ইসরাইলের নির্বাচনে যেই জিতুক ফলাফল হবে একই

  আকিভা এলডার ০৯ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইসরাইলে নির্বাচন
ইসরাইলে নির্বাচন। ছবি: সংগৃহীত

চলমান নির্বাচনী মৌসুমে ইসরাইলে যদি মঙ্গলগ্রহ থেকে কোনো এলিয়েন আসে, তাহলে তৃতীয়বারের মতো সে বিশ্বাস করবে যে দেশটি সামরিক দখলদারিত্বের অধীনে লাখো মানুষের বিরুদ্ধে সহিংস সংঘর্ষে লিপ্ত গত ৫০ বছরের বেশি সময়জুড়ে।

নির্বাচনী প্রচারণার দিকে দৃষ্টি দিয়ে এবং প্রার্থীদের বক্তব্য শুনে আমাদের এখানে এসে পড়া এলিয়েন অতিথি ভাবতে পারেন, তিনি সম্ভবত হোঁচট খেয়ে বিচিত্র ‘বিগ ব্রাদার’ ধরনের কোনো টেলিভিশন রিয়েলিটি শোর প্রোগ্রামে ঢুকে পড়েছেন; যে শোটির দর্শক উদ্বেগের সঙ্গে সর্বশেষ টিকে থাকা ব্যক্তিকে দেখার জন্য অপেক্ষা করছেন।

কে হতে যাচ্ছেন ইসরাইলি রাজনীতির পরবর্তী তারকা- প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু নাকি সাবেক মিলিটারি চিফ অব স্টাফ বেনি গানটজ? বাইরের একজন মানুষের কাছে ইসরাইল হচ্ছে স্বাভাবিকভাবে আলোকিত পশ্চিমা ও ইউরোপীয় স্টাইলের গণতন্ত্রের দেশ- যেখানে ভোটাররা রক্ষণশীল পুঁজিবাদী শাসন ও সামাজিক-গণতন্ত্রিক ব্লকে বিভক্ত। দেশটিতে ফিলিস্তিনের সঙ্গে তিক্ত সংঘর্ষের বিষয়টিকে কৃতিত্ব হিসেবে নগ্নভাবে পুনঃপুন উল্লেখ করা হয়ে থাকে।

আজকের নির্বাচনে যদি নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি হেরে যায় তবে দলটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাভিচাই ম্যানডেলব্লিটকে দায়ী করবে। দুর্নীতির বহু অভিযোগে নেতানিয়াহুকে অভিযুক্ত করার সিদ্ধান্তের কারণে সেটা করা যুক্তিসঙ্গতও বটে।

লিকুদ পার্টি যুক্তিসঙ্গতভাবে গণমাধ্যমকেও নিজেদের পরাজয়ের জন্য দায়ী করতে পারে নেতানিয়াহুকে তারকা ধরে নিয়ে তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগকে অতিরঞ্জিত হিসেবে বিবেচনা করার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করার কারণে। লিকুদ নেতার ওপর অপরাধমূলক আচরণের জন্য তেমনটি করা হয়নি; দলটির উচিত নির্বাচনে পার পাওয়ার ফন্দি-ফিকির না করে বরং নিজেদের বর্তমান শক্তিসামর্থ্যরে দিকে ভালোভাবে নজর দেয়া।

পশ্চিমতীরের বর্ণবৈষম্যের প্রশাসন, বিশ লাখ ফিলিস্তিনি মানুষকে গাজায় অবরোধ করে রাখার কারণে সৃষ্ট মানবিক সংকট, ইসরাইলের গণতান্ত্রিক পরিচয়ের হুমকি এবং আরব লীগের ঐতিহাসিক শান্তি প্রক্রিয়া শুরুর সুযোগ হারানো- এসব বিষয় কার্যত পাবলিক এজেন্ডা থেকে অনুপস্থিত।

গানটজের নেতৃত্বে ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট জেনারেলদের দল সামরিক বাহিনীর সাবেক দুই প্রধান- মোশে ইয়ালন এবং গাবি অ্যাশকেনাজি ও মধ্যপন্থী ইয়েশ আতিদ পার্টির প্রধান ইয়াইর ল্যাপিড তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ এসব বিষয় সামলানোর ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতাকে জোর দিয়ে তুলে ধরতে পারে।

অবসরপ্রাপ্ত তিন জেনারেল সামরিক বাহিনীতে থাকার সময় তাদের তারকাসমৃদ্ধ রেকর্ডের সুবিধা নিতে পারেন জনগণকে ওইসব বিষয়ের কথা বলে যা দেশটির সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারা বিশ্বাস করেন যে, সরকারের পছন্দ করা সীমান্ত সংক্রান্ত যে কোনো সিদ্ধান্তে ইসরাইলকে প্রতিরক্ষা দিতে সামরিক বাহিনী যথেষ্ট শক্তিশালী।

তারা ঘোষণা করতে পারেন ওই বিষয়টি যা দরজার পেছনে বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের মানুষ বলে থাকে- প্রতিনিয়ত দখলদারিত্ব ইসরাইলের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত হুমকি। তারা সাহসিকতার সঙ্গে জোর দিয়ে বলতে পারেন, ইসরাইলের আরব নাগরিক এবং নেসেটে তাদের প্রতিনিধিরা সরকারের বৈধ ও গ্রহণযোগ্য অংশীদার।

যা হোক, এ ধরনের বার্তাগুলো ‘লেফটিজম বা বামপন্থার’ ইঙ্গিত দেয়- এটি এমন একটি পরিভাষা, ইসরাইলে যা বিপদ ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার অর্থ বোঝায়, ‘আরব’ শব্দটি দিয়ে যা বোঝানো হয় প্রায় তার মতোই। প্রতিটি অনভিজ্ঞ রাজনৈতিক উপদেষ্টাই জানেন যে, ব্যালটবাক্সের পথে ছোট্ট ‘লেফটিস্ট’ শব্দটির চেয়ে মারাত্মক ল্যান্ডমাইন আর কিছু হতে পারে না।

নেতানিয়াহু যদি ভালোয় ভালোয় শান্তি, সহাবস্থান এবং পুনর্মিলনের আলোচনার মোড় ঘোরানোর ব্যবস্থা করতে না পারেন নিজের প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য ভীমরতির আগাম প্রতীক হিসেবে, অন্যথায় মারাত্মক পরাজয়ের চূড়ান্ত প্রকাশ দেখতে হবে।

ডানপন্থীরা যে বদনাম অসলো চুক্তি ও দুই দেশ সমাধান প্রক্রিয়াকে দিয়েছে সেটাই ব্যাখ্যা করে কেন গানটজ ও তার বন্ধুরা ‘ডান ও বাম বলে কিছুই নেই’- এমন ফাঁপা স্লোগানের আশ্রয় কী কারণে নিচ্ছেন।

নিজেদের একনিষ্ঠতা প্রমাণের জন্য আরব দলগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের রাজনৈতিক জোট গঠনের বিষয়টিও তারা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এর বিপরীতে ঘোষণা করেছেন তারা বরং লিকুদ পার্টিকে আমন্ত্রণ জানাবে তাদের নেতৃত্বে সরকারে যোগদান করার জন্য।

ইসরাইলি বামপন্থীদের মধ্যে আশাবাদীরা মনে করে, এ ফ্যাকাশে কৌশল হচ্ছে নির্বাচনী তারকাদের কল্পনাপ্রসূত, যারা মনে করে ক্ষমতা নেয়া হচ্ছে দখলদারিত্বের বাগাড়ম্বরকে চিরস্থায়ী করার বিষয়টিকে যৌক্তিক করার পদ্ধতি।

শান্তিপ্রেমীরা সন্দেহ করেন নির্বাচিত হয়ে গেলে পরে গানটজ ও তার সঙ্গীরা বসতি স্থাপন লবির চাপকে ঝেড়ে ফেলতে পারবে, যেটা লিকুদ পার্টিকে বছরে পর বছর আতঙ্কে রেখেছে এবং চলমান পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার যে কোনো পথ আটকে দিয়েছে।

তারা বিশ্বাস করে যে, মধ্য বামপন্থী দলের নেতৃত্বাধীন যে কোনো জোট সীমানার বাইরের এবং যে কোনো বিচ্ছিন্ন বসতি স্থাপনকে বন্ধ করে দিতে পারে ও মূল বসতি ব্লকের বাইরে অবস্থিত যে কোনো বসতির অর্থায়ন আটকে দিতে পারে। যেমনটি ব্ল– অ্যান্ড হোয়াইট পার্টির প্লাটফর্ম প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যে, তারা ফিলিস্তিনিদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে এগিয়ে নেবে।

যাহোক, এরা ‘ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র’ শব্দটি উচ্চারণ না করার বিষয়ে যথেষ্ট সতর্ক এবং যে কোনো ধরনের একপক্ষীয় পদক্ষেপ, যেমন- ২০০৫ সালে ইসরাইলের গাজার সংশ্লিষ্টতা থেকে সরে যাওয়ার মতো বিষয়কে প্রত্যাখ্যান করছে। গাজার বিষয়টিতে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে একটি চুক্তির আওতায় দুই দেশভিত্তিক সমাধানের বিষয় ছিল। গানটজ-ল্যাপিড পার্টি প্রতিজ্ঞা করেছে, যে কোনো প্রস্তাবিত শান্তিচুক্তির জন্য একটি গণভোট বা নেসেটের বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে।

কিন্তু আপাতত অঞ্চলগুলো থেকে সামান্য একটা কিছু প্রত্যাহারেরও কোনো সুযোগ নেই যাতে করে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া যাবে আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া। এমন সমর্থনের বিষয়টিও একই দলগুলো এবং ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট পার্টি আগেই বাতিল করে দিয়েছে।

এ ছাড়া প্রাথমিকভাবে ইয়ালন, নেতানিয়াহুর সাবেক কট্টর সহযোগী জেভি হাউসার এবং ইওয়াজ হেন্ডেল গানটজের জন্য বড় ধরনের মাথাব্যথার ইঙ্গিত দিচ্ছেন এটা বলে যে, যদি গানটজ কখনও ১৯৬৭ সালের সীমানা অনুযায়ী ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের জন্য তার দলের অনুমোদন চান তবে সেটি বাধাগ্রস্ত করা হবে।

যে কোনো ধরনের ফিলিস্তিনি স্বাধীনতার জন্য অন্তত দেড় লাখ বসতি স্থাপনকারীকে তাদের বসতি থেকে উচ্ছেদ করতে হবে, জেরুজালেমের সার্বভৌমত্বের বিষয়টি বিভক্ত করতে হবে এবং শরণার্থী সমস্যার একটি সমাধান বের করতে হবে। এটি ঘটাতে হলে চার তারকাসমৃদ্ধ চারটি বিষয় একই সরল রেখায় অবস্থানের অসম্ভাব্য একটি বিষয় সংঘটন করতে হবে।

প্রথমত, ইসরাইলি জনগণ ও তাদের নির্বাচিত কর্মকর্তাদের এমন একটি চুক্তি স্বাক্ষরের ইচ্ছা থাকতে হবে যাতে ইসরাইলে সামাজিক অস্থিতিশীলতা ও গৃহযুদ্ধের মতো বিষয় না ঘটার নিশ্চয়তা থাকবে।

দ্বিতীয়ত, ফিলিস্তিনিদের একটি চুক্তি লাগবে যাতে তাদের সব দাবি শেষ করার ঘোষণা থাকবে ১৯৪৮ সালের শরণার্থীদের ইসরাইলে ফেরার অধিকারের পূর্ণ বাস্তবায়নের অন্তর্ভুক্তিসহ। যেহেতু এ ক্ষেত্রে ঐকমত্যের অভাব রয়েছে, সুতরাং এর অভ্যন্তরীণ মূল্য চুকাতে হবে চড়া হারে।

তৃতীয়ত, ধনী ও প্রভাবশালী দেশগুলোর ফিলিস্তিনি শান্তি ক্যাম্পকে সমর্থন ও যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যানকারী সংস্থাগুলোর ইসরাইলের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্কের যারা বিরোধিতাকারী, তাদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকি মোকাবেলার মানসিকতার প্রয়োজন হবে।

চতুর্থত, এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তারকাসমৃদ্ধ বিষয়- এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন এবং কংগ্রেসের ইচ্ছা থাকতে হবে উভয় পক্ষে তাদের প্রভাব বাড়িয়ে তোলা ও ইভানজেলিক্যাল এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ ইহুদি দাতাদের মাঝে গভীর সংকট তৈরির ঝুঁকি মোকাবেলার জন্য।

হোয়াইট হাউসের ব্যাপক অন্তর্ভুক্তি ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের বাস্তবতা পরিবর্তন করতে কোনো ইসরাইলি নেতা সক্ষম নন। ১৯৬৫ সালে সিনাই উপত্যকা থেকে সেনা প্রত্যাহার, ১৯৭৯ সালে মিসরের সঙ্গে শান্তি চুক্তি এবং ২০০৫ সালে গাজা থেকে বেরিয়ে যাওয়া- বছরের পর ইসরাইলের বড় ধরনের এসব নীতি পরিবর্তনে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা মূল ভূমিকা পালন করেছেন।

ইসরাইলি বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ সিনিয়রের লড়াই ১৯৯২ সালে ইসরাইলি মধ্য বামপন্থী আইজ্যাক রবিনের বিজয়ে ভূমিকা রেখেছে এবং সে পথ ধরে অসলো শান্তি চুক্তিতেও।

কট্টর ডানপন্থী ইসরাইলি প্রশাসনকে সমর্থন করার যে কোনো চেষ্টা হাতছাড়া না করা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ সংক্রান্ত সম্ভাবনা বর্তমান গানটজের নেতৃত্বাধীন মধ্য বামপন্থী ব্লকের শক্ত আস্থা অর্জনের সঙ্গে সমানতালে চলছে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, গানটজ ও তার ডানপন্থী সহকর্মীরা মনে হয় ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনি জনগণের অপরিহার্য প্রয়োজনের ক্ষেত্রে পটপরিবর্তনকারী না হয়ে ‘বর্তমানে যারা আছে তাদের চেয়েও বেশি গতানুগতিক’ দলমুখী।

বিদেশি পত্রিকা থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম

আকিভা এলডার : আলমনিটর’স ইসরাইল পালসের জ্যেষ্ঠ কলামিস্ট

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×