বলাকার ভাঙা ডানা আবার জোড়া লাগুক

প্রকাশ : ১২ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মুঈদ রহমান

‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’- এটি একটি সংস্কারপ্রসূত মনোভাব বলেই বিবেচনা করতাম। কিন্তু আজকের বিমান বাংলাদেশের যে বেহাল দশা বা অব্যবস্থা, তাতে যে কেউ উক্তিটিকে বিশ্বাস বলে বিবেচনা করলে অন্যায় হবে না।

বাতাসে মানুষ ওড়ার ঘটনা এদেশে প্রথম ঘটে ১৮৮৩ সালে। ঢাকার নওয়াব পরিবারের লোকজন জিন্যাট ভ্যান টাসেল নামের এক আমেরিকান পেশাদার বেলুনিস্ট তরুণীকে ভাড়া করে এনেছিলেন।

ভদ্রমহিলা ১৮৮৩ সালের ১৬ মার্চ বুড়িগঙ্গার দক্ষিণ তীর থেকে আহসান মঞ্জিলের ছাদ লক্ষ্য করে উড়ালযাত্রা শুরু করেন। মাঝপথে একটি দমকা হাওয়ার কবলে পড়ে বেলুনটি শাহবাগের বাগানে একটি বড় গাছে আছড়ে পড়ে। ভদ্রমহিলা টাল সামলাতে না পেরে গাছ থেকে মাটিতে পড়ে মৃত্যুবরণ করেন। বাংলার উড়াল ইতিহাসের শুরুটা এমনি হৃদয়বিদারক ছিল।

আধুনিক বিমানের যাত্রা শুরু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বদৌলতে। তখন ব্রিটিশরাজ যুদ্ধবিমান নামার জন্য ঢাকার তেজগাঁওয়ে একটি রানওয়ে তৈরি করে। পরে সহযোগী হিসেবে ১৯৪১ সালে আরেকটি রানওয়ে নির্মাণ করা হয় ঢাকার কুর্মিটোলায়। সেদিনকার সেই কুর্মিটোলা রানওয়েই আজকের হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ১৯৫৪ সালের ৭ জুন ইস্পাহানি গ্রুপের রিজেন্ট এয়ারওয়েজ নামে প্রথম বেসরকারি বিমান ঢাকা-করাচির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান বিমান সংস্থার সঙ্গে একীভূত হয়ে নামকরণ হয় পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস (পিআইএ)।

মহান মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ নং ১২৬ বলে প্রতিষ্ঠিত হয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। তবে এর এক বছর পর ১৯৭২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি অভ্যন্তরীণভাবে বিমান বাংলাদেশ তার যাত্রা শুরু করে। প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয় একটি উড়ন্ত বলাকা। ২০০৭ সালের ২৩ জুলাই তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিমানকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত করে।

সাধারণ যাত্রীসেবার সঙ্গে বিশেষ হজ ফ্লাইটও পরিচালনা করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। তবে যাত্রীসেবার পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে সফলতা দেখাতে পারেনি সংস্থাটি। মোট পণ্যের ৪৭ শতাংশ পরিবহন করে থাকে বিদেশি বিমান, ২৪ শতাংশ বেসরকারি বিমান আর বিমান বাংলাদেশের ভাগে মাত্র ২৯ শতাংশ। আন্তর্জাতিকভাবে ৪৩টি দেশের সঙ্গে যাত্রীসেবা পরিচালনার চুক্তি থাকলেও বিমানের অভাবে মাত্র ১৬টি দেশের মধ্যে আপাতত সীমাবদ্ধ রয়েছে। বিমানের যাত্রীসেবায় নিয়োজিত উড়োজাহাজের সংখ্যা ১৪ আর ভাড়া করা ৩টি।

একটি স্বাধীন দেশে সরকারি-বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত নানা রকমের, নানা গুরুত্বের সংস্থা কাজ করে। কিন্তু এয়ারলাইন্স একটি অতিরিক্ত গুরুত্ব বহন করে। যে কোনো দেশের বিমান সংস্থাকে আকাশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। একটি বিমান রাষ্ট্রীয় পতাকা বহন করে, বিমানে কর্মরত মানুষদের দ্বারা অন্য দেশের মানুষ তার আচরণ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হয়। এটি একটি মর্যাদার বাহনও। সে মর্যাদার ওপর ভর করেই স্বাধীন বাংলাদেশে বিমান বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল। বলতে দ্বিধা নেই যে, জন্ম থেকেই বিমান বাংলাদেশ নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েই তার পথচলা অব্যাহত রেখেছে। বিখ্যাত দার্শনিক কার্ল মার্কস বলেছেন, যে কোনো কিছুর শুরুটা কঠিন- এটা বিজ্ঞানসম্মত। মানুষ তার অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে সার্থকতার পথ খুঁজে বের করে। সুতরাং প্রাথমিক অবস্থাকে আমরা অস্বীকার করছি না। কিন্তু ৪৮ বছরে পা দিয়ে বিমানের এ হাল মেনে নেয়ার মতো নয়। অদক্ষতাকে কোনো না কোনোভাবে মেনে নেয়া যেতে পারে; কিন্তু অসততা? আজ আমাদের জাতীয় পতাকা বহনকারী উড়ন্ত বলাকা যেন অসততা আর অনিয়ম-দুর্নীতির ভারে ডানা ভেঙে পড়েছে।

বিমান বাংলাদেশের দুর্নীতি সর্বকালের মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে সিভিল এভিয়েশনের কাছেই দেনা পড়েছে ৩ হাজার কোটি টাকার ওপরে। সারা বিশ্বের এয়ারলাইন্স শতকোটি ডলারের মুনাফা করছে আর আমাদের বিমান জন্ম থেকে লোকসান দিয়ে যাচ্ছে। এর কারণ একটাই- দুর্নীতি। ১৭ এপ্রিল যুগান্তর শিরোনাম করেছে, ‘বিমানের ঘাটে ঘাটে দুর্নীতি’। অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে আপনার মনে হবে, এ শিরোনামটিতে কম বলা হয়েছে; শিরায় শিরায় বললে ভালো হতো; এটাও যদি যথার্থ মনে না হয়, তাহলে বলতেই হবে- বিমানের দুর্নীতি পরিমাপ করে তার সঠিক মাত্রা প্রকাশ করার মতো কোনো শব্দ বা বাক্যই তৈরি হয়নি।

গত ১০ বছরে কার্গো হ্যান্ডলিং চার্জ থেকে আত্মসাৎ করা হয়েছে ৭২০ কোটি টাকা। এছাড়াও বিমানের অন্তত ৮টি খাত পুরোপুরি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে- ১. এয়ারক্রাফ্ট কেনা ও লিজ নেয়া; ২. রক্ষণাবেক্ষণ-ওভারহোলিং; ৩. গ্রাউন্ড সার্ভিস; ৪. কার্গো আমদানি-রফতানি; ৫. ট্রানজিট যাত্রী ও লেফট-ওভার যাত্রী; ৬. অতিরিক্ত ব্যাগেজের চার্জ; ৭. টিকিট বিক্রি এবং ৮. ক্যাটারিং খাত। তার মানে হল, বিমানের কর্মকর্তাদের নিজ নিজ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছাড়া কোনো খাতই তারা অক্ষত রাখেনি। যাবেন কোথায়- পাইলট নিয়োগেও দুর্নীতি হয়েছে। প্রায় ৩০-৩২ জনকে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করে সুযোগ দেয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক স্টেশনগুলোতে স্টেশন ম্যানেজার, কান্ট্রি ম্যানেজার ও স্থানীয় জেনারেল সেলস এজেন্টের (জিএসএ) যোগসাজশে সবচেয়ে বড় ধরনের লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। আন্তর্জাতিক স্টেশনগুলোর মধ্যে অন্তত পাঁচটি যথা- লন্ডন, জেদ্দা, সিঙ্গাপুর, দুবাই ও মালয়েশিয়ার অবস্থা শোচনীয়। যেসব বিমান লিজ নেয়া হয়েছিল, সময়মতো দেখভাল না করার কারণে ফেরত দেয়ার সময় হাজার কোটি টাকার ইঞ্জিন প্রতিস্থাপন করতে হয়েছে। এখানেও নাকি ভাগাভাগির একটা ব্যাপার রয়েছে। মেরামত সরঞ্জাম কিনতে গিয়ে ওভার প্রাইসিংয়ে শত শত কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। তার সঙ্গে রয়েছে পছন্দসই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেয়া।

বিমানের টিকিট ব্লক করে কালোবাজারে বিক্রির মাধ্যমে সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের পরিচালক আশরাফুল আলমের নেতৃত্বে একটি চক্র প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে। মাসের হিসাবে অঙ্কটা দাঁড়ায় ৬ কোটি থেকে ৭.৫ কোটি টাকা। বছরের হিসাব করলে তা হয় ৭২ থেকে ৯০ কোটি টাকা। ভাবলে অবাক হবেন, এ অপকর্ম চলেছে বছরের পর বছর। আশরাফুল আলমের সঙ্গে আরও আছেন ‘সাবেক জেনারেল ম্যানেজার আতিকুর রহমান চিশতি, লন্ডনের সাবেক কান্ট্রি ম্যানেজার শফিকুল ইসলাম, জিএম আরিফুর রহমান, হংকংয়ের কান্ট্রি ম্যানেজার মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন, কার্গো শাখার মাহফুজুর রহমান, জেটি খান, আবদুল্লাহ, মার্কেটিং শাখার মুশফিক বাবু, জিয়া, জাহিদ বিশ্বাস, এনায়েত হোসেন প্রমুখ’ (যুগান্তর, ০৪.০৫.২০১৯)। একজন মানুষের জীবনযাপন করতে কত টাকার প্রয়োজন হয়? টু ডাইমেনশানাল চিত্রের কারণে বিমানের প্রতীক উড়ন্ত বলাকার একটি ডানা দৃশ্যমান। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম যে, অপর পাশে আরেকটি ডানা আছে। কিন্তু আজকে বিমানের যে হাল, তাতে নিশ্চিত যে- বলাকাটির দুটি ডানা কোনোদিনই ছিল না।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনেক দূর এগিয়েছে। দুদকের প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই। অনেক তদন্ত কমিটি করা হয়েছে এবং তারা কাজ শুরু করেছে। বিমানের ১৪৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীর জবানবন্দি নেয়ার জন্য চিঠি দেয়া হয়েছে। সদ্য অব্যাহতি পাওয়া ম্যানেজিং ডিরেক্টর মোসাদ্দিক আহমেদসহ ১০ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। দুদক চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘যে কোনোভাবে বিমান মাফিয়াদের আদালত পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া হবে।’ আমরা এটাকে সৎসাহসী বক্তব্য বলে বিবেচনা করতে চাই; কিন্তু সমস্যাটা হল আস্থার। সরকারের তরফ থেকে বারবারই বলা হচ্ছে- আমরা বিচার বিভাগ, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং দুদকের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করছি না। অথচ বাস্তব সত্য হল, এদেশের সাধারণ মানুষ একথা বিশ্বাস করতে নারাজ। অতীতের কিছু কার্যকলাপের কারণেই এ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর থেকে জনগণের আস্থা উবে গেছে। জনমানুষের এ অনাস্থাকে আস্থায় ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। আমরা আশাবাদী এ কারণে যে, অনিয়ম নিয়ে নড়েচড়ে বসতেই সুফল পাওয়া গেছে। ২০১৮ সালের এপ্রিলে টিকিট বিক্রি খাতে আয় হয় ২৭০ কেটি ৩৯ লাখ টাকা। এ বছরের এপ্রিলে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১৩ কোটি টাকা, যা গত বছরের তুলনা প্রায় ১৪৩ কোটি টাকা বেশি। শতকরা হিসাবে ৫২ শতাংশ।

আমি দৃঢ়ভাবেই বিশ্বাস করতে চাই, বর্তমান সরকারপ্রধানের সামান্যতম ইচ্ছার কারণেই দুদকের পক্ষে এতটা এগোনো সম্ভব হয়েছে। কিন্তু বিশ্বাস করতে চাই না, বিষয়টি ‘সামান্য’র স্তরেই থাকুক। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে ‘জিরো টলারেন্সে’র কল্পশব্দ শুনি; তার বাস্তবরূপ দিতে হলে ‘অসামান্য’ কিছু করা দরকার। আমাদের মনে রাখতে হবে, যে মশাকে আমরা রক্তচোষা বলে থাকি, মানবদেহ থেকে তার রক্ত চোষার ক্ষমতা মাত্র এক ফোঁটা রক্তের ২০ ভাগের এক ভাগ।

এজন্য আমরা তাকে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দিই। আর যারা রাষ্ট্রের কিংবা সমাজের নদী পরিমাণ রক্ত চুষে নেয়, তাদের শাস্তি কী হওয়া উচিত; তা সরকারকেই নির্ধারণ করতে হবে। আমরা সরকারের নৈতিক ভূমিকা প্রত্যাশা করি।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়