মোদির দ্বিতীয় ইনিংসে কী হবে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি?

  গৌরীশংকর নাগ ০৩ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নরেন্দ্র মোদি

মোদির দ্বিতীয় ইনিংসে চমকের প্রত্যাশায় জল্পনা তুঙ্গে। আর সেই ভাবনা থেকেই আশা-আকাক্সক্ষার দোলাচলে ভারতীয় বিদেশনীতি সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে যে কথাটি এসে পড়ে তা হল, পপুলিজম থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ২০১৬’র সেপ্টেম্বরে সার্জিকাল স্ট্রাইক ২০১৭’র ডোকালাম সংকট এবং সম্প্রতি বালাকোট বিমান হানার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয় অবস্থানে সামান্য হলেও ভারসাম্যের অভাব ঘটেছে, যাকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক পরিভাষায় 'Realist tilt' বলা যেতে পারে। শুধু অস্ত্র কেনা, অন্য দেশের সঙ্গে যৌথ মহড়া বা মিসাইল প্রযুক্তির উন্নতি ঘটিয়ে ডিফেন্স মডার্নাইজেশন নয়, চাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর সমান গুরুত্বারোপ।

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে অবশ্য আশার কথা শোনা যাচ্ছে, কারণ ২০১৯-২০ অর্থবছরে বৃদ্ধির সম্ভাবনা ৭.৫ শতাংশ। তবে আত্মতুষ্টির জায়গা নেই। তাছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার সমস্যা হল রফতানির ক্ষেত্রে ঘাটতি, যার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির। ভারতের ক্ষেত্রে রফতানির পরিমাণ তার জিডিপির ১০ শতাংশ। এটা হওয়া উচিত ৩০-৪০ শতাংশ। এ বিষয়ে চীন এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে। সুতরাং চীনের থেকে শিখতে হবে।

আবার দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অর্থনীতির সুবিধা বা অসুবিধা যাই বলি না কেন, সেটা যেমন তার দীর্ঘ ঔপনিবেশিক কারণে, তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির অভাব রয়ে গেছে। ফলে প্রায়ই পপুলিজম থেকে বেরিয়ে বা ভাবাদর্শের গণ্ডি অতিক্রম করে ভারত উন্নত মানবসম্পদ গঠনের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে সেভাবে নজর দিতে পারেনি। অথচ তা না করলে আন্তর্জাতিক বাজারে যথেষ্ট প্রতিযোগিতামূলক হওয়া সম্ভবপর নয়। সাম্প্রতিককালে চীনা অর্থনীতির শ্লথ বৃদ্ধির কারণ তার জোগানের দিকে ঘাটতি, বিশেষত সস্তা শ্রমিকের বড়ই অভাব। ভারত তুলনামূলকভাবে সেদিক থেকে এগিয়ে থাকলেও বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ হান্স টিমারের মতে, ভারতের আর্থিক বৃদ্ধির কারণ প্রধানত তার অভ্যন্তরীণ চাহিদা।

ফলে একদিকে যেমন কারেন্ট অ্যাকাউন্টের ঘাটতির বিপুল বৃদ্ধি ঘটছে, তেমনি আমদানি যতটা বাড়ছে, তার তুলনায় রফতানি বৃদ্ধির হার একেবারেই আশাপ্রণোদিত নয়। তবে মোদি-জেটলির যৌথ উদ্যোগে জিএসটির ফলে অবশ্যই আন্তরাজ্য পণ্য ও বাণিজ্যে জোয়ার এসেছে বলা যায়। সুতরাং এবার নতুন ইনিংসের শুরুতেই যেটা দেখা দরকার সেটা হল দক্ষিণ এশিয়ার অভ্যন্তরে এবং ভারতের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্য বৃদ্ধি। সুতরাং নতুন অর্থনৈতিক কূটনীতির মধ্য দিয়ে ভারতকে সেই নেতৃত্ব দিতে হবে এবং ই-কমার্সকে আরও প্রসারিত করার উদ্যোগ নিতে হবে।

নতুন সরকারকে দেখতে হবে যাতে রফতানি বৃদ্ধির জন্য প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন ব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত আবিষ্কার, স্টার্টআপ বাড়ানো যায়। এমনকি নজর দিতে হবে যাতে উৎপাদনে আগামী দিনে আরও মহিলাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো যায়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, ভারতে লিঙ্গবৈষম্য এখনও উদ্বেগজনক। ফলে একাধারে সামাজিক সচেতনতার প্রসার যেমন প্রয়োজন, তেমনি সরকারি স্তরে নতুন আইনি রক্ষাকবচের ভাবনার গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। কারণ মহিলাদের কর্মস্থলের নিরাপত্তা বৃদ্ধি এর অপরিহার্য পূর্বশর্ত।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আগামী দিনে মোদির বিদেশনীতির একটা বড় চ্যালেঞ্জ হবে কীভাবে পাকিস্তানি প্ররোচনায় সায় না দিয়ে আঞ্চলিক স্থিতি ও বাণিজ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা যায়। ইতিমধ্যে আমরা দেখেছি, পাকিস্তান মোদির পুনর্নির্বাচনকে অনেকটা উত্তর কোরিয়ার ঢঙে দেখতে চাইছে। তারা পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম নতুন ব্যালিস্টিক মিসাইল উৎক্ষেপণের জন্য এ সময়টিকে বেছে নিয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, ভারত-পাক বিরোধ আগামী দিনে আঞ্চলিক বাণিজ্য প্রসারের ক্ষেত্রে গলার কাঁটা হয়ে উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে লাভ হবে তৃতীয় রাষ্ট্রের। যেমন- চীন বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। সুতরাং আঞ্চলিক বাণিজ্য যাতে প্রসারিত হয়, তার চেষ্টা করতে হবে।

বস্তুত, এটা তখনই সম্ভব যখন ভারত পণ্য পরিবহনের জন্য সোনালি চতুর্ভুজের মতো গতিশীল করিডোর তৈরি করতে পারবে। ইতিমধ্যে ভারত ৩৩০০ কিমি বিস্তৃত পূর্ব-পশ্চিম করিডোর, ১৩৬০ কিমিজুড়ে ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড সংযোগকারী ট্রাইল্যাটারাল হাইওয়ে, ভারত-মিয়ানমারের মধ্যে কালাভান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট এবং ২৮০০ কিমি বিস্তৃত বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমার সংযোগকারী অর্থনৈতিক করিডোরের কাজ শুরু করতে পেরেছে (আরআইএস প্রকাশিত Assessing Economic Impacts of Connectivity Corridors, 2018 দ্রষ্টব্য)।

সেই সঙ্গে আফগানিস্তানের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের স্বার্থে ইরানের চাবাহার বন্দরকেও ব্যবহার করতে চাইছে। ইরানের তুলনামূলক সুলভ তেলও ভারতের অত্যন্ত প্রয়োজন। ইতিমধ্যে ইরান থেকে তেল আমদানিতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ভারত মানবে কিনা নির্বাচনের দরুন সরকার তা নিয়ে সন্দিহান ছিল। কিন্তু নির্বাচন মিটতে না মিটতেই দেখা গেল এ বিষয়ে সরকার মার্কিন চাপের কাছে মাথা নুইয়েছে। ফলে অপরিশোধিত তেলের জোগানে টান পড়লে বা তেলের মূল্যবৃদ্ধি ঘটলে সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতির বিরূপ প্রভাব থেকে ভারত সহজে বেরোতে পারবে না। সুতরাং নতুন সরকারকে একদিকে যেমন টাপি প্রজেক্টে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, তেমনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ না করেও মার্কিন সখ্য নিয়ে ভবিষ্যতে ভাবতেই হবে। কারণ ট্রাম্পের নীতি হল ‘America First’।

ফলে আমেরিকা চীনের সঙ্গে ইতিমধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। আবার হুয়াওয়েইকে আটকানোর মধ্য দিয়ে মার্কিন-চীন বিরোধ নতুন করে প্রযুক্তিগত ঠাণ্ডা যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। ফলে অর্থনীতিতে ডমিনো প্রভাব পড়ার প্রভূত সম্ভাবনা রয়েছে। এ অবস্থায় মোদি সরকারের উচিত চীনকে অহেতুক ক্ষিপ্ত না করে সুনির্দিষ্ট স্ট্র্যাটেজি গ্রহণ করা। যেমন- এশিয়ান রিভিউতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে কিরণ শর্মা জানাচ্ছেন, মোদি চাইছেন ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড হাইওয়েকে ইন্দো-চীন পর্যন্ত প্রসারিত করতে, যাতে চীনের ইজও-এর সঙ্গে আংশিকভাবে পাল্লা দেয়া যেতে পারে। তাছাড়া বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে ভারত তার প্রধান হাইওয়েগুলোকে সংযুক্ত করতে চাইছে।

তবে বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল টুইং ইং-এর মতে, এশিয়ার ভারত ও জাপানের যোগাযোগ ব্যবস্থার নকশা যতটা না নিজের স্বার্থে তার থেকে বেশি চীনের প্রভাব রোধ করার জন্য। দ্বিতীয়ত, ভারত মহাসাগরে চীনকে আটকানো উচিত। কারণ ভবিষ্যতে যদি চীন একাধারে জাপান ও আমেরিকার মুখে পড়ে, তখন হয়তো সে ভারত মহাসাগরকে ‘Strategic depth’ হিসেবে ব্যবহার করতে চাইবে। এর ফলে একদিকে যেমন ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতীয় আধিপত্য ক্ষুণ্ণ হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়, তেমনি চীনের সামরিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রের সম্প্রসারণের পথ এর ফলে উন্মুক্ত হতো।

পরিশেষে মোদির আমলে ভারতের বিদেশনীতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভারতের সখ্য; সেই সঙ্গে জাপান, ইসরাইল ও ঈখগঠ দেশগুলোর সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৬ সালে মোদির ভিয়েতনাম সফরের পরপরই ভারত-ভিয়েতনাম সম্পর্ক কম্প্র্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপে উত্তীর্ণ হয়েছে। এর পাশাপাশি ভারতের উচিত হবে ইবসা, ব্রিকস্?, মেকং গঙ্গার মতো আঞ্চলিক অথচ বহুপাক্ষিক গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করে যাওয়া। তবেই ভারত আগামী দিনে অর্থনৈতিক পাওয়ার হাউস হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পাশাপাশি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হওয়ার দৌড়ে নিজেকে এগিয়ে রাখতে পারবে।

বিদেশি পত্রিকা থেকে

গৌরীশংকর নাগ : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, সিধু-কানহু-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

ঘটনাপ্রবাহ : ভারতের জাতীয় নির্বাচন-২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×