জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর কীভাবে সম্ভব

  আবুল খায়ের ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে ওঠা ও বেকার সমস্যা মোকাবেলা করা যে কোনো দেশের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ-বিগ্রহ যেমন থেমে নেই, তেমনি হানাহানি ও জাতিগত দাঙ্গা লেগেই আছে। গ্লোবালাইজেশনের প্রভাবের কারণে আমাদের দেশও বাদ পড়বে না এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে। দেশে বেকারের প্রকৃত সংখ্যা কত, তা নিয়ে বিতর্ক আছে বিস্তর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, দেশে এখন বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ। বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে বিভিন্ন শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষ কাজ হারিয়েছে। প্রকৃত বেকার সংখ্যা কত, তা নিয়ে বিতর্ক না করে বেকারত্ব দূরীকরণে কার্যকর ভূমিকা নিয়ে সবারই এগিয়ে আসা উচিত।

মনে রাখতে হবে, আজ যে শিশুটি জন্ম নিচ্ছে- ২৫-২৬ বছর পর ওই শিশুটি চাকরির বাজারে প্রবেশ করবে। এখন থেকে সে অনুযায়ী পরিকল্পনা না থাকলে শিশুটিকে নিশ্চিত বেকারত্বের দিকেই ঠেলে দেয়া হবে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। ভারত একটি উন্নয়নশীল দেশ হয়েও প্রযুক্তিগত উন্নতির কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শ্রমবাজারে দাপটের সঙ্গে টিকে আছে।

চীন একসময় আমাদের দেশের মতো দরিদ্র ছিল। চীন অর্থনৈতিকভাবে নিজেকে শক্তিশালী করার জন্য ১২ বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ রেখেছিল। চীন সরকারের বক্তব্য ছিল, এত ছেলেমেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে কী করবে? কোথায় চাকরি পাবে তারা? এত হাজার হাজার লোকের কর্মসংস্থান দেয়ার মতো প্রতিষ্ঠান চীনে নেই। এ সময়টায় চীন শিক্ষার্থীদের আধুনিক প্রশিক্ষণ দিয়েছিল নানা ধরনের ট্রেড কোর্সে। স্বল্পমেয়াদি ট্রেড কোর্স শেষ করে বাস্তব জীবনে প্রয়োগের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে বেশি সময় লাগেনি। প্রতিটি বাড়ি গড়ে উঠল একটা করে ছোট ছোট কারখানা হিসেবে। পরিবারের সবাই সেখানে কাজ করে। বড় ফ্যাক্টরি করার জন্য আলাদা খরচ দরকার নেই। ফলে পণ্যের উৎপাদন খরচ কমে গেল। বর্তমানে যে কোনো পণ্য একেবারে সস্তায় উৎপাদন করার সক্ষমতা তাদের ধারে কাছে কোনো দেশ এখন পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি। পারবেও না কোনোদিন, তা সহজেই অনুমেয়। পৃথিবীর প্রতিটি দেশে চীনা পণ্যের প্রসার বাড়ছে প্রতিনিয়ত। চীন বর্তমানে বিশ্ব বাণিজ্যের এক অপ্রতিরোধ্য পরাশক্তি। উপযুক্ত মূল্য দিয়ে অর্ডার দিলে তারা এমন জিনিস বানিয়ে দেবে, যার গ্যারান্টি ১০০ বছরও দিতে পারবে। ইউরোপ ও আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলোয়ও চীনের তৈরি জিনিসপত্র স্থান পাচ্ছে দাপটের সঙ্গে এবং দৈনন্দিন চাহিদা মেটাচ্ছে। বাংলাদেশে আরএফএল, সিম্ফোনি, ওয়ালটনসহ বহু প্রতিষ্ঠান এই চায়নার বদৌলতেই কিছু করে খাচ্ছে, যা বলার অপেক্ষা রাখে না।

অপরদিকে বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত গড়ে উঠছে বেকার বানানোর কারখানা! এর আধুনিক নাম বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিবছরই দু-একটা নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হতে দেখা যাচ্ছে। আর বের হচ্ছে কয়েক হাজার বেকার। দল বেঁধে পড়ানো হচ্ছে- বিবিএ, এমবিএ অথবা চিরাচরিত সেই ডাক্তারি অথবা ইঞ্জিনিয়ারিং। এত বেকারের ভিড়ে চাকরি বাংলাদেশে একটি সোনার হরিণ। কর্পোরেট কোম্পানিগুলোও এটা ভালো করেই জানে। ফলে এ দেশের শিক্ষিত ছেলেরা প্রত্যাশা অনুযায়ী বেতন পায় না, চাকরিও পায় না যোগ্যতানুযায়ী। আর পেলেও সহ্য করতে হয় মালিক অথবা বসের নানাবিদ অদ্ভুত পরীক্ষা ও অপেশাদার আচরণ। অবশ্য এর যৌক্তিক কারণও আছে- দীর্ঘদিন পরাধীনতার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে এ জাতির মন-মননে বিরাজ করছে ভৃত্যগিরির প্রবণতা। আমরা মনে করি স্যুট, টাই পরিধান করে কোনো কাজ করতে পারলেই বুঝি সেখানেই জাতির সফলতা। আসলে এটা একটি অপ্রকাশ্য দীনতা। প্রকাশ্যে কেউ হয়তো স্বীকার করছেন না। আমরা বিশ্বখ্যাত কোম্পানি ‘আলী বাবা’ গ্রুপের কর্ণধার ‘জ্যাক মা’-এর কথা জানি। তিনি জীবনে বহু চাকরির ইন্টারভিউ দিয়েও চাকরি না পেয়ে পরবর্তীকালে চাকরি না করার সিদ্ধান্ত নেন। নিজে নিজে কিছু করার চিন্তা থেকেই আজ তিনি এত বড় প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হতে পেরেছেন। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায় যে, এ দেশের অর্থনীতির জন্য সামনে খুব ভয়াবহ দিন অপেক্ষা করছে। তাই বাংলাদেশের উচিত চীনের মতো শক্ত ও কঠোর পদক্ষেপ নেয়া। আর তা যত তাড়াতাড়ি নেয়া যাবে ততই দেশের জন্য মঙ্গল।

অ্যারিস্টটল বলেছেন- ‘সব চাকরিই মনকে শুষে ও হীন করে তোলে।’ চাকরি করে দেশের উন্নতি হয় না। হয় কি? আমাদের উদ্যোক্তা প্রয়োজন। তাই শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন, গুরুত্ব দেয়া উচিত কর্মমুখী শিক্ষার ওপর। সরকার একটু সচেতন হলেই অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই আমরা এ দেশের চেহারাটা পাল্টে দিতে পারি। এ দেশে কারিগরি শিক্ষার প্রসার হয়নি বললেই চলে। নতুন কোনো কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারিভাবে যেমন হচ্ছে না, আবার বেসরকারি উদ্যোগেও হচ্ছে না। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে কেউ বেকার আছে কিনা, কেউ বলতে পারবে না। দেশে অথবা বিদেশে প্রচুর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও এই সেক্টরের প্রতি নজর নেই কারও। অপরদিকে দেশ-বিদেশে প্রচুর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সরকারি শারীরিক শিক্ষা (ম্যাটস-হেলথ টেকনোলজি) প্রতিষ্ঠান আছে একেবারে হাতে গোনা কয়েকটা। বিদেশে প্রশিক্ষিত নার্স ও নার্সিংয়ের ওপর ডিপ্লোমা কিংবা উচ্চতর ডিগ্রিধারীদের প্রচুর চাহিদা। কারিগরি বা শারীরিক শিক্ষার কোনো প্রতিষ্ঠান উদ্বোধন করতে কখনও শোনা যায় না। অথচ পাস করে বের হলেই নিশ্চিত চাকরি। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় না করে যদি প্রতিবছর ২-৪টা করে হলেও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যেত এবং ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীদের (বিষয়ভিত্তিক) বিএসসি ডিগ্রি অর্জনের সহজীকরণ ও ব্যাপকতা বৃদ্ধি করা যেত, তবে এ সেক্টরে শিক্ষার্থীদের যেমন আগ্রহ বাড়ত, পাশাপাশি নিজেরাও নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারত। আর যদি এ সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি ও চলমান রাখা যেত, তবে একপর্যায়ে বেকারত্বকে ওয়ান ডিজিটে নিয়ে আসা সম্ভব হতো।

ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে পারলে বিদেশে বেশি বেতনে চাকরি পাওয়া সহজ।

আমাদের দেশে ডিগ্রি কিংবা মাস্টার্স পাস করার পরও নিজের পরিচয় ইংরেজিতে দিতে পারে না বেশিরভাগ শিক্ষার্থী। ১৬-১৭ বছর ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রচলিত নিয়মে বাংলা মাধ্যমে পড়ালেখা করলেও ইংরেজি শেখার সুযোগ থাকছে পাঠ্যবইয়ে বাধ্যতামূলকভাবে। এত বছর বা সময় পড়ালেখার পরও কেন শিক্ষার্থীরা ইংরেজি লিখতে অথবা কথা বলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারছে না। এর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা উচিত নয় কি? কেন এমনটি হচ্ছে? প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এখনই নিতে হবে। যারা মানবসম্পদ নিয়ে কাজ করছেন, কেবল তারাই উপলব্ধি করছেন- শিক্ষার নামে আসলে কী হচ্ছে? যদিও ইংরেজি মাধ্যমের কোনো প্রতিষ্ঠানকে সরকারি করার নজির চোখে পড়ে না। আবার ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা ইংরেজি মাধ্যমে পড়ালেখা ব্যয়বহুল হওয়ায় কেবল বিত্তশালীদের ছেলেমেয়েরাই পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। সাধারণের জন্য সুযোগ থাকছে কেবল মাদ্রাসা অথবা মফস্বলের অবহেলিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বলার অপেক্ষা রাখে না, সেখান থেকে পাস করে বের হয়ে বেকারত্বের পথে পা বাড়ানো যেন অবধারিত। কারণ তাদের পক্ষে যে কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া দুরূহ ব্যাপার। ডিগ্রি-মাস্টার্স পাস করে শিক্ষিত হওয়ার কারণে কৃষিকাজে মন বসে না; আবার কাক্সিক্ষত চাকরিও জোটে না। সাধারণ শ্রমিক হিসেবে বিদেশে যেতে প্রয়োজন ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা। সেটাও যদি সম্ভব না হয়, তবে মনোকষ্টে জীবনকে হতাশাগ্রস্ত যুবকের মতো তিলে তিলে শেষ করে দেয়া ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর থাকে না।

অন্যদিকে প্রশ্ন ফাঁসের মতো অলৌকিক ঘটনা ঘটছে, যা বিশ্বের আর কোথাও দেখা যায় না। কারণ ফাঁস হওয়া প্রশ্নে পরীক্ষায় মেধা যাচাইয়ের সুযোগ থাকে না। আর যারা এভাবে পাস করে বের হবে, তাদের দিয়ে জাতির কী উপকার হবে? দেশের কী কাজে লাগবে তাদের মেধা, এ প্রশ্ন থেকেই যায়। তাই বেকারত্ব দূরীকরণে চাই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। কারিগরি শিক্ষার বিকল্প নেই। আর যে শিক্ষা দেশ ও জাতির কোনো কাজে আসবে না, তা বন্ধ করা উচিত শক্তভাবে। সবচেয়ে কম দামে শ্রম পাওয়া যায় চীনে। আর তারা ওই শ্রমকে কাজেও লাগিয়েছে যথাযথভাবে। কম দামে মেধা পাওয়া যায় ভারতে। আর তারা তা কাজে লাগিয়েছে প্রযুক্তি খাতে। সাফল্যও পেয়েছে উভয় দেশ।

পরিশেষে, বেকারদের ডিজিটাল ডাটাবেজ থাকতে হবে এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যথাযথভাবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশাল জনগোষ্ঠীকে বেকার রেখে কখনও দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে সরকার ও জনগণকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। কর্মমুখী শিক্ষা বা কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষাব্যবস্থাই পারে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বেকারত্ব দূরীকরণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে। বিদেশে দক্ষ জনশক্তি রফতানি বাড়াতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। ডিগ্রি অর্জনকে শিক্ষার মূল লক্ষ্য না করে শিক্ষার গুণগত মানের দিকে নজর দিতে হবে। ঢালাওভাবে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের প্রতিযোগিতা থামাতে হবে। বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতি থেকে বের হয়ে আসার রাস্তা বের করতে হবে। প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হলে বেকারত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে। উদ্যোক্তা তৈরি করতে প্রয়োজন প্রশিক্ষণ প্রদান, আর্থিক সহযোগিতা ও উৎসাহ প্রদান। শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার পাশাপাশি পার্টটাইম কাজের সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। অভিভাবক ও শিক্ষকদের এ বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান রাখতে হবে। উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত হতে না পারলে বেকারত্ব হ্রাস পাবে না। বেকারত্ব দূর না হলে সমাজে নানা রকমের সামাজিক অস্থিরতা ও নৈতিক অবক্ষয় দেখা দেবে, যা জাতীয় উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করবে। এ অবস্থা কোনো জাতির কাম্য হতে পারে না।

আবুল খায়ের : উন্নয়নকর্মী

[email protected]

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

E-mail: [email protected], [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter