রমজানে অতি মুনাফাপ্রবণ মানসিকতা

প্রকাশ : ১৩ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মুনতাকিম আশরাফ

ছবি: যুগান্তর

পবিত্র মাহে রমজানকে বলা হয় মুসলমানদের আত্মশুদ্ধি ও সিয়াম সাধনার মাস। অথচ আমাদের দেশে রমজান এলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য সাধারণ মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

প্রতিবছর রমজানে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে সরকার নানামুখী উদ্যোগ হাতে নিলেও শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত দাম দিয়েই পণ্য কিনতে হয় ক্রেতাকে। কখনও ‘চাহিদা বেড়েছে’, কখনও ‘সরবরাহ নেই’- এ রকম অসংখ্য অজুহাতে সুকৌশলে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ান অসাধু ব্যবসায়ীরা।

মূলত যে কয়েকটি কারণে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে তার মধ্যে একটি হল চাহিদার তুলনায় পণ্য সরবরাহ কম থাকা। পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিমভাবে বিভিন্ন পণ্যের ঘাটতি দেখিয়ে অতি মুনাফা লাভের আশায় নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়।

লাগামহীন মুনাফা অর্জনের জন্য নানা সময় নানা প্রতারণার আশ্রয় নেয় ব্যবসায়ীদের একটি অংশ। বাজারে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফা আদায়ের চেষ্টা করেন। এক বাজারে পণ্য নেই, এমন মিথ্যা তথ্যে অন্য বাজারে অহেতুক দাম বাড়ায় তারা। দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে অজুহাতের কমতি নেই তাদের। তাদের এমন নানা কারসাজিতে রমজান এলেই নিত্যপণ্যের মূল্য বরাবরই বৃদ্ধি পায়।

সম্প্রতি পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে কিছু প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সুকৌশলে বাড়ানোর অভিযোগ দেখা গেছে। পহেলা বৈশাখের উৎসব শেষ হলেও ইলিশের দাম মোটেও কমেনি। কোনো কোনো বাজারে কেজিতে ৩০-৫০ টাকা বেড়েছে মাংসের দাম।

চাল, ডাল, ভোজ্য তেলসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকলেও স্বস্তি নেই সবজিতে। বিশেষ করে টমেটো, শসা, করলা, লাউয়ের দাম বেড়ে গেছে। বৈশাখের আগে একটু বাড়ল, তারপর শবেবরাতে আরও একটু বাড়ল। রোজা আসতে আসতে নিত্যপণ্যের দাম এভাবেই সুকৌশলে বাড়ায় ব্যবসায়ীদের একটি শ্রেণী। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে এক দশক ধরে সরকার রমজানে ব্যবহৃত হয় এমন সব পণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চাহিদার চেয়েও বেশি পণ্য আমদানি করা হয়েছে বিদেশ থেকে। তারপরও মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতায় লাগাম পরানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অথচ আরব দেশগুলোতে রমজানে দেখা মেলে ভিন্ন চিত্র। রমজান এলেই সেখানকার ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় নামেন কে কত কম দামে জিনিসপত্র বিক্রি করতে পারেন। মাংস থেকে শুরু করে চাল, ময়দা, চিনি, তেল, দুধসহ যাবতীয় নিত্যপণ্যের দাম নেমে আসে অর্ধেকে। অনেক দেশে ভোজ্য তেলের দাম কমে নেমে আসে তিন ভাগের এক ভাগে। কোনো কোনো পণ্য ৯০ ভাগ পর্যন্ত ছাড়ে বিক্রি করা হয়।

ব্যবসায়ীদের নিজ উদ্যোগে দাম কমানো ছাড়াও অনেক দেশে সরকারিভাবে রমজানে পণ্যের দাম কমিয়ে নির্ধারণ করে দেয়া হয়। আর বাংলাদেশে এ চিত্র পুরোটাই উল্টো। বিগত বছরগুলোয় সরকারের সঙ্গে বৈঠকে ভোক্তাদের স্বার্থরক্ষায় নানা আশ্বাস দেয়া হলেও পরবর্তী সময়ে তা রক্ষা করা হয়নি।

রমজানের কয়েকদিন চলে গেছে। এ বছর নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টি অনেকটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে সরকার। যে কোনো অবস্থাতেই জনগণকে স্বস্তি দিতে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে সরকার। আগে থেকেই রমজানে সাধারণ মানুষকে নিত্যপণ্যে স্বস্তি দিতে উদ্যোগী হয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবাই। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীও জিনিসপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যবসায়ীদের অনুরোধ জানিয়েছেন। রমজানে নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে কয়েকটি সংস্থাকে বাজার তদারকির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর মূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য বাজার মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করতে বিএসটিআই, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, সিটি কর্পোরেশনের বাজার মনিটরিং সেল ও জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) রমজানে কমমূল্যে বাজারে পণ্য বিক্রি করে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করবে। এর বাইরেও র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত, কৃষি বিপণন অধিদফতর ও পুলিশ বাহিনীর ভ্রাম্যমাণ টিম কাজ করবে বলেও জানা গেছে।

এবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বাজারের ওপর নজর রাখবেন সংশ্লিষ্টরা। জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর যে কোনো কারসাজি সৃষ্টিকারী ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথাও ভাবছে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল। রমজানের চাহিদাকে পুঁজি করে কেউ যাতে পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করতে না পারে, সে লক্ষ্যে এবার বাজারে গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি থাকবে।

জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রমজানে পরিচালিত হবে ভেজালবিরোধী অভিযান। রাসায়নিকমুক্ত ফল নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করবে। এ ছাড়াও জেলা ও উপজেলায় বাজারে পণ্য সরবরাহ ও মজুদ অটুট রাখা, নির্বিঘ্নে পণ্য পরিবহন, অবৈধ মজুদ প্রতিরোধ এবং পণ্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে মোবাইল কোর্ট কার্যক্রম জোরদারসহ প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ফলে রমজানকে পুঁজি করে কারসাজির মাধ্যমে আর কেউ অতি মুনাফা লুটতে পারবে না ধরে নেয়া যায়।

রমজানে আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় ভোজ্য তেল, চিনি, মসুর ডাল, ছোলা, পেঁয়াজ ও খেজুর। তাই ছয়টি পণ্য আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। রমজানে যাতে এ ধরনের পণ্যসামগ্রীর কোনো সংকট তৈরি না হয়, সে লক্ষ্যে ব্যবসায়ীদেরও আমদানি বাড়ানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ট্যারিফ কমিশনের তথ্যমতে, রমজানে ভোজ্য তেলের চাহিদা থাকে ২.৫ থেকে ৩ লাখ টন, চিনি ৩ লাখ টন, ছোলা ৮০-৯০ হাজার টন, খেজুর ১৮ হাজার টন এবং পেঁয়াজ ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টনের। এছাড়া ৫০-৬০ হাজার টন মসুর ডালের চাহিদা তৈরি হয়। এরই মধ্যে এ পণ্যগুলোর পর্যাপ্ত মজুর গড়ে তোলা হয়েছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ, বিপণন ও মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বছরে ভোজ্য তেলের চাহিদা ১৫ লাখ টন। রমজানে এ চাহিদা বেড়ে হয় প্রায় আড়াই লাখ টন। দেশে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টন সরিষা উৎপাদন হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অপরিশোধিত এবং পরিশোধিত সয়াবিন ও পাম অয়েল আমদানি করে ঘাটতি পূরণ করতে হয়।

ঘাটতি পূরণে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি) ৮ লাখ ৬৪ হাজার টন ভোজ্য তেল আমদানি করা হয়েছে। আরও বেশ কয়েক হাজার টন ভোজ্য তেল আমদানি পাইপলাইনে রয়েছে। ফলে এ মুহূর্তে চাহিদার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি ভোজ্য তেল মজুদ রয়েছে।

অন্যদিকে দেশে পেঁয়াজের চাহিদা বছরে প্রায় ২২ লাখ টন। প্রতিমাসে গড়ে ১ লাখ ৭০ হাজার টন চাহিদা থাকলেও রোজার মাসে চাহিদা থাকে ৪ লাখ টন। এর মধ্যে দেশে ২৩ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। আর এনবিআরের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৭ লাখ ২০ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে। তাই চাহিদার তুলনায় এ মুহূর্তে দেশে পেঁয়াজ অনেক বেশি মজুদ রয়েছে।

চিনির চাহিদা দেশে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন। রোজার মাসে এই চাহিদা থাকে ৩ লাখ টন। দেশে চিনির উৎপাদন প্রায় ৬৫ হাজার টন। বর্তমানে দেশে আমদানি করা চিনির মজুদ রয়েছে ৯ লাখ টন। ফলে এ মুহূর্তে চাহিদার অনেক বেশি চিনি মজুদ রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ছোলার বার্ষিক চাহিদা এক লাখ টন। এর মধ্যে রমজানে চাহিদা ৮০ হাজার টন। এনবিআরের তথ্যমতে, এ মুহূর্তে চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি ছোলার মজুদ রয়েছে।

অন্যদিকে দেশে খেঁজুরের চাহিদা বছরে প্রায় ২০ হাজার টন। এর মধ্যে রমজানে চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার টন। এনবিআরের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত অর্থাৎ প্রথম আট মাসে প্রায় ৪০ হাজার টন খেজুর দেশে আমদানি হয়েছে। এ মুহূর্তে চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণ খেজুর মজুদ রয়েছে। এছাড়া চাল, গম, আদা ও রসুনও চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি মজুদ রয়েছে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়। জানা গেছে, এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম নিুমুখী ধারায় রয়েছে। তাই পবিত্র রমজানে দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়ার কোনো আশঙ্কা নেই। রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের এসব উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।

তবে এত কিছুর পরও বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে, যদি আমাদের ব্যবসায়ীদের মানসিকতা ও অতি মুনাফার প্রবণতা না কমে।

মুনতাকিম আশরাফ : সিনিয়র সহসভাপতি, এফবিসিসিআই