বিএনপিকে ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে

প্রকাশ : ১১ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মো. মইনুল ইসলাম

সম্প্রতি ছয়জন নির্বাচিত সংসদ সদস্যের শপথ গ্রহণের ব্যাপারে বিএনপি যে নাটকের অবতারণা করেছে, সে বিষয়ে কিছু আলোচনাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য। তার আগে ঘটনাপ্রবাহের একটি সংক্ষিপ্ত প্রেক্ষাপটও তুলে ধরার প্রয়াস এখানে আছে।

শুরুতেই বলা ভালো, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিএনপি নেতৃত্বের মুখ্য অভিযোগ ছিল, দেশে গণতন্ত্র নেই। একই অভিযোগ পরবর্তী দুটো নির্বাচনের পরও ক্রমাগত করে যাচ্ছে। মূলত তাদের অভিযোগটি ছিল নির্বাচনের সুষ্ঠুতা এবং সত্যতা নিয়ে। কারণ নির্বাচন গণতন্ত্রের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

তবে একমাত্র নির্বাচনই গণতন্ত্রের জন্য যথেষ্ট নয়। তার জন্য আরও দরকার আইনের শাসনসহ সুশাসন এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ন। যাহোক, ২০১৩ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত এ নির্বাচন নিয়ে তারা কম জল ঘোলা করেনি। দেশব্যাপী হরতাল, অবরোধ এবং অগ্নিসন্ত্রাসের মাধ্যমে জনজীবনে এক মহাদুর্যোগের সৃষ্টি করেছিল।

২০১৪ সালে নির্বাচন বানচালের মানসে তারা পেট্রলবোমা নিক্ষেপ, অগ্নিসংযোগ এবং হাজার হাজার গাছ কেটে রাজপথ অবরোধ করে। তাছাড়া ভোটকেন্দ্র স্থাপনের কারণে প্রায় ৫০০ স্কুলগৃহ পুড়িয়ে দেয়।

২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে টানা ৯৩ দিন গণতন্ত্র হত্যার বর্ষপূর্তি পালনের নামে বিএনপি-জামায়াতের অগ্নিসন্ত্রাসে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ অগ্নিদগ্ধ হয়। এর মধ্যে অন্তত ২৫০ জন মানুষ মারা যায়। অবশিষ্ট অগ্নিদগ¬দের অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। তখন মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে পোড়া মানুষের স্থান সংকুলান হচ্ছিল না।

আর সে কারণেই মনে হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পোড়া রোগীদের জন্য একটি বড় ধরনের পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল স্থাপনের কথা ভাবেন, যা এখন ঢাকা মেডিকেলের পূর্বপাশে গড়ে উঠেছে। এটাও দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করা গেল, এসব অগ্নিদগ্ধ যন্ত্রণাকাতর মানুষকে দেখতে খালেদা জিয়া একবারও হাসপাতালে গেলেন না।

সে সময়ের দুটো ঘটনা আমাদের মনে বড় ধরনের নাড়া দিয়েছিল। একটি হল, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে যাত্রীবাহী একটি বাসে বোমা নিক্ষেপের ফলে ৮ জন মানুষের পুড়ে মরার ঘটনা। তার মধ্যে ২ জন ছিলেন পিতা ও কন্যা। কন্যার বেজায় শখ ছিল সমুদ্রদর্শনের। সে শখ পূরণের মানসে পিতা কন্যাকে নিয়ে যশোর থেকে কক্সবাজার গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফেরার পথে বাসটি বোমা হামলার শিকার হয় এবং এর সঙ্গে অবসান ঘটে পিতা ও কন্যার জীবন।

অন্য ঘটনাটি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের এক হতদরিদ্র মানুষের; সে রাতের বাসে ঢাকা রওনা হয়েছিল জীবিকার সন্ধানে। ঘরে ছিল মাত্র ৫-৭ দিনের খাবার। স্ত্রী-সন্তানকে বলে এসেছিল, রাজধানীতে আসার পর কিছু রোজগার হলেই বাড়িতে টাকা পাঠাবে। তার আয়-রোজগার আর হয়নি। রংপুরের মিঠাপুকুরের কাছে রাতে পেট্রলবোমার শিকার হয়ে বাসেই মারা যায় হতভাগা মানুষটি। এই হল বিএনপির গণতন্ত্রপ্রীতি ও জনগণের প্রতি দরদের নমুনা।

এসব কথা মনে হল কয়েকদিন আগে নানা বাগাড়ম্বর ও নাটকের পর বিএনপির ৫ জন সংসদ সদস্যের শপথ গ্রহণের ফলে। গেল নির্বাচন যে একেবারেই ভুয়া এবং নির্বাচনের নামে যে দেশে এক মহাপ্রহসন হয়ে গেছে- এ ব্যাপারে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল এবং যুগ্ম মহাসচিব রিজভী সাহেবকে বেজায় সোচ্চার দেখা গেছে।

বিগত নির্বাচন সামনে রেখে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপিসহ কয়েকটি দল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে। নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্টের সাফল্য ছিল খুবই কম। ফ্রন্টের মাত্র ৮ জন প্রার্থী জয়ী হয়; যার মধ্যে ড. কামাল হোসেনের দল গণফোরাম থেকে ২ জন এবং বিএনপি থেকে ৬ জন। নির্বাচনের পর ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি এবং কারসাজির অভিযোগে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে।

বিএনপির মির্জা ফখরুল নির্বাচনকে প্রহসনমূলক বলে আখ্যায়িত করে এটি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য বলে দাবি করেন। ঐক্যফ্রন্ট এবং বিএনপি তাদের সংসদ সদস্যদের সংসদে যোগদান নিষিদ্ধ করে। তবে নির্বাচিত হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে শপথ নেয়ার আইনি বাধ্যবাধ্যকতা থাকায় দেখা গেল- প্রায় ৬০ দিন পর গণফোরামের সুলতান মোহাম্মদ মনসুর শপথ নিয়ে নিলেন। তার কিছুদিন পর ওই ফোরামের সংসদ সদস্য মোকাব্বির খানও শপথ নিলেন।

ফলে দু’জনকেই দল (গণফোরাম) থেকে বহিষ্কার করা হয়। বিএনপির ফখরুল এবং রিজভী সাহেব শপথ গ্রহণের জন্য উপরোক্ত দু’জনকে কঠোর ভাষায় নিন্দা জানান। নিজের দলের ৬ জনের ব্যাপারে সমানে বলতে থাকেন, তাদের শপথ গ্রহণ ও সংসদে যোগদানের প্রশ্নই ওঠে না। ‘গণতন্ত্র হরণকারী এ ফ্যাসিবাদী সরকারকে শপথ নিয়ে কোনোভাবেই বৈধতা দেয়া যাবে না।’

এখন দেখা গেল, একমাত্র মির্জা ফখরুল ছাড়া একে একে বিএনপির বাকি ৫ জনই শপথ নিয়েছেন। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান যখন প্রথম শপথ নেন, তখন মির্জা ফখরুল তীব্র ভাষায় নিন্দা জ্ঞাপনে উচ্চকিত হয়ে উঠেন।

দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করার জন্য দলের প্রাথমিক সদস্য পদ থেকেও তাকে বহিষ্কার করা হয় এবং অভিযোগ করা হয় যে, এর পেছনে সরকারের হাত আছে। এর ৪-৫ দিন পর বিএনপির ৪ সংসদ সদস্যকে শপথ নিতে দেখা গেল।

তারা জানালেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তেই তারা শপথ নিয়েছেন। অথচ মির্জা ফখরুলকে বারবার বলতে শোনা গেছে- দলের স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত হচ্ছে, নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন না। নিলে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে তারা বহিষ্কৃত হবেন।

মির্জা ফখরুলের এতসব হাঁকডাক এবং দলের স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে বসবাসকারী তারেক রহমানের এক ফুৎকারে বুদবুদের মতো উড়ে গেল। হায়রে বিএনপির গণতন্ত্র! দলেই গণতন্ত্র নেই- এমন একটি দলকে যখন দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সদাসর্বদা সোচ্চার থাকতে দেখা যায়, তখন তা কি বিশ্বাস করা যায়?

তাদের একটি অন্যতম প্রধান দাবি হচ্ছে, খালেদা জিয়ার মুক্তি। তিনি মুক্তি পেলেই দেশে গণতন্ত্র মুক্তি পাবে। খালেদা জিয়া দেশের প্রচলিত আইনে দণ্ডিত হয়েছেন। তার মামলা দুটি প্রায় এক দশক ধরে চলে এবং মামলাগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে করা হয়।

অথচ মির্জা ফখরুল বলে থাকেন, মামলা দুটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বিচারের রায়ও রাজনীতি দ্বারা প্রভাবান্বিত। দেশের আইন-আদালত যদি এতই স্বাধীনতাহীন এবং দুর্বল হয়, তাহলে উচ্চ আদালতে তাদের আপিল করতে দেখা যায় কেন?

তাছাড়া ‘মহামতি’ মওদুদ সাহেবকে একদিন বলতে শুনলাম, আইনের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা যাবে না। দরকার রাজপথের আন্দোলন। ভালো কথা। রাজপথের আন্দোলন এবং গণআন্দোলনের কথা বিএনপির মুখে বহুদিন ধরে শুনছি। তা তারা করেন না কেন?

কারণ তারা জানেন, মানুষ এখন দেশে অশান্তি চায় না। তাদের ডাকে মানুষ সাড়া দেবে না। বিএনপি ও মির্জা ফখরুলদের আন্দোলন যে গণতন্ত্রর জন্য নয়; বরং খালেদা জিয়া ও তারেককে ক্ষমতায় বসানোর জন্য, সে কথা মানুষ জানে। দল হিসেবে বিএনপিও ক্ষমতা পরিচালনা করবে না, করবে তারেক ও খালেদা।

এখন যেমন দলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এ দু’জনই নেয়। তবে খালেদা জিয়ার বয়সের কারণে প্রকৃতপক্ষে তারেকই সুদূর লন্ডন থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন এবং দল পরিচালনা করেন।

দলীয় সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণের পর মির্জা ফখরুল বিষয়টিকে বৈধ ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য নানা চটকদার এবং চালাকির কথা বলছেন। বলছেন, এটা একটা কৌশল। তাহলে তাদের অভিধানে নীতি-আদর্শ বলে কোনো বিষয় নেই।

যদি কৌশলই হয়; তাহলে এ কৌশল এতদিন কোথায় ছিল এবং তিনি নিজে এ কৌশলে যোগ দিলেন না কেন? জাহিদুর রহমানের ব্যাপারে তাহলে এত লম্পঝম্প এবং হম্বিতম্বি করা হল কেন? তবে ফখরুল সাহেবদের জানা দরকার, বাংলাদেশের মানুষ এত বোকা নয়।

কথায় আছে, শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না। গণফোরাম ও বিএনপির সংসদ সদস্যরা ক্ষমতা ও অর্থের লোভ থেকে মুক্ত নয়। আমাদের দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতা এবং অর্থের লোভই প্রাধান্য পায়।

একজন এমপি বা সংসদ সদস্য বিরোধী দলে থাকলেও যে আর্থিক সুবিধা পাবেন এবং ক্ষমতা ভোগ করবেন; তা তারা যে হাতছাড়া করবেন না, এটা মানুষ আগেই অনুমান করেছিল। তাছাড়া তাদের একটি নৈতিক যুক্তিও আছে। তা হল, সংসদে যাওয়ার জন্যই মানুষের কাছে ভোট চেয়েছি এবং পেয়েছি। এখন তাদের ইচ্ছাকে অবমাননা করতে পারি না ইত্যাদি।

এটা সত্য, বিগত নির্বাচনের ব্যাপারে অভিযোগ আছে। তা সত্ত্বেও দেশের মানুষ এর ফলাফল মেনে নিয়েছে। এটাও কম কথা নয়। এটা স্বীকার করতে হবে যে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত ১৪ দলীয় সরকার দেশকে উন্নয়নের আলো দেখিয়েছে।

গত ১০ বছরে যে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে, তা বিশ্বসভায় স্বীকৃতি পেয়েছে। দেশবাসী এটাও জানে, আওয়ামী লীগের বিকল্প বিএনপি হতে পারে না। গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রমাণ শেখ হাসিনার সরকার যতটুকু দিয়েছে, তা জামায়াতপ্রেমিক বিএনপি থেকে আশা করা যায় না।

পরিশেষে এটাও বলতে হয়, গণতন্ত্রের স্বার্থেই একটি দায়িত্বশীল ও শক্তিশালী বিরোধী দল দরকার। তাই বিএনপিকেও আমাদের মতো সাধারণ মানুষের আলোচনা-সমালোচনা এবং অতীতের ভুলভ্রান্তির আলোকে শুদ্ধিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই তারা একটি বিশ্বাসযোগ্য গণতান্ত্রিক দল বলে মানুষের কাছে পরিচিতি লাভ করবে।

উভয় দলকেই মনে রাখতে হবে, জনগণই সব ক্ষমতার উৎস ও মালিক। রাষ্ট্রশক্তির অপব্যবহার, অপপ্রয়োগ এবং গণবিরোধী কাজকর্ম দীর্ঘদিন চলতে থাকলে জনগণ যে একদিন বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং জুলুমবাজদের ক্ষমতার মসনদ তছনছ করে দেয়, ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্তের অভাব নেই। বর্তমানে আলজেরিয়া ও সুদানে চলমান গণআন্দোলন ও বিক্ষোভ তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

মো. মইনুল ইসলাম : সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়