মোদির ওপর আস্থাই বিজয়ের মূল কারণ

  করণ থাপার ১২ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মোদির ওপর আস্থাই বিজয়ের মূল কারণ

গত সপ্তাহে আকস্মিক এক সিদ্ধান্তে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভায় নতুন দুটি কমিটি তৈরি করেছেন। একটি কমিটি করেছেন বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি সংক্রান্ত সমস্যা মোকাবেলা করার জন্য এবং অন্যটি কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন মোকাবেলা করার জন্য।

উভয় কমিটির সভায় সভাপতিত্ব করবেন খোদ প্রধানমন্ত্রী। এই কমিটি করায় প্রথম সরকারি স্বীকৃতি হল যে, অর্থনীতি মারাত্মক সমস্যার মুখে রয়েছে।

অন্যরা বিষয়টি নিয়ে আগে থেকে সতর্ক ছিল; কিন্তু নির্বাচনের সময় সরকার বিষয়টি স্বীকার পর্যন্ত করেনি।

এই ঘোষণার বিষয়টি (দুটি কমিটি গঠন) আমি যেভাবে বিবেচনা করেছি, তাতে ব্যাখ্যাতীত একটি অনিয়মের মধ্য দিয়ে আমি ভীষণ ব্যথিত হয়েছি। প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া, গ্রামীণ হতাশা ও বেকারত্ব কেন আমাদের ভোটের পথকে প্রভাবিত ও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারেনি?

বিরোধী পক্ষ বারবার জোর দিয়ে বিষয়টি সম্পর্কে (অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সমস্যা) বলেছে; কিন্তু বিজেপির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা বলছে এ খাতে সমস্যা-সন্দেহের কিছু নেই এবং অর্থনীতিতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। যদিও এসব সমস্যা দীর্ঘসময় ধরে বিদ্যমান এবং মানুষকে এজন্য অনেক ভুগতে হয়েছে। বাস্তবতা বিষয়টিকে স্পষ্ট করে দিয়েছে।

প্রথমে আসি প্রবৃদ্ধিতে। গত বছরের চতুর্থ কোয়ার্টারে এটি কমে ৫ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা বিগত ২০টি কোয়ার্টারের মধ্যে সর্বনিম্ন।

ফলস্বরূপ, গত বছর সামগ্রিকভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। এদিকে অর্থ সচিব স্বীকার করে নিয়েছেন যে, চলতি বছরের প্রথমার্ধে এটি আরও নিচে নেমে যেতে পারে। সুতরাং যে পরিস্থিতিতে আমরা ভোট দিয়েছি তাতে সরকারের পারফরম্যান্স নিয়ে উদ্বেগ থাকা উচিত ছিল।

এবার আসি গ্রামীণ মর্মপীড়ার বিষয়ে। বিগত মোদি সরকারের প্রথম বছর থেকে তৃতীয় বছরে ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো কর্তৃক পরিসংখ্যান প্রকাশ বন্ধ করে দেয়ার আগ পর্যন্ত কৃষকের আত্মহত্যার হার বেড়েছিল ৪২ শতাংশ।

মহারাষ্ট্র সরকারের রাজস্ব বিভাগ থেকে আরটিআই বা তথ্য অধিকারের আওতায় করা এক আবেদনের জবাব থেকে জানা গেছে যে, রাজ্যটিতে আগের সরকারের পাঁচ বছরের তুলনায় ফাডনাভিস সরকারের গত পাঁচ বছরে কৃষকের আত্মহত্যার পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে পড়েছে। লেবার ব্যুরোর ডেটা থেকে এর একটি ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে। তারা দেখিয়েছে, মোদি সরকারের গত আমলে গ্রামীণ মজুরি বার্ষিক মাত্র শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ হারে বেড়েছে।

ওই পাঁচ বছরের দুই বছর মূল্যস্ফীতি ছিল উচ্চহারে। বাজে বিষয় ছিল, বাণিজ্যের পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কৃষকের বিরুদ্ধে মোড় নিয়েছিল। যেখানে তারা যেসব পণ্য বিক্রি করে, সেগুলোর দাম তীব্রভাবে কমে গিয়েছিল, সেখানে তারা যেসব পণ্য ক্রয় করে সেগুলোর দাম দৃঢ়ভাবে বাড়ছিল। কৃষক আরও দরিদ্র হচ্ছিল বা অন্তত আরও দরিদ্র হয়ে পড়ার বিষয়টি তারা অনুভব করছিল। সরকারের প্রতি তাদের অসন্তোষ দানা বাঁধা উচিত ছিল।

শেষে আসি বেকারত্বের বিষয়ে। শুরুতে সরকার বেকারত্বের হার ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৬ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদে অস্বীকার করেনি, যা ছিল বিগত ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

যুবক শ্রেণী যে পরিস্থিতির মোকাবেলা করছিল উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ ছিল। ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে অফিসের প্রতিবেদন বলছে, ২০১১-১২ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৭-১৮ অর্থবছরে যুবক শ্রেণীর বেকারত্ব দ্বিগুণের বেশি হয়ে গিয়েছিল। এটি ঘটেছিল ভারতের গ্রামীণ ও শহর- উভয় অঞ্চলে।

অন্যদিকে সেন্টার ফর মনিটরিং দি ইন্ডিয়ান ইকোনমি বলছে, বেকারত্ব আরও বাজে আকার ধারণ করেছে। এটি গড়ে ৭ শতাংশ হতে পারে। সুতরাং বেকারদের উচিত ছিল বিজেপিকে পিঠ দেখানো।

পাঠক এখন বুঝতে পারছেন কেন আমি হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছি? প্রবৃদ্ধি পড়ে যাওয়া, গ্রামীণ পর্যায়ে হতাশা এবং বেকারত্বের বাস্তবতাভিত্তিক যেসব তথ্য-উপাত্ত দেয়া হল, সেগুলো আমাদের ভোট দেয়াকে প্রভাবান্বিত করার মূল নিয়ামক হওয়া উচিত ছিল। এটিই বিরোধীরা প্রত্যাশা করেছিল।

তাহলে কেন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নির্বাচনে কোনো ফ্যাক্টর হল না? আমার কাছে একটি সহজ উত্তর আছে। সেটি হল নরেন্দ্র মোদি।

তার ওপর আস্থা নির্বাচনকে প্রভাবান্বিত করেছে। ভোগান্তি ও মর্মপীড়ার শিকার কৃষক বা বেকার যুবকরা সতর্কতার সঙ্গে নিজেদের কষ্ট ও কঠোর পরিস্থিতিকে এড়িয়ে গেছেন মোদির ওপর আস্থার কারণে। তাদের বিশ্বাস ছিল, যদি দ্বিতীয়বার সুযোগ দেয়া হয় তবে মোদি তাদের সমস্যার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে নিতে পারেন।

আমি কেবল ধারণাই করতে পারি যে, কীভাবে তারা বিষয়টিকে নিজেদের কাছে বিশ্লেষণ করেছেন। সম্ভবত তারা অনুভব করেছেন যে, যদি তিনি তাদের টয়লেট ও বিদ্যুৎ, রান্নার গ্যাস ও গ্রামীণ সড়ক উপহার দিতে পারেন, তবে দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি আরও বেশি কিছু করতে পারবেন।

অবশ্য যদিও টয়লেটে পানি নেই এবং নিজেদের গ্যাস সিলিন্ডার তারা বদলাতে পারছেন না, তারপরও অন্তত বিশ্বাসযোগ্য একটি শুরু তো করা গেছে।

এটি অবশ্যই তাদের আগে যা ছিল তার চেয়ে বেশি। এভাবে বিবেচনা করুন, এটি বোঝা কঠিন নয় কেন তারা এমন উপসংহারে আসলেন যে, দ্বিতীয় মেয়াদে সুযোগ দেয়া হলে মোদি আবারও সরবরাহ করবেন। এটি একজন ব্যক্তির ওপর বিশ্বাস ছাড়া আর কিছুই নয়।

তাহলে উপসংহার টানব কীভাবে? এক ব্যক্তি ও তার ক্যারিশমা, তার বাগ্মিতা, বিশ্বাস তৈরির শক্তি এবং যে সাড়া দেয়ার বিষয়টি তিনি টেনে এনেছেন, সেগুলো মানুষকে তাদের ভোগান্তির বাস্তবতা ভুলিয়ে দিয়েছে এই প্রত্যাশায় যে, তিনি বিষয়গুলোকে আরও ভালো করতে পারেন। এটি একেবারে সহজ বিষয়।

এখন প্রশ্ন হল, এটি কি মতিবিভ্রম? সম্পূর্ণ তা নয়। আরও ভালো ভবিষ্যতের আশা এমন একটি বিষয়, যা আমাদের সবাইকে চলমান রাখে, বিশেষত যখন বিষয়গুলো বাজে পথে চলে।

হিন্দুস্তান টাইমস থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম

করণ থাপার : ভারতীয় লেখক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×