বৈশাখ আসুক স্নিগ্ধতা আর সুন্দর নিয়ে

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ড. এম এ মাননান

আগের মতো আর ধরা দেয় না পহেলা বৈশাখ। ক্ষণে ক্ষণে চরিত্র বদলে যাওয়া প্রকৃতির বৈরী আচরণে চৈত্র মাসেই দেখছি আমরা বর্ষাকাল। বৈশাখ আসার আগেই বৈশাখী ঝড়। মেঘভাঙা বৃষ্টির অঝোর ছোঁয়ায় শীতের পরশ।

আবার পরক্ষণেই বদলে যাওয়া আবহাওয়া তৈরি করছে খরতাপ। অনুভূত হচ্ছে ভ্যাপসা গরম। বিচিত্র আবহাওয়ার বিচিত্র রূপ। কেউ কি আগে দেখেছি চৈত্র মাসে বর্ষাকাল? ঝড়ো হাওয়ার বৈশাখ দেখেছি চৈত্রে। বৈশাখের আগেই কালবৈশাখী। চৈত্রের শেষদিকের দিনগুলোতে আবহাওয়া অফিস প্রায় প্রতিদিনই দিয়েছে কালবৈশাখীর সতর্ক সংকেত।

বৈশাখ বঙ্গাব্দের প্রথম মাস। ১৪ এপ্রিল মানে পহেলা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। প্রথম দিনের উৎসব বাঙালির প্রাণের উৎসব। বৈশাখের আগমনের আগেই বসন্তের শেষবেলায় সোনাপাতি ফুলের মতো চারদিক আলোকিত করা পুষ্পরাজি সোনারঙের সৌন্দর্যের বাহার ছড়ায়। ফুলের গায়ে হলুদের মাখামাখি।

হলুদের আঁচল বিছিয়ে প্রায় বিদায় নিয়েছে গাঁদা। অকাল বর্ষায় এসেছে নয়নাভিরাম সব ফুল। অনেক ফুল সবুজ পাতাগুলোকে ঢেকে দিয়ে জানান দিচ্ছে নিজের আগমন। এরই মধ্যে বিদায় নিল বঙ্গাব্দ ১৪২৫। চ্যানেলগুলো মুখিয়ে আছে ১৪২৬ বঙ্গাব্দকে বরণ করে নেয়ার জন্য। অষ্টমবারের মতো আয়োজিত হবে চ্যানেল আইয়ের ‘হাজার কণ্ঠের বর্ষবরণ’।

বাঙালির জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ পহেলা বৈশাখ। পৃথিবীর যত জায়গায় বাঙালির বসবাস, সেখানেই পালিত হয় পহেলা বৈশাখ। আকুলিত হৃদয়ে প্রথম প্রহরে গেয়ে ওঠে- ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো।’

বৈশাখ থাকাতেই বৈশাখপ্রিয় সরকারের ঘোষিত বৈশাখী ভাতায় বৈশাখের প্রথম দিনটিকে আনন্দময় করে তুলছে সরকারি, আধা-সরকারি চাকরিজীবীদের। বৈশাখী বাতাসে উথালপাতাল শপিংমল আর অনলাইন বিপণিবিতান। শহরের বুটিক হাউস আর মার্কেটগুলোয় পাওয়া যাচ্ছে বৈশাখী রেশ। কাচের চুড়ি, তাঁতের শাড়ি আর শুভ্র পুষ্পের মেলা বসে এখানে-সেখানে। বৈশাখের প্রথম দিনে এগুলোই এনে দেয় বাঙালিয়ানা আর মনে ধরায় রঙের খেলা। আমাদের কালে তরুণীরা সাজত দু’হাত ভরা লাল-নীল রঙের চুড়ি, লাল পেড়ে সাদা শাড়ি আর খোঁপায় গোঁজা বর্ণিল ফুল দিয়ে। বিবাহিত-অবিবাহিত সবাই। ঘুরে বেড়াত এবাড়ি-ওবাড়ি, মার্কেটে, ক্যাম্পাসে। বেড়াতে যেত আপনজন আর বন্ধুবান্ধবদের বাড়িতে। এখন তো শুধু বাধা আর বাধা। ঘুচবে কবে বাধার পাহাড়? কবে হতে পারব আমরা সিঙ্গাপুরের মতো নিরাপদ?

পহেলা বৈশাখ নিয়ে একটু ইতিহাস চর্চা করি। একটা সময় ছিল যখন বঙ্গাব্দ বা বাংলাবর্ষ বলতে কিছুই ছিল না। প্রথমে ‘ফসলি সন’ আর পরে ‘বাংলাবর্ষ’ নামে বঙ্গাব্দ শুরু হয় মোগল সম্রাট আকবরের আমলে। তারই নির্দেশে তৎকালীন মশহুর জ্যোতির্বিজ্ঞানী বাংলাভাষী ফতেউল্লাহ সিরাজি প্রথম বাংলা বর্ষপঞ্জিকা তৈরি করেন। তিনি এটি করেছিলেন সৌর সন আর তখনকার সময়ে প্রচলিত হিজরি সনের ভিত্তিতে। হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে খাজনা আদায় করার রীতি ছিল তখন। সম্রাট যখন দেখলেন চাঁদের ভিত্তিতে হিসাব করা হিজরি সনের কারণে ফসলের মৌসুমভিত্তিক খাজনা আদায়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়, তখনই তিনি নতুন কিছু করার চিন্তা করেন। এ চিন্তারই ফসল বাংলাবর্ষ। সবারই জানা আছে, চাঁদের হিসাবে বছর গণনা করা হলে বছরের হিসাব ১১ দিনের ঝামেলায় পড়ে যায়। ফলে বছর বছর ফসলের মৌসুমের সঙ্গে মাসের হিসাব মিলে না। এতে কৃষক অন্য মৌসুমে খাজনা দিতে পারেন না। এ সমস্যা দূর হয় বাংলাবর্ষ প্রবর্তনের কারণে। সম্রাট আকবরের আমলে প্রবর্তিত হওয়ায় তখন থেকেই বাংলা ভূখণ্ডে নববর্ষ উদযাপন শুরু হয়। পহেলা বৈশাখে একে অপরকে মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করা, তার আগের দিন সব ধরনের খাজনা-শুল্ক পরিশোধ করা, ব্যবসায়ীদের দোকানপাটের হিসাব হালনাগাদের লক্ষ্যে লাল কাপড়ে মোড়ানো হালখাতা লেখার রীতির প্রচলন হয়। কালক্রমে আমাদের সংস্কৃতি আর কৃষ্টির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে বাংলা নববর্ষ আর পহেলা বৈশাখ। গ্রামে গ্রামে একসময় বসত বৈশাখী মেলা। আজও বসে অনেক জায়গায়। তবে মলিন হয়ে যাচ্ছে এ রকম মেলার আবেদন। পশ্চিমা সংস্কৃতি জায়গা করে নিচ্ছে বাঙালির ঐতিহ্যের এ জায়গাটিতে। এখন যতটা ঘটা করে খ্রিস্টীয় নববর্ষ উদযাপন করা হয়, ততটা জাঁকজমক সহকারে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করতে শহরবাসী উৎসাহ পায় বলে মনে হয় না। অথচ বৈশাখী মেলায় আনন্দ-উপকরণ কী না থাকত? ছোটকালে দেখেছি গ্রামবাংলায় পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বৈশাখী মেলায় সমাহার ঘটত কত কিছুর- পুতুল নাচ, হাতিঘোড়ার সার্কাস, বায়োস্কোপ, লাঠিখেলা, পালাগান আর কীর্তনের আসর, নদীতে নৌকাবাইচ আর মাঠে কুস্তিখেলা। দোকান সাজিয়ে বসত মৌসুমি দোকানিরা। এসব দোকানে থাকত নানা রকমের গ্রামীণ জনপদের তৈরি পিঠা, বাচ্চাদের মন কেড়ে নেয়া গুড়ের বাতাসা, কদমা, জিলাপি, সাত রঙের আঁচড়কাটা লেবেনচুস, মুড়কি-মোয়া আর মাটির বাসনকোসন থেকে আরম্ভ করে হরেক রকমের কারুপণ্য। লাল-কালো-নীল-সবুজ তাগা আর বেলোয়ারি রেশমি চুড়ি কিনে নিয়ে অনিন্দ্য হাসিমুখে বাড়ি ফিরত নবীন-প্রবীণ বাবারা। জনারণ্যে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বাবা-চাচা-মামা হাত ধরে শিশুদের নিয়ে যেতেন মেলায় আর হাতে বানানো চড়কিতে উঠিয়ে দিয়ে তাকিয়ে থাকতেন একবুক আদর-ভালোবাসার ঝলক নিয়ে দু’নয়নে। বালকরা যেত নাচতে নাচতে। দশ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদের বারণ করা হতো মেলায় যেতে, দুষ্টু যুবাদের বক্রনজর এড়াতে। তারা করুণ নয়নে তাকিয়ে থাকত ছোট ভাইটির মেলায় যাওয়ার পথের দিকে।

শৈশবে আর প্রথম যৌবনে আমার মতো মানুষ দেখেনি মঙ্গল শোভাযাত্রা, যা বর্তমানে অনুষ্ঠিত হয় নববর্ষের প্রথম দিন। এটি শুরু হয়েছে মাত্র বত্রিশ বছর আগে স্বাধীন বাংলাদেশে। ১৯৮৭ সালে শিল্পী মাহবুব জামাল শামীম আর হিরণ্ময় চন্দের উদ্যোগে হাতিঘোড়া আর পাখপাখালির আদলে তৈরি পুতুল দিয়ে যশোরে শুরু হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রা, এখন অনুষ্ঠিত হয় দেশব্যাপী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটে এর শুরুটা ১৯৮৯ সালের দিকে। তখন আমি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক। সে বছরের পহেলা বৈশাখে চারুকলার কিছু তরুণ শিক্ষার্থীর উদ্যোগে বর্তমানের বৈশাখী চত্বর থেকে শুরু করে মঙ্গল শোভাযাত্রা, যা শাহবাগ হয়ে ঘুরে শেষ হয় একই স্থানে। এখন তো এটি রীতিমতো বিশেষ আকর্ষণীয় জাঁকজমকের অনুষ্ঠান। শুনলাম, এবার নদী বাঁচানোর থিম্কে সামনে রেখে মাছের মুখোশ বানিয়ে পালিত হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা।

পহেলা বৈশাখে আনন্দে উদ্বেলিত হয় পাহাড়ি এলাকা। রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি এবং ময়মনসিংহ ও বৃহত্তর সিলেটের কিছু এলাকার আদিবাসীরা (ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী) উৎসবে মেতে ওঠে বৈশাখের প্রথম দিনে। শুরু হয় দু’দিন আগে, পুরনো বছরকে বিদায় জানিয়ে বছরের প্রথম দিনে বরণ করে তারা নতুন বছরকে। বাংলা নববর্ষ আর চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে পালন করা এ উৎসবের নাম বৈসাবি। ত্রিপুরাদের বৈসুক, মারমাদের সাংগ্রাই আর চাকমাদের বিজু নামক ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয়-সামাজিক উৎসবের নামগুলোর আদ্যাক্ষর নিয়ে গঠিত এ শব্দটি পাহাড়ি এলাকায় এখন সুপরিচিত উৎসবের নাম। আদিবাসীদের তৈরি হরেক রকম পণ্য নিয়ে বসে মেলা, অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর তরুণ-তরুণীরা মেতে ওঠে বিভিন্ন রকমের খেলাধুলায়। সবচেয়ে আকর্ষণীয় মারমাদের আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী ‘পানিখেলা’। শুদ্ধ মনে একে অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে পবিত্র করে নেয় নিজেদের। সিলেটের মণিপুরী জনগোষ্ঠী নিজেদের সংস্কৃতি অনুযায়ী পালন করে পহেলা বৈশাখ।

এ উৎসবকে ঘিরে বাঙালি-পাহাড়ির অতি প্রিয় ইলিশের গায়েও লাগে বৈশাখী ঝড়। হু হু করে বাড়তে থাকে দাম, হয়ে যায় তিন-চারগুণ। চলে যায় সাধারণ ক্রেতাদের সামর্থ্যরে বাইরে। তবুও বাঙালি হাল ছাড়ে না, কিনে নেয় যতটুকু পারে ততটুকু। কদর বাড়ে পান্তা আর বেগুনের। সঙ্গে ইজ্জত বেড়ে যায় মাটির থালা-বাসনের। অরুণোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রমনার বটতলায় বসে বাঙালির প্রিয় ছায়ানটের আসর। সবুজের মায়া হারানো ইট-পাথরের দেয়ালে বন্দি রাজধানীবাসী পরিবার-পরিজন নিয়ে ছুটে আসে একটু ‘আউটিং’-এর আশায়। উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে সবখানে, গ্রামে-গঞ্জে শহরে-বন্দরে।

ঐতিহ্যময় ইতিহাস বাংলা নববর্ষের। যুগের পর যুগ পার হয়ে নববর্ষের প্রথম দিনটির পালনে এসেছে অনেক ভিন্নতা, বহুমুখিতা। বিয়োগ হয়েছে বেশকিছু, যোগ হয়েছে অনেক কিছু। সময়ের বিবর্তনে বদলেছে শহুরে জীবন, অনেক কিছু পাল্টেছে গ্রামীণ জীবনে। বদলের বাঁকে বাঁকে এসছে নতুনত্ব। তবুও পহেলা বৈশাখে বসছে মেলা কোন বটতলায়, নদীর ধারে, হাটের পাশে, হাওর-বিলের প্রান্তে, খেলার মাঠে কিংবা চারণভূমিতে।

বাঙালির রঙিন উৎসব বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে কামনা করি, হে বৈশাখ তুমি এসো স্নিগ্ধতা আর সুন্দর নিয়ে, পুরনোকে ভুলে গিয়ে, আনন্দময় হয়ে, হতাশা বিদায় দিয়ে। এসো স্নিগ্ধ সাজে বাঙালিপনা নিয়ে, লাল আর শুভ্রতার নান্দনিক চমক নিয়ে, পবিত্রতা আর উৎসবের প্রতীক হয়ে। এসো হে বৈশাখ বৈষম্য দূরের প্রত্যয় নিয়ে, আগামীর উজ্জ্বলতা নিয়ে, বৈশাখী শাড়ির আঁচলে একরাশ ভালোবাসা নিয়ে, উজ্জ্বল হৃদয়ে উজ্জ্বল আবেগ নিয়ে, বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার অঙ্গীকার নিয়ে আর সমাজের সব কুসংস্কারের আবর্জনা নিরসনের প্রত্যয় নিয়ে। এসো শুধুই শালীন আর নির্মল আনন্দ সহকারে মঙ্গলের প্রতীক হয়ে।

ড. এম এম মাননান : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট; উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়