আমাদের ঈদ মোনাজাত

  সালাহ্উদ্দিন নাগরী ০৪ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঈদ মোনাজাত
মোনাজাত। ছবি: সংগৃহীত

বছর ঘুরে রমজানের ঈদ আমাদের দ্বারপ্রান্তে। সহজ কথায় ঈদ অর্থ খুশি। ঈদের খুশিকে প্রিয়জনের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য আমাদের প্রচেষ্টার শেষ নেই। ঈদের কেনাকাটায় দোকানপাট, মার্কেট, বাজার চষে বেড়াচ্ছি, প্রিয়জনের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য উপহারসামগ্রী কিনছি।

মা-বাবা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য বাস, ট্রেন, লঞ্চ, স্টিমার ও আকাশপথের টিকিট সংগ্রহে হন্যে হয়ে ঘুরছি। কোনো ক্লান্তি নেই, কোনো বিরক্তি নেই, ঈদ আনন্দের আভা এখনই চোখে-মুখে ফুটে উঠছে।

ঈদের এ আনন্দ আমরা কেন সারা বছর জারি রাখতে পারি না? জাতীয় জীবনে আমাদের অনেক বড় বড় অর্জন তো হয়েছে। আমাদের গড় আয়ু, মাথাপিছু আয়, জীবনযাত্রার মান ও ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। দারিদ্র্যদূরীকরণ, বেকারত্ব হ্রাস, এসডিজির অভীষ্ট অর্জনে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। ভৌত অবকাঠামোর ব্যাপ্তি ও সংখ্যা বেড়েছে। আমরা উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হয়েছি।

কিন্তু তারপরও কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা কেন জানি হেরে যাচ্ছি। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় জীবনে মনে হয় অসহিষ্ণু হয়ে উঠছি। জীবন থেকে মানবিকতা, শুভ চিন্তা, শুভ ইচ্ছা, শুভ উদ্যোগ হারিয়ে যাচ্ছে। হিসাবের খেরোখাতা কেন জানি এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। কোথায় চলেছি আমরা?

স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা পরস্পরের মধ্যে অবিশ্বাস, সন্দেহ ও অবহেলা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মান-অভিমান থেকে দ্বন্দ্ব, বিতৃষ্ণা জীবনকে বিষিয়ে তুলছে। কেউ কারও প্রতি যথাযথ আচরণ করতে পারছি না। পারিবারিক জীবনে আমাদের গর্বের বন্ধনগুলো আলগা হয়ে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত পরকীয়া ও বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কে আমরা জড়িয়ে পড়ছি।

প্রেম প্রতারণা, বন্ধুবান্ধবসহ প্রেমিকার শ্লীলতাহানি, আবেগঘন মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে দেয়া এবং অপরজনকে ভিডিও অনলাইনে রেখে গলায় ফাঁস দিয়ে প্রতিশোধ নেয়া দিন দিন বেড়েই চলেছে। পত্রিকার পাতা খুললেই চোখের সামনে এ খবরগুলো বারবার ভেসে উঠছে। আমরা তো এ ধরনের খবর ও ছবি দেখতে অভ্যস্ত নই। এ ধরনের প্রবণতা বৃদ্ধি পুরো সমাজকে অস্থির করে তুলছে।

নারীর প্রতি সহিংসতা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। বাস, ট্রেন, লঞ্চ, স্টিমার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, বাসাবাড়ি কোনো খানেই কোনো বয়সের নারীই আজ আর নিরাপদ নয়।

শ্লীলতাহানি, ধর্ষণ, গণধর্ষণ এবং ধর্ষণের ভিডিও ধারণ অতি স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। কটিয়াদীতে ইবনে সিনা হাসপাতালের নার্সকে গণপরিবহনে পরিকল্পিতভাবে ধর্ষণ এবং খুন সচেতন মানুষকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। সবারই তো স্ত্রী, সন্তান, মা, বোন আছে; তাদেরও তো একা একা ভ্রমণ করতে হয়। তাদের বাইরে পাঠিয়ে আর চিন্তাহীন থাকা যাচ্ছে না।

ঢাকাসহ সারা দেশে সড়কে অপঘাত জনমানুষের কাছে বিভীষিকায় পরিণত হয়েছে। শহরের ভেতরের সড়কসহ, মহাসড়ক, আঞ্চলিক মহাসড়ক কোথায় নিরাপত্তা নেই। রিকশা, টেম্পো, মোটরসাইকেল, বাস, ট্রাক, ব্যক্তিগত যানবাহন কোনো কিছুই নিরাপদ নয়। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, টিভি স্ক্রল ও চ্যানেলে যানবাহনজনিত দুর্ঘটনায় মৃত্যুর খবর ভেসে উঠছে।

এসব নিয়ে সেমিনার, ওয়ার্কশপ, টকশো, পত্রিকার পাতাজুড়ে নিবন্ধ-প্রবন্ধ লেখা হচ্ছে। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন গাইডলাইন, নির্দেশাবলি জারি হচ্ছে। তারপরও ফিটনেস ও রুট পারমিট ছাড়া লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভার-হেলপার গাড়ি চালাচ্ছে, লক্কড়ঝক্কড়, ছাল-বাকল উঠে যাওয়া বাস-মিনিবাস চলছে। লোভের খপ্পরে পড়ে অন্য গাড়ির সঙ্গে পাল্লাপাল্লি করছে। দু’পাশে গাড়ি চলা অবস্থায় রাস্তার মাঝখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছে।

বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতে ঢাকাসহ অনেক শহরের নিচু এলাকার বাসাবাড়ি, কর্মপ্রতিষ্ঠান, মিল-ফ্যাক্টরি হাঁটুপানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় বের হওয়া সিএনজি অটোরিকশা, প্রাইভেট কার, রিকশার পাদানি পানিতে নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছে। মুমূর্ষু রোগীকে যথাসময়ে চিকিৎসা দেয়া যাচ্ছে না। ঘর থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না। ১৬ কোটি মানুষের সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রভূমি ঢাকা অচল হয়ে যাচ্ছে।

গ্রামাঞ্চলে বাড়িঘর, দোকানপাট নির্মাণে আগে খড়, কাঠ, টিনের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে আগুন লাগত বেশি। তখন ফায়ার সার্ভিস ছিল না। আগুন লাগলে মহল্লার পর মহল্লা পুড়ে ছারখার হয়ে যেত। বালতি দিয়ে পানি ছুড়ে আগুন নেভানো হতো। গ্রামের সে আগুন এখন ইটপাথরের শহরে ভর করেছে। বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল, দাহ্য বস্তুর গোডাউন, মিল-ফ্যাক্টরি, দোকানপাটের আগুন আমাদের পুড়িয়ে মারছে। নিয়ম না মেনে স্থাপনা নির্মাণ, নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহারের কারণে শর্টসার্কিট, এসি ও গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে অগ্নিকাণ্ড লেগেই থাকছে।

খাদ্যে ভেজাল গোটা দেশের মানুষকে ভীষণভাবে আতঙ্কিত ও চিন্তিত করে ফেলেছে। শিশুখাদ্য, রোগীর পথ্য থেকে শুরু করে সবকিছুতেই ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো হচ্ছে। ফলমূল, শাকসবজি, মাছ, মাংস, দুধ, মিষ্টান্ন দ্রব্য, বিভিন্ন ধরনের জুস, কনফেকশনারি আইটেম কোনো কিছুই ভেজালকারীদের কালো নিঃশ্বাস থেকে বাদ পড়ছে না। কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে সুপারমলের খাদ্যপণ্য, ফুটপাতে কাপড় দিয়ে ঘেরা ভাতের দোকান থেকে দেশের সেরা অভিজাত হোটেলের সবকিছুতেই প্রাণসংহারকারী ভেজাল। কাপড়ের রং, ফরমালিন, হাইড্রোস, ইউরিয়া, চকপাউডার, টিসু পেপার, বিভিন্ন কেমিক্যাল মিশিয়ে মানুষকে খাওয়ানো হচ্ছে বিষের অমৃত।

তাৎক্ষণিকভাবে ওইসব খাদ্যদ্রব্যের কুপ্রভাব হয়তো বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু ধীরে ধীরে দুরারোগ্য ব্যাধি শরীরে বাসা বাঁধছে। আমাদের দেশে দুরারোগ্য ব্যাধি নিরাময়ে উন্নতমানের চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে উঠেনি। বিদেশে ব্যয়বহুল চিকিৎসা গ্রহণ সবার পক্ষে সম্ভব নয়। কয়েকদিন থেকে ফেসবুকের নিউজ ফিডে কিছু কথা ঘুরেফিরে আসছে- একজন ডাক্তারের ভুলের কারণে একজনের মৃত্যু হতে পারে, একজন প্রকৌশলীর ভুলের কারণে একটি স্থাপনা ভেঙে জানমালের ক্ষতি হতে পারে।

কিন্তু খাদ্যে ভেজাল একটি জেনারেশনকে নিঃশেষ করে দিতে পারে। ভেজাল খাদ্য আমাদের অসুস্থ জাতিতে পরিণত করছে। সরকারের তরফ থেকে ভেজাল নিরোধে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। ভেজাল মিশ্রণকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতার অভাবে খাদ্যে ভেজালের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না।

তরুণ-যুবসমাজের নেশায় আসক্তি পরিবার ও সমাজ জীবনে আমাদের কঠিন সমস্যার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। আসক্তি শুধু তাকে নয়, পুরো পরিবারকে তছনছ করে দিচ্ছে। মাদকের করাল গ্রাস থেকে তরুণ-যুবাদের ফিরিয়ে আনার জন্য সরকার যারপরনাই চেষ্টা করে যাচ্ছে। পিতা-মাতা, অভিভাবককে সন্তানের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতে এবং পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। মা-বাবার কলহ সন্তানের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। তাদের মধ্যে তখন অসহায়ত্ব কাজ করে, জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কাজকর্মে। কিন্তু তারপরও আমাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

দেশে এত এত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তারপরও এশিয়া মহাদেশের প্রথম ৪১৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায় আমাদের একটিও নেই। অনেক উন্নত দেশের থেকে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হার অনেক বেশি। একটি প্রবাদ আছে, ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন’। একজন শিক্ষার্থী সরকারি স্কুল-কলেজে যেভাবে বেড়ে উঠে, উচ্চশিক্ষার জন্য প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে ক্ষুদ্র অবকাঠামোর মধ্যে তাকে বন্দি হয়ে যেতে হয়।

ঢাকা শহরের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অডিটোরিয়াম, খেলার মাঠ নেই। বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও শহরের ঘিঞ্জি এলাকার কোনো বহুতল ভবনের নিচতলায় ওয়েল্ডিং কারখানা, দ্বিতীয় তলায় কমিউনিটি সেন্টার, তৃতীয় তলায় কর্পোরেট অফিস, চতুর্থ তলায় সাত-আট রুমের ফ্লোরে পুরোদস্তুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলছে। গলির মুখের এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে বিশ্বজনীন স্ট্যান্ডার্ড কোথায়?

তাই তো নতুন সহস্রাব্দের সূচনালগ্নে বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে অনেকেই নিজের অর্জিত জ্ঞান খাপ খাওয়াতে পারছে না। স্নাতক, স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেও কর্মসংস্থান হচ্ছে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি অপেক্ষা শিক্ষার মান বৃদ্ধি আরও জরুরি হয়ে পড়েছে। শিক্ষাকে আমরা কবে, কীভাবে বাণিজ্য থেকে পৃথক করতে পারব?

পারিবারিক বন্ধনে শিথিলতা, সম্প্রীতির অভাব, নারীর প্রতি সহিংসতা, খাদ্যে ভেজাল, সড়কে অপঘাত, যানজট ও অন্য অশুভ কার্যক্রমগুলো আমাদের জাতীয় জীবনের বড় বড় অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে। উল্লিখিত এ সমস্যাগুলো বহুল আলোচিত। এগুলো নিরসনে সরকার যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। সরকারের একার পক্ষে সব সমস্যার সমাধানও সম্ভব নয়। তারপরও সরকারের সে চেষ্টায় আমরা নিজেকে শামিল করছি না। অন্যায় লোভের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেই চলেছি। আমাদের খাই-খাই মনোবৃত্তি সবকিছুকে গ্রাস করে নিচ্ছে।

আমাদের মেধা-মনন আছে। সুন্দর জীবনের আকাক্সক্ষা এবং সুস্থির সমাজ গঠনের উদগ্র বাসনা ও অঙ্গীকার আছে। তারপরও পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, সেবাপ্রদান-সেবাপ্রাপ্তি, পণ্য, ভোগ্যপণ্য ক্রয়বিক্রয়, আদানপ্রদানে অন্যকে প্রতারিত, হয়রানি ও বঞ্চিত করছি। বহুবিধ অন্যায় কাজের মাধ্যমে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও জাতীয় জীবনকে অস্থির করে তুলছি। নিজেকে সংশোধন করার জন্য মনের মধ্যে সামান্যতম তাগিদ অনুভব করছি না। ফলে নিরুপদ্রব সমাজ গঠনে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। হোক না এবার ঈদ মোনাজাতটি একটু দীর্ঘ।

ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সমাজ জীবনে অসঙ্গতি, অনিয়ম দূরীকরণ ও ঈদের আনন্দ সারা বছর জারি রাখার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করি। আমাদের সবই আছে; মনে হচ্ছে বোধ, শুধু বোধের ঘাটতির কারণে আমাদের দক্ষতা, যোগ্যতা ও প্রচেষ্টার কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ হচ্ছে না। তাই সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গঠনে সবার মধ্যে বোধের উন্মেষ ঘটুক। এটাই হোক আমাদের এবারের ঈদ মোনাজাত।

সালাহ্উদ্দিন নাগরী : সরকারি চাকরিজীবী

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×