কমাতে হবে রাজনৈতিক প্রকল্প

  সাজ্জাদ আলম খান ২০ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কমাতে হবে রাজনৈতিক প্রকল্প
কমাতে হবে রাজনৈতিক প্রকল্প

জুন সিনড্রম; দেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে এ সিনড্রমের অবস্থান অপ্রতিরোধ্য। পর্যালোচনা, কাঠামোগত পরিবর্তন, নীতিনির্ধারকদের নির্দেশনা, আগাম পদক্ষেপ, প্রকল্প পরিচালকদের দৃঢ় প্রত্যয়- কোনো কিছুই এ সিনড্রম উত্তরণে ভূমিকা রাখতে পারছে না। আর এতে অর্থের গুণগত ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

জাতীয় বাজেট বাস্তবায়নের হার ক্রমান্বয়ে কমছে। বরাদ্দকৃত অর্থসংশ্লিষ্ট অনেক প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো ব্যয় করতে পারে না। ফলে জাতীয় উন্নয়নে নেয়া প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় ধীরগতিতে। বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ের মান বাড়ানোর বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

বছর বছর বাড়ছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার। তবে বাড়ানো যাচ্ছে না বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যবহারের সক্ষমতা। তাই অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এডিপি বাস্তবায়ন চিত্র থাকে হতাশাজনক। অবশ্য বছর শেষে জুনে তড়িঘড়ি করে দেখানো হয় উন্নয়ন ব্যয়। এ চিত্র প্রতি বছরের এবং বহুকাল ধরেই চলে আসছে। নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট প্রকল্পে মূল কাজ শুরু করতেই চলে যায় দেড় বছর।

বলা হয়, প্রকল্প অনুমোদনের পর সমীক্ষা, ভূমি অধিগ্রহণ, পরামর্শক ও বিশেষজ্ঞ নিয়োগসহ পূর্ত কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে এ সময় লাগে। যদিও সরকারের কাছে আছে ‘প্রকল্পের প্রস্তুতিমূলক কাজের অর্থ বরাদ্দ ও ব্যবস্থাপনা নীতিমালা’ এবং ‘প্রকল্পের প্রস্তুতি কাজের চেকলিস্ট’।

নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিয়ে নতুন বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি তৈরির কাজ শুরু করেছে পরিকল্পনা কমিশন। কিন্তু অন্যবারের মতো বরাদ্দহীনভাবে অননুমোদিত নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি এবারও নিশ্চিত করা হবে। নতুন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার কথা বলছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে, চলমান সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার শেষ বছর, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এবং নির্বাচনী ইশতেহার।

এবার অবশ্য এডিপিতে বরাদ্দহীন নতুন প্রকল্প যুক্ত করার ক্ষেত্রে বৈষম্য হ্রাস, দারিদ্র্য নিরসনসহ বিভিন্ন বিষয় রাখতে হবে। অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন, এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, নদীভাঙন-জলাবদ্ধতা রোধে ড্রেজিং, নদীশাসন ও রক্ষণাবেক্ষণের লক্ষ্যে পরিবেশ ও প্রতিবেশের বিষয়টি বিবেচনায় রাখার কথা বলা হচ্ছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন কিছুটা বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে ৪৭ দশমিক ২৪ শতাংশ। অর্থাৎ লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিন মাসে ব্যয় করতে হবে ৫২ শতাংশেরও বেশি অর্থ। ৯ মাসে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো খরচ করতে পেরেছে ৮৩ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা।

চলতি অর্থবছরে মূল এডিপি থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা কাটছাঁট করে সম্প্রতি সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। মূল এডিপির আকার ছিল ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। এক্ষেত্রে বৈদেশিক সহায়তা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে ৯ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে সরকারি তহবিল থেকে এক হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে দেয়া হয়।

প্রকল্প পরিচালকদের অদক্ষতা ও গাফিলতিতে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বেহাল দশা। অধিকাংশ প্রকল্প পরিচালক থাকেন ঢাকায়, ফলে প্রকল্পের তদারকি সঠিকভাবে হচ্ছে না। এছাড়া এক ব্যক্তি একাধিক প্রকল্পের দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি সিলেট অঞ্চলের প্রকল্প পর্যালোচনা সভায় পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান হতাশা প্রকাশ করেছেন। প্রকল্প পরিচালকদের লাখ লাখ টাকা দামের গাড়ি দেয়া হয় হাওরে ঘুরে বেড়ানোর জন্য।

তিনি জানতে পারেন সেই গাড়িতে চড়ে গুলশান-বনানী ঘুরে বেড়াচ্ছেন প্রকল্প পরিচালক। তার প্রশ্ন, তাহলে কেমন করে প্রকল্প বাস্তবায়ন বৃদ্ধি পাবে? আর এর সুফল যথাসময়ে পাবে জনসাধারণ? জনগণের টাকায় গাড়ি কেনা হচ্ছে, সেই গাড়ি থাকছে ঢাকায়; কিন্তু কাজ গ্রামে। নিয়ম অনুযায়ী ৫০ কোটি টাকা বেশি ব্যয়ের একটি প্রকল্পে একজন প্রকল্প পরিচালক থাকার কথা; কিন্তু দেখা যাচ্ছে আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের ৫ প্রকল্পের দায়িত্বে আছেন মাত্র একজন।

এডিপিতে রাজনৈতিক বিবেচনায় আনা প্রকল্পের লাগাম টেনে ধরা উচিত। সান্ত্বনামূলক এসব প্রকল্পের হয়তো ভিত্তি স্থাপন করা হয়; কিন্তু কাজ হয় না। বছর শেষে শুধু উদ্বোধনী নামফলক থাকে। একসময় তা-ও উপড়ে ফেলে স্থানীয় মানুষ। একবার বলা হল, অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের বাসভবন বানিয়ে দেয়া হবে। প্রকল্প পাস হল ২০১৭ সালে। খরচ ধরা হয়েছে ২ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও কোনো খরচ হয়নি।

চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ মাত্র এক লাখ টাকা। এখন পর্যন্ত এ প্রকল্পে এক টাকাও খরচ হয়নি। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ৫৫টি প্রকল্প মাত্র এক লাখ টাকা করে বরাদ্দ দিয়ে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে আছে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ, সেতু তৈরি, সড়ক উন্নয়ন, রেলপথ ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। এসব এলাকায় আশা জাগিয়ে রাখার চেষ্টা চলে মাত্র।

এসব প্রকল্প নেয়া হয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। এজন্য প্রকল্পগুলোকে নামমাত্র বরাদ্দ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়। প্রতি বছরই এডিপিতে নতুন নতুন প্রকল্প পাস করা হয়। ঢুকে পড়া এসব প্রকল্পে বরাদ্দ দিতে হয়; আবার পুরনো প্রকল্পগুলোতেও বরাদ্দ দিতে হয়। গত ১০ বছরে এডিপিতে প্রকল্পের সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এডিপিতে বাড়ে প্রকল্পের সংখ্যা। ফলে এডিপির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় এক ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।

এডিপিতে শূন্য বাস্তবায়নের প্রকল্পের সংখ্যাও কম নয়। বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের প্রতিবেদন বলছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯০টি প্রকল্পে কোনো টাকা খরচ হয়নি। পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিতে না পারায় প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেয়া সম্ভব হয়নি।

শুধু হারের দিক থেকে এডিপি বাস্তবায়ন করে হয়তো গোষ্ঠীস্বার্থ উদ্ধার করা যেতে পারে; কিন্তু জনস্বার্থকে সুরক্ষা দেয়া সম্ভব নয়। জনগণের কষ্টার্জিত অর্থের গুণগত ব্যয় নিশ্চিত করার দায়িত্ব জনপ্রতিনিধিদের। এখন প্রয়োজন মানসম্মত ও নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্পের বাস্তবায়ন এবং নির্দিষ্ট ব্যয়ের মধ্যে বাস্তবায়ন।

এ তিনটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। গভীর সমুদ্রে বড় জাহাজ থেকে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে জ্বালানি তেল সরবরাহের জন্য সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয় কয়েক বছর আগে। কিন্তু নকশায় ত্রুটির কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের শুরুতেই হোঁচট খায়। আবার নতুন করে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করে নকশা তৈরি করা হয়। সময়ক্ষেপণ ও অন্যান্য কারণে প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৫ গুণ।

প্রথমে ব্যয় ধরা হয়েছিল এক হাজার কোটি টাকা। পরে ধরা হয়েছে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। শুধু সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং নয়, চলমান বেশকিছু বড় প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাস্তবায়ন পিছিয়ে যাচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে। আর বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হওয়ায় জনগণের ঘাড়ে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। অনেক সময় দেখা যায়, বাস্তবায়ন জটিলতায় পিছিয়ে যায় অর্থায়ন সংস্থা। নতুন করে খুঁজতে হয় বহুজাতিক সংস্থা। নকশায় পরিবর্তনের কারণে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার তৈরিতে ব্যয় বেড়েছে।

এফডিসি গেটের পরিবর্তে সোনারগাঁও হোটেল পর্যন্ত বাড়তি ৪৫০ মিটার ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকল্পটির মূল ব্যয় ছিল ৭৭২ কোটি টাকা, এরপর আরও ৪৪৬ কোটি টাকা বাড়ানোর ফলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ১ হাজার ২১৯ কোটি টাকা।

একই সঙ্গে বাস্তবায়নের সময় দুই বছর বাড়িয়ে দেয়া হয়। এতে প্রকল্পের সুফলও মেলে বিলম্বে। ভূমি অধিগ্রহণে দেরি, দরপত্র জটিলতা, প্রকল্প পরিচালকের অদক্ষতা, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের অবহেলাসহ বেশকিছু কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অনেক প্রকল্পের বাস্তবায়ন চলছে ধীরগতিতে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ জরুরি।

সাজ্জাদ আলম খান : অর্থনীতি বিশ্লেষক

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×