যুক্তরাষ্ট্রের নির্লজ্জ ইসরাইল তোষণ নীতি

প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  রবার্ট ফিস্ক

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু। ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীতে কি এমন আরেকটি দেশ আছে, যার সঙ্গে এমন মাত্রার আঁতাত করার ধৃষ্টতা দেখাবে যুক্তরাষ্ট্র? ব্রিটেনের বাতিকগ্রস্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে ‘বিশেষ সম্পর্কে’র বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পুরনো বিশ্বকে উদ্ধার করতে আসতে থাকা নতুন বিশ্বের বিষয়টি ভুলে যান।

বর্তমানে বিবেচনায় নেয়া হয় এমন বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে মাত্র একটি- এবং আমরা সবাই জানি সেটি কী। গোটা জেরুজালেমকে ইসরাইলের সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃতিতে এর আশীর্বাদ এবং এখন গোলান মালভূমিকে ‘সংযুক্তির জন্য’ ইসরাইলের বলে স্বীকৃতি দেয়ার অর্থ হল তার ‘মালিকানায় দেয়া’- তাই নয় কি? জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৪২নং প্রস্তাবে থাকা ‘শান্তির জন্য ভূমি’র সম্পূর্ণ মূলভিত্তিটাকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প দুর্বল করে দিয়েছেন। আমাদের বলা হচ্ছে, এটা হল ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর পুনর্নির্বাচনের জন্য একটি উপহার।

সত্য কথা বলতে, যদি কখনও অস্তিত্বে থেকে থাকে তবে ‘মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়া’ কয়েক বছর আগেই মারা গেছে বা সে পথে রয়েছে; কিন্তু গোলান মালভূমিকে ইসরাইলের সঙ্গে একত্রীকরণের ঘোষণায় ট্রাম্পের জাঁকজমকপূর্ণ স্বাক্ষর দুই দেশভিত্তিক সমাধানের সব ভিত্তিমূলক নথিপত্র ও অনুচ্ছেদ ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে, যা আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে দীর্ঘ সামরিক দখলদারিত্বের অবসান ঘটাতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের শেষ ঔপনিবেশিক যুদ্ধে ইসরাইলের পক্ষে খোলাখুলি, প্রকাশ্য ও পূর্ণমাত্রার সমর্থন দিয়েছে। ইরানের হুমকির কারণে যদি বর্তমানে গোলান ইসরাইলের অংশ হতে পারে, তাহলে দক্ষিণ লেবাননও ইসরাইলের অংশ হতে পারে। হিজবুল্লাহও কি ইরানি ‘হুমকি’ নয়? এ ছাড়া কত দ্রুত আমরা দেখব যে পশ্চিমতীরকে ইসরাইল নিজেদের ভূখণ্ড করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন নিয়ে?

উপরের অনুচ্ছেদ সম্পর্কে দুটি বিষয় লক্ষ করুন। প্রথমত, কতবার শব্দ, ক্রিয়া ও গুণবাচক শব্দের মধ্যে কোটেশন চিহ্ন ব্যবহার করতে আমি বাধ্য হয়েছি, যেটা সাধারণত এগুলোর ক্ষেত্রে কখনও প্রয়োজন হয় না।

দ্বিতীয়ত, কীভাবে সিরিয়া নামটি এড়ানো হয়েছে। ১৯৬৭ সালের সিরিয়ার গোলান মালভূমি হারানো এত আগের বিষয় এবং এত স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে, একটি ন্যায়ভ্রষ্ট পথে এর প্রকৃত মালিকানার অস্তিত্ব থমকে গেছে। বিশ্বের অন্য কোথাও অস্বীকৃত হলেও গোলান মালভূমিকে ইসরাইলের নিজস্ব অংশ হিসেবে অঙ্গীভূত করার ট্রাম্পের স্বীকৃতি স্রেফ এমন গ্রহণীয় হয়েছে যেন আমরা সবাই গোপনে এর সঙ্গে একমত।

ইসরাইলকে ভীরু ও কাপুরোষিত অভিবাদন করে যাওয়া এবং ‘ইহুদিবিরোধিতার’ অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার ভয়ে মাটিতে মুখ গুঁজে পড়ে থাকা মিডিয়ার জবাব দেয়ার অনেক কিছু আছে। যখন কলিন পাওয়েল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র বিভাগকে বলেছিলেন নিজেদের দূতাবাসগুলোতে নির্দেশনা দেয়ার জন্য যাতে তারা পশ্চিমতীরকে ‘দখলীকৃত’ না বলে ‘বিতর্কিত’ বলে, তখন মার্কিন সংবাদপত্র ও টিভিগুলোর প্রায় সবাই একইসঙ্গে নামকরণ পরিবর্তনের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

আর যখন কয়েক সপ্তাহ আগে মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগ আকস্মিকভাবে গোলানকে ‘ইসরাইলি দখলকৃত’ থেকে ‘ইসরাইলি নিয়ন্ত্রিত’ বলার বিষয়কে প্রাধান্য দেয়, তখন আমরা বুঝতে পারি কী ঘটতে যাচ্ছে। ওইসব ইসরাইলি সাংবাদিক এবং খুবই কিছুসংখ্যক অধিকার কর্মী ও রাজনীতিক, যারা এসব বিষয়ে তীব্র প্রতিবাদী, তাদের জন্য স্রষ্টাকে ধন্যবাদ, যেমনটি আমি সবসময় বলি।

তবে ইসরাইলি সবকিছুতে যুক্তরাষ্ট্রের চরম আত্মসমর্পণ করার বিষয়টি নিগূঢ়ও নয়, আবার আকস্মিকও নয়; তবে মধ্যপ্রাচ্যের জনগণের জন্য এটি খুবই অমঙ্গলসূচক। গোলানের নথিতে ট্রাম্পের নীতিবিগর্হিত স্বাক্ষরের জবাবে নেতানিয়াহু যা বলেছেন তাতে আমি খুবই মর্মাহত। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘গোলানে ইহুদি জনগণের শিকড়ের ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো।’ সত্য; তবে আমি ১৯৮২ সালে একবার সেটা খতিয়ে দেখেছি।

লেবাননে ইসরাইলি বাহিনীর আগ্রাসনের পর ইসরাইলি সামরিক ও ‘বেসামরিক বিষয়ক’ কর্মকর্তারা দক্ষিণ লেবাননের শিয়া মুসলিম ও খ্রিস্টানদের গ্রামগুলোতে যায় এবং আরবদের হাতে কিছু প্রশ্নপত্র তুলে দেয়।

আমি তাদের সেটা করতে দেখেছি। নথিগুলো ছিল জটিল ও দীর্ঘ। লেবাননিদের জিজ্ঞাসা করা হয়, তাদের ভূমিতে কোনো ইহুদি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ছিল কিনা? তাদের পুরনো কোনো ভবনে আগের দশক বা শতাব্দীগুলোতে কোনো ইহুদি বসবাসের নিদর্শন ছিল কিনা? কোনো পাহাড় বা গ্রামের হিব্রু নাম আছে কিনা? তারা বিশেষত আগ্রহী ছিল তায়ার, সিদন ও কানা ট্রায়াঙ্গেলের ভেতরের এলাকার দিকে।

নিঃসন্দেহে সেখানে অনেক ইহুদি নিদর্শন আছে। কিছু বসবাসকারী সেগুলো ইসরাইলি সেনাদের দেখিয়েছে এবং ইসরাইলিরা সেগুলো তাদের বইয়ে নথিবদ্ধ করেছে। পরবর্তী লেবানন যুদ্ধের পর ইসরাইল দক্ষিণ লেবানন দখল করার বদলে অঞ্চলটিকে ইসরাইলের সঙ্গে একত্রীকরণের সিদ্ধান্ত নেবে; কারণ এর ‘ইহুদি জনগণের শেকড় হাজার বছরের’।

নেতানিয়াহু যখন বক্তব্য দেন তখন মার্কিন কংগ্রেসের দিকে তাকিয়ে দেখুন- মার্কিন প্রতিনিধিরা দাঁড়ায়, প্রশংসা করে এবং বসে পড়ে। আবার দাঁড়ায়, প্রশংসা করে এবং বসে পড়ে। ২০১১ সালে এমনটি হয়েছে ২৯ বার এবং ২০১৫ সালে ৩৯ বার। মার্কিন আইনসভার আত্মমর্যাদাহীন এ আচরণ আমি সবসময় মুচকি হেসে পর্যবেক্ষণ করি; কারণ এটি আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় ওইসব উচ্ছ্বসিত প্রশংসা, যা সাদ্দাম হোসেন সবসময় তার প্রিয় মানুষের কাছ থেকে গ্রহণ করতেন এবং যা বাশার আল-আসাদ সবসময় তার অনুগতদের কাছ থেকে গ্রহণ করতেন এবং এখনও করছেন। আমি ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পারি কেন মধ্যপ্রাচ্যের নেতারা আরববিশ্ব ও আমেরিকার মাঝে সমান্তরালে চলেন।

আমি ভালোভাবে বুঝতে পারি কেন মনোযোগ আকর্ষণ করতে মার্কিন কংগ্রেস বক্তব্যের শেষে দাঁড়িয়ে যায়, যখন ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স বলেন (যেমনটি তিনি সেদিনও বলেছেন), ‘আমরা ইসরাইলের পক্ষে আছি এ জন্য যে তার যা অভিপ্রায় তা আমাদেরও অভিপ্রায়, তার মূল্যবোধ আমাদের মূল্যবোধ এবং তার যুদ্ধ আমাদের যুদ্ধ।’ সত্যিই? যে যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনের বিরুদ্ধে ঔপনিবেশিক যুদ্ধ করেছে, সে কি সত্যিই ইসরাইলের উপনিবেশ বিস্তৃতকরণ এবং পশ্চিমতীরে ভূমি চুরির ঔপনিবেশিক পথে তেলআবিবের পক্ষে দাঁড়াচ্ছে?

আমেরিকানরা কি ফিলিস্তিন ও লেবাননে ইসরাইলের প্রতিনিয়ত বর্বর বোমা হামলার পক্ষে দাঁড়াচ্ছে এবং সহ্য ও অনুমোদন করছে ওইসব যুদ্ধাপরাধ, যা আমেরিকানরা ইসরাইলের দায়িত্ব বলে স্বীকার করে। যদি তেমনটি হয়, তবে কেন আমেরিকানরা সাদ্দামের সঙ্গে যুদ্ধে যেতে বিরক্ত হয়েছিল? কেন আমরা সিরিয়ায় বোমা ফেলছি?

অন্যের ভূমি দখল করে নিজেদের সঙ্গে একীভূত করার দুর্গন্ধযুক্ত ইতিহাস খোঁজার বিষয় এটি নয়। প্রশান্ত মহাসাগরে নৌঘাঁটির জন্য (যেমনটি জাপানিরা বলে থাকেন) যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক হাওয়াই নিজের ভূখণ্ডে একত্রীকরণ এবং নিউ মেক্সিকোর বেশিরভাগ, টেক্সাস ও অ্যারিজোনাকে দখল করে একত্রীকরণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ক্রিমিয়া ও পুতিন এবং অন্যান্য একত্রীকরণের কথা আমি এখানে টানছি না।

না, আমি এখানে অন্যের ভূখণ্ড সংযুক্তকরণের তুলনা করছি না। ইসরাইলিরা নাৎসি নয়, আমেরিকানরা রাশিয়ান নয় এবং রাশিয়ানরাও ইসরাইলি নয়। কিন্তু এখানে সমান্তরাল বিষয় রয়েছে দেশগুলোর মধ্যে- যে দেশ যখন সংযুক্ত করতে পছন্দ করে বা অন্য মানুষের জমি সংযুক্তকরণকে পবিত্র কাজ মনে করে, তখনই সে তা করে থাকে। এর সব কটিরই ভিত্তি থাকতে পারে এবং অধিকাংশ ঘটনা নৃতাত্ত্বিক শেকড় এবং সামরিক প্রয়োজনীয়তার ওপর ভিত্তি করেও ঘটতে পারে।

আজ আমাদের অবশ্যই আবারও শিখতে হবে সেই পুরনো বাগধারাটি- ‘ফ্যাক্টস অন দ্য গ্রাউন্ড’ (১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পর থেকে ইসরাইল অধিকৃত ভূখণ্ডে ইহুদি বসতিস্থাপনের অজুহাত হিসেবে ব্যবহৃত)। ইসরাইল জেরুজালেম ও গোলান দখল করে যথাক্রমে ১৯৮০ ও ১৯৮১ সালে এবং গোটা বিশ্ব (এমনকি বহু ইসরাইলিও) ওই সময় এর তীব্র নিন্দা করে; কিন্তু এখন ট্রাম্প ‘শান্তির ভূমি’র সমীকরণে অর্ধেক থাবা বসিয়েছেন। ওয়াশিংটন এবার অবৈধ ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ভূখণ্ড চোরকে বৈধতা দিয়েছে। আর কংগ্রেসে যখন ইসরাইলের কৃতদাসরা রয়েছে, তখন কেনই বা সেটা হবে না?

ইসরাইলের গোলান সংযুক্তীকরণকে স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে ট্রাম্প স্রেফ স্বীকৃতি দিলেন যে, ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রকে সংযুক্ত করে নিয়েছে।

ব্রিটেনের দি ইনডিপেনডেন্ট থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম

রবার্ট ফিস্ক: ব্রিটিশ সাংবাদিক