লোকসভা নির্বাচন-২০১৯

ওবিসি ভোটের মেরুকরণের ওপর নির্ভর করছে বিজেপির ভাগ্য

  অজয় গুদাভারথি ১৫ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

লোকসভা নির্বাচন-২০১৯

চলমান লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের নির্বাচনী কৌশল চলছে এর বহু পুরনো নেহরু কৌশল ‘আপসরফার রাজনীতি’র ওপর ভর করে। অন্যদিকে শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) চলছে রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘের কৌশল ‘মেরুকরণ বা বিভক্তির রাজনীতি’র ওপর ভর করে।

যেমনটি গত পাঁচ বছরে দেখা গেছে বহু সংসদীয় এলাকায়- জাতপ্রথা, ধর্ম ও আঞ্চলিকতা নিয়ে নানা ধরনের সামাজিক উত্তেজনা পাকিয়ে তোলা হয়েছে। এসব উত্তেজনা ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিজেপির রাজনৈতিক কৌশলের ভিত্তি তৈরি করেছে।

এটি মেরুকরণের মাধ্যমে সামাজিক সম্পর্কের নানা কুসংস্কার এবং সামাজিক বিভক্তির চিত্র তুলে ধরে সেগুলোর সমর্থনকে উৎসাহিত করেছে। কাশ্মীরকে রেফারেন্সের কেন্দ্রে রেখে, এই কৌশলের অংশ হিসেবে হিন্দু ও মুসলমানদের মাঝে ধর্মীয় বিভক্তি বহাল রাখার চেষ্টা নেয়া হয়েছে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা এবং রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরের মাধ্যমে, যাতে সাম্প্রদায়িকতা ও জাতীয়তার মধ্যকার পার্থক্য ভেঙে ফেলা যায়।

সব কৌশলের সমষ্টি : দেখা গেছে, জাতপ্রথার ভিন্নতা বিবেচনায় নিয়ে টেকসইভাবে দলিতদের প্রান্তিকীকরণ করা হয়েছে, যা শুরু হয়েছে ২০১৬ সালের শুরুর দিকে গুজরাটের উনায় হামলায় রোহিত ভেমুলার মৃত্যুর পর শিডিউলড কাস্টস অ্যান্ড ট্রাইবস (নৃশংসতা প্রতিরোধ) অ্যাক্ট এবং তাদের সংরক্ষণের ব্যবস্থাকে হালকা করার চেষ্টার মধ্য দিয়ে।

এ চেষ্টাটি নেয়া হয়েছে হিন্দু বিভিন্ন জাত এবং অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণীর (আদার ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস- ওবিসি) ভোট নিজেদের পক্ষে নিশ্চিত করার জন্য। জাতপাতের হিন্দুদের ভোট চাওয়া হয়েছে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বলদের জন্য উচ্চ জাতের ওপর ১০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণের ভিত্তিতে।

সংখ্যায় কম হলেও কিন্তু উঁচু জাতের হিন্দুদের ভোট নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে একটি পার্থক্য তৈরি করা যাবে, যদিও ২০১৯ সালে বিজেপির ভাগ্য ওবিসির ওপর নির্ভর করছে।

যদিও ওবিসি অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্ত একটি বিসমজাতীয় গ্রুপ, তারপরও বিজেপি ঘরানার মধ্যে থেকে ওবিসির একটি টেকসই আন্দোলন হয়েছে। এই পরিবর্তন এবং নিজে পিছিয়ে পড়া জাতের বলে নরেন্দ্র মোদির বাগাড়ম্বর ২০১৪ সালে তাকে ক্ষমতায় বসানোর ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও সহায়তা করেছে।

ওবিসির এই মোড় পরিবর্তন চলমান থাকবে বড় জাতীয় ও আঞ্চলিক দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী সম্ভাবনাকে নিশ্চিত করার জন্য। আশির দশকে ওবিসি পেছনে থেকে অনেক আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের অবস্থান মজবুত করেছে।

নব্বইয়ের দশকের পর সামাজিক ন্যায়বিচারের রাজনীতিকে উদ্দীপ্ত করা এবং ‘দ্বিতীয় গণতান্ত্রিক উচ্ছ্বাস’ বিজেপির দিকে ওবিসির সমর্থনের মোড় ঘোরানোর পথ উন্মোচন করেছে। একে ‘সেকুলার উচ্ছ্বাস’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, কারণ ওবিসি কোটা সংরক্ষণ হিন্দু-মুসলিম ওবিসি একসঙ্গে আনার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল তাদের স্বার্থ ও সম্ভাব্য উদ্দীপনাকে এক করার মধ্য দিয়ে।

বিজেপির দিকে ওবিসির সমর্থনের মোড় ঘোরার বিষয়টি বুঝতে হবে জাতপ্রথার ক্ষেত্রে ওবিসির বিশেষ অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে এবং গত তিন দশকে তাদের ভোগ করা তুলনামূলক অর্থনৈতিক গতিশীলতার ওপর ভিত্তি করে।

কম কর্তৃত্বময় ওবিসি জাতগুলো বর্তমানে ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রজন্ম হিসেবে চিহ্নিত, যারা গ্রামীণ এলাকা থেকে শহর পর্যন্ত গতিশীলতা তৈরি করছে এবং তারা শহর ও উপশহর এলাকার নিম্নমধ্যম শ্রেণীর বেশির ভাগ জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করছে।

গ্রামীণ এলাকায় নিয়মিত হয়ে পড়া কৃষি সংকট নিয়ে কৃষকদের ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকের আন্দোলন পরিবর্তিত হয়েছে ওবিসি পরিচিতির রাজনীতিতে, যা তাদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে যোগদানের ওপর জোর দিয়েছে। এ ধরনের সামাজিক আসনগুলোতে ‘নতুন ভারত’, চাকরি তৈরি, দ্রুত নগরায়ণ ও স্মার্ট সিটির বাগাড়ম্বরের মধ্য দিয়ে বিজেপি দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছে।

১৯৯০-এর দশকের অর্থনৈতিক সংস্কারের পর বড় ধরনের আন্তঃপ্রজন্ম গতিশীলতা থেকে উপকৃত হয়েছে ওবিসি। বর্তমানে তারা শোচনীয় দারিদ্র্য থেকেও দারিদ্র্যে বসবাস করার বিষয়টি উপলব্ধি করছে। এমন অনিশ্চিত একটি অবস্থান তাদের আকৃষ্ট করছে কর্পোরেট প্রক্রিয়া এবং নতুন সুযোগ-সুবিধার দিকে, যা বিশ্বায়নের অর্থনীতি প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে।

হিন্দুত্বের আবেদন : তাদের জাতপ্রথার অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে আরও যে বিষয়টা উল্লেখ্য তা হল, ওবিসি দলিতদের মতো কখনও হিন্দু ঘরানার বাইরে কোনো প্রোগ্রাম নেয়নি। এতে ওবিসি রাজনীতিকে হিন্দি কেন্দ্রে প্রতীকে পরিণত করা রাম মনোহার লোহিয়া এবং বিআর অম্বেদকরের মধ্যকার বিভক্তিগুলো আংশিক স্পষ্ট হয়ে গেছে।

যেখানে অম্বেদকর প্রভাবান্বিত ছিলেন যে, জাতপ্রথা অপরিহার্যভাবে হিন্দুধর্মের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং দলিতদের মুক্তি দেয়ার একমাত্র পথ ছিল রূপান্তর, সেখানে লোহিয়া জাতপ্রথাভিত্তিক বৈষম্যের সমালোচনাকে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কখনও একে হিন্দুধর্মের সমালোচনার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেননি।

হিন্দুত্বে উদ্বুদ্ধের বিজেপির শক্ত অবস্থান যে প্রতীক তুলে ধরে তা হল, দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোসহ দেশজুড়ে হিন্দু পরিচয় ওবিসিতে প্রবেশের আবেদন তৈরি করে। এটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে স্থানীয় সাংস্কৃতিক বাগদারা, যা প্রথমদিকে ছড়ানো হয়েছিল বিভিন্ন দল কর্তৃক, যেমন- সমাজবাদী পার্টি নিজেদের প্রচারণায় ইংরেজি এবং কম্পিউটারের পরিচিতির বিরুদ্ধে।

ওবিসিও একটি ‘প্রাকৃতিক’ নির্বাচকমণ্ডলীতে পরিণত হয়েছে, হিন্দি ভাষাকে একমাত্র সরকারি ভাষা করার বিজেপির প্রচারণার জন্য, যা এলিটবিরোধী রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরের পর্যায়ে পড়ে।

এছাড়া পিছিয়ে পড়াদের প্রতিনিধিত্ব তৈরি করার জন্য ওবিসিকে ভেতর থেকে উপদলে বিভক্তির আন্দোলনের সামনের কাতারে রয়েছে বিজেপি। দলটি উত্তর প্রদেশে এটি করতে ভালোভাবেই সফল হয়েছে, যা ২০১৭ সালের রাজ্যসভা নির্বাচনে বিজেপির বিশাল জয়ের প্রধান কারণগুলোর একটি। এটি আরও পিছিয়ে পড়া ওবিসিদের প্রভাবশালী ওবিসিদের পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বেরিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করে।

যেমন- উত্তর প্রদেশে যাদবদের এবং বিহারে কুর্মিশদের। ছোট ও কম প্রভাবশালী ওবিসির ব্যক্তিদের আরও বেশি আসন দেয়ার অদ্বিতীয় সুযোগ আছে বিজেপির হাতে। কারণ দলটি তুলনামূলক নতুন এবং বিভিন্ন রাজ্যে এর নেতৃত্বের বিস্তার ধীরে ধীরে ঘটছে।

আরও যে বিষয়টি বিজেপির জন্য সুবিধার তা হল, বিজেপি নিজেদের নির্বাচনী কৌশলের কারণে মুসলমানদের কোনো আসন দিচ্ছে না, যা অন্য দলগুলো দিচ্ছে। ফলে অন্য ওবিসির জন্য বেশি আসন রিজার্ভ রাখা তাদের জন্য সহজ।

আপাত স্ববিরোধীভাবে, যেখানে প্রভাবশালী ওবিসি যেমন- যাদবরা সমাজতান্ত্রিক ধারার রাজনীতির দিকে ঝুঁকেছে, সেখানে অন্য ওবিসিতে থাকা নিম্নজাতের গ্রুপগুলো পেশিশক্তির হিন্দুত্ববাদী ধারার রাজনীতিতে ঝুঁকেছে।

বিজেপির নির্বাচনী সম্ভাবনা নির্ভর করছে এই নতুন অভিমুখের ওবিসির ওপর এবং উত্তর প্রদেশে সমাজবাদী ও বহুজন সমাজবাদী পার্টির জোটের মুখে কীভাবে এর কৌশল এগিয়ে নেয়া হয় তার ওপর।

দ্য হিন্দু থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম

অজয় গুদাভারথি : জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পলিটিক্যাল স্টাডিজের সহকারী অধ্যাপক

ঘটনাপ্রবাহ : ভারতের জাতীয় নির্বাচন-২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×