গবেষণায় আমরা কেন পিছিয়ে থাকব?

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

গবেষণায় আমরা কেন পিছিয়ে থাকব? ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন অব বাংলাদেশের (আইইবি) ৫৯তম কনভেনশন উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গবেষণা বাড়ানো দরকার। বিজ্ঞান প্রযুক্তির যেমন বিস্তার ঘটছে, নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন হচ্ছে, সেইসব প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের চলতে হবে।

সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। কথাটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। কারণ গবেষণা ছাড়া একটি দেশ কোনোভাবেই উন্নত হতে পারে না। পৃথিবীতে গবেষণা এগিয়ে চলেছে। প্রতি মুহূর্তে নতুন নতুন প্রযুক্তি পৃথিবীকে সমৃদ্ধ করছে। ফলে স্বাভাবিক নিয়মে আগের প্রযুক্তিকে বিদায় নিতে হচ্ছে। আবার যে প্রযুক্তি আগের প্রযুক্তিকে ফুরিয়ে যাওয়ার কথা বলছে তারাও একদিন নতুন প্রযুক্তির কাছে ম্লান হয়ে যাবে। এভাবে গবেষণার মাধ্যমে প্রযুক্তি উন্নয়নের গতি বেড়েছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার।

আমরা যদি গবেষণাবিমুখ হই, তবে ক্রমাগতভাবে আমরা পিছিয়ে পড়ব। গবেষণায় পিছিয়ে পড়া মানে মানুষ হিসেবে পিছিয়ে পড়া, গবেষণায় পিছিয়ে পড়া মানে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া। এজন্য একটি কথাই দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, সেটি হল, নিজে গবেষণা করব, অন্যকে উৎসাহিত করব। এর কারণ গবেষণার মাধ্যমে একজন ব্যক্তির মধ্যে যেসব চিন্তা সৃষ্টি হয়, তা তাকে বহুমাত্রিকভাবে গড়ে তোলে।

এসব চিন্তা কেবল গবেষণাতেই নয়, বিভিন্ন ক্ষেত্রেও সাফল্য আনে। গবেষণামনস্ক একজন মানুষ যা করতে পারেন, অন্যরা তা পারেন না। যারা এখনও গবেষণা শুরুই করেননি- তারা ভাবতে পারেন, একজন মানুষের পক্ষে এত কিছু করা কি সম্ভব? তারা তো কাজের চাপে ভারাক্রান্ত হওয়ার কথা। এতে কাজের কোয়ালিটি নেমে যাওয়ার কথা। এটা তাদের ভুল ও কল্পনাপ্রসূত ধারণা। প্রাচীন ধারণা তাদের মধ্যে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে।

পৃথিবী অনেক এগিয়ে গেছে। আধুনিক গবেষণা থেকে জানা যায়, যারা চিন্তাশক্তি প্রয়োগ করতে পারেন, তারা বহুমাত্রিক হতে পারেন। আমাদের বাঙালি গবেষকরা যেমন বিজ্ঞানচর্চা করে গেছেন তেমনি সাহিত্যচর্চাও করে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্যচর্চা করেছেন।

বিজ্ঞানের চর্চাও তিনি করে গেছেন। অনেকে বলতে পারেন, কীভাবে তিনি বিজ্ঞানচর্চা করেছেন। আমরা জানি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে আলবার্ট আইনস্টাইন, জগদীশ চন্দ্র বসুসহ বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের নিবিড় সম্পর্ক ছিল। রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যের মাধ্যমে তার নিজের ধারণা বিজ্ঞানীদের সঙ্গে আলোচনা করতেন। বিজ্ঞানীরা সেই আলোচনা থেকে অনেক উপাদান সংগ্রহ করে- সেই সূত্রে গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞানের বড় বড় আবিষ্কারগুলো উপহার দিয়েছেন।

এজন্যই সম্ভবত বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু ভাবতে পেরেছেন, উদ্ভিদের প্রাণ আছে। তিনি এটি ভেবে বসে থাকেননি। বরং তিনি ক্রেস্কোগ্রাফের মাধ্যমে প্রমাণ করলেন, উদ্ভিদের প্রাণ আছে। তার গবেষণা প্রবন্ধ ‘Responses in the living and non living’-এর মধ্যেও বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় তিনি বিজ্ঞানের আলোচনাকে সাহিত্যের মতো করে রং-রূপ-গন্ধ দিয়ে সহজভাবে তুলে ধরেছেন।

আরেক বাঙালি গবেষক আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় বিজ্ঞান গবেষণার সঙ্গে সঙ্গে শিল্প-সংস্কৃতির চর্চায়ও মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছেন। সাহিত্যের কল্পনাকে বিজ্ঞানের চিন্তাশক্তিতে রূপান্তরিত করার জন্য তিনি শেক্সপিয়র, কার্লাইল, এমার্সন, ডিকেন্স প্রমুখের রচনা ও বাংলাসাহিত্যের নির্যাস গ্রহণ করেছেন। তার বিভিন্ন রচনায় দেশপ্রেমের বিষয়টিও বিশেষভাবে উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিভিন্ন গবেষকের গবেষণাকর্মের মধ্যেই তাদের বহুমাত্রিক দক্ষতা স্পষ্ট হয়ে উঠে। আমাদের তরুণরাও গবেষণার মাধ্যমে যে কোনো বিষয়ে তাদের দক্ষতা প্রমাণ করতে পারেন। এখনও সাহিত্যের কল্পনা বিজ্ঞানকে দ্রুত এগিয়ে যেতে সহায়তা করছে।

২.

গবেষণার ক্ষেত্রে একক প্রচেষ্টার চেয়ে সম্মিলিত প্রয়াস বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে। কারণ গবেষণা এখন একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের মধ্যে আবদ্ধ নেই। বরং একটি বড় বটবৃক্ষের মতো গবেষণা তার ডালপালা ছড়িয়ে বহুমাত্রিক রূপ লাভ করেছে। আমাদের দেশেও সম্মিলিত গবেষণা প্রচেষ্টাকে প্রাধান্য দিতে হবে। এজন্য দরকার পরিকল্পিত ভাবনা। কেবল ভাবলেই হবে না, এর বাস্তবায়নও ঘটাতে হবে।

কারণ গবেষণার মাধ্যমে আমরা আমাদের দেশকে এগিয়ে নিতে পারি। আমি গবেষণায় আছি, আপনাকেও গবেষণায় চাই- এমন গবেষণা সংস্কৃতি আমাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাক। এভাবেই এক সময় বড় কিছু অর্জন করা সম্ভব হবে।

আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিভিন্ন ধরনের গবেষণায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। এখন আমরা কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়কে একই মানদণ্ডে বিবেচনা করি। কিন্তু এমনটা হওয়ার কথা নয়। কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পার্থক্য হল- কলেজে গবেষণা বা নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি হয় না বললেই চলে। সেসব প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য থাকে শিক্ষা প্রদান করা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভাবনমুখী শিক্ষাদানসহ গবেষণাও করতে হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সব স্তরের শিক্ষার্থীর মধ্যে নতুন কিছু সৃষ্টির প্রেরণা জাগিয়ে তোলা শিক্ষকদের দায়িত্ব। আমাদের দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা বা নতুন জ্ঞান সৃষ্টির দৃষ্টান্ত কম থাকায়- অনেকে বুঝতে পারেন না- কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পার্থক্য কোন জায়গায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদান হল গৌণ; কিন্তু নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি হল মুখ্য। তারপরও কেন এমনটা ঘটছে, তা সবাইকে ভেবে দেখতে হবে। তা না হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ওয়ার্ল্ড র‌্যাংকিংয়ে আসবে না, আমাদের তরুণরা গবেষণাবিমুখ থেকেই যাবে।

অনেকেই বলেন, আমাদের দেশে গবেষণার পরিবেশ নেই। বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। বর্তমান সরকার গবেষণায় অনুদান বাড়িয়েছে। গবেষণাকে সংস্কৃতিতে পরিণত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগিয়ে চলেছে। আবার আমাদের দেশের গবেষকরা বিদেশের বিভিন্ন প্রজেক্টের মাধ্যমেও তাদের গবেষণাকর্ম চালাতে পারেন। গবেষণার জন্য খুব বড় ল্যাবরেটরির প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন গবেষণার মানসিকতা। আলবার্ট আইনস্টাইনের কোনো বড় পরীক্ষাগার ছিল না; কিন্তু তিনটি জিনিস তার ছিল, যা তাকে কিংবদন্তি বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

খুব সাধারণ তিনটি জিনিস- কাগজ, কলম ও চিন্তাশক্তি। আবার আমাদের বাঙালি বিজ্ঞানীরা দেশের মধ্যে বসেই বিশ্বমানের কাজ করেছেন। একটা ছোট ঘরকে কেন্দ্র করে তারা গবেষণা চালিয়ে গেছেন। কোনো প্রতিবন্ধকতা তাদের আটকাতে পারেনি। তারা উন্নত দেশের বিজ্ঞানীদের মতো বড় পরীক্ষাগার পাননি। তারা গবেষণাকে বাণিজ্য হিসেবে গ্রহণ করেননি।

গবেষণা করে কখনও কখনও সমালোচনার শিকার হয়েছেন; কিন্তু থেমে যাননি। তারা সবসময় দেশের কথাও ভেবেছেন। বিজ্ঞানের প্রতি অসীম ভালোবাসার কারণে তারা উন্নত দেশের বিজ্ঞানীদের থেকেও এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন। মাত্র ২৪ বর্গফুটের নিজের কক্ষে বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু একের পর এক গবেষণা করে গেছেন। সারা দিন ক্লাস নেয়ার পরও তিনি নিজের চেষ্টায় অনেক কষ্ট করে অপ্রতুল যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ করেছেন।

আর এ সময় তাকে প্রেরণা দিয়েছেন তার সহধর্মিণী অবলা বসু। তার গবেষণাপত্রগুলো লন্ডনের রয়েল সোসাইটির জার্নালে প্রকাশিত হলে চারদিকে সাড়া পড়ে যায়। ন্যূনতম যন্ত্র ব্যবহার করে ভারতবর্ষের মতো এক দেশে বসে তিনি এত গবেষণা করেছেন যে সেসব দেখে পশ্চিমা বিজ্ঞানীরা অবাক হয়েছেন। তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় ১৮৯৬ সালের মে মাসে তাকে ডিএসসি ডিগ্রি প্রদান করে।

বাঙালিরাও যে বিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে কোনো অংশে কম যান না, বরং সুযোগ পেলে তারা পশ্চিমাদের চেয়েও বেশি দিতে পারেন, তা জগদীশ চন্দ্র বসু চোখে আঙুল দিয়ে সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। লন্ডনের বিখ্যাত ডেইলি এক্সপ্রেস পত্রিকা তাকে গ্যালিলিও-নিউটনের সমকক্ষ বিজ্ঞানী বলে স্বীকৃতি দেন। আর আইনস্টাইনের ভাষ্যমতে,‘জগদীশ চন্দ্র যেসব অমূল্য তথ্য পৃথিবীকে উপহার দিয়েছেন তার যে কোনটির জন্য বিজয়স্তম্ভ স্থাপন করা উচিত।’ আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় বিজ্ঞান কলেজের একটি কক্ষে ছাত্রদের নিয়ে রাত-দিন গবেষণা করে গেছেন। গবেষণা করতে করতে তিনি সংসার করার কথাও ভুলে গেছেন; কিন্তু গবেষণা থেকে একবিন্দু সরে আসেননি।

প্রশ্ন হল, গবেষণায় আমরা কেন পিছিয়ে থাকব? আমাদের দেশে গবেষণা করার মতো যে উপাদান আর সৃষ্টিশীল ভাবনা রয়েছে, তা আর কারও নেই। কোনোভাবেই গবেষণার ক্ষেত্রে আপস করা যাবে না।

আমাদের দেশের গবেষণায় কেবল পুরুষদের নয়, নারীদেরও অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। বড় বড় নারী বিজ্ঞানীর সফলতা তুলে ধরে নারীদের গবেষণায় অনুপ্রাণিত করতে হবে। মারি কুরির নাম আমরা সবাই জানি। তিনি একমাত্র বিজ্ঞানী যিনি রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানে দু’বার নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। রেডিয়াম ও পোলোনিয়াম নামের দুটি মৌল তিনি আবিষ্কার করেন। তিনি বলেছেন, আমাদের সবার মধ্যে ধৈর্যের চর্চা করা উচিত।

ভুলে গেলে চলবে না, স্রষ্টা আমাদের একটি মহৎ উদ্দেশ্যে তৈরি করেছেন। যতক্ষণ না পর্যন্ত সেটি অর্জন করা যাচ্ছে, ততক্ষণ আমাদের ধৈর্য ধারণ করতেই হবে। আমাদের দেশের গবেষণার ক্ষেত্রেও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। তবেই দেশ এগোবে, মানুষ এগোবে।

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

[email protected]