স্বদেশ ভাবনা

চাল রফতানি করা কি ঠিক হবে?

প্রকাশ : ১২ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আবদুল লতিফ মন্ডল

ফাইল ফটো

ধানের মূল্যবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সরকার চালকল মালিকদের মাধ্যমে ১০ থেকে ১৫ লাখ টন মাঝারি চাল রফতানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে মর্মে পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে।

কৃষিমন্ত্রীর বরাত দিয়ে খবরে বলা হয়েছে, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ঠিক রেখে বাইরে চাল রফতানি করা হবে। এরই মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চাল রফতানির উদ্যোগ নিয়েছে।

সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে কৃষকের লাভ নিশ্চিত করতে। কৃষির যান্ত্রিকীকরণ, আধুনিকীকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণ করতে হবে। এ বছর ধানের দাম অস্বাভাবিক কমে যাওয়া সরকারের কাছে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এ অবস্থার উত্তরণে সরকার চাল রফতানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উল্লেখ্য, দেশ কয়েক বছর ধরে স্বল্প পরিমাণে অর্থাৎ প্রতিবছর কমবেশি ৫০ হাজার টন সুগন্ধি সরু চাল বিদেশে রফতানি করে আসছে। দেশ মাঝারি বা মোটা চাল রফতানি করার পর্যায়ে পৌঁছেছে কি না, তা আলোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

গত এক দশকে বাংলাদেশে চাল উৎপাদনের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হারে ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি।

এ সময়কালে অর্থ মন্ত্রণালয় প্রকাশিত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ও অন্যান্য রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশে উৎপাদিত মোট চালের পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ১৩ লাখ ১৭ হাজার টন। ২০০৯-১০ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ কোটি ২২ লাখ ৫৭ হাজার টনে।

২০১০-১১ অর্থবছরে চাল উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৩৫ লাখ ৪১ হাজার টন, যা ২০১১-১২ অর্থবছরে দাঁড়ায় ৩ কোটি ৩৮ লাখ ৮৯ হাজার টনে। এর অর্থ হল, ২০০৯-১০ এবং ২০১০-১১ অর্থবছরের তুলনায় ২০১১-১২ অর্থবছরে চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হার ছিল নিম্নমুখী।

২০১২-১৩ অর্থবছরে দেশে উৎপাদিত মোট চালের পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৩৮ লাখ ১৪ হাজার টন। অর্থাৎ এ বছর দেশে চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ঋণাত্মক।

২০১৩-১৪ অর্থবছরে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৩ কোটি ৪৩ লাখ ৫৬ হাজার টনে। ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চাল উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় যথাক্রমে ৩ কোটি ৪৭ লাখ ১০ হাজার টন এবং ৩ কোটি ৪৭ লাখ ১০ হাজার টন। অর্থাৎ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হার ছিল শূন্য।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে চাল উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৩৮ লাখ টন। অর্থাৎ এ বছর চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ঋণাত্মক। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চাল উৎপাদনের সরকারি তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের তুলনায় উৎপাদনের পরিমাণ সামান্যই বাড়বে।

উপর্যুক্ত বর্ণনার মাধ্যমে যা বলতে চাওয়া হয়েছে তা হল, দেশে চালের উৎপাদন এখনও স্থিতিশীল জায়গায় পৌঁছায়নি। কোনো বছর উৎপাদন বেড়েছে আবার কোনো বছর কিছুটা কমেছে এবং কোনো বছর তা হয়েছে ঋণাত্মক।

এ সময়কালে চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হার শূন্য দশমিক শূন্য শতাংশ থেকে ১ দশমিক ৩৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, যা ওই সময়কালে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গড় হারের (১ দশমিক ৩৭ শতাংশ) তুলনায় কম। দেশে চাল উৎপাদনে অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজমান থাকায় এক বা দু’বছরের ভালো উৎপাদনের ভিত্তিতে চাল রফতানির ঝুঁকি নেয়া ঠিক হবে না।

প্রশ্ন উঠতে পারে, চাল উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হার সন্তোষজনক না হলে এখন ধান-চালের দাম নিম্নমুখী কেন? ধানচাষীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কেন?

কৃষিমন্ত্রীর ভাষায়, ‘ধান-চালের দাম কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত চাল আমদানি’। উল্লেখ্য, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বাধীনতার পর থেকে দেশ চাল আমদানি করে আসছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলে চাল আমদানির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫ লাখ ৫৪ হাজার টন।

২০১১-১২ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ১৩ হাজার টন। ২০১২-১৩ এবং ২০১৩-১৪ অর্থবছরে চাল আমদানির পরিমাণ কমে এলেও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল ১৪ লাখ ৯০ হাজার টন। ২০১৫-১৬ এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চাল আমদানির ওপর যথাক্রমে ১০ শতাংশ ও ২৮ শতাংশ শুল্ক আরোপ করায় আমদানির পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমে যায়।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে শুধু বেসরকারি খাতে চাল আমদানি হয় এবং আমদানিকৃত চালের পরিমাণ পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৩ হাজার টনে। একদিকে চালের আমদানি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে, অন্যদিকে সিলেটের হাওরাঞ্চলে অকাল বন্যায় বোরোর উৎপাদন সরকারি হিসাবে ১০ লাখ টন হ্রাস পায়।

চালের ঘাটতি মেটাতে এবং চালের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে সরকার বেসরকারি খাতে চাল আমদানিকে উৎসাহিত করার সিদ্ধান্ত নেয়।

চাল আমদানির ওপর পুরো শুল্ক (আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ এবং রেগুলেটরি ডিউটি ৩ শতাংশ) রহিত করা হয়। আমদানিকারকরা শুল্ক মওকুফের সুযোগ নিয়ে চাল আমদানিতে উৎসাহী হয়ে ওঠে।

চলতি অর্থবছরে (২০১৮-১৯) দেশে চাল উৎপাদন অনেকটা সন্তোষজনক হলেও মূলত আগের অর্থবছরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত আমদানিকৃত বিপুল পরিমাণ চাল বর্তমানে ধান-চালের মূল্য হ্রাসকে প্রভাবিত করেছে।

এদিকে চাল রফতানির উদ্যোগ নেয়া হলেও চলছে পণ্যটির আমদানি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য মোতাবেক চলতি অর্থবছরের ৩ জুন পর্যন্ত সরকারি খাতে ৭০ হাজার টনসহ মোট ২ লাখ ৫ হাজার টন চাল আমদানি হয়েছে। তাছাড়া পাইপলাইনে রয়েছে ৩ লাখ ৮০ হাজার টন চাল।

গত মে মাসে চাল আমদানির ক্ষেত্রে মোট করভার ২৮ শতাংশ থেকে ৫৫ শতাংশে (শুল্ক ২৫ শতাংশ, রেগুলেটরি ডিউটি ২৫ শতাংশ এবং অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ) উন্নীত করা হয়েছে।

এতে বেসরকারি চাল আমদানিকারকরা চাল আমদানিতে নিরুৎসাহিত হবেন। চাল আমদানিতে উচ্চহারে শুল্ক আরোপের ফলে চাল আমদানি ১ লাখ টনে নেমে আসা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ১০ লাখ টন বোরো চাল নষ্ট হওয়ায় কারণে ২০১৬-১৭ সালে চালের ক্রাইসিস দেখা দেয়। সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে যেন এমন ক্রাইসিসের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

মূলত বড় চালকল মালিকদের প্রভাবে সরকার চাল রফতানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চলতি বোরো মৌসুমে সরকার ১৩ লাখ টন ধান-চাল কেনার সিদ্ধান্ত নিলেও সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কিনবে মাত্র দেড় লাখ টন ধান।

দেড় লাখ টন ধান থেকে পাওয়া যাবে এক লাখ টনের সামান্য বেশি চাল। ১২ লাখ টন চাল কেনা হবে খাদ্য অধিদফতরে নিবন্ধিত চালকলগুলো থেকে। এতে বড় চালকল মালিকরা একাধিকভাবে লাভবান হবেন। এক. সরকার কৃষকদের কাছ থেকে মাত্র দেড় লাখ টন ধান কেনার সিদ্ধান্ত নেয়ায় বলতে গেলে বাজারে ধানের একমাত্র ক্রেতা চালকল মালিকরা।

ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক তাদের দায়-দেনা মেটাতে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক কম দামে চালকল মালিকদের কাছে তাদের ধান বিক্রি করছে।

পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী, ধানচাষীদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে চালকল মালিকরা সরকার নির্ধারিত দামের (প্রতি কেজি ধান ২৬ টাকা) পরিবর্তে অর্ধেক দামে (প্রতি কেজি ১২-১৩ টাকা) চাল কিনছে। এ ধান তারা চালে পরিবর্তন করবে এবং এজন্য সব খরচসহ ৩৬ টাকায় প্রতি কেজি চাল সরকারের কাছে বিক্রি করে প্রচুর লাভ করবেন।

দ্বিতীয়ত, বোরো ধান কাটা প্রায় শেষ হয়েছে। দেশের কৃষি পরিবারগুলোর ৮৪ শতাংশ ভূমিহীন, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষী পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এরা চাল বিক্রি করে না, এরা বিক্রি করে ধান। দায়-দেনা মেটাতে ধানকাটা মৌসুমের শুরুতে এরা ধান বিক্রি করে। চালকল মালিকদের মাধ্যমে চাল রফতানির সরকারি সিদ্ধান্ত হওয়ায় এতে শুধু লাভবান হবেন চালকল মালিকরা। প্রস্তাবিত রফতানি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে।

বাংলাদেশ অটো, মেজর, হাসকিং ও মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, ‘কোন মিল মালিক কী পরিমাণে চাল কোন দেশে রফতানি করবেন, সেই যোগাযোগ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।’

সুতরাং যখন চাল রফতানি শুরু হবে, তখন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ধানচাষীদের ঘরে বিক্রির ধান থাকবে না। তাই প্রস্তাবিত চাল রফতানি থেকে কৃষকের লাভবান হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

চাল আমাদের প্রধান খাদ্য। দেশের মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ শহরাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ, গ্রামাঞ্চলে ভূমিহীন শ্রমিক, মজুর, ধান কাটার মৌসুম শেষে চাল ক্রেতায় পরিণত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীসহ ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ চাল কিনে খায়। চালের মূল্যবৃদ্ধিতে স্বল্পসংখ্যক বড় ও মাঝারি কৃষক ছাড়া অন্য সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হন।

চালের মূল্যবৃদ্ধি খাদ্যনিরাপত্তাকে হুমকির সম্মুখীন করে। তাই চালের মূল্যবৃদ্ধি সমস্যাকে বাড়াবে বৈ কমাবে না। যা প্রয়োজন তা হল, ধান উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করা।

চাল উৎপাদনে অবকাঠামোগত সুবিধাদি, বিশেষ করে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছলে এবং কৃষি উপকরণ যেমন উন্নতমানের বীজ, সার ধানচাষীদের নামমাত্র মূল্যে সরবরাহের ব্যবস্থা করা গেলে তারা কম খরচে ধান উৎপাদন করতে পারবেন।

তখন কম দামে ধান বিক্রি করলে তারা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। এজন্য সরকারকে কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়াতে এবং কৃষকদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ভর্তুকি প্রদান করতে হবে। সরকার বর্তমানে যে হারে কৃষিতে বিনিয়োগ করছে এবং কৃষককে প্রণোদনা দিচ্ছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান কৃষককে প্রচুর পরিমাণে ভর্তুকি দিয়ে থাকে। আমাদের ধানচাষীদের নামমাত্র মূল্যে কৃষি উপকরণ সরবরাহ করা গেলে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ধান ফসলের ক্ষতিতে বা বাজারে ধানের দাম পড়ে যাওয়ায় ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হলে তারা কম খরচে ধান উৎপাদনে আগ্রহী হবেন। চালের উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে আনা গেলে তাতে ধানচাষী ও ভোক্তা উভয়েই উপকৃত হবেন।

সবশেষে বলতে চাই, দেশে ধান উৎপাদন অনেকটা প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে পরপর দুটি প্রলয়ংকরী বন্যায় আমনের উৎপাদন ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

চালের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে এবং খাদ্যনিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে না ফেলতে তৎকালীন সরকার বিদেশ থেকে চাল আমদানি করতে গিয়ে নানা অসুবিধার সম্মুখীন হয়। বেড়ে যায় চালের দাম।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে সিলেটে হাওরাঞ্চলে অকাল বন্যায় বোরোর উৎপাদন ১০ লাখ টন হ্রাস পাওয়ায় এবং বেসরকারি খাতে চাল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক হার বলবৎ থাকায় এক কেজি মোটা চাল ৫০ টাকায় বিক্রি হয়। দেশে চাল উৎপাদনে স্থিতিশীলতা না থাকায় চলতি ও গত অর্থবছরে ভালো উৎপাদনের ভিত্তিতে চাল রফতানির সিদ্ধান্ত যুক্তিসঙ্গত হবে না।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক খাদ্য সচিব, কলাম লেখক

[email protected]