মিঠে কড়া সংলাপ

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি খোলা চিঠি

  মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন ২০ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি খোলা চিঠি
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফাইল ছবি

বায়ুদূষণে ঢাকা পৃথিবীর দ্বিতীয় নিকৃষ্টতম রাজধানী নগরী। আর সেই নগরীতে আমরা প্রায় দুই কোটি লোক বসবাস করি। অথচ এ বিষয়ে আমাদের বা সরকারের তেমন কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না।

কারণ সরকারের কাজকর্ম দ্বারা তেমনটি প্রমাণ হয় না। সরকার এখনও রাজধানী শহরের এই অপ্রশস্ত ও সংকীর্ণ স্থানটুকুর মধ্যেই গাদাগাদি-ঠাসাঠাসি করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে। বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করে ঢাকার বাদবাকি আকাশটুকুও ঢেকে দিতে চাচ্ছে। লাখ লাখ পুরনো গাড়ি বা যানবাহনের সঙ্গে প্রতিদিন শত শত নতুন ইঞ্জিনচালিত যানবাহনকে রাস্তায় চলার অনুমতি প্রদান করছে।

একশ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মী রুটপারমিট বাণিজ্যের মাধ্যমে রাস্তাঘাটে এমন পরিবেশ-পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন যে, ঢাকা শহরে একজন নাগরিকের পা ফেলার জায়গাটুকুও অবশিষ্ট নেই। অপরিকল্পিতভাবে অবকাঠামো নির্মাণ করে রাস্তাঘাটে যানবাহন চলাচলের অনুমতি-অনুমোদন দিয়ে রাজধানীকে নরককুণ্ডে পরিণত করে ফেলা হয়েছে। আর এতদসত্ত্বেও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে সরকারের তরফ থেকে রাজধানীকে একটু নড়ানো-সরানোর কোনো তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে না।

ইদানীং ঘোষণা করা হয়েছে, বর্তমান সচিবালয়ের মধ্যেই আরও বহুতল (টাওয়ার) ভবন নির্মাণ করা হবে। অর্থাৎ এ ঘিঞ্জি পরিবেশের মধ্যেই সরকারি ভবনগুলোর সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখা হবে; রাজধানী শহরটিকে কংক্রিটের আবর্জনায় ভরে ফেলা হবে। অথচ পাকিস্তানের রাজধানী করাচি থেকে একবার রাওয়ালপিণ্ডিতে স্থানান্তর করে ইতিমধ্যে তা ইসলামাবাদে সরিয়ে নেয়া হয়েছে এবং ইসলামাবাদ এখন পৃথিবীর অন্যতম একটি সুন্দর, পরিবেশবান্ধব ও দৃষ্টিনন্দন রাজধানী শহর।

আর আমরা অন্য প্রায় সব দিক থেকেই পাকিস্তান অপেক্ষা এগিয়ে গেলেও একটি দূষিত রাজধানী শহর নিয়ে পড়ে আছি। কেন জানি এ অপ্রশস্ত সংকীর্ণ জায়গাটুকুর মায়াজাল ছিন্ন করে বের হতে পারছি না।

যেখানে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে ভিড় বা যানজট বলতে কিছুই নেই বা ছিল না, তবুও সেদেশটি তাদের রাজধানী খানিকটা দূরে পুত্রজায়ায় সরিয়ে নিয়েছে, সেখানে আমরা কেন রাজধানীকে একটু দূরে সরানোর চেষ্টা করছি না- সে বিষয়টিও বোধগম্য নয়।

সবকিছু দেখেশুনে মনে হচ্ছে, এ বিষয়ে কারও কোনো চিন্তাভাবনা, আগ্রহ কোনো কিছুই নেই। এ অপ্রশস্ত জায়গাটুকুর মধ্যেই যেন অবিশ্বাস্যভাবে আমাদের ধুঁকে ধুঁকে মরতে হবে! অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ অনুযায়ী শুধু বায়ুদূষণই পৃথিবীর শতকরা ২৮ জন মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী। আর আমরা ঢাকা শহরের বাসিন্দারা সেই বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে পৃথিবীর দ্বিতীয় নিকৃষ্টতম শহরে বসবাস করছি।

প্রিয় পাঠক, যাদের ঘরে এসি, গাড়িতে এসি এবং যারা রাস্তাঘাটের খোলা স্থানে বের হোন না, বা বের হতে হয় না, তাদের কথা বাদ দিলে ঢাকা শহরের বাদবাকি মানুষকে যে বিষাক্ত পরিবেশের মধ্যে দিনরাত চলাচল ও বসবাস করতে হচ্ছে সে কথাটি একটু ভালোভাবে বুঝিয়ে দিতে এবং যারা দেশ চালান কথাটি তাদের কানে তুলে দিতেই আজকের লেখাটির অবতারণা। আর সেক্ষেত্রে এটি একটি ব্যর্থ প্রয়াসও হতে পারে।

তবুও কাজটি করতে হবে ভেবেই লেখাটিতে হাত দিয়েছি এবং একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের কর্ণধারকে উদ্দেশ করেই তা লিখছি। কারণ রাজধানী ঢাকাকে স্থানান্তর না করার ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে কেউ তেমন করে ভাবছেন কিনা সে বিষয়ে আমার মনে যথেষ্ট সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।

রাজধানী ঢাকাকে সরিয়ে দূরের একটু খোলা স্থানে না নিয়ে গেলে যে বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউয়ের মতো স্থানে দশতলা ভবনের অনুমতি নিয়ে বারো তলা, বিশতলার অনুমোদন নিয়ে পঁচিশ তলা করার প্রবণতাও থামানো যাবে না, সে কথাও বুঝি কেউ ভেবে দেখছেন না অথবা মাথাপিছু পৃথিবীর সবচেয়ে ভূমি স্বল্পতার দেশে এমনটি ঘটাও যে অস্বাভাবিক কিছু নয়, সে বিষয়টিও কেউ ভেবে দেখার ফুরসত পাচ্ছেন না।

কারণ অভাবে স্বভাব নষ্ট বলেও একটা কথা আছে। আর বিষয়টি নিয়মানুগ ও সমর্থনযোগ্য না হওয়া সত্ত্বেও গাদাগাদি-ঠাসাঠাসির এ শহরে ভবন সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে আনুভূমিক সম্প্রসারণের সুযোগ না থাকায় ভূমি স্বল্পতার জন্য এভাবে উল্লম্ব (খাড়া) সম্প্রসারণ করা হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা করা হচ্ছে বিধিবিধান না মেনেই।

রাস্তাঘাটের ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটে চলেছে। ঢাকায় যথেষ্ট পরিমাণ রাস্তাঘাট না থাকাতেও সরকার প্রতিদিন শত শত নতুন গাড়ির রেজিস্ট্রেশন দিয়ে চলেছে, আর এসব কার-বাসসহ অন্যান্য যানবাহন ঢাকার রাস্তার সবটুকুই ঢেকে ফেলেছে।

রাস্তার সবটুকুই দখল করে তারা তাদের নৈরাজ্য অব্যাহত রেখেছে। ফলে প্রতিদিন অসংখ্য দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে, প্রাণহানি হচ্ছে। আর আনুপাতিক হারে রাস্তাঘাটের পরিমাণের অতি স্বল্পতাই হল এসব ঘটনার মূল কারণ। তাই শত বছরের পুরনো ঢাকা শহরকে ঢাকার মতো রেখে বর্তমান রাজধানী ঢাকাকে কিছুটা হলেও দূরে সরানো এখন সময়ের দাবি বলেই প্রমাণিত।

আর বর্তমানে এ দাবি উপেক্ষা করা একটি আত্মঘাতী কাজ হিসেবে প্রমাণিত হবে। দেশের যারা নীতিনির্ধারক তাদের কাছে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে তাই বলতে চাই, আপনারাও বিষয়টি নিয়ে একটু ভেবে দেখুন। ভেবে দেখুন সাধারণ মানুষের মতো আপনাদেরও যদি ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে হতো, রাস্তায় চলতে হতো, তাহলে সুস্থভাবে ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা থাকত কিনা। দিনে-রাতে ঢাকা শহরে এই যে, সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে, এজন্য শুধু গাড়িচালক, পথচারীরাই দায়ী, নাকি ঢাকার ঘিঞ্জি পরিবেশও দায়ী সে বিষয়টি ভেবে দেখার সময়ও বোধহয় পার হয়ে যাচ্ছে।

অতএব এসব বিষয় বিবেচনা না করে শুধু বনানী বা অন্যান্য এলাকার ভবনগুলোর ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের দিকে তাকিয়ে থাকলে, বা ওইসব ভবনের বর্ধিতাংশ ভেঙে দিলেই যে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে এমনটিও কিন্তু নয়। ওইসব অননুমোদিত ভবন ভাংচুর-অপসারণের পাশাপাশি বিষয়টির স্থায়ী সমাধানকল্পে রাজধানীকে অবশ্যই বর্তমান স্থান থেকে একটু খোলামেলা জায়গায়, একটু মুক্ত পরিবেশে নিয়ে যেতে হবে- যেখানে জায়গার অভাবে ঠাসাঠাসি করে ভবন নির্মাণ করতে গিয়ে আইনভঙ্গ করার প্রবণতা থাকবে না।

অর্থাৎ ধনাঢ্য ব্যক্তি বা শিল্পপতিরা প্রয়োজনীয় জায়গা বরাদ্দ পেলে, নতুন বাণিজ্যিক এলাকা গড়ে তোলার সুযোগ পেলে, একটু মুক্ত পরিবেশে সুন্দর আবাসিক এলাকায় বসবাসের সুযোগ পেলে অবশ্যই নিয়মভঙ্গ করে বাণিজ্যিক বা আবাসিক ভবনকে বর্ধিত করার প্রবণতা কমবে। কারণ এসব ভবন নির্মাণের আর্থিক ক্ষমতা আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেলেও শুধু ভূমি স্বল্পতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।

আর এ ভূমি স্বল্পতার সমাধান না হলে এ সমস্যা কিন্তু থেকেই যাবে। কারণ আগেই বলা হয়েছে, অভাবে স্বভাব নষ্ট। এ বিষয়ে আমার সঙ্গে অনেকে একমত না হলেও হতে পারেন। তবে রাজধানী ঢাকা শহরকে বর্তমান স্থানে রেখে শত শত ঘরবাড়ি ভাঙলেও কিন্তু এ সমস্যার সমাধান হবে না। যদি তাই হতো, তাহলে এক-এগারোর সরকারও এ বিষয়ে কম চেষ্টা করেনি, বুলডোজার দিয়ে কম মানুষের ঘরবাড়ি ভাংচুর করেনি; কিন্তু ফল হয়েছে শূন্য। মাঝখানে তাদের প্রতি জনগণ বিতৃষ্ণ হয়েছেন।

যাক সে কথা। এসব বলতে গিয়ে আমি কোনো অন্যায় কাজ বা অননুমোদিত অবকাঠামোর প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করতে চাইনি। বাস্তবতাকে পাশ না কাটাতেই দু-একটি কথা বলতে হয়েছে মাত্র। আমি যা বলতে চেয়েছি তা হল, আগামী দশ বছরের পরিকল্পনাতে হলেও দেশ ও জাতিকে একটি নতুন রাজধানী উপহার দেয়া উচিত এবং তা বর্তমান ঢাকার আশপাশেই হওয়া উচিত। কারণ বর্তমান ঢাকা গ্যাস চেম্বারে পরিণত হয়েছে বিধায় রাজধানীকে একটু দূরে সরাতেই হবে। আর আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ঘটায় এ কাজটি করাও সম্ভব।

আমার আজকের লেখাটি তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি হিসেবে উপস্থাপন করে অপেক্ষায় রইলাম। আশা করি, তিনি দেশ ও জাতিকে একটি নতুন রাজধানী উপহার দেবেন।

মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×