মিঠে কড়া সংলাপ

অতি উৎসাহীদের ঠেকান!

  মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন ১৮ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন
মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন

সরকারের বিভিন্ন স্তরে অতি উৎসাহীদের দৌরাত্ম্য প্রকট আকার ধারণ করেছে। সরকারি পদ-পদবিধারীদের প্রায় সবাই বর্তমানে নিজেদের সরকারি দলের প্রতিভূ হিসেবে দাবি করছেন! ফলস্বরূপ সরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

তারা সরকারি দলের লোক পরিচয়ে বিভিন্ন লাভজনক স্থানে পদ-পদবি বাগিয়ে নিয়ে সেখানে জেঁকে বসে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ঘুষ-দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছেন। সরকারি দফতরগুলোয় এই শ্রেণীর ব্যক্তির অভাব না থাকলেও সরকারের হাইকমান্ড এসব জানে কিনা তা আমাদের জানা নেই।

তবে এই শ্রেণীর সরকারি পদ-পদবিধারী ব্যক্তিরা যে সরকারের জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে হুমকি হয়ে উঠেছেন, সে কথাটি বোধহয় বলাই যায়। গত ১২ মে একটি জাতীয় পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার হেডলাইন (লিড নিউজ) দেখলেও সেই কথাটিরই প্রমাণ মিলবে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না, অন্তহীন হয়রানি; অতিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা, সরকারের সর্বোচ্চ মহলের হস্তক্ষেপ কামনা ব্যবসায়ী নেতাদের।’

এসব দেখেশুনে মনে হচ্ছে, একশ্রেণীর সরকারি কর্তাব্যক্তিদের কাছে দেশের ব্যবসায়ী সমাজ তথা জনসাধারণ অসহায়। দেশের নিরীহ মানুষকে যেন ওই শ্রেণীর কর্তাব্যক্তিদের খোরাক বানিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আর রূপকথার রাক্ষসের মতো ওই শ্রেণীর কর্তাব্যক্তিরা যেখানে টাকার গন্ধ পাচ্ছেন সেখানেই হানা দিচ্ছেন।

টাকা না দিলে যেনতেনভাবে দোষত্রুটি বের করে জনহয়রানি করা হচ্ছে। অথচ সরকারি চেয়ারে বসা ওই শ্রেণীর ব্যক্তিদের সবাই যে সরকারদলীয় সমর্থক এমনটিও কিন্তু নয়। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, তাদের অনেকেই অন্য দল বা মতের অধিকারী হয়েও বর্তমানে সরকারদলীয় লোক সেজে বসে আছেন।

আমার জানামতে একটি ঘটনায় বিশেষ শ্রেণীর একটি সরকারি চাকরিতে প্রার্থীর অতীত পরিচয়ে তিনি কোন্ দলের অনুসারী তা জানার প্রয়োজন থাকায় তিনি বর্তমান সরকারবিরোধী দলীয় মত-পথের পরিবারের সদস্য হওয়ায় তৃণমূল থেকে তাকে ছাড়পত্র দেয়া হয়নি। কিন্তু পরে তিনি ঠিকই তা ম্যানেজ করে বর্তমানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরিরত আছেন।

তাতেও হয়তো আপত্তি ছিল না, যদি না একশ্রেণীর সরকারি চাকরিজীবী বাড়াবাড়ি করে সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্টের পথে যেতেন। কারণ একশ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের গায়ে সরকারদলীয় নামাবলি চাপিয়ে ঘুষ-দুর্নীতি বাণিজ্যসহ নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নে জনগণের ওপর অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছেন।

সরকার বিভিন্ন দফতরে বিভিন্ন ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করেছে। এভাবে রাজউক, কাস্টমস, আয়কর ইত্যাদি বিভাগের প্রধান হিসেবে যাদের নিয়োগদান করা হয়েছে তারা ছাড়াও ওইসব স্থানে আরও প্রচুর কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে। আর গোলমালটা সেখানেই। কারণ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দফতরের প্রধান হিসেবে যাচাই-বাছাই করে নিয়োগ দেয়া হলেও সেখানকার অন্যান্য পদ-পদবিতে চেষ্টা-তদবির করে অনেক মতলবাজ ঢুকে পড়েছেন।

আর এসব মতলববাজই সরকারের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। কোনো একটি সংস্থার প্রধান ব্যক্তি অত্যন্ত সৎ ও নিষ্ঠাবান হলেও দেখা যাচ্ছে তিনি ওইসব মতলববাজকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারায় তার সংস্থার অনেক বদনাম হচ্ছে। আর সেই সঙ্গে সরকারেরও বদনাম হচ্ছে।

কারণ ওই শ্রেণীর মতলবাজরা দাপটের সঙ্গে অন্যায় কার্যক্রমে লিপ্ত থাকায় তাদের হাতে জনহয়রানি বেড়ে চলেছে। আর এসব নিয়ে সরকারকেও কম বিব্রত হতে হচ্ছে না। থানা পুলিশ থেকে শুরু করে সেবাধর্মী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন- রাজউক, ওয়াসা, গ্যাসসহ বিভিন্ন স্থানে এখনও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে মনে হয় না। কারণ আশীর্বাদপুষ্ট একশ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারী তা হতে দিচ্ছেন না।

তারা মনে করা শুরু করেছেন যে, তাদের মর্জিমাফিকই তারা সরকারি কাজকর্ম চালিয়ে যাবেন। সেক্ষেত্রে তাদের কাজ গণমুখী হল কিনা তা ভেবে দেখছেন না। শুধু ব্যক্তিগত, শ্রেণীগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই তারা ফায়দা হাসিল করে চলেছেন। এভাবে জনহয়রানির ক্ষেত্রে যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন, পত্রপত্রিকায় বা মিডিয়ায় তাদের পরিচয় প্রকাশিত হলেও খুব কম ক্ষেত্রেই তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

আবার অনেক ক্ষেত্রে তা করা সম্ভবও হচ্ছে না। যেমন প্রশাসনিক ক্যাডারের এক কর্মকর্তাকে যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ডেপুটেশনে নিয়োগ দেয়া হয়, তখন তিনি যদি কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেন বা ব্যক্তিগত ইগো কোনো মানুষের ওপর চাপিয়ে দেন অথবা যেখানে তাকে নিয়োগ দেয়া হল, সেই প্রতিষ্ঠানের মতলববাজদের দ্বারা পরিচালিত হয়ে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করে ফেলেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে কে কীভাবে ব্যবস্থা নেবেন? আর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিচারিক ক্ষমতা, দক্ষতা বা যোগ্যতাই বা কে যাচাই করে দেখবেন?

সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র যদি এসব কর্মকর্তার মনমানসিকতা এবং বিচারিক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত, শিক্ষাগত যোগ্যতা যথাযথভাবে নিরূপণ না করেই তাদের চেয়ারে বসায়, তাহলে সেসব ক্ষেত্রে জনগণ যে সুবিচার বঞ্চিত হবেন, সে কথাটিও বোধহয় সঠিক।

অনেক ক্ষেত্রে আবার এমনটিও দেখা যাচ্ছে যে, কোনো ব্যক্তির আবেদন-নিবেদন, কাগজপত্র যথাযথ বিচার-বিবেচনা না করেই অনেকটা গায়ের জোরে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। আর এভাবে একশ্রেণীর কর্মকর্তা সমানতালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে চলেছেন।

যথাসময়ে সিদ্ধান্ত না দিয়ে আবেদন-নিবেদন ফেলে রেখে বা ফাইল আটকে রেখে জনহয়রানি তো একটি নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব ক্ষেত্রে জনগণকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হীন মানসিকতার শিকার হয়ে ঘুষের দাবি মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

অথচ এসব বিষয়ে কেউ কিছু বলতে গেলে বা মুখ খুললে তারই দোষ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী একদম সঠিক! কারণ তারা সরকারি লোক এবং সরকারদলীয় আশীর্বাদে নিয়োগপ্রাপ্ত। এ অবস্থায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো কিছু বলে-কয়ে লাভও নেই।

যদিও গত ১২ মে তারিখের জাতীয় পত্রিকাটির লিড নিউজে তাদের সম্পর্কেই বলা হয়েছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়ে কোনো কোনো কর্মকর্তা স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠছেন; তেমন অনেক প্রমাণই চেষ্টা করলে খুঁজে বের করা সম্ভব।

এখন প্রশ্ন হল, ‘বিড়ালের গলায় ঘণ্টাটি বাঁধবেন কে?’ এই শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর থেকে আশীর্বাদের হাত তুলে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে আগেভাগেই ব্যবস্থা নিতে না পারলে রাফি হত্যা ঘটনার মতো অনেক ঘটনাই যে আগেভাগে রোধ করা যাবে না, সে কথাটিও বোধহয় বিবেচনা করার সময় এসে গিয়েছে।

মনে রাখা প্রয়োজন, চোর পালালে বুদ্ধি বাড়িয়ে লাভ নেই। এ অবস্থায় সরকারের বিভিন্ন স্তরে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এখনও যারা নিজেদের সরকারদলীয় প্রতিভূ হিসেবে পরিচয় দিয়ে বুক ফুলিয়ে ব্যক্তিগত এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে চলেছেন এবং এভাবে তারা নিজেদের সবকিছুর ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে এখনই একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন বলেই মনে হয়।

উপসংহারে একটি সতর্কবাণী উচ্চারণ করেই লেখাটি শেষ করতে চাই। আর সে সতর্কবাণীটি হল, ইংরেজিতে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন বলে একটি শব্দ আছে, যার অর্থ হল ‘যে বস্তু তার সৃষ্টিকর্তার বিনাশের কারণ হয়।’ যুগে যুগে দেখা গেছে অনেক সরকারেরই মূল ক্ষতি হয়েছে নিজেদের লোকজন দ্বারা। আর বর্তমানে যেহেতু সরকারের সব পর্যায়ে, সব স্তরের প্রায় সবাই নিজেদের সরকারদলীয় প্রতিভূ হিসেবে দাবি করছেন, সুতরাং ভয়টা সেখানেই।

আর সে ভয়ের মূল কারণ হল, দলীয় নামাবলি গায়ে চাপানো ওইসব ব্যক্তি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিজেদের ইচ্ছা, স্বার্থ, মেজাজ-মর্জিমাফিক কাজ করে সরকারের ক্ষতি করে চলেছেন। তারা তাদের ব্যক্তিগত ইগো, ব্যক্তিগত লিপ্সা বাস্তবায়নের জন্য নিজেদের সরকারের খাস ব্যক্তি হিসেবে প্রমাণের ক্ষেত্রে অতি উৎসাহী হয়ে উঠেছেন। আর কোনো ভয়-ভীতি বা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই তারা এসব করে চলেছেন। এ অবস্থায় প্রশ্ন হল, ‘এদের ঠেকাবেন কে, এদের ঠেকানোটাও কিন্তু জরুরি।’

মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×