ক্ষমতা ও বিত্তের কাছে ধরাশায়ী হলে চলবে না

  এ কে এম শাহনাওয়াজ ২১ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এ কে এম শাহনাওয়াজ
এ কে এম শাহনাওয়াজ। ফাইল ছবি

আমরা দীর্ঘদিন থেকে লক্ষ করে আসছি, ন্যায্য হোক বা কম ন্যায্য হোক- কোনো প্রাতিষ্ঠানিক গোলযোগ হলে, দাবি-দাওয়া উঠলে সহজে নিষ্পত্তি করা হয় না। শ্রমিক, ছাত্র বা শিক্ষক অসন্তোষ যাই হোক না কেন, যে নিষ্পত্তিটি সহজে করা যায়; তা জল ঘোলা না হওয়া পর্যন্ত নিষ্পত্তি করতে এগিয়ে আসে না কর্তৃপক্ষ।

এসব কর্তৃপক্ষের ধারণা বোধহয় শুরুতে সমাধান দিলে সবাই মাথায় চড়ে বসবে! ফলে কেবল দাবি-দাওয়াই করবে। আমরা মনে করি, এমন চিন্তা বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক নয়। গ্রামের মানুষ যাকে বলে ‘হরিণ চালাকি’ এটি সে ধরনের চালাকিতে পরিণত হয়। নিজের মুখ লুকিয়ে আত্মরক্ষা করার চেষ্টা করেও কিন্তু শেষ পর্যন্ত হরিণ বাঁচতে পারে না।

বরঞ্চ এসব চালাকিকে সাধারণ মানুষ সরকারের দুর্বলতা ভাবে। মনে করতে পারে, চাপের মুখে সরকার বাধ্য হল নতি স্বীকার করতে। আর শুরুতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক তৎপরতায় সংকটের নিষ্পত্তি করতে পারলে কৃতিত্বটা সরকার পক্ষই নিতে পারত।

এবার বোরো মৌসুমে ধানচাষীদের হাহাকারের কথা কাছে থেকে এবং সংবাদ মাধ্যমে দেখে ও শুনে বড় আতঙ্ক বোধ করছি। একদিকে উন্নয়নের মহাসড়কে হাঁটছে দেশ; অন্যদিক ক্ষুব্ধ-হতাশ কৃষক দাম না পেয়ে নিজের ক্ষেতের ধানে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে। এ সত্য প্রথম হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন কৃষিমন্ত্রী মহোদয়।

পরে মেনে নিয়ে বললেন, এসব নতুন নয়; ফ্রান্সের কৃষকরাও নিজ ফসলে আগুন লাগিয়েছিল। আমি জানি না, একথা শুনে আমাদের বিপন্ন কৃষকরা কতটা সান্ত্বনা পেয়েছেন! যেখানে সরকারের কেনার কথা প্রায় ৯শ’ টাকা মণ দরে ধান; সেখানে মিল মালিকদের কাছে সাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে কৃষক।

উৎপাদন খরচেরও অনেক কম দরে বেচতে হচ্ছে। পরে সরকার ৯০০ টাকা দরে আংশিক কৃষক আর আংশিক মিল মালিকদের কাছ থেকে কিনে নেবে। এমন অবস্থায় ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া একটি ছবির দিকে চোখ পড়ল। একজন কৃষকের গেঞ্জির পেছনে লেখা ‘আর করব না ধান চাষ/দেখি তোরা কি খাস!’ এর মধ্যে টিভি প্রতিবেদনে দেখলাম, কোনো কোনো এলাকার কৃষকরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ধানের বদলে তারা গম আর ভুট্টার চাষ করবেন।

এমন সংকট কিন্তু নতুন না, প্রতিবছরই বোরো ফলিয়ে কৃষক কম বেশি ক্ষতিতে পড়ে। তখন ভাবনা হয়, সরকার যখন ৯০০ টাকাতেই ক্রয় করা স্থির করেছে; তখন যথাসময়ে কৃষক পর্যায়ে ক্রয়ের ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন! এ তো কঠিন কিছু না। কিন্তু কৃষিমন্ত্রী মহোদয়ের জবানিতে বোঝা গেল, এটি অনেক কঠিন।

জানালেন, এত বছরেও ক্রয়ের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এখনও তৈরি হয়নি। উত্তরটি আমাদের অবাক করেছে। অতীত কাল থেকে বাংলাদেশ কৃষিভিত্তিক দেশ। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। মাথামোটা প্রশাসনও সদর্পে ছড়ি ঘোরাচ্ছে। জনপ্রতিনিধিরাও রয়েছেন দুধে-ভাতে। তা হলে নীতিমালা তৈরি হল না কেন!

বছরের কোন সময় আমন ধান আর কোন সময় বোরো ধান গোলায় তোলে কৃষক, তা তো নির্ধারিতই। আধুনিক চাষ পদ্ধতিতে এখন যে বাম্পার ফসল ফলে, এ তথ্যটিও অজানা নয়। কৃষি মন্ত্রণালয় বলে একটি পূর্ণ মন্ত্রণালয় রয়েছে। আছে একটি সংসদীয় কমিটিও। এই মন্ত্রণালয়ের চালিকাশক্তি হিসেবে আমলাতন্ত্র রয়েছে।

সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে কৃষকবান্ধব নন, তেমনটা আমরা মনে করি না। তাহলে ধান ক্রয়ের নীতিমালাটা তৈরি করবে কে? কৃষককে রক্ষা করার দায়িত্ব তো রাষ্ট্রেরই নেয়ার কথা।

এ প্রসঙ্গে খাদ্যমন্ত্রী যে বক্তব্য দিলেন, তাতে বিভ্রান্তিতে পড়তে হচ্ছে আমাদের। মনে হল, কৃষককে রক্ষা করার চেয়ে মিলারদের রক্ষা করা রাষ্ট্রের জন্য অধিক জরুরি। তিনি জানালেন, আমন মৌসুমে মিলাররা অনেক বেশি ধান কিনে রেখেছে; ফলে তাদের পক্ষে এখন ধান কেনা ও সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়।

ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা ঋণ পেতেও অসুবিধা হচ্ছে না মিলারদের। আমরা তো দেখছি, মন্ত্রণালয়ের এমন প্রশ্রয় পেয়ে মিলাররা অল্প দামে ধান কিনে ঠিকই মজুদ বাড়াচ্ছে। এখন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে বর্তমান সংকট মোকাবেলায় সরকার কেন চাল রফতানির চিন্তা করছে। এই রফতানির চাল জোগান দিয়ে মিলাররা আরেক প্রস্থ আয়ের সুযোগ পাবে। আবার দেশে উদ্বৃত্ত চাল থাকার পরও চাল আমদানি করা হয়েছে। পুরো বিষয়টি কেমন দুর্বোধ্য মনে হচ্ছে।

একটি প্রশ্ন মাথা থেকে সরাতে পারছি না, তা হল- যে সরকার পদ্মা সেতু বানাতে পারে, মেট্রোরেল তৈরি করতে পারে, বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করতে পারে; সেই সরকার সারা দেশে ধান চালের সংরক্ষণাগার তৈরি করতে পারে না কেন? মন্ত্রণালয়ের মধ্যস্বত্বভোগী মিলারদের ওপরই ভরসা করতে হয় কেন?

কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। এখন নাকি ১ হাজার ১০০ টাকায় ধানের মণ বিক্রি করতে পারলে কোনোরকমে উৎপাদন খরচ ওঠে। সে জায়গায় সরকারি ৯০০ টাকাও পাচ্ছে না কৃষক। তারপরও প্রশ্ন থাকে, ধান কাটার মৌসুমে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সরকার কেন ধান কেনে না? সরকার কিনে মিলারদের কাছে বিক্রি করলে তো কৃষকের সংকট অনেকটা কমে। এ অবস্থায় মিলাররাও প্রতিযোগিতামূলক দামে কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনতে বাধ্য হবে। নাকি মিলারদের লাভের মার্জিন ছোট হলেই সব পক্ষের অস্বস্তি!

কৃষিমন্ত্রী মহোদয়ের একটি সরল উক্তিতে বড় এক রহস্য উন্মোচিত হল। তিনি জানালেন, কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহে একটি বড় বাধা রাজনৈতিক প্রভাব। সরকারের পক্ষে সম্ভব নয় এসব প্রভাবশালীকে অতিক্রম করে ধান কেনা। এই বাস্তবতা যদি সত্য হয়, তাহলে তো সরকার সাধারণ মানুষের চোখে দুর্বল হয়ে পড়বে।

মন্ত্রী মহোদয়ের কথায় স্পষ্ট হয়েছে, এই মধ্যস্বত্বভোগী বা তাদের আশ্রয়দাতারা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি। তাদের হাতে অনেকটাই কুপোকাত সরকার। বোঝা গেল, প্রকৃতপক্ষে কৃষকের পিঠে ছুরিকাঘাত করছে অপরাজনৈতিক শক্তি। বর্তমান বাস্তবতায় সরকারেরই কাছের মানুষ। মাননীয় মন্ত্রীর কথায় যে হতাশা ছিল, তাতে বোঝা যায় এই রাজনৈতিক শক্তি ও তাদের অর্থের কাছে নতজানু সরকার। এভাবেই সম্ভবত সুশাসনের পথ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।

এমন ব্যর্থতার দায় তো কৃষি মন্ত্রণালয়কে নিতেই হবে। কৃষককে রক্ষার দায়িত্ব সরকারেরই। সরকার কিভাবে রক্ষা করবে, সে ভাবনা প্রধানতই সরকারে থাকা সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের। দুর্ভাবনা এই যে, স্বস্তি পাওয়ার মতো আলামত তেমন দেখতে পাচ্ছি না। সরকার এবং আওয়ামী লীগের ঊর্ধ্বতন মহলের নেতৃত্ব; বেলা শেষে শেষ ভরসার আশ্রয়স্থল মনে করি যাদের, তারা মানতে চান না দলীয় দুর্নীতি কোথাও আছে। সাধারণ মানুষ তো প্রতিদিন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।

কৃষিমন্ত্রী মহোদয়ও অকপটে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের কথা বললেন। তা হলে এসব বিত্তবান ও শক্তিমান প্রভাবশালীদের দেখতে পান না কেন সরকার পরিচালকরা? নাকি এসব প্রভাবশালীর চাপে এবং অর্থের উত্তাপে সব অন্যায় মেনে নিতে হয় বা আপস করতে হয়? এরাই কি দলীয় সরকারের দল ঠিক রাখেন। তাহলে তো এদের দুধেভাতেই রাখতে হবে!

আমরা মনে করি, প্রতিবছর ধান কাটার মৌসুমে শুরুতেই কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার জন্য সরকারকে প্রস্তুত থাকতে হবে। টাকা নেই, ছাড় হয়নি; এসব মতলবী বক্তব্য। মনে রাখতে হবে, চাষাবাদের জন্য অনেক কৃষককেই ঋণ করতে হয়। ফসল ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের ওপর ঋণ পরিশোধের চাপ থাকে। আর সেই সুযোগটিই নেয় মিলাররা। অনেক কম দরে কৃষককে ধান বিক্রিতে বাধ্য করে।

অভিযোগ রয়েছে, বড় বড় মিল মালিকদের শত কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। আর সেই টাকায় বিপাকে ফেলে কৃষকদের কাছ থেকে স্বল্পমূল্যে ধান কিনে নিচ্ছে এসব মিলার। একটি কৃষকবান্ধব সৎ সরকার কেমন করে এমন বাস্তবতা মেনে নিতে পারে? চাষ উপকরণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকের ধান উৎপাদনের খরচ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ধরে নিই, সরকার ১,১০০/১,২০০ টাকা মণ দরে কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে নিল।

এতে কৃষকের মুখে হাসি ফুটলেও সাধারণ ভোক্তা অধিক দামে চাল কিনতে গিয়ে বিপাকে পড়বে। এ অবস্থা থেকে বেরুনোর একমাত্র উপায় সার, বীজ, কীটনাশক ও জ্বালানি তেলের মূল্য কমানো। কৃষি এবং জনগণকে রক্ষা করতে হলে কৃষি উপকরণে একদিকে ভর্তুকি দিতে হবে; অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলো থেকে দুর্নীতি কমাতে হবে।

আমরা মনে করি, যথাসময়ে সরকার সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে ধান ক্রয় করলে মিলাররাও প্রতিযোগিতামূলক দরে ধান ক্রয় করতে এগিয়ে আসবে। এতে একটি সুস্থ ভারসাম্য তৈরি হবে। আর অধিক মুনাফার লোভে নতুন নতুন মিল মালিক তৈরি হওয়ার প্রবণতাও কমে আসবে।

এভাবে মধু কমে গেলে প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তিমানরাও জায়গা বদল করতে বাধ্য হবে। আমরা মনে করি, সরকারকে সততার সঙ্গে একটি দৃঢ় অবস্থানে দাঁড়াতে হবে। কৃষককে দুর্দশায় রেখে সরকারের উন্নয়নের রথ লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে না। সরকার যদি ক্ষমতা ও বিত্তের কাছে ধরাশায়ী হয়; তবে এমন হতাশা দেশবাসী কাটাবে কেমন করে!

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×