কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইতি ও নেতিবাচক দিক

  ফজলে রাব্বী খান ১৪ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইতি ও নেতিবাচক দিক

ড্যান ব্রাউনের ‘অরিজিন’ উপন্যাসটি যারা পড়েছেন তারা হয়তো কিছুটা ধারণা পেয়ে থাকবেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌরাত্ম্য সম্পর্কে। ‘অরিজিন’ উপন্যাসের কাহিনী কাল্পনিক হলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাস্তব অগ্রগতি এখন কল্পনাকেও হার মানায়।

মানব সভ্যতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কতখানি দানবীয় গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, তা বোঝা যায় গত বছরের ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একটি ঘটনায়। গত বছর ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লব’বিষয়ক একটি শুনানিতে পার্লামেন্টারিয়ানদের সঙ্গে আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে আমন্ত্রণ জানানো হয় ‘পিপার’ নামের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন এক রোবটকে।

এ সময় রোবট পিপার সংশ্লিষ্ট বিষয় ছাড়াও নৈতিকতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো ‘মানবীয়’ বিষয়েও আলোচনায় অংশ নেয়। পার্লামেন্টারিয়ানদের এক প্রশ্নের জবাবে পিপার অবশ্য তাদের আশ্বস্ত করেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কখনই মানবজাতির প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াবে না। পিপারের এ উত্তরের ওপর কতখানি আস্থা রাখা যাবে, সেটি অবশ্য ভাববার বিষয়।

একসময় কম্পিউটারকে সংজ্ঞায়িত করা হতো বুদ্ধিহীন একটি যন্ত্র হিসেবে, যা কিনা কেবল মানুষের দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে পারে। তবে কম্পিউটারের সেই সংজ্ঞা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে।

কম্পিউটার এখন মেশিন লার্নিং ও ডিপ লার্নিং প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের মতোই বুদ্ধিমান হয়ে উঠছে। অতীতে কম্পিউটার অনেক যান্ত্রিক কাজে মানুষকে পেছনে ফেললেও ‘কগনিটিভিটি ও ক্রিয়েটিভিটির’ মতো মানবীয় বিষয়গুলো ছিল কম্পিউটারের ধরাছোঁয়ার বাইরে। সেই ধারণাও এখন বদলে যাচ্ছে, লেখালেখি বা চিত্রকর্মের মতো অতিসংবেদনশীল সৃষ্টিশীল বিষয়ও এখন কম্পিউটার দখল করে নিচ্ছে।

অথচ মানুষ হলেই যে সবাই শিল্প-সাহিত্যের মতো বিষয়ে সৃষ্টিশীলতা দেখাতে পারেন, এমনটি নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন সঙ্গীত সৃষ্টি করছে, ছবি আঁকছে, উপন্যাসও লিখছে। জাপানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রচিত একটি উপন্যাস মৌলিক সাহিত্য হিসেবে পুরস্কারের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী দিনের বেস্টসেলার বইয়ের পুরস্কারগুলো দখল করে নেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অ্যালগোরিদম।

সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্বারা আঁকা একটি চিত্রকর্ম ৪,৩২,০০০ ডলারে বিক্রিও হয়েছে। চিত্রকর্মটির নিচে মানবশিল্পীর মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অ্যালগোরিদম তার একটি স্বাক্ষরও করে দিয়েছে।

সাংবাদিকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পদচারণা। ইতিমধ্যে নিউইয়র্ক টাইমস, এপি, রয়টার্সের মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সফটওয়্যারকে অটোমেটেড জার্নালিস্ট বা সাংবাদিক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে।

জাপানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সংবাদ সংস্থা চালু হয়েছিল ২০০৮ সালেই, নতুন ধারার এই সাংবাদিকরা মানুষের চেয়ে কোনো দিকেই কম দক্ষ নয় বরং দ্রুততা এবং নির্ভুলতা মানুষের চেয়েও বেশি। চীনে ইতিমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ভার্চুয়াল সংবাদ পাঠককে দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা হচ্ছে। এসব ঘটনা থেকে সহজেই বোঝা যায়, আগামীর গণমাধ্যম শিল্পের গতিপথ কোনদিকে প্রবাহিত হচ্ছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই ভয়াল থাবার প্রভাব ইতিমধ্যেই কর্মবাজারে পড়া শুরু হয়ে গেছে। টেক জায়ান্ট কোম্পানি অ্যাপলের হার্ডওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফক্সকন ইতিমধ্যে ৬০ হাজার কর্মী ছাঁটাই করে তার পরিবর্তে রোবটকে কর্মী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। চীনের শিল্প-কারখানাগুলোতে রোবটের ব্যবহার বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে।

গত বছর চীনের কারখানাগুলোয় রোবট ব্যবহারের হার বৃদ্ধি পেয়েছে ৩০.৮ শতাংশ। ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম’ তাদের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২২ সালের ভেতরে রোবটের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি মানুষ চাকরি হারাবে, মানুষের জায়গা দখল করে নেবে রোবট।

আরেক গবেষক ম্যাককিনস জানিয়েছেন, ২০৩০ সালের ভেতর বিশ্বের ৮০ কোটি চাকরি দখল করে নেবে রোবট। বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি যে কেবল চাকরি দখল করছে তা নয়, ফরচুন ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের অন্তত ৫০০টি নেতৃত্বস্থানীয় কোম্পানি তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া ছেড়ে দিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে, অর্থাৎ যন্ত্র এখন মানুষকে নিয়োগ দিচ্ছে!

তবে অনেক বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে শুধু মানবজাতির চাকরি হারানোর কারণ হবে তা নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে নতুন পেশারও সৃষ্টি হবে।

ডাটা সায়েন্টিস্ট, মেশিন লার্নিং ইঞ্জিনিয়ার, আইওটি এক্সপার্টের মতো বিভিন্ন পেশা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থানের ফলে সৃষ্টি হলেও উঁচুস্তরের এ পেশায় তৃতীয় বিশ্বের মানুষের নাগাল পাওয়া কোনোক্রমেই সহজ হবে না। উঁচুমানের কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন এসব পেশায় একচ্ছত্র আধিপত্য করবে উন্নত বিশ্বের উঁচুতলার মানুষজন, আর বেকার হবে গরিবরা।

প্রয়াত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং, জাতিসংঘের প্রয়াত মহাসচিব কফি আনান অনেক আগেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান সম্পর্কে আমাদের হুশিয়ার করেছিলেন। বর্তমান সময়ের আলোচিত প্রযুক্তিবিদ ইলন মাস্ক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নকে ‘Summoning the Demon’ অর্থাৎ ‘দৈত্যকে ডেকে আনার শামিল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

তার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবজাতির জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর হুমকি- এমনকি এটি পারমাণবিক বোমার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে বড় বিপদ হল, এ প্রযুক্তি একসময় মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে, নিজেই একটি সত্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন একটি চ্যাটবটের প্রকল্প ঠিক একই কারণে বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল।

ফেসবুকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন চ্যাটবট ‘মূল প্রোগ্রামের’ বাইরে নিজ থেকে আলাদা একটি ভাষায় মেসেজ আদান-প্রদান শুরু করে দিয়েছিল, যার ওপর ওই প্রকল্পের বিজ্ঞানীদের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। এ ঘটনার পর ফেসবুক কর্তৃপক্ষ প্রকল্পটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়।

চীনের অতিপ্রাচীন ‘গো’ খেলায় পেশাদার কিংবদন্তি খেলোয়াড় লি সিডলকে টানা চারবার হারিয়েছে গুগল ডিপ মাইন্ডের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ‘আলফা গো’। এ ঘটনায় স্পষ্ট হয়, আগামী দিনে বুদ্ধিভিত্তিক বিষয়গুলোতেও মানুষকে ছাড়িয়ে যেতে পারে কম্পিউটার।

মানুষ প্রযুক্তি সৃষ্টি করে তার পরিশ্রম লাঘবের জন্য। মানুষের সঙ্গে যন্ত্রের পার্থক্যই এখানে। যন্ত্র যদি ক্রমশ মানবীয় গুণাবলি অর্জন করতে শুরু করে, মানুষ এবং যন্ত্রের বিরোধটা শুরু হবে এখান থেকেই।

অনেকের ধারণা- আগামী দিনে মানুষের কাজের পরিধি কমে গিয়ে মানুষ হয়ে পড়বে ক্রমশ কর্মশূন্য। বুদ্ধিমান যন্ত্রের মাধ্যমে যে বিপুল সম্পদ উপার্জিত হবে তার ওপর কর ধার্য করে এবং সেই অর্থ মানবজাতির ভেতর বণ্টন করে মানবসভ্যতায় সমন্বয় করা হবে। কর্মহীন যে জীবনের আশঙ্কা আমাদের দিকে উঁকি দিচ্ছে, তা একেবারে অমূলক নয়।

সেই কর্মহীন জীবন কতটা সুখকর হবে অথবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি আমরা কতটা মানবকল্যাণে কাজে লাগাতে পারব, সেটিই আসল চিন্তার বিষয়। তবে অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায় - বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উদ্ভাবিত নানা প্রযুক্তি মানবজাতির কল্যাণের তুলনায় ‘শোষণ’ ও ‘ধ্বংসের’ কাজে প্রয়োগ হয়েছে বেশি। ড্যান ব্রাউন তার উপন্যাসে দেখিয়েছেন মানবসভ্যতাকে ক্রমশ আচ্ছন্ন করে ফেলছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

উপন্যাসের ঘটনা কাল্পনিক হলেও আসল বাস্তবতা হচ্ছে আমরা অনেকটা অজান্তেই প্রবেশ করছি সভ্যতার আরেকটি স্তরে, যেখানে মানবসভ্যতার সঙ্গে সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে, যার স্রষ্টা মানুষ নিজেই।

ফজলে রাব্বী খান : প্রকৌশলী

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×