গ্রামকে শহরে রূপান্তরে প্রয়োজন গ্রামীণ পর্যটন উন্নয়ন

  মো. জিয়াউল হক হাওলাদার ১৮ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গ্রাম হবে শহর

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ২০১৮-এর একটি উল্লেখযোগ্য প্রতিশ্রুতি হচ্ছে ‘গ্রাম হবে শহর’। এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ইতিমধ্যে কিছু প্রকল্প গ্রহণের জন্য সরকার বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমিসহ (বার্ড) কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দিয়েছে। গ্রামকে শহরে রূপান্তরের পেছনে সরকারের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে শহরের জরুরি সুবিধাগুলো গ্রামে পৌঁছে দেয়া।

গ্রামকে শহরে রূপান্তর করা হবে কৃষিজমি নষ্ট না করে। আর যেসব সেবা প্রাধান্য পাবে তা হচ্ছে গ্রামীণ জনগণের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বিদ্যুৎ, সুপেয় পানি, কর্মসংস্থান ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিসহ সহজ যাতায়াত। এগুলোর সঙ্গে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বিনোদন। বিনোদন সামষ্টিকভাবে হবে পর্যটন কর্মকাণ্ড। অর্থাৎ গ্রামকে শহরের রূপান্তরের জন্য গ্রামীণ পর্যটন কর্মসূচি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ইতিমধ্যে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন এবং বার্ড গ্রামীণ পর্যটন উন্নয়নের জন্য কয়েকটি সেমিনার ও আলোচনা সভা করেছে। স্থানীয় কয়েকটি রিসোর্টের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন ওইসব রিসোর্টকে বুদ্ধিবৃত্তিক সহায়তা দিয়ে আসছে।

যেহেতু বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের সারা দেশে পর্যটন কর্মকাণ্ড বিদ্যমান আছে এবং পর্যটন উন্নয়নের স্কিল রয়েছে, সেহেতু প্রাইভেট সেক্টরসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান এ সংস্থার বুদ্ধিবৃত্তিক সহায়তা চাইলে সহজেই পেতে পারে।

এবার আসা যাক কীভাবে গ্রামাঞ্চলে বিনোদন সেবা প্রদানে পর্যটন উন্নয়ন করা হবে। প্রতিটি গ্রামকে আমাদের বানাতে হবে একেকটি পর্যটন গন্তব্য বা ডেস্টিনেশন। এসব গন্তব্যে শহরের পর্যটকরাও বেড়াতে যাবে, যাতে করে গ্রাম এলাকায় আর্থিক কর্মকাণ্ডসহ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।

গ্রামীণ অর্থনৈতিক অবস্থাকে চাঙ্গা এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানের জন্য ক্ষুদ্রঋণের চেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বাংলাদেশের গ্রামীণ পর্যটন উন্নয়ন। গ্রামীণ পর্যটন উন্নয়নের মাধ্যমে সব সম্প্রদায়ের আর্থিক সচ্ছলতাসহ স্থায়ী উপার্জনের পথ সুগম হয়। এর জন্য ছোট ছোট পর্যটন উদ্যোক্তাকে সহজ শর্তে সরকারি ঋণ প্রদান করা যেতে পারে।

এ বিষয়েও আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রয়োজন প্রতিটি গ্রামে বিনোদন পার্ক, শিশুপার্ক এবং ঐতিহ্যবাহী স্পোর্টস আয়োজনের জন্য পর্যাপ্ত মাঠ। এগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন দ্রুত ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে আশা করা যায়।

দেশের গ্রামাঞ্চলে পর্যটন উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ পরিকল্পনা অবশ্যই পাশাপাশি থাকবে। পরিবেশকে ক্ষতি করে যেমন গ্রামীণ পর্যটন হবে না, আবার শুধু পরিবেশ রক্ষার দোহাই দিলেও পর্যটনের উন্নয়ন হবে না। বিষয়টি পরিপূরক।

গ্রামীণ পর্যটন উন্নয়ন করতে স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিসহ সরকারের বিনাসুদে কিংবা সহজ শর্তে ঋণ প্রদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন গ্রামের একজন লোক পিঠা, পায়েস বা দই তৈরি করে বাজারে কিংবা পর্যটকদের কাছে বিক্রি করতে চাইলে তার উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো, এসব পণ্য স্বাস্থ্যসম্মত করা এবং আরও আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরার জন্য অর্থের প্রয়োজন। সহজ শর্তে বা বিনাসুদে ঋণ তাকে নিশ্চয়ই আরও গতিশীল এবং সত্যিকারের টেকসই উন্নয়নের দিকে ধাবিত করবে।

গ্রামীণ পর্যটনের উন্নয়ন হলে পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ এবং অনেক ধরনের ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা সৃষ্টি হবে। যেমন- চিড়া-মুড়ি-খই-দই প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতা, পিঠা-পায়েস-মোয়া প্রস্তুতকারক, হস্তশিল্প (বাঁশ, বেত, হোগলা) প্রস্তুত ও বিপণনকারী ইত্যাদি। এদের টিকিয়ে রাখার জন্য সহজ শর্তে সরকারি ঋণের প্রয়োজন।

গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে হবে। এজন্য আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যগুলোকে নান্দনিক উপায়ে তুলে ধরতে হবে। আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যগুলো হচ্ছে গ্রাম্য সমাজব্যবস্থা, কৃষি জমির চিরায়ত পদ্ধতিতে চাষাবাদ, চিরায়ত লোকসংগীত, দেশীয় খাবার প্রস্তুতি- চিড়া, মুড়ি, খৈ, খেজুরের পায়েস, মাডা, ইত্যাদি।

এগুলোই পর্যটকরা দেখতে চায়, উপভোগ করতে চায়। এসব পণ্য প্রসারের লক্ষ্যে এবং তা পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরার জন্য সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বর্তমানে অনেক প্রাইভেট ট্যুর অপারেটর গ্রামীণ জীবনযাপন পর্যটকদের দেখানোর জন্য গ্রামে নিয়ে যায়। এতে গ্রামীণ জনগণের তেমন উপকার হয় না।

গ্রামীণ জনগণের কাছে পর্যটন বেনিফিট পৌঁছানো যায় না। পর্যটন বেনিফিট পৌঁছানোর জন্য দরকার গ্রামীণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ। এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা বেশি প্রয়োজন। একজন গ্রামীণ নারীর খৈ বা মুড়ি তৈরির দৃশ্য কিংবা একজন গ্রামীণ কৃষকের ধান কাটার দৃশ্য, খেজুর গাছ থেকে রসের হাঁড়ি নামানোর দৃশ্য পর্যটকদের দেখিয়ে যারা আয় করেন, তাদের উচিত ওই আয়ের একটা অংশ ওই নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের- যারা পর্যটন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করল- তাদের হাতে দেয়া। এতে করে তাদের আয় বাড়বে এবং বাঁচার তাগিদে অন্যান্য স্বাভাবিক কাজকর্মের পাশাপাশি পর্যটন কর্মকাণ্ড চালাবে।

দেশে গ্রামীণ পর্যটন উন্নয়নে পর্যটনকে কয়েকটি নির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যেতে পারে- ফার্মিং ট্যুরিজম, ইকো-ট্যুরিজম, গ্রিন ট্যুরিজম ইত্যাদি। ফার্মিং ট্যুরিজমের মধ্যে গ্রামবাংলার স্বকীয় কৃষি খামার ও জমির চাষাবাদ পদ্ধতি, ফসল কাটার দৃশ্য, সেচ প্রণালী, ফসল তোলা, গ্রামীণ মহিলাদের ধান শুকানো, ধান উড়ানো এবং ধান ভানার দৃশ্য হতে পারে অন্যতম আকর্ষণ।

এছাড়া ইকো-ট্যুরিজম হতে পারে গ্রামবাংলার প্রাকৃতিক দৃশ্যবলী, নদী-নালা, খাল-বিল এবং দেশীয় মাছ, পশু, পাখিসহ নানা প্রজাতির জৈববৈচিত্র্য। গ্রামীণ ট্যুরিজমের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গ্রিন ট্যুরিজম। অনেক বিদেশি বাংলাদেশের অবারিত সবুজের সমারোহ দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়। গ্রিন ট্যুরিজমের সব উপাদানই বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে বিদ্যমান। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত ও শীত- সব ঋতুতে বাংলাদেশ সবুজে আচ্ছাদিত থাকে।

সবুজের প্রাণচাঞ্চল্য অনেক বরফাচ্ছন্ন দেশের পর্যটককে আন্দোলিত করে। অনেক স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশের লোক বাংলাদেশের আবহমান সবুজ-শ্যামল গ্রামীণ জনপদকে ভালোবাসেন। শুধু ভালোবাসেন না, দেখতেও আসেন।

দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে প্রাথমিকভাবে ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোসহ ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, হালুয়াঘাট, সিলেট এবং সর্বোপরি পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় গ্রামীণ পর্যটন উন্নয়ন করা যেতে পারে। উল্লেখিত এসব জেলায় এমনিতেই যথেষ্ট পর্যটন উন্নয়ন ও বিকাশের সম্ভাবনা রয়েছে।

পার্বত্য জেলাগুলোয় বিদ্যমান প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সেখানে কোনো ভারি শিল্পের উন্নয়ন করা যাবে না। এর প্রাকৃতিক দৃশ্য ও স্থানীয় জনগণের বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নই সেখানে আয়ের একমাত্র পথ। পর্যটন শিল্প এখানে ব্যাপক কর্মসংস্থান ও আর্থিক প্রবাহের সুযোগ সৃষ্টি করবে। এজন্য প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে খাপ-খাইয়ে সেখানে অবকাঠামোর উন্নয়ন করতে হবে।

তবে এসব জেলায় স্থানীয় সম্প্রদায়- যেসব ক্ষুদ্র জাতিসত্তা রয়েছে, তাদের দূরে রেখে পর্যটন উন্নয়ন সম্ভব নয়। এখানে প্রতিটি জাতিসত্তারই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও আকর্ষণ রয়েছে। এখানে পর্যটন উন্নয়ন করতে হলে স্থানীয় যে কয়টি জাতিসত্তা রয়েছে, তাদেরই পর্যটন সম্পদের মালিকানা প্রদান ও মালিকানাবোধ (সেন্স অফ ওনারশিপ) জাগ্রত করতে হবে। এরাই আর্থিক আয় ও নতুন নতুন কর্মসংস্থানের তাগিদে পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন আকর্ষণগুলোকে রক্ষা করবে।

এমন একটি ধারণা আছে যে, পর্যটনের উন্নয়ন হলে গ্রামীণ পরিবেশ ও সংস্কৃতি বিনষ্ট হবে। আসলে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য পরিকল্পিত ও সুনিয়ন্ত্রিত পর্যটন উন্নয়নের প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসন ও পর্যটক সবার দায়িত্ব পর্যটন উন্নয়নের পাশাপাশি পর্যটন আকর্ষণগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা। একে মূলত রেসপন্সিবল ট্যুরিজম বলা হয়। ইকো-ট্যুরিজম, গ্রিন ট্যুরিজম, নেচার ট্যুরিজম- এ সবকিছুই রেসপন্সিবল ট্যুরিজমের অংশ।

বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করাসহ গ্রামকে শহরে রূপান্তরের জন্য গ্রামীণ বিনোদন তথা গ্রামীণ পর্যটন উন্নয়ন একান্ত প্রয়োজন। এর জন্য গ্রামের যুবসমাজকে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজন পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ- গাইডিং, কুকিং, ইন্টারপ্রিটেশনসহ নানা প্রশিক্ষণ।

আমরা আশা করছি, সরকার গ্রামীণ পর্যটন উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য দূরীকরণের দিকে যথাযথ নজর দিলে ২০৩০ সাল নাগাদ সরকার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জন করতে পারে।

মো. জিয়াউল হক হাওলাদার : পর্যটন বিশেষজ্ঞ

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×