কৃষকের ধানের ন্যায্য দাম দ্রুত নিশ্চিত করুন

  ড. তাজুল ইসলাম চৌধুরী তুহিন ০৩ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ধান

ধান নিয়ে গত কয়েকদিন ধরেই তুলকালাম কাণ্ড ঘটছে। কৃষকের গোলা থেকে শুরু করে পথঘাট, মাঠ, চাতাল- সবখানে এখন পাকা ধানের ছড়াছড়ি। গত ১০ বছরের মধ্যে চালের এত ভালো উৎপাদন আর লক্ষ করা যায়নি। তারপরও কৃষকের মুখে হাসি নেই, স্বস্তির কোনো খবর নেই। কৃষকের আহাজারি আর কান্না যেন থামানোরও কেউ নেই। ব্যক্তিগতভাবে অনেকে পাশে দাঁড়ালেও রাষ্ট্রীয়ভাবে যতটুকু বলা হচ্ছে বা করা হচ্ছে, তাতে কৃষক নিশ্চিন্ত হতে পারছে না।

আর নিশ্চিন্ত হবেই বা কীভাবে; গত কয়েকদিন ধরে কৃষকের মাতম চলতে থাকলেও এ সমস্যা সমাধানে তেমন কোনো প্রয়োজনীয় উদ্যোগ এখন পর্যন্ত লক্ষ করা যায়নি। আমরা সবাই অন্ধ হলেও কৃষকের এ প্রলয় বন্ধ হচ্ছে না বরং প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও কৃষকের নানা অসহায়ত্বের কথা বেরিয়ে আসছে।

একসময় গোয়াল ভরা গরু, গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ ছিল কৃষকের নিজস্ব সম্বল। তখনকার কৃষক সমাজের মূল উৎপাদক শক্তি হিসেবে ভূমিকা রেখেছে, অর্থনীতির চাকা সে নিজে নিয়ন্ত্রণ করেছে। কালের বিবর্তনে জমিদারদের চক্রান্তে কৃষক তার জমি হারিয়েছে, গোলা হারিয়েছে, শক্তি হারিয়েছে, পেশিও হারিয়েছে। কৃষককে আজ বলা হয় ভূমিহীন ক্ষেতমজুর।

গোলা আজ সব মহাজন আর জোতদারের আড়তে জড়ো হয়েছে। গ্রামের অধিকাংশ কৃষক আজ নিঃস্ব, সহায়-সম্বলহীন ও দিন আনতে পানতা ফুরোয় অবস্থা। তাই রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে অধিক ফলন পেলেও দাম না পাওয়ার আশঙ্কায় তাকে আর মাতোয়ারা করে না। চটকদার কোনো কথা ও কাজ এখন আর কৃষকের হৃদয়কে নাড়া দেয় না। কৃষক শুধু বুঝতে চায় ধান বিক্রি করে সে তার ধারদেনা পরিশোধ করবে, দুবেলা দুমুঠো ভাত পেট ভরে পরিবারের সঙ্গে নিশ্চিন্তে খাবে, তার স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের বেতনের টাকা পরিশোধ করবে অথবা অন্য কোনো প্রয়োজন মেটাবে।

কৃষিতে বাংলাদেশের সাফল্য অপরিসীম এ কথাটি অস্বীকারের কোনো উপায় নেই। আজ বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। খাদ্য রফতানি করার সক্ষমতা অর্জন করছে, ধান উৎপাদনে বৈশ্বিক গড়কে পেছনে ফেলে পৃথিবীতে চতুর্থ স্থান করে নিয়েছে। ইতিপূর্বে চাল রফতানিও করেছে সার্কভুক্ত কয়েকটি দেশে। প্রবাসীরা দেশের বাইরে থেকেও স্বাদ পাচ্ছে দেশের চালের। মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। প্রাণিজ আমিষ উৎপাদন অনেক বেড়েছে, ডিম-দুধের জোগান বেড়েছে এ খবরগুলো আমাদের জন্য খুবই আশাজাগানিয়া।

এত সব ভালো খবরের পরও আমরা স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও কৃষকের পরিশ্রমের সঠিক মূল্য দিতে ব্যর্থ হয়েছি। অন্য যে কোনো পেশা থেকে কৃষকের আয় অনেক কম বাংলাদেশে। কৃষককে আমরা তার দুর্যোগকালীন বা আপৎকালীন নিরাপত্তা দিতে পারি না। অনেক ক্ষেত্রেই কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায় না। প্রতিদিন জীবনযুদ্ধের সঙ্গে সংগ্রাম করেই বেঁচে থাকে আমাদের প্রান্তিক কৃষক। আর তাই মাঠের কৃষিকে আমাদের তরুণ প্রজন্ম আর পেশা হিসেবে নিতে আগ্রহী হয়ে উঠে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে আজ থেকে ১০-২০ বছর পর আমাদের কৃষির কী অবস্থা হবে, তা কি আমরা ভেবে দেখেছি?

তাই কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। তার সঙ্গে ফড়িয়া, যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাব, বাজারজাত ও পরিবহনের সংকট এবং নানা অব্যবস্থাপনাকে শক্ত হাতে মোকাবেলা করতে হবে। কৃষি উন্নয়নে সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ (যেমন কৃষি ঋণ, সঠিক বীজ বিতরণ, ১০ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ইত্যাদি) নিয়েছে- এ কথাগুলো আর নতুন করে বলার কিছু নেই; তবে এগুলো আরও যথাযথ বিশ্লেষণের নিরিখে নেয়া প্রয়োজন। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কৃষিতে আরও বেশি বিনিয়োগে আগ্রহী করা প্রয়োজন। এ সময় বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আইন করে হলেও কৃষকের পাশে থাকার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

কৃষি রফতানি বাজার সৃষ্টি করার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া দরকার। তবে রফতানির আগে পরবর্তী সময়ে সংকট মোকাবেলা করার সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে। রফতানির জন্য লবিস্ট ও বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকে আরও বেশি কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। প্রয়োজনবোধে দূতাবাসগুলোতে কৃষি বাণিজ্য প্রতিনিধির পদও সৃষ্টি করা যেতে পারে। সঠিক পদ্ধতি আর নীতিনির্ধারণ করতে পারলে কৃষি রফতানিও বছরে কয়েক বিলিয়ন করা সম্ভব। মুখ্য বিষয়, এতে কৃষকের জীবনমানের উন্নয়ন হবে এবং গ্রামের খেটে খাওয়া এ মানুষগুলো একটু স্বস্তিতে জীবন যাপন করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিবিষয়ক সংস্থা ইউএসডিএ গত মাসে বিশ্বের দানাদার খাদ্যের বৈশ্বিক উৎপাদন অবস্থা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা গেছে, গত এক বছরে বাংলাদেশে চালের উৎপাদন বেড়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। এ বছর উৎপাদন হতে পারে ৩ কোটি ৫৩ লাখ টন চাল, যা বিশ্বের প্রধান ধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। ধানের বাম্পার ফলন হলেও দেশের প্রধান ধান-চালের মোকাম ও বাজারে বিক্রি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। অন্য বছরগুলোয় এ সময়ে ধানের জোগান কম থাকে, তাই দামও বেশি থাকে। এ বছর জোগান বেশি আর দাম কম। সরকার সাড়ে ১২ লাখ টন ধান-চাল সংগ্রহের ঘোষণা দিলেও মাঠপর্যায়ে তা এখনও কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারেনি।

খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ১২ লাখ ৫০ হাজার টন ধান-চাল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে এক লাখ ৫০ হাজার টন বোরো ধান (চালের আকারে এক লাখ টন), ১০ লাখ টন সিদ্ধ চাল এবং এক লাখ ৫০ হাজার টন আতপ চাল থাকবে। আর প্রতি কেজি বোরো ধানের সংগ্রহ মূল্য ২৬ টাকা, প্রতি কেজি সিদ্ধ চালের দাম ৩৬ টাকা এবং আতপ চালের দাম ৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি সংগ্রহ মূল্য ২৬ টাকা ইতিবাচক। অর্থাৎ মণপ্রতি দাম হয় এক হাজার ৪০ টাকা। এটাকে কৃষকবান্ধব দর বলা গেলেও বাস্তবে এ দাম কৃষকের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।

সরকার মিলারদের মাধ্যমে বেশি দামে চাল কিনলেও মিলাররা কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনছে ৪০০-৫০০ টাকার মধ্যে। এক কথায় সরকারি দামের অর্ধেকও পায় না কৃষক; ওই টাকা যায় মধ্যস্বত্বভোগী মিলারদের কাছে। আর মিলাররা ধান শুকানোর মানের অজুহাত তুলে কৃষককে বঞ্চিত করছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি লোকজনও ধান শুকানোর মান নিয়ে মিলারদের কারসাজির সুযোগ করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া বিশেষ করে শ্রমিক ব্যয় বড় একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃষকের জন্য। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা জানতে পারছি, দুই মণ ধানের দামেও একজন মজুর মিলছে না। এর পেছনে কৃষি দিনমজুরের পেশা বদলের বিষয়টি অন্যতম সমস্যা হয়ে উঠেছে। শ্রমিকরা এখন জমিতে দিনমজুরি না করে অন্য পেশায় নিয়োজিত হচ্ছে বা শহরে চলে যাচ্ছে। ফলে গ্রামে ব্যাপকভাবে শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। শ্রমিক সংকট কাটাতে প্রযুক্তির দিকে নজর দেয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। প্রযুক্তিকে যত সহজভাবে দেশের কৃষি খাতে যুক্ত করা যাবে কৃষকের জনবলের প্রয়োজনীয়তা ও খরচ ততই কমে আসবে। ফলে ধানের দাম আর উৎপাদন খরচের ভারসাম্য বজায় থাকবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে আরও বেশি এগিয়ে আসতে হবে।

এসব বিষয় মাথায় রেখে আমাদের দরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও জরুরি ভিত্তিতে কার্যকরী পদক্ষেপ। আর তাহলেই কৃষি বাঁচবে, কৃষক বাঁচবে আর আমরাও বেঁচে যাব। অন্যথায় হয়তো কৃষকের খুব বেশি লাভ হবে না।

ড. তাজুল ইসলাম চৌধুরী তুহিন : সহযোগী অধ্যাপক, কৃষি রসায়ন বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

[email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : ধানের ন্যায্য মূল্য দাবিতে আন্দোলন

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×