শিশুদের কিন্ডারগার্টেনে দেয়া হয় কেন

  মাছুম বিল্লাহ ০৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিশুদের কিন্ডারগার্টেন

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণীর আগেও একটি শ্রেণী রয়েছে, যা ‘প্রাক প্রাথমিক শ্রেণী’ নামে পরিচিত। ভর্তি হওয়ার বয়স পাঁচ বছর। তবে আজকাল অনেক অভিভাবক বাচ্চাদের বয়স তিন বা চার বছর হলেই স্কুলে ভর্তি করাতে চান। সেক্ষেত্রে শিশুকে দিতে হয় বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনে। একবার কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি হলে শিশু আর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফিরে আসতে চায় না। এ ধারায় বদল আনতে চাইছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এক্ষেত্রে প্রাক-প্রাথমিককে কেজি বা শিশু শ্রেণী ধরে এর আগে আরেকটি শ্রেণী নার্সারি চালুর পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। নার্সারিতে ভর্তির সর্বনিু বয়স হতে হবে চার বছর।

জাতীয় শিক্ষানীতিতে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা দুই বছর করার কথা বলা হয়েছে। মূলত শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতে গিয়েই প্রাথমিকে নতুন একটি শ্রেণী চালু করার পরিকল্পনা করছে মন্ত্রণালয়। প্রধানমন্ত্রীর কাছে তা পাঠানো হবে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেন, প্রাক-প্রাথমিকে দুটি ক্লাস চালু করলে প্রথমটিতে মূলত খেলাধুলাই থাকবে। খেলার ছলে শিশু যা শিখতে পারে, সেটাই যথেষ্ট হবে। আর মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও প্রাক-প্রাথমিকে দুটি শ্রেণী থাকা দরকার। এতে অভিভাবকদের কিন্ডারগার্টেনে যাওয়ার হারও কমবে। নতুন করে শ্রেণী খুলতে হলে আরও একজন করে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হবে বলে তিনি জানান।

প্রধানমন্ত্রী প্রাক-প্রাথমিকে নতুন শ্রেণী খোলার অনুমতি দিলে ২০২০ সাল থেকে সীমিত পরিসরে নার্সারি শ্রেণী চালু করা হবে, পরে বাস্তবায়ন হবে সব সরকারি প্রাথমিকে। সরকারি স্কুলে ভালো অবকাঠামো ও বিনা বেতনে পড়ার পরও অনেক অভিভাবকই সন্তানদের সেখানে দিতে চান না। বদ্ধ ঘরের কিন্ডারগার্টেনের প্রতিই তাদের ঝোঁক। এর কারণও অবশ্য আমরা জানি। মন্ত্রণালয় কিন্ডারগার্টেনগুলোকে বাগে আনতে টাস্কফোর্স গঠন করেছিল, তাও কোনো কাজে আসেনি। তাই আবারও তারা চাচ্ছে, অভিভাবকরা যাতে তাদের বাচ্চাদের বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনে না পাঠান। কিন্তু আমরা জানি, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভবন আছে, খেলার মাঠ আছে, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক আছেন কিন্তু নেই পড়াশোনা, নেই বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি, নেই কোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড আর নেই শিক্ষার্থীদের কোনো আকর্ষণ। ফলে অভিভাবকরাও আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেছেন; বিনা বেতনের হলেও সেখানে বাচ্চাদের পাঠাতে। এসব কারণে ঢাকা মহানগরীর ৩৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আধুনিকায়নে মন্ত্রণালয় ১ হাজার ২৬৯ কোটি ২১ লাখ ৭ হাজার টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর আওতায় পুরনো বিদ্যালয়গুলোয় স্থাপন করা হবে আধুনিকমানের দৃষ্টিনন্দন বহুতল ভবন। এছাড়া বিদ্যালয়ের দেয়াল, সাজসজ্জাকরণ, আসবাবপত্র ক্রয়, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, নিরাপদ পানি সরবরাহ, অভ্যন্তরীণ রাস্তা নির্মাণ, সংযোগ সড়ক, চিলড্রেনস প্লে কর্নার, অগ্নিপ্রতিরোধসহ নানা আধুনিকায়নে বদলে যাবে রাজধানীর প্রাথমিক বিদ্যালয়। এছাড়া উত্তরা ও পূর্বাচলে নতুন করে আরও ১৪টি বিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। এ পদক্ষেপগুলো প্রশংসনীয় তবে দুঃখজনক হল, এসব কাজ হওয়ার পর আর কোনো ধরনের মেইনটেন্যান্স করা হয় না। ফলে সেগুলো আর বাচ্চা বা অভিভাবকদের আকর্ষণ করে না।

শিশুর যথাযথ বিকাশের জন্য কমপক্ষে দু’বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু করার কথা বলছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এক্ষেত্রে তারা বেসরকারি সংস্থাগুলোর সহায়তাও কামনা করেছে। তবে প্রাক-প্রাথমিক বা নার্সারি শ্রেণী খোলার আগে কিছু বিষয় আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। দার্শনিক রুশো, অ্যারিস্টটল, প্লেটো থেকে শুরু করে আধুনিক দার্শনিক আগস্ত কোঁতে, ফ্রান্সিস বেকন, জন ডিউই প্রমুখ শিশু শিক্ষার ব্যাপারে বস্তুনিষ্ঠ মতামত দিয়েছেন আর সেটি হচ্ছে, শিশুদের ছয় বছরের আগে স্কুলে পাঠানো উচিত নয়। দার্শনিক রুশো চমৎকারভাবেই বলেছেন, শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য শিশুকে প্রকৃতির হাতে ছেড়ে দিতে হবে। সে প্রকৃতি থেকে শিখবে, স্বাধীনভাবে শিখবে; যেমন আমাদের বাসার ছোট ছোট শিশুদের আমরা কী করতে দেখি? তারা যতক্ষণ জেগে থাকে, ততক্ষণ একটার পর একটা বিষয় কিংবা জিনিস অথবা আসবাবপত্র নিয়ে সর্বদাই ব্যস্ত থাকে। একটার পর একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে, মুখের সামনে এনে দেখায়, জানতে চায় সেটি কী, কী কাজ করা হয় সেটি দিয়ে। সে একটি বস্তু নিয়ে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, আছাড় দেয়; সেখান থেকে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করে। এগুলো প্রকৃতির শিক্ষা। এটিই তার সবচেয়ে বড় বিদ্যালয়, শেখার বড় জায়গা। সে স্বাধীনভাবে শেখে। গ্রামের বাড়িতে হলে বাড়ির উঠানে অঙ্গিনায় ঘুরে ঘুরে বেড়ায়, হাঁস-মুরগি ও পশুপাখি দেখে; তাদের সঙ্গে কথা বলে, ভাববিনিময় করে। শহরের বাড়িতে-ফ্ল্যাটে জায়গা নেই, তবুও সারাদিন এ রুম থেকে সে রুমে ঘুরে বেড়ায়, টিভি দেখে, বাসার আসবাবপত্র দেখে, ধরে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে, ভাঙে, আছাড় দেয়, আদর করে, লুকিয়ে রাখে, নিজের জায়গায় নিয়ে যায়। এ সবই তার প্রাকৃতিক শিক্ষার অংশ। আমরা যে ইসিডি কেন্দ্র বলি বা প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় বলি, সেসব স্থানে কি এগুলোর কোনো কিছুই করার সুযোগ শিশুরা পায়? অবশ্যই পায় না। যে অর্থেই বলি না কেন, সেখানে শ্রেণীশাসিত দেখাশোনা, পড়াশোনা হয়ে থাকে; যা তার স্বাভাবিক বিকাশ ও জানার জগত ও পথকে শুধু সীমিত নয়, বাধাগ্রস্ত করে।

শিক্ষার চাপ বহন করার ক্ষমতা অর্জনের জন্য একটি ন্যূনতম বয়স প্রয়োজন। সেই বয়সের আগে চাপ প্রয়োগ করলে শিশুর যতটুকু মেধাবী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, ততটুকু মেধাবী সে হতে পারে না। এমনকি তার অর্ধেকও নয়। অর্থাৎ শিশু হয়ে যায় মেধাহীন। জন্মের পর অন্যান্য অঙ্গের মতো আস্তে আস্তে শিশুর মগজের উন্নতি হতে থাকে। আস্তে আস্তে সে বাবা-মাকে চেনে, তারপর তার আশপাশে যারা থাকে, তাদের চেনে। তাদের মুখের কথা শুনতে শুনতে সে একটু একটু কথা বলতে শুরু করে। এভাবে দেখতে দেখতে এবং শুনতে শুনতে নিজে বলতে শেখে। এজন্য শিক্ষকের প্রয়োজন হয় না, চারপাশের পরিবেশই তার শিক্ষক। যেহেতু সে নিজেই নিজের মতো করে শেখে, তাই তার ব্রেনে কোনো চাপ পড়ে না। এক্ষেত্রে সব শিশু সমানভাবে শেখে না, সবাই সমান সময় নেয় না। যার মেধা বেশি, তার সময় কম লাগে; আর যার কম, তার একটু সময় বেশি লাগে।

এই মেধা শিশু জন্মের আগেই পেয়ে থাকে। জন্মের পর মগজ গঠন বা মগজ মজবুত হওয়ার পর্যাপ্ত সময় না দিলে শিশু জন্মগত মেধার বিশাল অংশ হারিয়ে ফেলতে পারে। এ বিষয়গুলো আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে। ব্র্যাক ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা সরকারের প্রতি পরামর্শ দেন- প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে দুই বছরে উন্নীত করার। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব বলেন যে, ২০২০ সাল থেকেই দুই বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালুর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে এবং আগামী পাঁচ বছরে এক লাখের বেশি শিক্ষক নিয়োগ হবে। তিনি গত দশ বছরে প্রাথমিক শিক্ষায় উন্নয়নের তথ্য তুলে ধরে বলেন, দশ বছরে এক লাখ আশি হাজার শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে। ফলে এখন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:৩৬। আগামী পাঁচ বছরে আরও এক লাখের বেশি শিক্ষক নিয়োগ করা হলে এ অনুপাত দাঁড়াবে ১:৩০-এ। শিক্ষক সংখ্যা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মানসম্মত পাঠদানের ব্যবস্থা ও মনিটরিংও করতে হবে। তা না হলে ব্যক্তির চাকরি সরকারি হবে, ব্যক্তির আর্থিক উন্নতি হবে; কিন্তু যে উদ্দেশ্যে তা করা হল, সেটি যদি বাস্তবায়ন না হয় তাহলে লাভ কী?

উন্নত জাতি গঠনে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার বিকল্প নেই। প্রাথমিক শিক্ষাই হচ্ছে শিক্ষার মূল ভিত্তি। বর্তমান সরকার ভবিষ্যতে মেধাসম্পন্ন মানুষ তৈরির জন্য মায়েদের অপুষ্টি দূর করতে মাতৃত্বকালীন ভাতার ব্যবস্থা করেছে। নতুন আরও বিশ হাজার শিক্ষক নিয়োগ করা হবে ২০১৯ সালেই; এটিও শিক্ষার মান বাড়াতে সহায়তা করবে। শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করার জন্য প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণীতে ভর্তির জন্য শিশুদের বয়সসীমা কমিয়ে আনা হচ্ছে। এ বয়স সাড়ে তিন বছর করার কথা বলা হচ্ছে। সচিব বলেন, ইতিমধ্যে সরকার সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে পেরেছে। মানসম্মত শিক্ষা অর্জন করা এখন সরকারের মূল লক্ষ্য। এ লক্ষ্য নিশ্চিত করতে দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষাক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। দুর্নীতিকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে। শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য অচিরেই নিরসন করা হবে। শিগগিরই দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত নতুন নিয়োগবিধি প্রণয়ন করা হবে এবং ২০১৯ সালেই আরও বিশ হাজার শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হবে। আমরা পত্রপত্রিকায় দেখলাম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী একটি সরকারি প্রাইমারি স্কুলের কোনো শিক্ষার্থীকে ইংরেজিতে ইংলিশ বানান জিজ্ঞেস করলে সে তা বলতে পারেনি; পরে তিনি দেখলেন যে, শিক্ষকরাও তা পারেন না। একই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত আগের মন্ত্রী একবার দেখেছিলেন- চতুর্থ, পঞ্চম ও তৃতীয় শ্রেণীর কোনো শিক্ষার্থীই তাদের শ্রেণীর বানান ইংরেজিতে লিখতে পারেনি। এই যখন হাল, তখন সহজেই বোঝা যায় যে, শিক্ষার্থীরা কেন বেসরকারি পর্যায়ে পরিচালিত প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকে গিয়ে থাকে। আসল কারণ খুঁজে বের করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করলে শিক্ষার্থীরা নিশ্চয়ই সরকারি প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতে উৎসাহিত হবে।

মাছুম বিল্লাহ : গবেষক, ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত ও সাবেক ক্যাডেট কলেজ শিক্ষক

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×