মিঠে কড়া সংলাপ

অগ্নিপরীক্ষায় রাজউক

  মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন ০৬ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজউক
রাজউক। ফাইল ছবি

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (রাজউক) সময়ের পরীক্ষায় পড়তে হয়েছে। মাথাপিছু ভূমি স্বল্পতার দিক থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে Land hungry দেশের রাজধানীর রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ, মার্কেটসহ বিভিন্ন নির্মাণকাজের নকশা অনুমোদন, নগর পরিকল্পনা, নিজস্ব প্রকল্প বাস্তবায়ন ইত্যাদি বিবিধ ক্ষেত্রে সংস্থাটিকে কাজ করতে হয়। আর এ পক্ষত্রে যে দক্ষ, নিষ্ঠাবান জনশক্তির প্রয়োজন, রাজউকের তা আছে বলে মনে হয় না।

তাছাড়া কাজের তুলনায় সেখানে জনবলেরও অভাব রয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন এ সংস্থাটিকে বিভিন্ন সময়ই আলোচনা-সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। গত ২৮ মার্চ বনানীর এফআর টাওয়ার নরককুণ্ডে পরিণত হওয়ায় সে আলোচনা-সমালোচনা আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি দলের মন্ত্রী-এমপি, নেতাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে রাজউকের সমালোচনা করা হচ্ছে।

যদিও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রাজউকের দায়িত্ব বা সম্পৃক্ততা কতটুকু সে বিষয়টিও বিচার-বিবেচনার দাবি রাখে। এফআর টাওয়ারের ক্ষেত্রে নকশা অনুমোদনের পর ডেভেলপার বা ফ্ল্যাট মালিক উপরের দিকে আরও দু-তিনটি ফ্লোর বর্ধিত করেছেন এবং এই বর্ধিতাংশের কোনো অনুমোদন নেই। আর এই অননুমোদিত অংশ রাজউকের তদারকিতে ধরা পড়েনি। সে দৃষ্টিকোণ থেকে এ অননুমোদিত অংশ ধরতে না পারা বা না ধরা রাজউকের ভুল বা অন্যায় হয়েছে এ কথা স্বীকার করতেই হবে।

কিন্তু রাজধানী ঢাকার লাখখানেক বাড়ির নথি হাতিয়ে বের করে তা বগলদাবা করে প্রতিটি বাড়ি পরিদর্শনের মতো জনবল রাজউকের আছে কিনা সে কথাটিও বোধহয় ভেবে দেখা দরকার। এ অবস্থায় ডেভেলপার কোম্পানিগুলোও এক ধরনের ইনডেমনিটি ভোগ করছে। আবার একশ্রেণীর ডেভেলপার এবং ভবন মালিক যে রাজউকের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ম্যানেজ করেই অনুমোদিত নকশার ব্যতিক্রম ঘটাচ্ছেন, সে কথাটিও সত্যি!

বস্তুত বর্তমানে রাজউকও এমন একটি সংস্থায় পরিণত হয়েছে যে, একশ্রেণীর মতলববাজ মানুষ বিভিন্নভাবে চেষ্টা-তদবির চালিয়ে সেখানে পোস্টিং নিয়ে নিজেরা লাভবান হতে চান। আবার প্রতিষ্ঠানটির স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকে সেখানে কায়েমি স্বার্থবাদীদের মতো জেঁকে বসেছেন। এ অবস্থায় রাজউকের পুরো স্ট্রাকচার পাল্টে ফেলে নতুনভাবে অর্গানোগ্রাম তৈরি করে কিছু নতুন দায়িত্বশীল পদ সৃষ্টির মাধ্যমে সেখানে নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে সংস্থাটিকে উন্নত ও গতিশীল করার চেষ্টা করা যেতে পারে। আর ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজউকের যে বিধি-বিধান রয়েছে, নির্মাণকাজের শুরুতেই তা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন।

কারণ একেকটি দশ-বিশ তলা ভবন নির্মিত হয়ে গেলে তার খুঁত ধরে বা বর্ধিত অংশ বের করে তা অপসারণ করতে গেলে ঝুট-ঝামেলার আশঙ্কা থেকে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে একশ্রেণীর কর্মকর্তা এসব থেকে ফায়দা লুটে নেন। আবার এসব ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরে ব্যবস্থা নিতে গেলে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, হোটেল-রেস্তোরাঁ, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, মার্কেট বসতভিটা ইত্যাদির ক্ষতিসাধন করতে হয়।

আর এসব ভবন নির্মাণে যে অর্থ ব্যয় করা হয়, সেখানে বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানি করা অনেক মালামালও ব্যবহার করা হয়। তাই কোনো একটি নির্মিত ভবনকে সামান্য কোনো কারণে অপসারণ বা ভেঙে ফেলার প্রশ্ন দেখা দিলে সেখানে দেশি মুদ্রার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রারও অপচয় ঘটে। অবশ্য এ কথার মাধ্যমে এমন কিছু বলার চেষ্টা করা হচ্ছে না যে, কোনো অবৈধ ভবন বা কোনো ভবনের অবৈধ অংশ অপসারণ করা বা ভেঙে ফেলা যাবে না।

অবৈধ বা অননুমোদিত ভবন অবশ্যই অপসারণ করতে হবে। যেমন বনানীর এফআর টাওয়ারের উপরের ভার্টিক্যালি বর্ধিত অংশ অনুমোদিত অংশের ক্ষতিসাধন না করে ভেঙে ফেলা যায়। তবে কোনো ভবনের হরিজেন্টাল অংশ ভাঙতে হলে, মূল ভবনের ক্ষতি হয় বিধায় শুরুতেই এ ধরনের নির্মাণকাজ বন্ধ করতে পারলে ভালো হয়।

আগেই বলা হয়েছে, জমি স্বল্পতার দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের দেশটি পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা ল্যান্ড হাংগ্রি কান্ট্রি। আর জনসংখ্যার তুলনায় রাজধানীতে জমির পরিমাণ এত কম যে, এখানে তিল পরিমাণ জমির মূল্যও অত্যন্ত চড়া। পার ক্যাপিটা আয়ের দিক থেকে হিসাব করলে ঢাকার জমি পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা মূল্যবান জমি! আর সে কারণেই বাড়িঘর নির্মাণের সময় বিল্ডার থেকে শুরু করে বাড়ির মালিকরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিয়ম অপেক্ষা একটুখানি হলেও বেশি জমিজুড়ে নির্মাণকাজ করতে চান বা করে থাকেন।

কারণ মানুষের মধ্যে কখনও কখনও লোভ-লালসা জেগে ওঠে। তবে সে লোভেরও যে একটা সীমা থাকা প্রয়োজন সে কথাটিও সংশ্লিষ্ট সবার মনে রাখা দরকার। এফআর টাওয়ারের যে মালিক ভবনটির উপরের দিকে ৩-৪ তলা বর্ধিত করে অবৈধ নির্মাণকাজ করেছেন, তিনি লোভের সীমা অতিক্রম করেছেন। আর সে কারণে তিনি দায়-দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। তবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার দায় কার ওপর বর্তায় সে বিষয়টিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। অগ্নিকাণ্ড ঘটার জন্য অত্যুচ্চ ভবনটির হরিজেন্টাল বা ভার্টিক্যাল এক্সটেনশন দায়ী, না অন্য কারণে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে সে বিষয়টি বের করাও অত্যন্ত জরুরি।

এমন একটি অত্যুচ্চ ভবন যারা ব্যবহার করতেন, তারা ভবনটিতে অগ্নিকাণ্ড নির্বাপণের যথাযথ ইকুইপমেন্ট ছাড়াই সেখানে অবস্থান করতেন কেন, সে প্রশ্নটিও সামনে এসে যায়। আর এমন একটি টাওয়ারে আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না কেন, সে বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিচার-বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে রাজউক, ফায়ার ব্রিগেড, ভবন মালিক, ব্যবহারকারী বা অন্য কারও নজরদারি, তদারকি বা ব্যবস্থা গ্রহণের ঘাটতি রয়েছে কিনা সে বিষয়টিও খুঁজে বের করা দরকার।

পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোয়ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে থাকে। যেমন, ২০১৭ সালে লন্ডনের একটি ২৪ তলা অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৭২ জন মানুষ অগ্নিদগ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন। সে ঘটনাও আমরা টেলিভিশনে প্রত্যক্ষ করেছিলাম এবং ইটালির এক যুবা নারী মৃত্যুর আগে ইটালিতে তার মা এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে কী কথা বলেছিলেন, তা জানতে পেরে আমাদের চোখে পানি এসেছিল। আবার বনানীর এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের সময়ও সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতে করতে কেঁদে ফেলেছিলাম। শুধু আমি বা আমরা কেন, বনানীর ঘটনায় আহত ও নিহতদের জন্য দেশের সব মানুষই অশ্রু ভারাক্রান্ত হয়েছেন, বেদনাহত হয়েছেন। তাই এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যাতে আর না ঘটে সে জন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতা গ্রহণই এখন সময়ের কাজ বলে বিবেচিত হওয়া উচিত।

কীভাবে এমন দুর্ঘটনা বন্ধ করা যায় তার উপায় খুঁজে বের করাই এখন মুখ্য উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। আর যে কাজটি এতদিন করা হয়নি বা করা সম্ভব হয়নি, বর্তমান পরিস্থিতিতে সে কাজটি করতে গিয়ে কেউ যাতে কোনোরূপ বিদ্বেষের শিকার না হন সেদিকে দৃষ্টি রেখেই তা করা উচিত। মনে রাখা প্রয়োজন, সব সময়ই এ দেশে একশ্রেণীর মানুষ ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে সিদ্ধহস্ত। সুতরাং বর্তমান পরিস্থিতিতে তেমন কোনো স্বার্থান্বেষী মহল যে হীন স্বার্থে নেমে পড়বে না তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।

কারণ ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই অনেকে এমনসব মন্তব্য করেছেন, ঢালাওভাবে এমনসব কথাবার্তা বলে চলেছেন, দোষারোপ করে চলেছেন, যেসবের অনেকাংশই নির্বিচারে কথাবার্তা বলার শামিল। অবশ্য বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকেই রাগের মাথায় অনেক কিছু বলছেন। আর রাগ হওয়াটাও স্বাভাবিক। তাই এ ঘটনায় যাদের দোষ আছে, বা যারা দোষ করেছেন, অবশ্যই তাদের ধরতে হবে। ভবিষ্যতে যাতে নিরীহ মানুষকে আর এভাবে বেঘোরে প্রাণ দিতে না হয় সে ব্যবস্থাও করতে হবে। তবে তা অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় করাই সমীচীন হবে। কারণ, ঘোলা পানিতে মাছ শিকারিদের কথা আগেই বলা হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকেই অনেক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করবেন, যা দোষের কিছু নয়। কিন্তু তাদের সেসব প্রতিক্রিয়াও যাতে কোনো দোষে দুষ্ট না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। বর্তমানে গুলশান, বনানী, বারিধারায় হাজার-দেড় হাজার হোটেল-রেস্টুরেন্ট আছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় আছে। এ অবস্থায় রাগের মাথায় এসব স্থাপনায় হাত দিয়ে দোষত্রুটি খুঁজে বের করে তা বন্ধ করে দিলে ব্যবসা-বাণিজ্যের অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে।

কারণ স্থানীয় প্রয়োজনেই এসব করা হয়েছে বা হয়েছিল। তবে এসব হোটেল-রেস্টুরেন্ট, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অগ্নিনির্বাপণের সক্ষমতার বিষয়ে অবশ্যই দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সজাগ করে কঠোরভাবে তা প্রতিপালনে বাধ্য করা উচিত। কিন্তু তা না করে ছোটখাটো দোষত্রুটি বের করে কাউকে ফায়দা লোটার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া ঠিক হবে বলে মনে হয় না। যাই করা হোক, ধীরস্থিরভাবে ঠাণ্ডা মাথায় তা করাই উত্তম কাজ বলে বিবেচিত হবে।

মোট কথা, রাজধানীর অত্যুচ্চ ভবনগুলো যাতে ঘটনা-দুর্ঘটনায় অগ্নিকাণ্ডের ফলে নরককুণ্ডে পরিণত না হয় এবং এসব ঘটনায় যাতে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো যায়, সেদিকে দৃষ্টি দিয়ে অগ্রসর হওয়াই হবে এখন সময়ের কাজ। আর রাজউক যাতে সেই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে সে জন্যও সংশ্লিষ্ট সবাইকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।

মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×