ভেজালের মধ্যেও ভেজাল!

  আলম শাইন ১১ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দুধ

আমাদের সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, ‘জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি রাষ্ট্রের অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলে গণ্য হইবে।’ অথচ দেশে ঠিক উল্টোটি লক্ষ করছি আমরা।

খাদ্যের পুষ্টিমান দূরের কথা, আসল খাদ্যই পাওয়া মুশকিল হয়ে গেছে এখন। ভেজালে ভেজালে সয়লাব যেসব খাবার, সে খাবারে পুষ্টি খোঁজার কী আছে আমাদের? ভেজালের জালে এমনভাবে জড়িয়ে গেছি আমরা যে ইচ্ছে করলেও সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না সহজেই।

বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলে হয়তো না খেয়ে জীবন খোয়াতে হবে, নচেৎ খেয়ে জীবন খোয়াতে হবে; এমন একটা সংকটাপন্ন অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। সঙ্গত কারণে বলা যেতে পারে, আমরা জিম্মি অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে।

আমরা জানি, উৎকৃষ্ট দ্রব্যের সঙ্গে নিকৃষ্ট দ্রব্যের মিশ্রণই হচ্ছে ভেজাল। ভেজালের রয়েছে নানা রকমফের। ভেজাল দিতে গিয়ে ক্ষেত্রবিশেষে অসাধু ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছেন, যে কৌশলের কাছে আমরা বারবার হেরে যাচ্ছি। এর কারণ ভেজালের ধরন স্থায়ী নয়, একেকবার একেক ধরনের ভেজালের মুখোমুখি হতে হচ্ছে আমাদের। অর্থাৎ কৌশল বদলানো হচ্ছে।

ভেজালের বিষয়টা এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে, প্রতিনিয়ত ভেজাল খেয়ে খেয়ে এখন আজেবাজে খাবারও অনায়াসে হজম করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি আমরা। এ অভ্যাস একদিনে হয়নি, দীর্ঘদিনের অনুশীলনে এমনটি হয়েছে। অবশ্য এটিকে অনুশীলন বলা ঠিক হবে না। বলতে হবে, পর্যায়ক্রমে ভেজাল খেয়ে খেয়ে এমন সহনশীল পর্যায়ে পৌঁছেছি আমরা।

তবে বেশিরভাগই ঘটেছে অজান্তে। আবার জেনেশুনেও কিছু খাবার খাচ্ছি আমরা। যেমন, ফল-ফলাদি কিংবা ফরমালিন দেয়া মাছ অথবা ডিডিটি মাখানো শুঁটকি। এসব জানা সত্ত্বেও খাচ্ছি আমরা। ফলের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন হতে পারে; কিন্তু মাছ তো খেতেই হবে।

সুতরাং জেনেই খাচ্ছি আমরা বিষ মাখানো মাছ। আসলে উপায়ান্তর না থাকাতে খেতে বাধ্য হচ্ছি। আমরা আগে খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে ভেজাল খেতাম, এখন ভেজালের মধ্যেই আবার ভেজাল দিচ্ছেন অসাধুরা। অর্থাৎ এক নম্বর নয়, দুই নম্বর ভেজাল খাচ্ছি আমরা। পরিণামে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে।

সমগ্র বিশ্বেই খাদ্যে ভেজালের প্রবণতা কম-বেশি দেখা যায়। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এ প্রবণতা বেশি। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যান্সারসহ অন্যান্য প্রাণঘাতী অসুখের অন্যতম কারণ হচ্ছে খাদ্যের ভেজাল।

এখন কথা হচ্ছে, আমরা যে হারে ভেজাল খাচ্ছি, সে হারে কিন্তু আমাদের রোগ-ব্যাধি সহজে ধরা পড়ছে না। অথবা শনাক্ত করতে পারছি না। অথবা ধীরলয়ে অসুস্থ হওয়ায় আমরা তা টের পাচ্ছি না।

আসলে ভেজালের বিষক্রিয়া খুব দ্রুত ছড়িয়ে না পড়ায় এমনটি ঘটছে। ফলে অনেকেরই ধারণা, ভেজাল মিশ্রিত খাবার খেলে খুব বেশি ক্ষতি হয় না; বড়জোর পেটের ব্যামো হতে পারে। অধিকাংশ মানুষের ধারণাই এমন। কাজেই ভেজালে আপত্তি নেই সেই অবুঝ মানুষের কাছে। ওই যে আমরা আগেই বলেছি, সয়ে গেছে, আসলেও অনেকটা সেরকম।

বলতে দ্বিধা নেই, ভেজালে ভেজালে সয়লাব এ দেশের পণ্যসামগ্রী কিংবা খাবার-দাবার। কোথায় নেই ভেজাল! ওষুধ থেকে শুরু করে কাফনের কাপড়ে পর্যন্ত ভেজাল দিচ্ছে অসাধুরা। খাদ্যদ্রব্যের কথায় আর বলার কিছু নেই! পঁচানব্বই শতাংশ মৌসুমি ফল ও শাকসবজিতে এখন কেমিক্যাল মেশানো হচ্ছে। মাছ, গুঁড়া মসলা, দুধ তথা শিশু খাদ্যে ভেজাল দেয়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা।

রোজার মাসে বিষয়টা আরও কঠিন পর্যায়ে পৌঁছে আমাদের দেশে। জিলাপি মচমচে রাখতে মবিল মেশানো হচ্ছে। মুড়ি ধবধবে করতে মেশানো হচ্ছে ইউরিয়াসহ নানা কেমিক্যাল। কিছু নামিদামি কোম্পানি তরল শরবতের বোতলের লেবেলে বিভিন্ন ফলের ছবি এঁকে দিলেও ফলের কোনো নির্যাস পায়নি বিএসটিআই।

শুধু নামিদামি কোম্পানিই নয়, ফুটপাতের দোকানি মাছে দেয়ার বরফ গলিয়ে শরবত বানিয়ে খাওয়াচ্ছেন রোজাদারকে। আরও কত কী যে হচ্ছে এ মাসে, তা বলা মুশকিল! সেসব বাদ দিয়ে বরং আমরা ভেজালেও ভেজাল দেয়ার কথায় আসছি।

ছোট্ট একটি উদাহরণ। আসলে এটিকে উদাহরণ বলা ঠিক হবে না, প্রামাণ্য দৃষ্টান্ত বলা যায়। চিত্রটি স্বচক্ষে কারও দেখার ইচ্ছা হলে নদীপথে ঢাকার আশপাশ থেকে লঞ্চে সওয়ার হয়ে সদরঘাট আসতে হবে। তখন দেখা যাবে কিছু অসাধু দুধ ব্যবসায়ী দুধের ড্রামে নদীর জল মেশাচ্ছে।

নদীর জল সরাসরি- বিষয়টা ভাবতে কেমন লাগছে! দুধে জল মেশানো অসাধুদের পুরনো অভ্যাস। অনেক জোকসও আছে ওইসব নিয়ে। কিন্তু সেটি যদি হয় টিউবঅয়েলের জল, তবু তা মানা যায়। না তা নয়; ভেজালের মধ্যেও ভেজাল দিচ্ছে। অর্থাৎ দূষণমুক্ত জল নয়, একেবারে ঘোলাজল খাইয়ে ছাড়ছে।

বিষয়টা কী দাঁড়িয়েছে তাহলে? ভেজাল নয়, ভেজাল দ্রব্যের মধ্যেও ভেজাল দেয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, কৃত্রিম দুধ-ঘি-ডিম-চাল বানানোর কথাও জানতে পেরেছি আমরা। ভেজাল চাল নিয়ে ক’দিন আগেও এমন সংবাদ আমরা খবরের কাগজ মারফত জানতে পেরেছি।

অপরদিকে প্যাকেটজাত দুধের অবস্থা আরও ভয়ানক। সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে দেশব্যাপী ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। পত্রপত্রিকায় বিস্তর লেখালেখি হয়েছে প্যাকেটজাত দুধ-দই নিয়ে। কীটনাশক, সিসা, অ্যান্টিবায়োটিক এসব নাকি মেশানো হচ্ছে! এটা কী করে সম্ভব তা ভাবতেও আমাদের গা শিউরে ওঠে।

এরকম প্রতিটি জিনিসেই ভেজাল দিচ্ছে অসাধুরা। যার শত শত দৃষ্টান্ত রয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলে আরও অনেক ধরনের খাবারের বিষক্রিয়া ধরা পড়বে। বেরিয়ে আসবে মিশ্রিত বিষাক্ত কেমিক্যালের নামও। খাদ্যদ্রব্য ছাড়াও প্রসাধনী সামগ্রীসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদিতে ভেজাল দিয়ে আসল জিনিসের চেহারাও পাল্টে দেয়া হচ্ছে আজকাল। ফলে আসল-নকল চেনাই দুষ্কর হয়ে পড়েছে এখন।

ফলমূলে ফরমালিন তো মামুলি ব্যাপার; আরও কতসব কেমিক্যাল ব্যবহার করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা, তার ফিরিস্তি দেয়াও কঠিন। কেমিক্যাল মিশ্রিত সেসব ফলমূল কিংবা খাদ্রসামগ্রী খেয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে মানুষ। তা কিন্তু সহজেই টের পাচ্ছে না কেউ। টের পাচ্ছে না কেউই কেন তারা ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে অথবা ডায়াবেটিস, হৃদরোগসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের কিডনি, লিভার, বিকল হচ্ছে।

কারণ, বিষয়টা খুব সহজে বোঝার উপায় নেই। ফলে রোগ-ব্যাধি বাঁধিয়ে হাসপাতালে গিয়েও স্বস্তি পাচ্ছেন না রোগী। সেখানেও আরেক দফা ভেজালের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। মেয়াদোত্তীর্ণ ও নকল ওষুধের খপ্পরে পড়ে রোগ জটিলতর পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে।

সেক্ষেত্রে সামর্থ্যবানদের পক্ষে দেশের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা নেয়া সম্ভব হলেও নিম্ন-মধ্যবিত্ত কিংবা দরিদ্রদের পড়তে হচ্ছে জীবনমরণ সমস্যায়। রোগের কারণ নির্ণয় করাতে না পেরে অনেকে তখন আশ্রয় নিচ্ছে ঝাড়ফুঁকের।

সম্প্রতি আমরা দেখেছি রাজধানীর নামিদামি হাসপাতালগুলোর চিত্র। মেয়াদোত্তীর্ণ ও নকল ওষুধে সয়লাভ। কয়েক মাস আগেও ভ্রাম্যমাণ আদালত এসব হাসপাতালকে বিপুল অঙ্কের টাকা জরিমানা করেছে। তাতেও কাজ হয়নি। বরং তাদের কাজ তারা বহাল তবিয়তে চালিয়ে যাচ্ছে।

চিকিৎসার নামে রোগীর বারোটা বাজাচ্ছে। অপচিকিৎসা থেকে রেহাই পাচ্ছে না শিশু কিংবা গর্ভবতীরাও। এমন ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত রয়েছে। কাজেই ভেজাল খেয়ে জটিল রোগ বাঁধিয়ে শেষ আশ্রয়স্থলে গিয়েও নিস্তার নেই আমাদের; সেখানেও একই অবস্থা।

সেখানকার ভেজাল আবার একটু ভিন্ন ধরনের। রয়েসয়ে অঙ্ক কষে তবে রোগীর ওপর ফলানো হচ্ছে। ইদানীং শোনা যাচ্ছে, অহেতুক আইসিইউতে ভর্তি করে রোগীর অপনজনকেও রোগী বানানো হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের আর ভরসাস্থল রইল কোথায়! ভেজালের আগ্রাসন, হাসপাতালে দুর্নীতি; সব মিলিয়ে টিকে থাকাই দায় এখন।

তাই আমরা বলতে পারি, ভেজালের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কোনোভাবেই ছাড় দেয়া ঠিক হবে না। শুধু জেল-জরিমানাই নয়, মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন পাস করা উচিত বলে মনে করছি আমরা। না হলে ভেজালের পুনরাবৃত্তি এড়ানো সম্ভব নয়।

আলম শাইন : লেখক ও বন্যপ্রাণী বিশারদ

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×