দেশপ্রেমের চশমা

ইভিএমে কেন এত আগ্রহ?

  মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার ১৮ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইভিএম

বারবার হোঁচট খেয়েও বর্তমান ইসি ইভিএম প্রেম থেকে সরে আসেনি। এ কমিশন দায়িত্বে আসার পর যেসব নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করেছে, প্রতিটি ক্ষেত্রে কম-বেশি অসুবিধা হয়েছে।

বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করে ইসি ভালো ফল পায়নি। উল্লেখ্য, গত বছর কেসিসি নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহৃত কেন্দ্রগুলোতে ভোট দিতে গিয়ে বারবার চেষ্টা করেও ভোটাররা আঙুলের ছাপ মেলাতে পারেননি।

এজন্য কোনো কোনো ভোটারকে ভোট দেয়ার জন্য বাসায় গিয়ে এনআইডি এনে ভোট দিতে হয়। একই বছর মধ্য জুনে অনুষ্ঠিত গাসিক নির্বাচনে রানী বিলাসমণি স্কুল কেন্দ্রের মহিলা বুথে ইভিএমে ভোটগ্রহণের কারণে ভোটারদের লাইন লম্বা হতে থাকে।

ওই কেন্দ্রের ভোটাররা ইভিএমের বাটনে চাপ না দিয়ে মেশিনের শরীরে চাপ দেয়ায় ইভিএম নষ্ট হয়ে যাওয়ায় নতুন করে ইভিএম আনতে হয় বলে সাংবাদিকরা নির্বাচনী কর্মকর্তাদের কাছে জানতে পারেন।

স্মর্তব্য, এ ইসি ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক সপ্তাহ পর বলেছিল, সংসদ নির্বাচনে কমিশন ইভিএম ব্যবহার করবে না। ১০ জুলাই, ২০১৭ তারিখে ঘোষিত একাদশ সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপেও ইসি সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

তা ছাড়া আরপিও সংস্কার নিয়ে কমিশন যখন রাজনৈতিক দল, সুশীলসমাজ, সাংবাদিক ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সংলাপ করেছিল, তখন সরকারি দল বাদে অন্য সবাই কমিশনকে সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করতে পরামর্শ দিয়েছিল; কিন্তু নিজ ওয়াদা এবং সরকারি দল বাদে বাকি সব অংশীজনের সংলাপে প্রদত্ত পরামর্শ উপেক্ষা করে সরকারি পরামর্শে ইসি কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ২ লাখ টাকা দরে ইভিএম মেশিন ক্রয় করে মাত্র ৬টি সংসদীয় নির্বাচনী এলাকায় (ঢাকা-৬ ও ১৩, চট্টগ্রাম-৯, খুলনা-২, রংপুর-৩ ও সাতক্ষীরা-২) একগুঁয়েমি করে ইভিএমে ভোট অনুষ্ঠানের আয়োজন করে লেজেগোবরে অবস্থা তৈরি করে সমালোচিত হয়।

সংসদ নির্বাচনে আগের রাতে অধিকাংশ আসনে ভোট হয়ে যাওয়ায় ভোটের দিন ভোটারদের মধ্যে ভোটদানের আগ্রহ হ্রাস পায়। তারপরও ইভিএমে ভোট হওয়া ৬টি নির্বাচনী এলাকায় নানাবিধ সমস্যা সৃষ্টি হয়।

যেমন, চট্টগ্রাম-৯ আসনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদালয়ের একজন অধ্যাপক ভোটদানের প্রাথমিক কাজ সেরে কাপড় ঘেরা অংশে ঢুকে পছন্দকৃত প্রার্থীকে মেশিনে ভোট দিতে গিয়ে সেখানে একজন যুবককে দেখে তার সামনে ভোট দিতে আপত্তি করেন। কিন্তু ওই ব্যক্তি ওখান থেকে না সরতে চাইলে তিনি নিবাচনী কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ফল পাননি।

পরে প্রিসাইডিং অফিসার এসে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নিলে তিনি গোপনীয়তা রক্ষা করে ভোট দেন। কিন্তু এ অধ্যাপকের মতো সবাই এভাবে আপত্তি করতে পারেননি এবং কেউ কেউ আপত্তি করলেও তা শোনা হয়নি। ফলে অনেক ভোটারকেই অপরিচিত ব্যক্তির সামনে মেশিনে ভোট দিতে হয়েছে।

তবে অল্পশিক্ষিত এবং বিশেষ করে নারী ভোটাররা ভোট দিতে এলে সহায়তার নামে এ অযাচিত ব্যক্তিরা তাদের নিজ পছন্দমতো মার্কায় ভোটারদের ভোটদানের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

অথচ, সংসদ নির্বাচনের আগে ইসি থেকে বার বার বলা হয়েছিল, যন্ত্রে ভোট হলে জালভোট রোধ, দ্রুত ফলাফল প্রকাশসহ বিভিন্ন সুবিধা পাওয়া যাবে। কিন্তু সংসদ নির্বাচনে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। ভোটগ্রহণ শেষে যেসব নির্বাচনী এলাকায় ইভিএমে ভোট হয়েছিল, সেখান থেকে ফলাফল এসেছে সবচেয়ে পরে।

তাছাড়া অনেক কেন্দ্রে যন্ত্র বিকল হয়ে যাওয়ার কারণে ভোটগ্রহণ শুরু করতে দেরি হয়। আবার কোনো কেন্দ্রে সময়মতো ভোটগ্রহণ শুরু হলেও মাঝপথে যন্ত্র বিকল হয়ে যায়। সংসদ নির্বাচনে যে কারচুপি হয়েছে তা স্বয়ং সিইসি উপজেলা নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে তার বক্তব্যে স্বীকার করেন।

তিনি বলেন, ভোটের আগের রাতে ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্সভর্তি বন্ধ করতে ইভিএম ব্যবহার শুরু করা হবে (যুগান্তর, ০৮.০৩.২০১৯)। সিইসির এ বক্তব্যের মাধ্যমে যারা একাদশ সংসদ নির্বাচনকে ‘মিডনাইট ইলেকশন’ বলে সমালোচনা করেছিলেন, তাদের অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়। প্রযুক্তি অসচেতন ও স্বল্পশিক্ষিত ভোটারের দেশে ইভিএমে ভোট নিতে গেলে এ রকম অনেক ধরনের সমস্যা হয়।

কিন্তু আমাদের ইসির গায়ের চামড়া অনেক মোটা। তারা এসব সমস্যা জানার পরও নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার বিষয়ে যেসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন, তাতে মনে হয় এ ইসি ইভিএম প্রেমে মশগুল।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএমের নেতিবাচক পারফরমেন্সের পর ইসির ইভিএম প্রেম কমেনি। পরবর্তীকালে উপজেলা নির্বাচনে আংশিক ইভিএম ব্যবহারের ক্ষেত্রে এ যন্ত্রের সক্ষমতা বাড়াতে কমিশন ৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪২ হাজার ২০০টি ট্যাব ক্রয় করে।

ইসির বক্তব্য অনুযায়ী এসব ট্যাব ব্যবহার করে ইভিএমের সক্ষমতা বাড়ানো যাবে এবং ভোটকেন্দ্রের ফলাফল দ্রুত পাঠানো সম্ভব হবে। কিন্তু কোনো এক্সপেরিমেন্ট না করে পাঁচ পর্বে অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনের তৃতীয় পর্বের নির্বাচনে দুটি উপজেলার ইভিএমে প্রাপ্ত তথ্য দ্রুত পাঠানোর জন্য প্রিসাইডিং অফিসারদের ইসি ট্যাব দেয়।

কিন্তু ওই ট্যাবগুলো ভুল তথ্য পাঠিয়ে ইসির ট্যাব ব্যবহারের মাধ্যমে ইভিএমের সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেয়। ট্যাবের এ ‘ভুতুড়ে তথ্য’ প্রেরণের ফলে চতুর্থ পর্বের উপজেলা নির্বাচনে আর ইসি ট্যাব ব্যবহার করেনি। প্রশ্ন উঠেছে, ৪৬ কোটি টাকা ব্যয় করে কেন তাহলে ৪২ সহস্রাধিক ট্যাব ক্রয় করা হল?

ইভিএমের এহেন নেতিবাচক পারফরমেন্সের পরও ইসি সম্প্রতি এর ৪৮তম সভায় আগামী বছর অনুষ্ঠেয় তিনটি সিটি (ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম) নির্বাচনসহ সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের অর্ধেক নির্বাচনী আসনে ইভিএমে ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা করেছে।

অবশ্য ইসি সচিব হেলালুদ্দীন বলেছেন, সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার দরকার আছে। এটি ইসি সচিবের কথার কথা। কারণ, এর আগে সরকারি দল বাদে সব দল এবং অংশীজন মিলে ইসিকে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার পরামর্শ দিলেও ইসি তা শুনেছিল কি?

এবারও ইসি সরকার যা চাইবে তাই করবে। সে লক্ষ্য নিয়ে কমিশন ৩,৮২৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের মাধ্যমে দেড় লাখ ইভিএম সংগ্রহ করেছে। এসব দেখে অনেক নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ভাবছেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনে দিনের ভোট রাতে করে যে বিজয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি না করে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের বিজয় ইভিএম ব্যবহার করে অদৃশ্য প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

তা না হলে অনেক প্রযুক্তি সচেতন ভোটারের দেশও যখন ইভিএম থেকে কাগজের ব্যালটে ফিরে এসেছে, তখন বাংলাদেশের মতো প্রযুক্তি অসচেতন ভোটারের দেশের ইসি বারংবার হোঁচট খাওয়ার পরও কেন ইভিএম ব্যবহারের প্রতি এতটা আকর্ষণ দেখাবে?

প্রতিবেশী দেশ ভারতের কথাই ধরা যাক। সরকারি দল বাদে বাকি দলগুলো, বিশেষ করে কংগ্রেস ইভিএমে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোরবিরোধী। ইভিএম হ্যাক করে নির্বাচনী ফলাফল বদলে দিয়ে বিজেপিকে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজয়ী করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইবার বিশেষজ্ঞ সৈয়দ সুজা।

লন্ডনে এক প্রেস কনফারেন্সে তিনি এ বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করে বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে ব্যবহৃত ইভিএম মেশিন হ্যাক করা হয়েছিল। এ তথ্য জানার কারণে নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ পর নয়াদিল্লিতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন বিজেপি নেতা গোপিনাথ মান্ডে।

সিবিআই মান্ডের হত্যাকাণ্ডকে দুর্ঘটনা বললেও জনাব সুজা দাবি করেন, ইভিএম হ্যাকিংয়ের তথ্য জানতেন বলেই মান্ডেকে হত্যা করা হয়। কেবল মান্ডেই না, সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশকেও একই কারণে খুন করার দাবি করা হয়।

অভিযোগ উঠেছে, কেবল লোকসভা নির্বাচনে নয়, ইভিএমে কারচুপি করা হয়েছিল ভারতের উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র এবং গুজরাটের বিধানসভা নির্বাচনেও। কীভাবে ভারতীয় ইসির ব্যবহৃত ইভিএম হ্যাক করা যায় তা বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করে দেখিয়েছেন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সৈয়দ সুজা। অবশ্য বিজেপি সুজার দাবি প্রত্যাখ্যান করে একে কংগ্রেসের ‘হ্যাকিং প্রদর্শনী’ বলে অভিহিত করে।

ভারতীয় নির্বাচন কমিশন এক বিবৃতিতে তাদের ব্যবহৃত ইভিএম হ্যাক করার দাবি প্রত্যাখ্যান করে একে ‘উসকানিমূলক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ অভিহিত করে (মানবজমিন, ২৩.০১.২০১৯)। চলমান ১৭তম লোকসভা নির্বাচনেও ইভিএমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে।

ইতিমধ্যে অন্ধ্রপ্রদেশে ইভিএম ভেঙে ফেলায় জনসেনা পার্টির এক প্রার্থী গ্রেফতার হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারেও ঘটেছে ইভিএম ভাংচুর। রাজ্যের উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ ৮০টি ইভিএমে বিভ্রাট ঘটার অভিযোগ তুলে ওইসব বুথে পুনর্নির্বাচন দাবি করেছেন।

ভারতের মতো প্রযুক্তিজ্ঞানসমৃদ্ধ এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন ভোটারের দেশে যখন ইভিএম নিয়ে এমন বিতর্ক চলমান, তখন তুলনামূলকভাবে প্রযুক্তি অসচেতন বাংলাদেশের মতো দেশের ইসির নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের জন্য অতি আগ্রহ প্রদর্শন রহস্যজনক। স্বচ্ছ ও অবাধ নির্বাচন দেখতে আগ্রহী ভোটারদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করব, আপনারা আর হাজার হাজার কোটি টাকা গচ্চা দেবেন না।

আর ইভিএম বা ট্যাব কেনার দরকার নেই। সরকারি দলের সমর্থন ছাড়া বাকি রাজনৈতিক দল ও অংশীজনের পরামর্শ উপেক্ষা করে যে নির্বাচনেই আপনারা ইভিএম ব্যবহার করেছেন, সেখানেই নেতিবাচক ফলাফল পেয়েছেন।

তারপরও ইভিএমে কী মধু পেয়েছেন যে তার প্রেমে আপনারা এতটা মশগুল? গণতন্ত্র ও দেশপ্রেমিক জনগণের পক্ষ থেকে আপনাদের প্রতি অনুরোধ, আগামী নির্বাচনগুলোকে গ্রহণযোগ্য করতে এবং অদৃশ্য ডিজিটাল কারচুপির বিতর্ক এড়াতে দয়া করে সব নির্বাচনে কাগজের ব্যালটে ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা করুন। অন্যথায় জনগণের কাছে ইসি আস্থাভাজন হতে পারবে না।

ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×