ভারতের লোকসভা নির্বাচন

কংগ্রেসের ইশতেহার বিজেপিকে লড়াইয়ে টেনে এনেছে

  পি চিদম্বরম ১১ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কংগ্রেসের ইশতেহার প্রকাশের
কংগ্রেসের ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে নেতারা। ছবি: সংগৃহীত

চুয়ান্ন পৃষ্ঠার একটা নথি যেন পায়রাদের মধ্যে শিকারি বিড়াল দর্শনের ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে। এখানে বিজেপি হল একদল পায়রা- ৫৬ ইঞ্চি বুকের পাটার দম্ভ এখানে ভুলে যান- কংগ্রেসের ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ইশতেহার প্রকাশ হতেই বিজেপি যেভাবে ফিটের রোগীর মতো আচরণ করছে তাতেই এর প্রমাণ।

সাধারণভাবে ইশতেহারগুলো হয় স্বল্পায়ু এবং তাকের কোণের কোথাও জায়গা পায়। ২ এপ্রিল কংগ্রেসের ইশতেহার প্রকাশের মিনিট কয়েকের ভেতরেই সেটা খবরের শিরোনাম দখল করে নেয় এবং একটা করে ঘণ্টা পেরিয়েছে, ঘটনাটা নতুন মাত্রা পেয়েছে। দিনের শেষে এবং নিশ্চিতভাবে ৫ এপ্রিল শেষের মুখে ইশতেহারের প্রধান প্রতিশ্রুতিগুলো প্রতিটি নগর, শহর এবং শহরঘেঁষা গ্রামগুলোয় পৌঁছে গেছে। আমি নিশ্চিত যে টেলিভিশন ও প্রচারকরা প্রধান প্রতিশ্রুতিগুলোর কথা দিনকয়েকের ভেতরে অন্যদের কাছে পৌঁছে দেবে। কংগ্রেসের ইশতেহারের বার্তার জোর এতটাই যে বার্তাবাহকরা এগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে ধন্য হবে।

কংগ্রেসের এবারের ইশতেহার কতটা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ যে ঘণ্টা কয়েকের ভেতরেই ‘টক অব দ্য টাউন’ (গ্রামেরও চর্চার বিষয়) হয়ে উঠল এর উত্তরটা হল- কংগ্রেসের ইশতেহারটা বস্তুত মানুষের কণ্ঠস্বর। আমি চূড়ান্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, এই ইশতেহারে জায়গা পাওয়া প্রতিটি আইডিয়া বা প্রতিশ্রুতি কোনো-না-কোনো নাগরিক দিয়েছেন- হয় লিখিতভাবে অথবা দেশজুড়ে ১৭৪টা পরামর্শদাতার কোনোটা মারফত। ইশতেহার প্রস্তুতকারীরা ওইসব আইডিয়াকেই সহজ ভাষায় গুছিয়ে লিখেছেন মাত্র।

বিজেপি উত্ত্যক্ত

সাধারণভাবে বিরোধী দলগুলোই শাসক দলের ইশতেহারের সমালোচনায় মুখর হয়। সাম্প্রতিক অতীতের একটা ঘটনার কথাও আমি মনে করতে পারি না, যাতে খোদ শাসক দল একটা বিরোধী দলের ইশতেহারের বিরুদ্ধে এভাবে খড়গহস্ত হয়েছে। এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে- কেন? বিজেপির লোকরা এর মধ্যে কী এমন পেয়েছে?

আমার মাথায় কয়েকটা জিনিস আসছে যেগুলো বিজেপিকে অবশ্যই উত্ত্যক্ত করেছে। প্রথমটা হল চাকরির প্রতিশ্রুতি। ৪৫ বছরের মধ্যে বেকারত্বের সর্বোচ্চ হার ৬ দশমিক ১ শতাংশ। নিশ্চিত এবং সত্বর সমাধান ছিল; কিন্তু সেই নিশ্চয়তা উপেক্ষা করে মোদিজি বছরে দুই কোটি চাকরির বন্দোবস্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বসলেন। উল্টো ওই প্রতিশ্রুতিই বিজেপিকে ধাওয়া করে বেড়িয়েছে। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার পরিবর্তে বিজেপির সরকার ডিমনিটাইজেশন ও ত্রুটিপূর্ণ জিএসটি চালুর মাধ্যমে চাকরি ধ্বংসই করেছে। ন্যাশনাল স্যাম্পেল সার্ভে অফিসের (এনএসএসও) সরকারি রিপোর্টে ৪ কোটি ৭০ লাখ চাকরি খোওয়া যাওয়ার কথা লেখা হয়। কংগ্রেসের ইশতেহার দেখিয়েছে দেশের বিশালসংখ্যক বেকার যুবক-যুবতীর নিশ্চিত কাজের ব্যবস্থা কী কী ভাবে করা সম্ভব। যেমন একটা সহজ পদক্ষেপ হল- সরকারি ও আনুষঙ্গিক দফতরগুলোয় যত শূন্যপদ রয়েছে সেগুলো পূরণ করা, তাহলে এখনই ২৪ লাখ বেকারের চাকরি দেয়া সম্ভব।

এরপর ইশতেহার সাহসী মনোভাব রেখেছে কৃষিক্ষেত্রের জন্য। এমনকি কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত বিজেপি উপহাস করার পরও কংগ্রেসের ইশতেহারে বকেয়া কৃষিঋণ মওকুফ করে দেয়ার ঘোষণা রাখা হয়েছে। বিজেপির তরফে কয়েকটি দেউলিয়া কোম্পানির ঋণ (৮৪,৫৮৫ কোটি টাকা) মওকুফের দৃষ্টান্ত টেনে কৃষিঋণ মওকুফের যথার্থতা দেখিয়েছে কংগ্রেস। কংগ্রেসের ইশতেহারের আরও দুটো প্রতিশ্রুতি কৃষকদের মন কেড়ে নিয়েছে : পৃথক ‘কিষান বাজেট’ এবং ঋণখেলাপি কৃষকদের নামে আর কোনো ফৌজদারি (ক্রিমিনাল) মামলা নয়- কেননা যথাসময়ে ঋণ পরিশোধ না হওয়াটা হল একটা দেওয়ানি (সিভিল) সমস্যা। একদা বিখ্যাত অ্যাগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন সার্ভিস ফিরিয়ে আনারও প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে কংগ্রেসের ইশতেহারে। কথা দেয়া হয়েছে- অ্যাগ্রিকালচারাল প্রোডিউস মার্কেট অ্যাক্ট প্রত্যাহার করা হবে, এসেনশিয়াল কমোডিটিজ অ্যাক্ট বদলানো হবে এবং দেশের প্রতিটি জেলায় একটা করে কৃষিবিজ্ঞান কলেজ এবং একটা করে পশুস্বাস্থ্য বিজ্ঞান কলেজ স্থাপন করা হবে।

এড়িয়ে যাওয়া নয়

স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর মুখোমুখি হতে ভয় পায়নি কংগ্রেসের ইশতেহার। মহিলাদের জন্য ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি রয়েছে- মহিলা সংরক্ষণ বিলের পরিবর্তন এবং সব সরকারি পদের তিন ভাগের একভাগ মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ। তফসিলি জাতি (এসসি), তফসিলি জনজাতি (এসটি) এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণীর (ওবিসি) জন্য কংগ্রেসের এবারের প্রতিশ্রুতি হল- ইকুয়াল অপরচুনিটিজ কমিশন, আরও ইতিবাচক ভূমিকা এবং বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও তাদের জন্য সংরক্ষণ। কংগ্রেসের ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি রয়েছে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য, ভাষাগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য, নানাভাবে প্রতিবন্ধীদের জন্য এবং ‘এলজিবিটিকিউআইএ+’ কমিউনিটির জন্য। কংগ্রেসের এবারের নির্বাচনী ইশতেহার পড়লে প্রত্যেকেই মনে করবেন এতে তার কথাটা আছে।

কংগ্রেসের নির্বাচনী ইশতেহার জাতীয় নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং বিদেশনীতি নিয়ে আলোচনা করেছে এবং এসব বিষয়ে বিজেপির ভুল নীতি ও ভুল পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ করেছে। জেটলিজি কিছু প্রশ্ন তোলার পর কংগ্রেস বাস্তব দিক তুলে ধরে জবাব দিয়েছে এবং পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। কেন জম্মু ও কাশ্মীরে অনুপ্রবেশের চেষ্টার সংখ্যা, অনুপ্রবেশকারীদের সংখ্যা এবং হতাহতের সংখ্যা বেড়ে গেল? সশস্ত্র বাহিনী (বিশেষ ক্ষমতা) আইন বা সংক্ষেপে আফসপা তুলে নেয়া হল কেন ২০১৫ সালে ত্রিপুরা রাজ্য থেকে পুরোপুরি, মেঘালয় থেকে ২০১৮ সালে এবং অরুণাচল প্রদেশের তিনটি জেলা থেকে ২০১৯-এর ১ এপ্রিল? বিজেপি কি মদদপুষ্ট-অন্তর্ধান, যৌননিগ্রহ ও হিংসাকে সমর্থন করছে? সংসদ যে কালে ডিফেন্স অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট এবং আনলফুল অ্যাক্টিভিটিজ (প্রিভেনশন) অ্যাক্ট তৈরি করেছে সেই কালে কেন ১২৪-এ ধারার (বিদ্রোহ) প্রয়োজন- যেটা উপনিবেশ জমানার একটা অন্যায় ব্যবস্থা মাত্র? এটা পরিষ্কার যে, তার মতো লড়াই করার কায়দাটা কংগ্রেস ফের খুঁজে বের করেছে এবং বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সদিচ্ছা দেখাচ্ছে। আমি বিতর্কে তাদের স্বাগত জানাই; কিন্তু হতাশ হচ্ছি প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ দিনকে দিন উগ্র হয়ে ওঠায়।

আইডিয়ার লড়াই চেয়েছিলাম

বিজেপিকে আইডিয়ার যুদ্ধে নামানো যাক। যত দূর সম্ভব, বিজেপি ভরসা রেখেছে উগ্র-জাতীয়তাবাদে এবং অপব্যবহারে- গালমন্দে। বিজেপির প্রচার যদি আইডিয়া ও যুক্তিতর্কের দিকে ঘুরে যেত তবে আমি সেটাকে স্বাগতই জানাতাম।

বহু দফায় ভোট গ্রহণের আইডিয়াটা আমার পছন্দ নয়; কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এটা হয়তো এড়ানো মুশকিল ছিল। ভোট গ্রহণের বিভিন্ন দফার ভেতরে খবর পরিবেশনে সংবাদমাধ্যমকে অবশ্যই নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে এবং নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা প্রয়োগে অবশ্যই কোনোরকম বৈষম্য হবে না। বাকিটা ভারতের মানুষের বিবেচনা।

পি চিদম্বরম : ভারতীয় রাজনীতিক, সাবেক মন্ত্রী

ঘটনাপ্রবাহ : ভারতের জাতীয় নির্বাচন-২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×