লোকসভা নির্বাচন-২০১৯

পশ্চিমবঙ্গের ভোট বিশ্লেষণ

  শুভময় মৈত্র ২২ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পশ্চিমবঙ্গের ভোট বিশ্লেষণ

এ লেখা যখন আপনারা পড়ছেন, ততক্ষণে বুথফেরত সমীক্ষা আপনাদের হাতে। কিন্তু সমীক্ষা মানেই যে সেটা মিলবে এমন নয়। এর কারণ দুটো। একটি হল, সব সমীক্ষারই সফল হওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকে। ঘুরিয়ে বললে সম্ভাবনা থাকে ব্যর্থ হওয়ারও।

দ্বিতীয়টি হল, সমীক্ষা যদি সঠিকভাবে পরিসংখ্যানের নিয়ম মেনে করা হয়, তাহলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের করা সমীক্ষার ফলাফল খুবই কাছাকাছি আসা উচিত। সেটা যে হচ্ছে না, বিভিন্ন সংস্থার ভবিষ্যৎ দর্শন যে বিভিন্ন, এটাই প্রমাণ করে সব সমীক্ষা সঠিক পদ্ধতি মেনে করা হয়নি। মোটের ওপর দেশজুড়ে এনডিএ এগিয়ে আছে এমনটা আভাস পাওয়া গেলেও তার মধ্যে ভ্যারিয়েন্স (ভেদমান) যথেষ্ট বেশি।

এর একটা বড় কারণ হচ্ছে, খুব ভালোভাবে সমীক্ষা করতে গেলে অনেক বেশি অর্থ ও সময়ের প্রয়োজন। চটজলদি তার ব্যবস্থা করা শক্ত। এছাড়া যে কথাটা বারবার আলোচনা করা হয় তা হল- কোন দল কত ভোট পাবে সে বিষয়টা অনেক ভালোভাবে বোঝা যায় সমীক্ষায়। কিন্তু ভোট শতাংশ থেকে আসন সংখ্যার বিন্যাস বোঝা অনেক কঠিন।

ফলে আসনের হিসাব কষতে যাওয়া আরও বেশি গোলমেলে ব্যাপার। সব মিলিয়ে তাই সত্যিটা লুকিয়ে থাকে ভোটযন্ত্রে। সেই ভোটযন্ত্র নিয়েই আবার বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল। জয়ী দল অবশ্যই বলবে, যন্ত্র সঠিকভাবে কাজ করেছে, আর পরাজিতরা খুঁজে পাবে বিভিন্ন গণ্ডগোল।

নির্বাচন দেশজুড়ে হলেও এবার সব থেকে বেশি আকর্ষণীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ। এর কারণ বিজেপি খুব ভালো ফল করার চেষ্টা করছে এই রাজ্যে। স্বভাবতই পঞ্চাশের দশকের পর রাজ্যে এই প্রথম নির্বাচনের মূল ইস্যু ধর্ম ও জাতপাত। এ বিষয়টা প্রমাণ করা শক্ত, এবং কোনো রাজনৈতিক দলই নিজের থেকে সরাসরি একথা স্বীকার করতে চাইবে না। বরং অন্য দলকে এই অপবাদ দেবে।

তবে উপলব্ধি করাই যায় যে সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘুর দ্বন্দ্ব কিংবা মতুয়া সংক্রান্ত আলোচনা যথেষ্ট প্রভাব ফেলবে এবারের নির্বাচনে। সেই হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচন বিজলি, সড়ক, পানির নয়। উন্নয়নেরও নয়।

যে কোনো সরকারই কিছু উন্নয়ন করে থাকে, আবার না পাওয়ার হতাশাও থাকে কিছু। সেগুলো কিছুদিন পরে ভুলে যায় মানুষ। তাই বাম আমলের উন্নয়ন কিংবা অনুন্নয়নের কথা ভেবে আজকের দিনে আর কেউ ভোট দিতে যাবেন না। ২০১৪ পর্যন্ত একটানা দশ বছরের কংগ্রেস রাজত্বে কেন্দ্রে কী কী ঘটেছিল সেটাও হয়তো ভুলে গেছেন সবাই।

হাতের কাছে থাকল কেন্দ্রে বিজেপি আর রাজ্যে তৃণমূলের উন্নয়নের স্লোগান। অবশ্যই দু’দল কিছু কিছু কাজ করেছে, আবার অনেক অকাজও। কিন্তু ভোটপ্রচারে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নের সংখ্যারাশির চেয়ে।

মনে রাখতে হবে, উন্নয়নের কথা সর্বদা ভোটে জেতায় না। বরং এমনটাও অনেক সময় দেখা গেছে যে, কোনো রাজনৈতিক দল সত্যিকারের উন্নয়নের চেষ্টা করা মাত্র নির্বাচনে হেরেছে। তাই পশ্চিমবঙ্গে এবারের ভোটে প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা এবং জটিল জাতপাতের হিসাবকে উপেক্ষা করলে ভুল হবে। ভোটফলে প্রতিফলিত হবে সেই হিসাবগুলোই।

গত কয়েকটি নির্বাচনের ভোটের ভাগ অবশ্যই ভবিষ্যদ্বাণীর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সেই পরিবর্তনও পরিষ্কার লক্ষ করা যায় সংখ্যা ঘাঁটলে। ২০০৮-এর পঞ্চায়েত নির্বাচন থেকে বামফ্রন্টের ভোট কমা অবশ্যই সেই প্রমাণ দেয়।

২০১১-তে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর বড় নির্বাচন বলতে ২০১৪-র লোকসভা এবং ২০১৬-র বিধানসভা। দশমিক ভুলে (অর্থাৎ পূর্ণসংখ্যায় লিখলে) ২০১৪/২০১৬-তে ভোটের ভাগ মোটামুটি তৃণমূল ৩৯/৪৫ শতাংশ, বামফ্রন্ট ৩০/২৬ শতাংশ, কংগ্রেস ১০/১২ শতাংশ এবং বিজেপি ১৭/১০ শতাংশ।

তাই যে সহজ ভোটবিন্যাস থেকে আলোচনা শুরু করা যায়, তা আলগাভাবে বলতে গেলে তৃণমূল ৪৫ শতাংশ, বামফ্রন্ট ২৫ শতাংশ, বিজেপি ১৫ শতাংশ, কংগ্রেস ১০ শতাংশ। বুঝতেই পারছেন এগুলো কোনো সঠিক সংখ্যা নয়, যোগ-বিয়োগ সহজভাবে বোঝার একটা প্রচেষ্টা মাত্র।

এবার প্রতিটি আসনে জিতবেন কে? সেই আসনে যিনি বেশি ভোট পাবেন তিনি। সার্বিকভাবে যদি বিজয়ী দলের ভোট শতাংশ রাজ্যজুড়ে দ্বিতীয় শক্তির থেকে ১০ শতাংশ বেশি থাকে, তাহলে অধিকাংশ আসনে জেতা সম্ভব। যে ভোট শতাংশের অঙ্ক থেকে প্রারম্ভিক আলোচনা, তাতে যোজনখানেক এগিয়ে আছে তৃণমূল।

তাই রাজ্যজুড়ে বিশাল কিছু পরিবর্তন হতে গেলে ভোট ঘুরতে হবে অনেক বেশি মাত্রায়। অন্যদিকে এটাও মনে রাখতে হবে যে, ২০১৬-র পর থেকে বেশিরভাগ ছোট-বড় নির্বাচনে বাম কিংবা কংগ্রেসকে সরিয়ে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে বিজেপি। গত বছরের ঘটনাবহুল পঞ্চায়েত নির্বাচন তার একটা প্রমাণ।

নির্বাচনের একটা বড় অংশ হল সংবাদমাধ্যমের প্রচার। সেই প্রচার সাধারণ মানুষের মনে কতটা দাগ কাটতে পারল তা বোঝা যাবে ভোটফলের পর। কিন্তু তার আগে ভোট পূর্ববর্তী বা বুথফেরত সমীক্ষায় এই প্রচার যথেষ্ট প্রভাব ফেলে।

যেহেতু বিভিন্ন সংবাদ বিপণির সঙ্গে তাদের লাভ-ক্ষতির পাটীগণিত জড়িয়ে থাকে, তাই তাদের মনের মাধুরীও অনেকটা মিশে যায় সম্ভাবনার অঙ্কে। সেখানে যে ভাবনাটা সব থেকে বেশি বিক্রি হয়েছে তা হল, এ রাজ্যে মূল লড়াই তৃণমূল বনাম বিজেপির এবং বিজেপির ভোট খানিকটা বাড়বে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এই নির্বাচনের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।

ধরা যাক, কিছুটা কমলেও তৃণমূল তাদের ভোট মোটামুটি ধরে রাখতে পারল, অর্থাৎ সেই ভোট নেমে হল ৪০ শতাংশের আশপাশে। এই ৫ শতাংশ ভোটটা দিয়ে দিন বিজেপিকে। বামেদের ভোট ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করুন। সেই ১০ শতাংশ ভোটও হাতবদল করুন বিজেপিকে। সেক্ষেত্রে বিজেপি ১৫ থেকে বেড়ে হবে ৩০ শতাংশ।

এ রকম পরিস্থিতিতেও তাদের সঙ্গে তৃণমূলের পার্থক্য থাকবে ১০ শতাংশ জনমতের। সেই হিসাবে তৃণমূলকে ৩২ থেকে ৩৬টি আসন দেয়াই যায়। বাকিটুকুর বেশিরভাগই যাবে বিজেপির দিকে, অর্থাৎ ৪ থেকে ৮। এক আধটা পেতে পারে কংগ্রেস বা বামেরা। আর তৃণমূল যদি শেষ বিধানসভার মতো নিজেদের ৪৫ শতাংশ ভোট ধরে রাখে, সেক্ষেত্রে কিন্তু তৃণমূলের ৩৯ বা তার বেশি আসনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। বুথফেরত সমীক্ষা যদিও এ কথা বলছে না।

বুথফেরত সমীক্ষা বলছে, তৃণমূল, বাম আর কংগ্রেসের আরও কিছু ভোট বাগিয়ে নিয়ে বিজেপি পৌঁছবে ৩৫ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশের আশপাশে।

তাদের কথামতো তৃণমূল আর বিজেপির পার্থক্য যদি পাঁচ শতাংশের মধ্যে চলে আসে, তখন কিন্তু বিজেপির আসন বেশ কিছুটা বেড়ে যেতেই পারে। তবে এই পরিস্থিতিতে আসনের ভবিষ্যদ্বাণী করা একেবারেই ঠিক নয়, কারণ দু’দলের ভোট কাছাকাছি এলে আসনের হিসাবে বিপুল ওলটপালট হয়। সেক্ষেত্রে এটা বুঝতে হবে যে, এই ভোটে তৃণমূলবিরোধী একটা হাওয়া উঠেছে।

সেরকম ঘটনা ঘটলে যেখানে বিজেপি দুর্বল, সেখানে তৃণমূলবিরোধী ভোট পৌঁছে যেতে পারে বাম বা কংগ্রেসে, যদিও সেই ভবিষ্যদ্বাণী সংবাদমাধ্যমের খাতায় অনুপস্থিত। তারাও যদি খানকয়েক আসন জুটিয়ে নেয় তাহলে তৃণমূলের নম্বর বেশ কমবে। সব মিলিয়ে বুথফেরত সমীক্ষার হিসাব বলছে, তৃণমূল নেমে যাবে ৩০-এর নিচে আর বিজেপি দুই অঙ্কে পৌঁছবে। সঙ্গে এটাও মনে রাখা জরুরি, অল্প কয়েকটি আলোচিত সম্ভাবনা ছাড়াও অনেকরকম ফল লুকিয়ে থাকতে পারে ভোটবাক্সে।

তাই ২৩ তারিখে ভোটফল প্রকাশ হওয়ার আগে লিখে রাখুন আপনার নিজের ভবিষ্যদ্বাণী। দেখে নিন কতটা মিলল সেই অঙ্ক। লড়াই, বদলা ইত্যাদি পেশিশক্তির শব্দমালা ছেড়ে ভোটফলের পর সবাই যদি এই গ্রীষ্মে নিজের মাথায় ঠাণ্ডা জল ঢেলে ভোট বিশ্লেষণের অঙ্ক কষেন, সেটাই রাজ্যের পক্ষে মঙ্গল। তারপর না হয় কেন্দ্রের দিকে নজর দেয়া যাবে।

বিদেশি পত্রিকা থেকে

শুভময় মৈত্র : অধ্যাপক, ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইন্সটিটিউট, কলকাতা

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×