একটি স্যান্ডউইচ ও এক গ্লাস জুস

প্রকাশ : ১৩ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মেজর (অব.) সুধীর সাহা

ছবি: সংগৃহীত

একেবারেই গল্পের মতো। তবে অন্যদিকে একেবারেই বাস্তবের কঠিন সত্যের কাছে বন্দি একটি ঘটনা। কেন যেন মনে হচ্ছে আমার লেখাটি পড়ে অনেক পাঠকই বিষয়টি বিশ্বাস করতে চাইবেন না। আমার নিজেরও এমনটাই হয়েছিল শুরুতে যখন আমি বাংলাদেশের একটি স্থানীয় পত্রিকায় সংবাদটি পড়েছিলাম। তাই আমি এটি নিয়ে আরও একটু গবেষণা করে দেখেছি এবং তারপর সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এ বিষয়টি নিয়ে লিখব। সংবাদটি খুব বড় আকারের ছিল না।

কিন্তু আমার মনে হয়েছে, সংবাদের পেছনের গল্পটির গুরুত্ব সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে অনেক বেশি। বিশেষ করে আজকের রাজনীতি যখন নৈতিকতা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করেছে, এমন সময় এ গল্পটি বাংলাদেশে অনেক বেশি শিক্ষা প্রদান করতে পারে। আমাদের অনেক বিতর্কিত রাজনীতিকের হয়তো চোখ খুলে যেতে পারে।

রাজনীতি যে কতখানি দায়িত্ব আর নৈতিকতার জায়গা, বিশেষ করে একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্যের দায়িত্ববোধ যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ- এ গল্পটি সেই কথাই বলবে।

দক্ষিণ মধ্য ইউরোপের একটি দেশ স্লোভেনিয়া। একপাশে ইতালি, একপাশে অস্ট্রিয়া, আর একপাশে হাঙ্গেরি এবং আরেক পাশে ক্রোয়েশিয়া। দুই মিলিয়ন লোকসংখ্যার বসবাস ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার দেশটিতে। পার্লামেন্টারি পদ্ধতির সরকার সেখানে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে পাঁচ দলবিশিষ্ট জোট যার প্রধান লিরিক মারিয়ান সারেজ লিস্ট (এলএমএস) নির্বাচনে জয়ী হয়ে সেখানে মধ্য বামপন্থী সরকার গঠন করেছে। এলএমএস থেকেই প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছে। এলএমএসের অন্যতম নেতা দারি ক্রাজিক স্লোভেনিয়ার একজন এমপি হিসেবে নির্বাচিত হন। দিনগুলো তার ভালোই যাচ্ছিল; কিন্তু কালরাত্রি হয়ে তার কাছে ধরা দিল একটিমাত্র স্যান্ডউইচ।

দারি ক্রাজিক একদিন রাজধানী লব্রিয়ানার একটি সুপার শপে স্যান্ডউইচ কিনতে গিয়েছিলেন। তিনি তৈরি স্যান্ডউইচটি হাতে নিয়ে দাম দেয়ার লাইনে দাঁড়ালেন। সেই সময় অত বেশি খদ্দের ছিল না। লাইনে তিনি একাই ছিলেন। সুপার শপটিতে তখন তিনজন কর্মচারী কাজ করছিলেন।

কিন্তু তিনজন কর্মচারীই তখন নিজেদের মধ্যে খোশগল্প করতে ব্যস্ত ছিল। তারা খেয়ালই করেনি যে একজন খদ্দের লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। এমপি দারি ক্রাজিক ভীষণ বিরক্ত হলেন তাকে পাত্তা না দেয়ার জন্য। তিনি তিন মিনিট অপেক্ষা করে রাগ করে মূল্য না দিয়েই সুপার শপ থেকে বেরিয়ে যান। কেউ টের পাননি। এভাবে হয়তো চলে যেত বিষয়টি।

কিন্তু এমপি সাহেবের যখন রাগ কমে গেল, তখন তার কাছে বিষয়টি কৌতুকের বিষয় হয়ে দাঁড়াল। পরবর্তী সময়ে পার্লামেন্টারি কমিটির এক বৈঠকে হাস্যোচ্ছলে তিনি সুপার শপের স্যান্ডউইচ বিনা পয়সায় আনার বিষয়টি বলে ফেলেন। তার সহকর্মীরাও ঘটনাটি শুনে মজা পান এবং হাসাহাসি করেন। কিন্তু বিষয়টি সেখানেই থেমে থাকে না। অনুসন্ধানী রিপোর্টের মাধ্যমে বিষয়টি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রকাশিত হয়। তারপর সবকিছু উল্টে যায়।

হাসাহাসির গল্প আর থাকে না। একজন সংসদ সদস্যের দায়িত্বশীলতার ভূমিকাটি প্রধান হয়ে আসে গণমাধ্যমে। প্রশ্ন তোলা হয়- এমপি কোনো নৈতিকতা এবং দায়িত্বশীল পদের অপমান করেছেন কিনা। ক্রাজিকের রাজনৈতিক দল এলএমএস পার্লামেন্টারি অংশের প্রধান দারি ক্রাজিকের এহেন আচরণের নিন্দা জানান। তিনি এ ধরনের কাজকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ অভিহিত করে বলেন, একজন সংসদ সদস্যের দায়িত্বজ্ঞান পরিলক্ষিত হয়নি ক্রাজিকের কাজে। ঘটনা উল্টোদিকে দৌড়াচ্ছে দেখে এবং পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে ক্রাজিক দুঃখ প্রকাশ করেন। পরে পার্লামেন্টের সদস্যপদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি। ঘটনাটি মাত্র কয়েকদিন আগে ঘটেছে। ১৪ ফেব্রুয়ারি ক্রাজিক পদত্যাগ করেন।

কানাডার অন্য একটি ঘটনা বলি। আন্তর্জাতিকবিষয়ক সহযোগিতা মন্ত্রী মিস বেভ ওদা ২০১১ সালে কানাডার মন্ত্রী হিসেবে যুক্তরাজ্য সফর করেছিলেন। সফরকালে তিনি লন্ডনের দামি হোটেল সেভয়ে অবস্থান করেছিলেন। অবস্থানকালে তিনি অরগানিক একগ্লাস অরেঞ্জ জুস খেয়েছিলেন যার দাম ছিল ১৬ কানাডিয়ান ডলার। দামি হোটেলে অবস্থান এবং ১৬ ডলারের অরেঞ্জ জুস খাওয়ার বিষয়টি সিবিসি টেলিভিশনে রিপোর্ট হওয়ার পর মিস ওদাকে হাউস অব কমন্সের কমিটির জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হতে হয়।

এ কমিটি তার কাছ থেকে ১ হাজার কানাডিয়ান ডলার আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা করে। ওদা প্রকাশ্যে স্বীকার করেন জনগণের করের টাকায় তার দামি হোটেলে অবস্থান এবং দামি জুস পান করা ঠিক হয়নি। শুধু এ স্বীকারোক্তিতেই শেষ রক্ষা হয়নি বিষয়টির। এরপর মিস বেভ ওদা এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রিত্ব থেকে সরে দাঁড়ান।

দুটি বিষয়ই কেন তুলে ধরলাম, তা নিশ্চয়ই পাঠককে বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। পার্লামেন্টারি সরকার পদ্ধতিতে আমাদেরও ৩০০ সংসদ সদস্য আছেন। সঙ্গে আছেন আরও ৫০ জন মহিলা সংসদ সদস্য। একটি স্যান্ডউইচ বিনা পয়সায় খাওয়ার জন্য অথবা বিদেশে গিয়ে দামি হোটেলে দামি জুস পান করার জন্য আমাদের কোনো সংসদ সদস্যকে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা কি দায়ী করতে পারবে? বাংলাদেশের এমপিদের দায়িত্বশীল আচরণের গল্প কি আমাদের ঝুলিতে আছে? আমরাও কি জনগণের টাকা খরচের বিষয়ে এমপি সাহেবদের কখনও সংযত হতে দেখেছি? বাংলাদেশের সংসদ সদস্যদের আমরা তো অন্যভাবে দেখি।

বিলাসবহুল জীবনব্যবস্থা, দায়িত্বশীল আচরণের অভাব, জনগণের করের টাকা খরচের বিষয়ে কৃচ্ছ্র না করা, ক্ষমতার অপব্যবহার- এসব কি আমাদের চোখে কখনও বড় করে দেখার উপায় আছে? আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা মেনেই নিয়েছে যে, একবার এমপি হলে রাষ্ট্রের এবং সমাজের সব সুযোগ-সুবিধা তাদের পদযুগলের নিচে চলে আসবে। দায়িত্বশীলতা নয়, বরং তাদের যখন যেভাবে চলার ইচ্ছে তারা সেভাবেই চলার ক্ষমতা রাখেন।

বিনা পয়সায় স্যান্ডউইচ কেন, স্যান্ডউইচের পুরো দোকানটাই এমপি সাহেবের বাড়িতে চলে এলেও সমাজ এবং মিডিয়ার চোখে কখনও দৃষ্টিকটু লাগবে না। এমপি সাহেবদের বাসায় বিনা অর্থে কী কী মালামাল বা উপঢৌকন আসছে, তার কি কোনো হিসাব আমাদের কোনো সংবাদমাধ্যম কখনও প্রকাশ করেছে? সংবাদমাধ্যম তো এ দেশেরই প্রতিষ্ঠান। এ দেশের প্রচলিত আবহাওয়াতেই তো তারা লালিত-পালিত। তাদের চোখে তাই খারাপ লাগবে কেন? আর লাগলেই বলা যাবে- এমন ভাবার দুঃসাহস তারা দেখাবে কেন?

কোনো সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত কোনো বিষয় টেনে আনতে চাই না। নিশ্চয়ই অনেক হৃদয়বিদারক ঘটনা আছে। সমাজ, রাষ্ট্র, জনগণ যাদের মনের কোথাও নেই, তেমন ব্যক্তিও আমাদের দেশের সংসদ সদস্য হয়ে যান। বহাল তবিয়তেই তারা থাকেন। সমাজে টুঁ শব্দটিও নেই। সমাজ মেনে নিয়েছে এসব। তাই ব্যক্তিগত কারও কোনো ঘটনা এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। পুরো চিত্রটি বদলাতে হবে। দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।

দায়িত্বশীল পদে গেলে ব্যক্তিকে যে আরও বেশি সতর্ক হতে হয়- এমন ধারণা বাংলাদেশ থেকে প্রায় মুছেই গেছে। বরং উল্টোটা এখানে বিদ্যমান। জনপ্রতিনিধিদের নির্বাচনের আগেই শুধু জনগণের প্রয়োজন, নির্বাচন শেষে জনগণ হয়ে পড়ে তাদের কাছে আপদের মতো। জনগণের সুখ-দুঃখের সাথী নয়- জনগণের করের টাকায় বিলাসবহুল জীবনব্যবস্থা পরিচালনা করার প্রতিযোগিতা থাকে বাংলাদেশের অনেক সংসদ সদস্যের মধ্যে।

উপরে উল্লিখিত গল্প দুটির একটি তো এ সেদিনের গল্প। মিস ওদার গল্পটা হয়তো একটু পুরনো। কিন্তু তাদের রাষ্ট্র এবং সমাজব্যবস্থা এমনভাবেই আছে। বরং আরও উন্নত হয়েছে উত্তরোত্তর। যারা এসব দেশে বসবাস করেন, তারা প্রতিনিয়ত এসব ঘটনার সম্মুখীন হন। এসব দেশের কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারকে দোকানের খদ্দরদের সঙ্গে লম্বা লাইনে অপেক্ষা করতে দেখা যায়।

পয়সা না দিয়ে কোনো পুলিশ অফিসার কখনও কোনো দোকানের কোনো জিনিস নিয়েছে- এমন ইতিহাস তাদের দেশে নেই। আর আমরা গিয়েছি পিছিয়ে। পাজামা-পাঞ্জাবি পরা শিক্ষকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সততার সঙ্গে বেড়ে ওঠা সাদাসিধে রাজনীতিবিদরা হঠাৎ যেন পাল্টে গিয়েছে আমাদের দেশে। রাজনীতি যেন তাদের কাছে হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থবৈভব বাড়ানোর মহা অস্ত্র। বাংলাদেশের সংসদ সদস্যদের অপকীর্তি নিয়ে অনেক গল্পগাথা থাকলেও কোনো ভুল বা অন্যায় কাজের জন্য পদত্যাগের ইতিহাস বাংলাদেশ এখনও প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্যবান হতে পারেনি। ক্রাজিক আর ওদার উদাহরণ যদি আমাদের দেশের সংসদ সদস্যের মনে বিন্দুমাত্র দায়িত্বশীল আচরণের ভূমিকা জাগ্রত করতে পারে তবেই আমার লেখাটি সার্থক হবে।

ভালো কাজের অনেক উদাহরণ হয়তো আমাদের দেশে আছে। বরং বলব তেমনটাই বেশি। বেশির ভাগ সংসদ সদস্য ও অন্যান্য জনপ্রতিনিধিই জনগণের প্রকৃত বন্ধু বাংলাদেশে। ভালো কাজের অনেক উদাহরণ আছে বাংলাদেশে; কিন্তু যা নেই তা হল, মন্দ কাজ করে শাস্তি পাওয়ার উদাহরণ। দায়িত্বশীল জায়গা থেকে ছোট ভুলকেও যে অনেক বড় করে দেখতে হয়, তা আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা একেবারে ভুলেই গেছেন। বিষয়টি এখন আমাদের উপলব্ধি করার সময় এসেছে। এখনও হয়তো শোধরানোর সুযোগ আছে। তা না হলে অন্ধকার গ্রাস করবে সর্বত্র। দায়িত্বশীল পদ কিংবা জনপ্রতিনিধি পদই শুধু নয়- পচে গেছে আমাদের সমাজের অনেকাংশই।

এখানে ক্ষমতাশালীরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে যাচ্ছেন, আর তা সহ্য করছে সমাজের অন্যরাও। প্রতিবাদ নেই কোথাও। একজন জনপ্রতিনিধি ভুল করলেও তা তুলে ধরতে দ্বিধা করছে সংবাদ মিডিয়াগুলো। এটুকু ভুল যেন করতেই পারে- এমনভাবে সবকিছু দেখা হচ্ছে এখানে। কেউ ভুল করছে আর অন্যরা এই ভুল ধরিয়ে দিচ্ছে না। কী করে হবে তাহলে আমাদের দেশ উন্নত? কয়েকটি টাকার অঙ্কে কি শুধু একটি দেশ উন্নত হতে পারে? নিশ্চয়ই নয়।

উন্নত হতে হবে আমাদের মন, সমাজ সর্বত্র। সবচেয়ে বেশি উন্নত হতে হবে জনপ্রতিনিধিদের। শুধু অর্থে নয়, উন্নত হতে হবে মননে এবং সংস্কৃতিতে। তবেই না আমাদের দেশ উন্নত দেশ হবে। জবাবদিহিতা থাকতে হবে জনপ্রতিনিধিদের কাজের এবং আচরণের। কেননা তারাই রাষ্ট্র এবং সমাজের নিয়ন্ত্রক। তাদের উদাহরণেই বদলে যাবে আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র- উদিত হবে নতুন সূর্য।

মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক

[email protected]