প্রশ্নফাঁস ও প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরম্পরা

  মো. সিদ্দিকুর রহমান ১০ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রশ্নফাঁস ও প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরম্পরা
প্রশ্নফাঁস ও প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরম্পরা। প্রতীকী ছবি

স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশে প্যানেল তৈরি করা শুরু হয়। প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি শুরু হয় রাষ্ট্রপতি এরশাদের আমল থেকে।

সামরিক শাসনের প্রথমদিকে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান ড. আ. মজিদ খান। ওই সময়ে পেশাজীবী সংগঠনের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী সংগঠন ছিল বাংলাদেশ প্র্রাথমিক শিক্ষক সমিতি। এ সংগঠনের ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্বে ১৯৮০ সালে ঢাকা মহানগরীর শিক্ষকরা ১৮ দিন এবং সারা দেশে ১৯৮১ সালে ৩ মাস ১০ দিন ঐক্যবদ্ধভাবে ধর্মঘট করে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে সর্বপ্রথম দাবি মানতে বাধ্য করান।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতীয় সংসদে আইন পাস করে ঢাকা মহানগরীর প্রাথমিক শিক্ষাকে তৎকালীন ঢাকা পৌরসভা ও সারা দেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে স্থানীয় সরকারের নামে গ্রাম সরকারের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ৩ লাখ শিক্ষক মহাবিক্ষোভ করে ঢাকা শহর অচল করে দেয়। সে রকম বিক্ষোভ আজও কোনো পেশাজীবী সংগঠন দেখাতে পারেনি। রাষ্ট্রপতি এরশাদের আমলে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ. মজিদ খান সংগঠনকে দ্বিধাবিভক্ত করার জন্য অপকৌশলের আশ্রয় নেন।

তিনি বহু শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে তাদের মাধ্যমে সংগঠনের ঐক্য নষ্ট করাতে চেয়েছিলেন। প্রতিপক্ষ সৃষ্টির লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি এরশাদকে প্রধান অতিথি করে সম্মেলন করেও সংগঠন দাঁড় করাতে ব্যর্থ হন তিনি। ড. আ. মজিদ খান শিক্ষকের আবেদনের ওপর ণবং লিখে স্বাক্ষর করে দিলেই শিক্ষকরা নিয়োগপত্র পেয়ে যেতেন। পরবর্তীকালে উপজেলা পরিষদ শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা পেয়ে শুরু হয় প্রাথমিকে অবাধ শিক্ষক নিয়োগ বাণিজ্য।

রাষ্ট্রপতি এরশাদের আমলে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি সম্মেলন হয় বর্তমান সচিবালয়ের অপর পাশের বিশাল খালি জায়গায়; রমনা রেলওয়ে ময়দানে। আগের রাতে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে কাদা-পানিতে ঐক্যবদ্ধভাবে লাখ লাখ শিক্ষক অবস্থান করেছিলেন। সেদিনের সমাবেশ সম্পর্কে রাষ্ট্রপতি এরশাদ বলেন, ‘আপনাদের নেতা সমাবেশ-মহাসমাবেশ কাকে বলে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন।’ সেদিন প্রাথমিক শিক্ষক কল্যাণ ট্রাস্ট, পোষ্য কোটাসহ প্রাথমিক শিক্ষকদের অসংখ্য দাবি বাস্তবায়িত হয়।

সেসময় বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক আবুল কালাম আযাদ। তিনি ১৯৭৫ সালের পর রাজনীতিতে বিতর্কিত ব্যক্তি হওয়ায় ধীরে ধীরে বিশাল ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি মরহুম আযাদ তার বক্তব্যে উপজেলা কর্তৃক শিক্ষক নিয়োগের দুর্নীতির কথা রাষ্ট্রপতি এরশাদের সমীপে তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ‘একজন ঠিকাদার লাখ লাখ টাকা দুর্নীতি করলেও সাধারণ মানুষের অজানা থাকে। অথচ শিক্ষক নিয়োগের ঘুষের টাকা জোগাড় করতে গ্রামের মানুষ জমি-পশু-গাছ বিক্রি করে। গ্রামের পর গ্রাম, ইউনিয়ন ও উপজেলায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে, অমুকের সন্তান ঘুষ দিয়ে মাস্টারির চাকরি পেয়েছে।’

সম্মেলনের পর থেকে উপজেলার কাছ থেকে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা মহাপরিচালক প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরে ন্যস্ত হয়। তৎকালীন মহাপরিচালক ড. জহিরুল ইসলাম ভূঞা ও আজিজ আহম্মেদ চৌধুরীর কঠোর ব্যবস্থাপনায় প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ একটি কাঠামো পায়।

সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমানের আমলের প্রথমদিকে সুষ্ঠু ও কড়াকড়ি নজরদারির ফলে প্রশ্নফাঁস শূন্যের কোঠায় চলে আসে। বর্তমানে শিক্ষক সংকটে অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয় বেহাল। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে ২০ শতাংশ বদলি কোটা নির্ধারণের ফলে গ্রামাঞ্চলে শিক্ষকের সংকটে প্রাথমিক শিক্ষার অস্তিত্ব বিপন্ন। শিক্ষক সংকট দূরীকরণের চেয়ে জরুরি কী কাজে এত ব্যস্ত কর্মকর্তারা, তা আমার বোধগম্য নয়। যার জন্য দীর্ঘ মাসের পর মাস প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা পেছানো হল।

সর্বোপরি প্রাথমিক শিক্ষার সমস্যাগুলো দূরীকরণে সংশ্লিষ্টদের মারাত্মক অবহেলা লক্ষ করা যাচ্ছে। ঢিলেঢালাভাবে চলছে অনেক কাজকর্ম, যা সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে। এর একটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করছি। ২০১৬ সাল থেকে প্রাথমিকে প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্ব দেয়া হয়। বিধি মোতাবেক চলতি দায়িত্বের ভাতা দেয়ার কথা। ২০১৭ সালের নভেম্বরে সচিব, মহাপরিচালক বরাবর চলতি দায়িত্বের ভাতা প্রদানে আবেদন করা হয়। ২০১৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আইনি নোটিশও দেয়া হয়। ১৫ জানুয়ারি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর থেকে চলতি দায়িত্বে সরকারি বিধি মোতাবেক ভাতা প্রদানে আদেশ জারি হয়।

অথচ ২০১৬ সালে পদায়নকৃত প্রধান শিক্ষকরা চলতি দায়িত্বের ভাতা আজও পাননি। প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের কাজকর্মের গতি দেখলে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে হতাশা বাড়ে। ২৪ ও ৩১ মে অনুষ্ঠিত প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসে মূল চক্রকে খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। প্রশাসনের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা ঘৃণ্য চক্রকে সমূলে বিনাশ করতে হবে। আগামী প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য সংশ্লিষ্টদের ভূমিকার প্রতি তাকিয়ে আছে শিক্ষক, জনগণসহ সুধীসমাজ।

মো. সিদ্দিকুর রহমান : আহ্বায়ক, বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষা ও গবেষণা পরিষদ; প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার সুরক্ষা ফোরাম

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×