মুক্তিযুদ্ধের এক অজানা অধ্যায়

  প্রশান্ত অধিকারী ০২ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মুক্তিযুদ্ধ

গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার কান্দি ইউনিয়নের একটি গ্রাম তারাকান্দর। গ্রাম তো নয় বরং বলা যেতে পারে বধ্যভূমি। ১৯৭১ সালে কোটালীপাড়ার একাধিক গ্রামে পাকবাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি যুদ্ধ হলেও এ গ্রামের মতো এত মানুষকে আত্মাহুতি দিতে হয়নি কোথাও।

অথচ স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও এই গণহত্যার কথা তেমন কেউ জানে না। ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পায়নি সে ঘটনা।

১৯৭১ সালের মে মাস। বাংলা ১৯ জ্যৈষ্ঠ। দেশজুড়ে চলছে যুদ্ধের প্রস্তুতি। কান্দি ইউনিয়নের মানুষও বসে নেই। তাই পাকবাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নেয় যুদ্ধের। দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তারা তারাকান্দরের বালা বাড়িতে প্রতিরোধ শিবির গড়ে তোলে। স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থান থেকে আশ্রয় নিতে আসা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ওই বাড়িতে তাঁবু খাটিয়ে আশ্রয় নেয়। এ খবর যায় পার্শ্ববর্তী গোপালপুরে পূর্ণবতী গ্রামের রাজাকার-আলবদরদের কাছে। তারা জানে, শুধু তারা এসে এ প্রতিরোধ যুদ্ধে টিকতে পারবে না। তাই পাকবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে তিন দিন বসে পরিকল্পনা করে তারাকান্দর আক্রমণের।

কোটালীপাড়া থানা থেকে তিনটি গানবোটে ঘাঘর নদী দিয়ে ১১ জন পাকসেনা গোপালপুর আসে। সেখানে পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়ে অপেক্ষা করছিল পাকিদের স্থানীয় দোসর রাজাকার আহমদ চেয়ারম্যান, আফতাব উদ্দিন (আপ্তু মিয়া), বারেক মাস্টার, সোবহানসহ অনেকে। তাদের ইশারায় পাকবাহিনী প্রস্তুতি নেয় তারাকান্দর আক্রমণের। একপর্যায়ে ভারি মেশিনগানের গুলি ও মর্টার শেল ছুঁড়তে থাকে তারাকান্দরের দিকে।

মাত্র এক কিলোমিটার ব্যবধানে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সহস্র জনতা ভারি অস্ত্রশস্ত্রের গুলি ও শব্দে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। পাকবাহিনীর ভারি অস্ত্রের সামনে আর টিকতে না পেরে পিছু হটতে বাধ্য হয় তারা। প্রাণভয়ে অস্ত্রশস্ত্র রেখে পেছন দিকে যে যেভাবে পারে পালাতে থাকে। এই সুযোগে স্থানীয় রাজাকার-আলবদররা পাকবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে ঢুকে পড়ে তারাকান্দর গ্রামে। সহস্রাধিক মানুষ যে যেভাবে পারে আশ্রয় নেয় ডোবায়, ঝোপঝাড়ে, পুকুরে কচুরিপানার মধ্যে। সেখানে পালিয়েও বাঁচতে পারেনি তারা। পাকবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে তাদের নির্মমভাবে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে পাকিদের দোসররা।

প্রতিরোধকারী যোদ্ধাদের ফেলে আসা রাম দা, কুড়াল ইত্যাদি দিয়ে শতাধিক আবালবৃদ্ধবণিতাকে হত্যা করে পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা। বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলা এ নারকীয় হত্যাযজ্ঞে শহীদ হন শতাধিক নারী, পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধ। প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ কেউ মনে করেন, এ সংখ্যাটা দুশ’র অধিক হবে। পাক হানাদারদের সেই নির্মম নৃশংসতার নীরব সাক্ষী পুরো তারাকান্দর গ্রাম ও বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ।

এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যাওয়া যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা জগদীশ বৈদ্য দীর্ঘদিন মানবেতর জীবনযাপন করে দুই বছর আগে যশোরে মারা যান। তারাকান্দর গ্রামের নটোবর রায় তাদের বাড়ির সামনের একটি ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, আমাদের বাড়ির সামনে পুকুরের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে একটা ডোবার মধ্যে পালিয়েছিল ৯ জন। তাদের কাউকে গুলি করে, কাউকে কুপিয়ে, চোখ তুলে নানাভাবে নির্যাতন করে হত্যা করে পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা। তাদের মধ্যে ডহরপাড়া গ্রামের নরেন দাঁড়িয়া (সমদ্দার), তার স্ত্রী, মা এবং চিন্তা দাঁড়িয়া ও তার ছেলে ছিল। এছাড়া ছিল দরশন রায়, তার স্ত্রী ও মেয়ে, মনোমোহন রায়ের ছেলে হরলাল রায়। সেই ভয়াল দৃশ্যের কথা এখনও মনে পড়লে আঁতকে ওঠেন তিনি। জানা যায়, তারাকান্দর খালের পশ্চিম পাড়ে বিষ্ণু রায়ের স্ত্রীকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মৃত পাওয়া যায়। এভাবে তারাকান্দর বৈদ্যবাড়ি, রায়বাড়ি, বিশ্বাসবাড়ির দক্ষিণপাশে মাঠে ও পুকুরপাড়ে সারি সারি মৃতদেহ দেখা যায়। যেসব শহীদের মরদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হয় তারা হলেন রাধিকা বৈদ্য, বিশ্বনাথ বৈদ্যর স্ত্রী পরিষ্কার বৈদ্য এবং তার দুই মেয়ে, পঁচু মণ্ডলের স্ত্রী, কুটিশ্বর মণ্ডল, লক্ষ্মণ বিশ্বাস, দীনেশ হালদার, পোকাই, কালু বালা, বিমল ঢালীর মা, মহেন্দ বৈদ্য, তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে এবং রাজেশ বাড়ৈর স্ত্রী। এছাড়াও এলাকা ও এলাকার বাইরের নাম না জানা বহু মানুষকে সেদিন এই তারাকান্দর বধ্যভূমিতে হত্যা করা হয়। এ হত্যাযজ্ঞের পাশাপাশি নারী নির্যাতন, লুটপাট ও ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা। এভাবে নারকীয় হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করতে করতে পশ্চিম তারাকান্দর থেকে পূর্ব তারাকান্দর হয়ে নলভিটা পর্যন্ত যায় পাকবাহিনী।

দেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৮ বছর। এর মধ্যে স্বাধীনতার পক্ষশক্তি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকেছে প্রায় বিশ বছর। এলাকাটি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্বাচনী এলাকা। এ ঘটনা নিয়ে এর আগে লেখালেখি হলেও স্থানীয় প্রশাসন কিংবা সরকারের তরফ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি। তাই এলাকার মুক্তিযোদ্ধা তথা শহীদ পরিবার ও গ্রামবাসী হতাশ। কারণ একাত্তরের সেসব শহীদের কথা কেউ মনে রাখেনি। তাদের নাম ঠাঁই পায়নি ইতিহাসেও। এমনকি তারাকান্দরের এই গণহত্যার কথা মানুষ জানেও না। আজ পর্যন্ত এ শহীদদের নামে কোনো স্মৃতিফলক নির্মিত হয়নি। শহীদদের তালিকা প্রণয়ন ও তাদের স্মৃতি সংরক্ষণ করার ব্যাপারেও উদ্যোগ নেয়নি কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা স্থানীয় প্রশাসন। স্থানীয় মানুষের দাবি, একাত্তরের শহীদদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে তারকান্দরের শহীদদের তালিকা খুঁজে বের করে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হোক।

প্রশান্ত অধিকারী : সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×