার হয় বাসাবাড়ি-বাণিজ্যে, ১২ শতাংশ শিল্পে, সার উৎপাদনে ২৪ শতাংশ, বিদ্যুতে ৪৫ শতাংশ আর বাদবাকি ৭ শতাংশ আমরা ব্যবহার করতে পারি না- যাকে বলে সিস্টেম লস।

আবাসিক ব্যবহারযোগ্য দুই চুলার দাম ৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪৪০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনো জিনিসের দাম বাড়লে আমরা তার ভোগ কিছুটা কমিয়ে দিয়ে আয়ের সঙ্গে সমন্বয় করি। কিন্তু এখানে তো গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে কোনো লাভ নেই- তাকে ১৪৪০ টাকাই দিতে হবে এবং এই বাড়তি খরচের জোগান দিতে হলে তার অন্যান্য ভোগ কমিয়ে দিতে হবে। আমার এক বন্ধুর মন্তব্য হল- তিতাসের পরিবর্তে সিলিন্ডার ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। আমার প্রশ্ন হল, উৎসাহিত করার প্রক্রিয়া কি গলাটিপে ধরা? অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে ৪০ টাকার সিএনজি কিনতে হবে ৫৪ টাকায়। এই বৃদ্ধি পরিবহন খাতকে ভাড়া বাড়াতে বাধ্য করবে আর সেই অতিরিক্ত ভাড়ার ভার বহন করতে হবে সাধারণ যাত্রীদেরই।

পত্রপত্রিকার খবর থেকে শিল্পোৎপাদনে প্রতিক্রিয়ার খবর পেয়েছি। জানা যায়, এক কেজি সুতা উৎপাদনে বর্তমানে গ্যাসের দাম দিতে হয় ১১ টাকা ৭৬ পয়সা (বা ১৪ সেন্ট)। নতুন দামে তা হবে ২৩ টাকা ৮০ পয়সা (বা ২৮ সেন্ট)। তার মানে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি! তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার উপায় থাকবে কি? অন্যদিকে এক টন রড উৎপাদন করতে গ্যাস বাবদ গুনতে হয় ৭০০০ টাকা, নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী গুনতে হবে ১৪০০০ টাকা অর্থাৎ এখানেও দ্বিগুণ। মধ্যবিত্তের বাড়ি বানানোর সাধ-আহ্লাদ ঘুচে যাবে। সব মিলিয়ে শিল্পখাতে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে ১৩২ শতাংশ।

আমাদের মোট গ্যাসের প্রায় চার ভাগের এক ভাগ ব্যবহার হয় সার উৎপাদনে, আর তা ব্যবহৃত হয় কৃষি উৎপাদনে। কৃষিপণ্যের দাম বাড়বে আর তা ভোক্তারা বহন করবে- এ তো সাধারণ অঙ্ক। কিন্তু আমাদের কৃষকের যে আর্থিক সঙ্গতি তাতে করে উৎপাদন খরচ জোগানোর মতো বাড়তি টাকা তারা পাবেন কোথায়? এখনকার উৎপাদন খরচ চালাতেই তাদের মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে দাদন নিতে হয়। বাড়তি খরচ মানে বাড়তি দাদন আর বাড়তি দাদন মানে বাড়তি সুদ। এতসব বাড়তি সামলে উঠতে পারলে তবেই না উৎপাদন। কৃষকের, বিশেষ করে প্রান্তিক চাষীদের একমাত্র সম্বল ‘ঘাড়ের গামছা টুকুন’ শেষতক থাকবে তো?

বলা হচ্ছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। এই বাড়তি উৎপাদন খরচ নিশ্চয়ই বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে উসুল করা হবে। তাহলে বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও শিল্প আবারও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে। একজন স্থির আয়ের মানুষ কী করে এই বাড়তি খরচের জোগান দেবে? কারও বেতন যদি ১০০ টাকা হয় তাহলে আজকে সে ১০০ টাকাতেই জীবন চালাবে। আগামীকাল যদি ১০০ টাকার জিনিস ১২০ টাকা হয় তাহলে বাড়তি ২০ টাকা সে পাবে কোথায়? বাধ্য হয়েই তাকে ২০ টাকা কম ভোগ করতে হবে। তার মানে হল- জীবনযাত্রার মান কমিয়ে আনতে হবে। কিন্তু উন্নয়ন হল একটি চলমান প্রক্রিয়া। আজকে যতটুকু ভালো আছি আগামীকাল তার চেয়ে ভালো থাকব, তা সে যে হারেই হোক। উত্তরোত্তর এগিয়ে যাওয়ার নামই তো উন্নয়ন। পিছিয়ে আসা তো নয়। দিন দিন জীবনযাত্রার মান বাড়বে, কমবে না। অর্থনীতির ওপর সার্বিক মূল্যস্ফীতি সবাইকে সমানভাবে আঘাত করে না। মানুষের আয় যে হারে বাড়ে, সে হারে খাদ্যদ্রব্যের ওপর তার খরচ বাড়ে না। অর্থাৎ আপনার যদি ১০০০ টাকা আয় হয় আর যদি আপনি ৫০০ গ্রাম চাল খান, তাহলে আয় বেড়ে ২০০০ টাকা হলে আপনি ১ কেজি চাল খাবেন না। তাই খাবারের ওপর আপনার বাড়তি খরচ হবে না। যদি তা উন্নত মানেরও হয় তবুও আয়বৃদ্ধির তুলনায় কম হবে। কিন্তু মানুষের বেসিক নিডস তো শুধুই খাওয়া নয়। বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর আছে যোগাযোগ। সেগুলো পূরণ হলে সঞ্চয় হবে, যা বিনিয়োগে কাজে লাগবে। মূল্যস্ফীতি উচ্চ আয়ের মানুষের ভোগব্যয়কে খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত করে না, যদিও সঞ্চয়কে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষ তো তার মূল চাহিদাই পূরণ করতে অক্ষম। নিম্ন আয়ের মানুষের প্রান্তিক ভোগ প্রবণতাও বেশি। তারা অতিরিক্ত যা আয় করেন, তার প্রায় পুরোটাই ভোগে ব্যয় করেন। কেননা তার অভাবের শেষ নেই। তাই মূল্যস্ফীতি তার ভোগব্যয়কে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আর যাদের নিম্ন আয় এবং তা নির্দিষ্ট, তাদের তো গলায় ফাঁস। কিন্তু উচ্চ আয়ের মানুষের অতিরিক্ত আয়ের একটা ক্ষুদ্র অংশই ভোগে ব্যয় হয়, বাকিটা হয় সঞ্চয়, অর্থাৎ তাদের প্রান্তিক সঞ্চয় প্রবণতা বেশি- যে কারণে উচ্চবিত্তের নীতিনির্ধারকরা গরিব মানুষের মর্ম অনুভব করতে পারেন না। গ্যাসের এই দামবৃদ্ধি সমগ্র অর্থনীতিতে যে মূল্যস্ফীতি ঘটাবে, তা এ দেশের সাধারণ মানুষের পক্ষে বহন করা কঠিন হবে।

কোনো পণ্য বা সেবার দাম সারা জীবন একই স্তরে থাকবে এমনটা প্রত্যাশা করার মতো বোকা আমরা নই। কারণ আমরা কমবেশি ৬.৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির ভেতর দিয়ে চলেছি। সেক্ষেত্রে গ্যাসের দাম একটি স্তরে স্থির থাকতে পারে না। কিন্তু যে হারে দামবৃদ্ধি করা হচ্ছে তা কি প্রত্যাশিত? গত ১০ বছরে ৬ বার গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। দুই চুলা ব্যবহারকারী ১০ বছর আগে যে গ্যাসের জন্য দাম দিতেন ৪৫০ টাকা, এখন তাকে দিতে হবে ১৪৪০ টাকা, যা প্রায় ৩০০ শতাংশ বেশি! নতুন প্রস্তাবে বাণিজ্যিক খাতে ৪১ শতাংশ, ক্যাপটিভ পাওয়ারে ৯৬ শতাংশ, শিল্পে ১৩২ শতাংশ আর বিদ্যুতে ২০৮ শতাংশ দাম বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এতটা চাপ নেয়ার ক্ষমতা তো আমাদের নেই। আমরা চাই দাম বাড়ানোটা ধীরে ধীরে তথা ক্রমান্বয়ে হোক, আমরা যেন চাপ সইতে পারি। আমরা এমনিতেই অনেক অশান্তি-অস্থিরতার মধ্যে আছি; তার মধ্যে নতুন এই গ্যাসের দামবৃদ্ধি হবে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। সবার শুভবুদ্ধির উদয় হোক।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×