স্তরভেদে শিক্ষার হাল-হকিকত

  মুঈদ রহমান ০৯ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষা

গত ১২ মে যুগান্তরের উপসম্পাদকীয়তে ড. মাহবুব উল্লাহ্ একটি লেখা পড়লাম। লেখাটির মূল বক্তব্য ছিল এদেশের উচ্চশিক্ষার মানের ক্রমাবনতি সম্পর্কে। টাইমস হাইয়ার এডুকেশন নামে লন্ডনভিত্তিক একটি পত্রিকা ২০১৯ সালে এশিয়ার দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর একটা জরিপ করেছে।

তাতে তারা এশিয়ার ৪০০টি বিশ্ববিদ্যালয়কে টপ অর্ডারে রেখেছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এই ৪০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের ৪২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটিও স্থান পায়নি। এমনকি প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও একটুখানি জায়গা করে নিতে পারেনি।

স্বনামধন্য সাহিত্যিক-সমালোচক আহমদ ছফা অবশ্য আশির দশকেই বলেছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অক্সফোর্ড বলার কারণ যথার্থ হতে পারে তার প্রাথমিক স্থাপনার স্থাপত্যশৈলীতে, কোনোভাবেই একাডেমিক কন্ট্রিবিউশনে নয়। এর বিপরীতে সত্যেন বোসের নাম বলা যেতে পারে, তবে একমাত্র উদাহরণকে পুঁজি করে পথ চলা যায় না। কিন্তু তার রাজনৈতিক ভূমিকাকে আহমদ ছফাও অস্বীকার করেননি।

আমরাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ’৫২, ’৬৬, ’৬৯, ’৭১ ও ’৯০-এর ভূমিকাকে তুচ্ছজ্ঞান করার অধিকার বা ইচ্ছা রাখি না, বরং গর্বই করি। সেই রাজনৈতিক উপলব্ধিও আজ প্রায় বিলুপ্ত। একচেটিয়া এবং সরকারের লেজুড়বৃত্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতির পরিচয় অত্যন্ত মলিন হয়ে গেছে। মাহবুব স্যার অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষাতেই বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অতিমাত্রায় দলীয়করণ, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং গবেষণাবিমুখতা এই পরিণতির জন্য দায়ী।

তিনি দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। তার অভিজ্ঞতালব্ধ পর্যবেক্ষণকে খণ্ডন করার কোনো সুযোগ তিনি তার লেখায় রাখেননি। তার শিরোনাম থেকে একটি আশঙ্কার বাণী উচ্চারিত হয়েছে, এই ‘দুষ্টচক্র’ (যাকে আমরা ইংরেজিতে বলি Vicious Cycle) থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার সুযোগ আছে কিনা। আমি স্যারকে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই, এর থেকে আপাত মুক্তির কোনো সম্ভাবনা নেই। স্যারের সঙ্গে দ্বিমত না করে বরং ভয়াবহতার স্বরূপটি খানিকটা বিস্তৃত করতে চাই।

আজ থেকে ২০ বছর আগে উচ্চশিক্ষা নিয়ে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বক্তব্য ছিল, ‘উচ্চশিক্ষার ভিত্তি একাধিক। একটা ভিত্তি বস্তুগত, যার কিছুটা প্রাতিষ্ঠানিক। আরেকটা ভিত্তি আদর্শিক। আদর্শিক ভিত্তিটা কম জরুরি নয়। আদর্শের পরিচয় পাওয়া যাবে উচ্চশিক্ষা শেষ পর্যন্ত কী করে তার ভেতর দিয়ে। সে যদি কেবলই উপরে ওঠে, নিচকে অবহেলা করে, তবে সেই উত্থানে আদর্শেরই প্রতিফলন ঘটবে। বোঝা যাবে আদর্শ

উন্মার্গগামী, সে উন্নাসিক, উৎকেন্দ্রিক, অহঙ্কারী। সে রকমের শিক্ষায় আমাদের কোনো কৌতূহল নেই, থাকার কথাও নয়। শিক্ষা কোনো লুকানো দক্ষতা নয়, শিক্ষা হচ্ছে নেয়ার এবং দেয়ার ব্যাপার; ওই জিনিসটা যদি না ঘটে, যে নেয় সে যদি না দিতে পারে তাহলে বুঝতে হবে, সে ব্যক্তি আর যাই হোক শিক্ষিত নয়। সেই শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা যা আলো হয়ে জ্বলে, যার নিজের মধ্যে আলো থাকে এবং যে অন্যকে আলোকিত করে’ (‘শিক্ষা সম্মেলন স্মারক গ্রন্থ’; পৃষ্ঠা : ২৫৭)। প্রকৃত সত্য হল এই যে, ১৯৯৯ সালের দেয়া স্যারের বক্তব্যকে তো আমরা কানে তুলিইনি, বরং দিনের পর দিন অধঃপতিত হয়ে চলেছি। অন্যকে আলোকিত করার বিপরীতে নিজেরাই অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছি।

কথা উঠেছে, ’৭৩-এর অধ্যাদেশে সময় বিবেচনায় পরিবর্তন আনা দরকার। কেননা সেখানে সিনেট নির্বাচন, ডিন নির্বাচন, ভিসি প্যানেল নির্বাচন থাকায় সারা বছর নির্বাচনের পেছনেই শিক্ষকরা তাদের সময় ব্যয় করেন। আর যেহেতু ভোটের ব্যাপার, তাই শিক্ষকদেরও নানা অনৈতিক সুযোগ নেয়ার ও দেয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে। যারা এ কথা বলছেন তারা হয়তো বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই বলছেন, আমি তাদের সঙ্গে দ্বিমত করব না। কিন্তু ’৭৩-এর অধ্যাদেশ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হবে, এ বিষয়ে আমি মোটেই একমত নই। শিক্ষকদের মানসিকতায় আমূল পরিবর্তনের কোনো বিকল্প নেই বলেই বিশ্বাস করি।

৪২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর- মাত্র এ চারটি বিশ্ববিদ্যালয় ’৭৩-এর অধ্যাদেশ অনুযায়ী চলে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বয়সের দিক দিয়ে পঞ্চম এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে ’৭৩-এর অধ্যাদেশ কার্যকর নয়। ভিসি, ডিন, সিনেট কোনো নির্বাচনেরই বালাই নেই। তাই বলে মনে করার কোনো কারণ নেই যে, এখানকার শিক্ষকরা সারাদিন লাইব্রেরিতে কাটান। নানা ধরনের দেনা-পাওনার ভিত্তিতে গ্রুপ-পলিটিক্স এখানেও পুরোদমে চলে। জাতীয় রাজনীতির হাল-হকিকত নিয়ে আমরা আলোচনা করি না, করি গ্রুপ-পলিটিক্স, যাকে আমি ‘গোত্রীয়-রাজনীতি’ বলি। এখানে দলীয়করণ তো আছেই, তার ওপর আছে দলীয়করণের দলীয়করণ। আপনি সরকার সমর্থক হলেই চলবে না, নিশ্চিত করতে হবে ভিসির পক্ষে বা বিপক্ষে কিনা।

একদল আছেন যাদের চোখে ভিসির কোনো ত্রুটি ধরা পড়ে না। তাদের বলা হয় ভিসি-গ্রুপ। আরেক দল আছেন যাদের চোখে ভিসির কোনো গুণই ধরা পড়ে না- এরা হল এন্টি ভিসি-গ্রুপ। আপনি যদি এন্টি ভিসি হন, তাহলে সুযোগ পেলে ভিসি আপনার পিন্ডি চটকে দেবেন। আবার ভিসির যদি কোনো দুর্বলতা পাওয়া যায়, তাহলে এন্টি ভিসি-গ্রুপ ভিসির রাতের ঘুম হারাম করে দেবে। এরকম লেঠালেঠিতে জড়িয়ে পড়লে আপনি শিক্ষাদান নয় শুধু, পাঠদানেরই সময় বের করতে পারবেন না। আমরা বুঝে হোক না বুঝে হোক, কমবেশি অপরাজনীতিতে দিন দিন ডুবে যাচ্ছি। আমি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বললেও এ হাল আজকের সব ক’টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই। তাই আমি শুধু ’৭৩-এর সংশোধনকে শিক্ষার মান উন্নয়নের একমাত্র উপায় বলে মনে করি না, বরং বিবেচনা করতে হবে সামগ্রিক দিক।

উচ্চশিক্ষার অবস্থা তো দেখলেন। এবার বেসিক এডুকেশন? শিক্ষার প্রাথমিক স্তর নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এ নিয়ে এখনও মূল্যায়ন হয়। খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ এবং ‘পাবলিক রিপোর্ট অন বেসিক এডুকেশন ইন ইন্ডিয়া’র (প্রোব) অন্যতম লেখক জ্যাঁ দ্রেজে বলছেন, ‘গত বিশ বছরে উন্নয়নের অর্থনীতি থেকে আমরা যদি একটা জিনিস শিখে থাকি, তবে তা হল উন্নয়নে বুনিয়াদি শিক্ষার গুরুত্ব। সত্যি কথা বলতে কী, জীবনকে পরিপূর্ণ করে তোলে এমন অনেক কর্মকাণ্ডে শিক্ষা বিপুলভাবে সাহায্য করে। শিক্ষা অর্জনের প্রক্রিয়াটির নিজস্ব মূল্যও প্রচুর। তার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক লক্ষ্য, যেমন আর্থিক অগ্রগতি, জনসংখ্যার কাঠামোয় পরিবর্তন, সামাজিক ন্যায় এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেও শিক্ষার অবদান আছে। এভাবে দেখলে বলতেই হয়, বিংশ শতাব্দীর ভারতে সর্বজনীন শিক্ষার ওপর কম গুরুত্ব আরোপ করাটা মারাত্মক ভুল হয়েছিল’ (পৃষ্ঠা : ১৩৫)। তারা অন্তত ভুলটা স্বীকার করেছে; কিন্তু আমরা তাও করি না। নাকি আমরা অনুধাবন করতেও পারি না? এটা একটা যুক্তিযুক্ত প্রশ্ন।

প্রাথমিক স্তরে আমরা একাধিক ধারার শিক্ষা পদ্ধতি চালু রেখেছি। ইংলিশ মিডিয়াম, সাধারণ শিক্ষা এবং মাদ্রাসা শিক্ষা। সাধারণ শিক্ষায় আবার দুটি ভাগ- ইংলিশ ভারসন ও বাংলা ভারসন। আবার মাদ্রাসা শিক্ষাতেও আরেকটি স্বতন্ত্র ধারা হল কওমি মাদ্রাসা। একই বয়সের ছেলেমেয়েদের কেউ শিখছে ইউরোপের সাহিত্য ও ইতিহাস, কেউ আবার বাংলা সাহিত্য ও ইতিহাস আর আরেকটি অংশ শিখছে শুধুই মুসলিম লেখকদের লেখা সাহিত্য ও মুসলিম শাসকদের ইতিহাস। শিক্ষার উচ্চ স্তরে অনেক শাখার বিস্তার ঘটতে পারে; কিন্তু প্রাথমিক অবস্থায় যদি একমুখী ধারার প্রচলন না হয়, তাহলে একই মানসিকতার নাগরিক তৈরি করা সম্ভব নয়। এই যে শিশুদের কথা বললাম তারা একে অপরের থেকে ভাবনা-চিন্তা-সংস্কৃতিতে অনেকখানি দূরে অবস্থান করে। এমনকি এক ধারার শিক্ষার্থীরা অন্য ধারার শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলতে নারাজ। স্বাধীন বাংলাদেশের শুরুতে এমনটি ছিল না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয়টাও গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারি বরাদ্দের একটি পুরনো তথ্য দিই। এখানে অনুপাতটা লক্ষণীয়। ১৯৯৮ সালে সংসদে দেয়া তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীর বিবৃতি অনুযায়ী একজন ক্যাডেট কলেজের ছাত্রের পেছনে সরকারি খরচ বছরে ৪৬ হাজার টাকা। সে সময়ে সরকারি মাদ্রাসার একজন ছাত্রের পেছনে ৬ হাজার ৯০০ টাকা, সরকারি স্কুলের ছাত্রের পেছনে ২ হাজার ৮৪১ টাকা, বেসরকারি মাদ্রাসা ছাত্রের পেছনে ৯৭৯ টাকা এবং বেসরকারি স্কুলের ছাত্রের পেছনে খরচ করা হতো মাত্র ৬৯৮ টাকা। কতখানি বৈষম্য ভাবা যায়!

আমরা প্রাথমিক স্তরে বৈষম্যহীন, বিজ্ঞানভিত্তিক একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবি করছি। এটা সময়ের দাবি। আমরা একটা ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের প্রত্যাশা করি এবং সেটাই আমাদের সংবিধান অনুমোদন করে। আমরা ভবিষ্যতে একটি বিভাজিত প্রজন্ম রেখে যেতে পারি না।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×