অ্যাসাঞ্জের গ্রেফতার ইতিহাস থেকে সতর্কবার্তা দিচ্ছে

  জন পিলগার ১৮ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অ্যাসাঞ্জ

লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাস থেকে উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে টেনে বের করার দৃশ্য সময়ের একটি প্রতীক। অধিকারের বিপরীতে ক্ষমতা প্রদর্শন। আইনের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ। সাহসের বিরুদ্ধে অশ্লীলতা। ছয়জন পুলিশ অসুস্থ একজন সাংবাদিককে বলপ্রয়োগ করছেন, যখন তার চক্ষুদ্বয় প্রায় সাত বছর পর প্রাকৃতিক আলোতে আসার কারণে কুঁচকে উঠছিল।

এ চরম নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটেছে লন্ডনের কেন্দ্রস্থলে, ম্যাগনা কার্টার ভূমিতে- যেসব মানুষ ‘গণতান্ত্রিক’ সমাজকে ভয় করে তাদের কাছে এটি লজ্জা ও ক্রোধের বিষয়। আন্তর্জাতিক আইনে সুরক্ষাপ্রাপ্ত একজন রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী অ্যাসাঞ্জ। তিনি আশ্রয়প্রার্থী এমন একটি কঠোর চুক্তির আওতায়, ব্রিটেনও যার স্বাক্ষরকারী। ‘ওয়ার্কিং পার্টি অন আরবিট্রেরি ডিটেনশনের’ আইনগত নির্দেশনায় খোদ জাতিসংঘ বিষয়টি স্পষ্ট করেছে।

কিন্তু এতে কার কী আসে যায়। ট্রাম্পের ওয়াশিংটনের দৃশ্যত ফ্যাসিবাদীদের নির্দেশনায় এটি পরিচালিত হয়েছে, ইকুয়েডরের লেনিন মোরেনোর যোগসাজশে, যিনি লাতিন আমেরিকার একজন বিশ্বাসঘাতক ও মিথ্যাবাদী, নিজের দুর্গন্ধযুক্ত সরকারকে আড়াল করার চেষ্টারত। অন্যদিকে ব্রিটিশ এলিট শ্রেণী তার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের সর্বশেষ রাজকীয় মিথটি পরিত্যাগ করেছে।

কল্পনা করুন, লন্ডনের কন্নাট স্কয়ারের কোটি কোটি পাউন্ডের জর্জিয়ান বাড়ি থেকে হাতকড়া পরা অবস্থায় টনি ব্লেয়ারকে টেনে বের করা হচ্ছে দ্য হেগের আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়ায় পাঠানোর জন্য। নুরেমবার্গ স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী ব্লেয়ারের ‘সর্বোচ্চ অপরাধ’ হল কয়েক লাখ ইরাকিকে হত্যা। আর অ্যাসাঞ্জের অপরাধ হল সাংবাদিকতা- লোভীকে জবাবদিহির আওতায় আনা, তাদের মিথ্যাগুলো প্রকাশ করে দেয়া এবং বিশ্বজুড়ে জনগণকে সত্য জানানোর মাধ্যমে ক্ষমতাবান করা।

অ্যাসাঞ্জের দুঃখজনক গ্রেফতার ওইসব মানুষের জন্য একটি সতর্কবার্তা বহন করে, অস্কার ওয়াইল্ডের ভাষায় যারা ‘এমন অসন্তোষের বীজ বপন করেছে, যার অনুপস্থিতিতে সভ্যতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।’ এ সতর্কবার্তা সুনির্দিষ্টভাবে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে।

উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদকের ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, একজন পত্রিকা কর্মী হিসেবে, একজন টেলিভিশন কর্মী হিসেবে, একজন রেডিও কর্মী হিসেবে, এমনকি একজন অনলাইন অডিও প্রচারক হিসেবে আপনার বেলায়ও তা ঘটতে পারে।

অ্যাসাঞ্জকে যন্ত্রণা দেয়া প্রধান মিডিয়া- রাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন সমঝোতাকারী দ্য গার্ডিয়ান- চলতি সপ্তাহে এক সম্পাদকীয়তে নিজের স্নায়ু দুর্বলতা দেখিয়েছে। গার্ডিয়ান অ্যাসাঞ্জ ও উইকিলিকসের কাজকে নিজেদের কাজে ব্যবহার করেছে।

মিডিয়াটির পূর্ববর্তী সম্পাদক উইকিলিকসের কাজকে ‘গত ৩০ বছরের সবচেয়ে বিশেষ তথ্য’ বলে মূল্যায়ন করেছেন। পত্রিকাটি উইকিলিকসের গোপন তথ্য ফাঁসকে ফোকাস থেকে সরিয়ে নিয়েছে এবং দাবি করেছে যে, প্রশংসা ও সম্পদ যা এসেছে তা তাদের মাধ্যমেই এসেছে।

অ্যাসাঞ্জ বা উইকিলিকসের কাছে একটি পয়সাও না পৌঁছালেও প্রতারণার মাধ্যমে প্রণীত গার্ডিয়ানের একটি বই দিয়ে হলিউডের একটি আকর্ষণীয় সিনেমা নির্মিত হয়েছে।

বইটির লেখক- লিউক হার্ডিং ও ডেভিড লেই নিজেদেরকে সোর্সে পরিণত করে গোপনে তাদের (গার্ডিয়ান) দেয়া অ্যাসাঞ্জের পাসওয়ার্ডের অপব্যবহার করেছেন, যে পাসওয়ার্ডটি তৈরি করা হয়েছিল একটি ডিজিটাল ফাইল সুরক্ষার জন্য, যার মধ্যে ছিল মার্কিন দূতাবাসের ফাঁস হওয়া তারবার্তাগুলো।

এখন যখন অ্যাসাঞ্জ ইকুয়েডরের দূতাবাসে আটক, তখন হার্ডিং দূতাবাসের বাইরের পুলিশের সঙ্গে যোগ দিয়ে নিজের ব্লগে সংকীর্ণ আত্মতৃপ্তিতে বলছেন, ‘স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড শেষ হাসি হাসতে পারে।’

তারপর থেকে গার্ডিয়ান অ্যাসাঞ্জ সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে মিথ্যা ছাপিয়ে যাচ্ছে। এমনকি তারা এমন অবিশ্বাস্য দাবি করতেও থামেনি যে, রাশিয়া ও ট্রাম্পের লোক পল ম্যানাফোর্টের একটি গ্রুপ দূতাবাসে অ্যাসাঞ্জের সঙ্গে দেখা করেছে। বাস্তবে এমন সাক্ষাৎ কখনও ঘটেনি, বিষয়টি ছিল মিথ্যা।

কিন্তু সে সুর এখন বদলে গেছে। পত্রিকাটি এখন মত দিয়েছে যে, ‘অ্যাসাঞ্জের মামলা নৈতিকতার জালে জট পাকানো’। ‘তিনি বিশ্বাস করেন এমন বিষয় প্রকাশ করা যাবে, যা প্রকাশ করা উচিত নয়... কিন্তু তিনি (অ্যাসাঞ্জ) এমনসব বিষয়কে আলোর মুখ দেখিয়েছেন যা কখনও গোপন করা উচিত নয়।’

এই ‘এসব বিষয়’ হল এমনসব নরঘাতী পন্থা সংক্রান্ত সত্য, যা আমেরিকা নিজের ঔপনিবেশিক যুদ্ধে ব্যবহার করে থাকে, ঝুঁকির মুখে থাকা মানুষের অধিকারের বিষয়ে ব্রিটিশ বৈদেশিক অফিসের মিথ্যাচার- যেমন- সাগোজ দ্বীপবাসী, মধ্যপ্রাচ্যে জিহাদের উপকারভোগী হিসেবে হিলারি ক্লিনটনের সমর্থন প্রকাশ হয়ে পড়া, সিরিয়া ও ভেনিজুয়েলায় সরকার কীভাবে উৎখাত করা যায়, সে বিষয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূতদের বিস্তারিত বর্ণনা এবং আরও অনেক কিছু। এ সবকিছু উইকিলিকস ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়।

গার্ডিয়ানের নার্ভাস হওয়ার কারণ বোধগম্য। গোপন পুলিশ এরই মধ্যে পত্রিকাটি পরিদর্শন করেছে এবং একটি হার্ডড্রাইভ ধ্বংস করার আলামত পেয়েছে বলে দাবি করেছে। এর উপরই পত্রিকাটি গঠিত হয়েছে।

১৯৮৩ সালে, বিদেশ দফতরের একজন ক্লার্ক- সারাহ টিসডাল ব্রিটিশ সরকারি নথি ফাঁস করেছিলেন, যাতে তথ্য ছিল মার্কিন পরমাণু অস্ত্রবাহী জাহাজ ইউরোপে পৌঁছবে। গার্ডিয়ান তখন প্রশংসার বানে ভেসে গিয়েছিল।

যখন আদালতের একটি আদেশে তথ্যের সূত্র সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তখন সোর্সকে রক্ষার মৌলিক মূলনীতি অনুযায়ী সম্পাদক জেলে যাওয়ার পরিবর্তে টিসডালের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন।

ফলে তাকে বিচারের মুখোমুখি এবং ছয় মাস জেল খাটতে হয়েছিল। গার্ডিয়ান যাকে ‘সত্য বিষয়’ অভিহিত করে প্রকাশ করেছে, সেগুলো প্রকাশের জন্য যদি অ্যাসাঞ্জকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যার্পণ করা হয়, তাহলে কোন জিনিসটি বর্তমান সম্পাদক ক্যাথেরিন ভাইনারকে পূর্ববর্তী সম্পাদক অ্যালান রুসব্রিজার বা প্রপাগান্ডা ছড়ানো লিউক হার্ডিংকে অনুসরণ করা থেকে বিরত রাখবে?

নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াশিংটন পোস্টের সম্পাদকই বা কীভাবে রেহাই পাবেন- যারা সত্যের নানা ক্ষুদ্রকণা প্রকাশ করেছেন উইকিলিকসে প্রকাশিত বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। অন্য সম্পাদকদেরই বা কী হবে, যাদের তালিকা অতি দীর্ঘ?

নিউইয়র্ক টাইমসের শীর্ষ আইনজীবী ডেভিড ম্যাকক্রো লিখেছেন, ‘আমি মনে করি, অ্যাসাঞ্জের বিচার প্রকাশকদের জন্য খুবই বাজে একটি নজির হতে পারে... সবকিছু থেকে আমি জানি তিনি একজন ক্লাসিক প্রকাশকের ভূমিকা নিয়েছিলেন এবং নিউইয়র্ক টাইমস ও উইকিলিকসের মাঝে পার্থক্য দেখানোর জন্য আইনকে কঠিন সময় ব্যয় করতে হবে।’

এমনকি যদি উইকিলিকসের প্রকাশ করা গোপন তথ্য প্রকাশের দায়ে প্রকাশকদের মার্কিন গ্রান্ড জুরি নাও তলব করে, তারপরও জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ও চেলসি ম্যানিংকে ভয় দেখানোটা যথেষ্ট হবে। প্রকৃত সাংবাদিকতাকে দোষী সাব্যস্ত করা হচ্ছে খোলা দৃষ্টির ঠগবাজির মাধ্যমে। ভিন্নমত হয়ে যাচ্ছে অপরাধী।

অস্ট্রেলিয়ায় বর্তমানে আমেরিকা-আচ্ছন্ন সরকার দু’জন গোপন তথ্যদাতার বিচার করছে, যারা পূর্ব তিমুরের নতুন সরকারের ক্যানবেরায় ভুতুড়ে মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকের খবর ফাঁস করেছিল।

ওই বৈঠকের মূল বিষয় ছিল তিমুর সাগরের তেল-গ্যাস সম্পদ থেকে ছোট্ট দেশটির প্রকৃত অংশ থেকে তাদের বঞ্চিত করা। তাদের বিচার গোপনে অনুষ্ঠিত হবে।

প্রকৃত সাংবাদিকতা এসব সম্মানহানিকর বিষয়ের শত্রু। এক দশক আগে লন্ডনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় একটি গোপন নথি তৈরি করেছিল, যাতে জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের ‘মূল হুমকি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল- সন্ত্রাসী, রাশিয়ান গোয়েন্দা ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে। সর্বশেষটিকে ধরা হয়েছিল বড় হুমকি হিসেবে।

এ নথিটিও উইকিলিকসের হাতে ফাঁস হয় এবং ওয়েবসাইটটি এটি প্রকাশ করে। অ্যাসাঞ্জ আমাকে বলেছিলেন, ‘আমাদের কোনো বিকল্প ছিল না। এটি একেবারেই স্বাভাবিক। মানুষের জানার অধিকার আছে এবং প্রশ্ন করার অধিকার আছে এবং ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার অধিকার আছে। এটাই হচ্ছে সত্যিকারের গণতন্ত্র।’

যদি অ্যাসাঞ্জ, ম্যানিং ও অন্যরা জাগিয়ে তোলার পরও অন্যরা চুপ থাকে, তবে কী হবে এবং ‘জানার ও প্রশ্ন করার এবং চ্যালেঞ্জ করার’ অধিকার যদি কেড়ে নেয়া হয়?

১৯৭০-এর দশকে অ্যাডলফ হিটলারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, যার চলচ্চিত্রের কল্যাণে জার্মানির ওপর নাৎসি অমঙ্গলের বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল, সেই লেনি রেইফেন্সটাহলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি আমি।

তিনি আমাকে বলেছিলেন, তার সিনেমায় যে বার্তা, প্রপাগান্ডা ছিল তা ‘উপরের আদেশে’র ওপর নির্ভর করছিল না; কিন্তু তা যার ওপর নির্ভর করেছিল তাকে তিনি বলেছিলেন জনগণের ‘আনুগত্যহীনতা’।

তাকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এই আনুগত্যহীনতার মধ্যে কি উদার, শিক্ষিত বুর্জোয়ারাও অন্তর্ভুক্ত?’ জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘অবশ্যই, বিশেষত যখন বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়... যখন মানুষ আর সিরিয়াস প্রশ্ন করে না, তারা তখন অনুগত ও নমনীয়। তখন যে কোনো কিছুই ঘটতে পারে।’

এবং ঘটেছে।

বাকিটা, তিনি সম্ভবত যোগ করেছিলেন, ইতিহাসে।

কাউন্টারপাঞ্চ ডটকম থেকে ভাষান্তর : সাইফুল ইসলাম

জন পিলগার : লন্ডনভিত্তিক অস্ট্রেলিয়ান সাংবাদিক

ঘটনাপ্রবাহ : উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×