মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধার পবিত্রতা রক্ষা করতে হবে

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মুঈদ রহমান

মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধার পবিত্রতা রক্ষা করতে হবে। ছবি: সংগৃহীত

প্রাচীন গ্রিসের এরিস্টটলকে (৩৮৪-৩২২ খ্রিস্টপূর্ব) আমরা যদি প্রথম শিক্ষক হিসেবে জ্ঞান করি, তাহলে নয় শতকের সিরিয়ার আল ফারাবি (৮৭২-৯৬০ খ্রিস্টাব্দ) হলেন দ্বিতীয় শিক্ষক। সেই সঙ্গে বিশ শতকের ব্রিটেনের বার্ট্রান্ড রাসেলকে (১৮৭২-১৯৭০) তৃতীয় শিক্ষক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

আমাদের তৃতীয় শিক্ষক মানুষের চরিত্র বিশ্লেষণ করে বলেছেন, ‘পৃথিবী গ্রহের প্রাণী-প্রজাতির মধ্যে সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক এবং সবচেয়ে বিরক্তিকর হচ্ছে মানুষ, অথবা তার উদ্ধত ভাষায়- হোমো সেপিয়েন্স’ (বার্ট্রান্ড রাসেল রচনাসমগ্র-২; পৃষ্ঠা : ১৩)। গত ৩ এপ্রিল যুগান্তরে প্রকাশিত ‘বাতিল হচ্ছে ১০২ সনদ’ শীর্ষক খবরটি পড়ে বার্ট্রান্ড রাসেলের কথাটা মনে হল। স্বাধীনতা নামক একটি বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে যে দেশের ৩০ লাখ মানুষ অকাতরে জীবন দিল, সেই দেশেরই কিছু মানুষ সামান্য সুযোগ-সুবিধার জন্য ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সেজে বসে আছে। এ ধরনের অপকর্ম জাতির শ্রেষ্ঠসন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা মলিন করে দিতে বাধ্য।

পত্রিকার খবর অনুযায়ী নতুন করে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সনদ বাতিল হতে যাচ্ছে ১০২ জনের। বলা হয়েছে, মিথ্যা তথ্যের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে ৫৯ জনই সরকারি কর্মকর্তা। যুগান্তর বলছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের যে ৫৯ জন আছেন তাদের মধ্যে সংস্থাপ্রধান, কর পরিদর্শক, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, রাজস্ব কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য সহকারী, পুলিশ কর্মকর্তা, ব্যাংকার, শুল্ক কর্মকর্তা, চিকিৎসক ও শিক্ষকের নাম আছে। আছেন পেশকার, অফিস সহকারী, কেরানি ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা।

তাদের অনেকে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় এখনও চাকরি করছেন, কেউ চাকরির মেয়াদ বাড়িয়ে এ সুবিধা নিয়ে অবসরে গেছেন। কেউ কেউ এখনও ভাতা পাচ্ছেন।’ যদি আজ থেকে ৫ বছর আগের কথা মনে থাকে তাহলে ভ্রু-কুঁচকানোর প্রয়োজন হবে না। ‘সরকারের পাঁচ শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভুয়া সনদ নেয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয় ২০১৪ সালে। ওই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর তৎকালীন স্বাস্থ্য সচিব এম নিয়াজ উদ্দিন মিয়া, সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) তৎকালীন সচিব একেএম আমির হোসেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব কেএইচ মাসুদ সিদ্দিকী এবং একই মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আবুল কাশেম তালুকদারের মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল করে গেজেট প্রকাশ করা হয়।

বাতিল করা হয় সাবেক সচিব এবং প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার তৎকালীন বেসরকারিকরণ কমিশনের চেয়ারম্যান ওয়াহিদুজ্জামানের সনদও। সনদ ভুয়া প্রমাণিত হওয়ার পর তাদের স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষকের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ ছিল (প্রথম আলো, ২০.১০.২০১৮)। মোদ্দা কথা, এখানে ব্রাহ্মণ বা নমশূদ্রের কোনো ব্যাপার নেই, আশরাফ আর আতরাফ বলে কোনো কথা নেই, সব পর্যায়ের ব্যক্তি এ অনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন। যারা পেশাগত সুবিধা নেয়ার জন্য এতটা নিচে নামতে পারে, তারা কর্মজীবনে আর্থিক লেনদেনে কতটা স্বচ্ছ হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। তাদের সম্পদের হিসাবটিও খতিয়ে দেখার প্রয়োজন আছে। অবাক হলাম এই দেখে যে, একটি জেলার খোদ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডারই ভুয়া! ভাবা যায়! আমরা কোন সমাজে বাস করছি।

মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে এ দেশের স্বাধীনতা এনেছেন, পরবর্তী প্রজন্মকে স্বাধীনভাবে বাঁচার সুযোগ করে দিয়েছেন। খুব স্বাভাবিক কারণেই মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সুন্দর অর্থনৈতিক জীবন নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। অনেক মুক্তিযোদ্ধাই আছেন বা ছিলেন, যারা রাষ্ট্রের আনুকূল্য নেয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি (আমার বাবা প্রয়াত সিদ্দিকুর রহমান তাদেরই একজন)। সে কথা ভিন্ন, তবে যদি কোনো মুক্তিযোদ্ধা প্রয়োজন মনে করেন, তবে তার সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। বলে রাখা ভালো, মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠন জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের যে কার্যক্রম চালু আছে তার ‘খ’ তে বলা আছে, ‘মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার জন্য কার্যক্রম গ্রহণসহ সর্বোতভাবে পুনর্বাসন।’

সে দিকটি সামনে রেখে আওয়ামী লীগ সরকার ভাতার পরিমাণ বাড়িয়ে ২০১৭ সাল থেকে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৯৪ মুক্তিযোদ্ধাকে মাসে ১০ হাজার টাকা করে দেয়ার উদ্যোগ নেয় এবং তা বাস্তবায়নও করে। সঙ্গে দুটো উৎসব ভাতাও দেয়া হয়। এ বছর থেকে ৫ হাজার টাকা বিজয় দিবস এবং ২ হাজার টাকা বৈশাখী উৎসব ভাতা পাওয়ার কথাও শোনা যায়। এ ধরনের ব্যবস্থা প্রণয়নে সরকার সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। যদি এ অর্থের পরিমাণ যথেষ্ট না হয় তবে তা আরও বাড়িয়ে দিলেও অন্তত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কোনো বাঙালি তাতে আপত্তি করবে না, করা উচিতও নয়। একটি কৃতজ্ঞ জাতির এমনটিই হওয়া উচিত।

কিন্তু সমস্যাটা হল প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে। ‘প্রকৃত’ নিয়ে কথা বললে তাকে বারণ করা যাবে না। ২০১৭ সালে ভাতা বাড়ানোর সময় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক বলেছিলেন, ‘The country has a list of 2,30,000 freedom fighters. We are continuing scrutiny to select real freedom fighters' (The Daily Star, 04.12.2017). তার মানে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নির্বাচন করার ক্ষেত্রে একটা চলমান বাছাই প্রক্রিয়ার প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন। এর দ্বারা প্রমাণিত হয়, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার উপস্থিতি নিশ্চিতভাবেই আছে।

কিন্তু ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কত? এ নিয়ে সরকারি দল আওয়ামী লীগ থেকে বলা হয়ে থাকে, বিএনপির আমলে তা ২২ হাজার ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের ২০০৮ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে যে অতিরিক্ত ১১ হাজার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তার বেশিরভাগই ভুয়া বলে পত্রপত্রিকায় খবর বেরিয়েছে। সব মিলিয়ে ৩৩ হাজার। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী তার আমলে ৮ হাজার ভুয়া সনদ বাতিলের কথা বলেছেন। এখনও ২৫ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় রয়ে গেছেন। সরকার বদল মানেই কি মুক্তিযোদ্ধার তালিকা বদল? ৪৮ বছরে ৬ বার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় সংযোজন-বিয়োজন করা হয়েছে। এটি হতে পারে, কেননা একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়তো একসময় নাম অন্তর্ভুক্ত করার কথা ভাবেননি, এখন ভাবছেন।

তার উত্তরসূরিদের সুযোগ-সুবিধা দিতে চাইছেন, এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ অন্তর্ভুক্তি মানুষের বিশ্বাসে অভাব তৈরি করে। মানুষ কোনো উদ্দেশ্যকে ইঙ্গিত করতে চায়। মুক্তিযোদ্ধার বয়স, সংজ্ঞা ও মানদণ্ডের দোলাচলও সন্দেহের বাইরে নয়। এ পর্যন্ত ১১ বার পাল্টানোর পর বয়স ৬ মাস কমিয়ে কমপক্ষে সাড়ে বারো বছর করা হয়েছে। এগুলো হয়তো স্বাভাবিক ব্যাপার; কিন্তু আমাদের মাঝে স্বচ্ছতার অভাব থাকায় তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়; মনে হয় ব্যক্তিস্বার্থে এ ধরনের পরিবর্তন ঘটানো হয়। সেক্ষেত্রে নেতিবাচক ভাবনার মানুষকে দোষ দেয়া যায় না।

২০১৮ সালের শুরু থেকে প্রকৃত ও নির্ভুল তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কয়েক মাস কাজ করার পর নানা জটিলতায় সে কাজ বন্ধ হয়ে যায়; কিন্তু এরই মধ্যে খরচ হয়ে যায় প্রায় ১০ কোটি টাকা। স্বয়ং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক বলেছেন, ‘এটা ঠিক, আমরা সব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিত করতে পারিনি বা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারিনি। তবে আমরা কোনো অমুক্তিযোদ্ধাকে মুক্তিযোদ্ধা বানাইনি।’ দুর্বলতা স্বীকার করা রাজনৈতিক উদারতা, তবে আমরা চাই দুর্বলতা দূর করার দৃঢ়তা। হাতের কাছে আইন আছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফৌজদারি আইনের ৪১৬ ধারা অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধার ক্ষেত্রে প্রতারণার আশ্রয় নিলে ৩ বছরের এবং সুযোগ-সুবিধা নিলে ৭ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তাহলে তা প্রয়োগ করতে বাধা কোথায়। আন্তরিকতা থাকলে এর সমাধান খুব একটা কঠিন বলে মনে হয় না। বিষয়টিকে রাজনৈতিক কুটিলতা থেকে দূরে রাখতে হবে।

বর্তমান সরকারি দল আওয়ামী লীগকে আমরা যেভাবেই মূল্যায়ন করি না কেন, একথা বলতেই হবে যে, দলটি মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল। আশা করি আওয়ামী লীগও তা মনে করে। যদি তাই হয়, তাহলে অন্যকিছু বাদ দিলেও অন্তত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক যে কোনো সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান আমরা আওয়ামী লীগের কাছেই প্রত্যাশা করি। এখানে অন্য দল কী করল না করল তা বিবেচনার দাবি রাখে না। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার কালিমা আমাদের দূর করতেই হবে। কারণ মুক্তিযোদ্ধার সম্মান মানে সমগ্র জাতির সম্মান। আমরা তা মলিন হতে দিতে পারি না। সবার শুভবুদ্ধির উদয় হোক।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়