মিঠে কড়া সংলাপ

একটি বার্নিং ইস্যু!

  মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন ১৫ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভাঙা রাস্তাঘাট

দেশের রাস্তাঘাট নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির ভয়াবহতা ঠেকানোই যাচ্ছে না। পাবনা পৌর এলাকায় দু’বছর আগে প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে এলজিইডি কর্তৃক আধা কিলোমিটারের একটু বেশি একটি রাস্তা নির্মিত হয়েছিল, যা ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে সেখানে বেশ কয়েকটি ছোট ছোট পুকুরের মতো গর্ত সৃষ্টি হয়েছে এবং জনসাধারণ সে রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে না পারায় চরম দুর্বিষহ অবস্থায় আছেন।

শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশের দিক থেকে প্রবেশের ক্ষেত্রে ওই একটিমাত্র রাস্তাই এলাকাবাসীর ব্যবহার্য হওয়ায় গত প্রায় এক বছর তাদের খানাখন্দ-গর্ত পেরিয়ে যাতায়াত করতে হলেও ঈদের মাসখানেক আগে থেকে ওই রাস্তায় গাড়িঘোড়া তো দূরের কথা, হেঁটে চলাচলও বন্ধ রয়েছে।

যার ফলে জনসাধারণ অলিগলিসহ মানুষের বাড়ির আশপাশ ও আঙিনা দিয়ে চলাচল করছেন। ওই এলাকার মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাসযোগ্য হবে না।

আশ্চর্যের বিষয় হল, প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে এলজিইডি কর্তৃক নির্মিত আধা কিলোমিটার রাস্তাটির আয়ু এক-দেড় বছরেই শেষ হয়ে গেল। অথচ এসব ঘটনা দেখাশোনার কেউ নেই।

সংশ্লিষ্ট এলাকার কমিশনার জানালেন, ঈদের আগে যাতে রাস্তাটি একটু চলাচলযোগ্য হয় এ জন্য তিনি শত চেষ্টা করেও সফল হতে পারেননি।

তার কাছে আরও জানা গেল, রাস্তাটির দৈর্ঘ্য আরও খানিকটা বাড়িয়ে নতুন করে আবারও টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে এবং রাস্তাটির দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পাওয়ায় এবারের প্রাক্কলিত নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় নয় কোটি টাকা।

এখন প্রশ্ন হল, এই নয় কোটি টাকার কাজ বুঝে নেবেন কে বা কারা? আর যারা বুঝে নেয়ার মতো ক্ষমতাশালী তারাই যদি কাজটি পেয়ে থাকেন তাহলে তো সে কাজ বুঝে নেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ যেসব ঠিকাদার এসব কাজ পান বা করেন তাদের টিকিটি ছোঁয়ার সাধ্য কারও আছে বলে মনে হয় না।

এসব ঠিকাদারি কাজ সম্বন্ধে এমন কথাও শুনে এলাম যে, বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সরকারের বিভিন্ন বিভাগের নির্মাণকাজ তদারকি কর্মকর্তাদের নির্মাণকাজে অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো কিছুই করার নেই! কারণ তদারকি করতে গেলে বা খারাপ কাজের বিরুদ্ধে রিপোর্ট দিয়ে বিল আটকে দিলে সংশ্লিষ্ট তদারকি কর্মকর্তাদের মারধর পর্যন্ত করা হয়।

শিক্ষা বিভাগের একটি হাইস্কুলের নির্মাণকাজের তদারকিতে নিয়োজিত একজন প্রকৌশলীকে নাকি ইতিমধ্যে এভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে, এমনকি তার গায়ে হাত পর্যন্ত তোলা হয়েছে! এ অবস্থায় সড়ক ও জনপথ, এলজিইডি, শিক্ষা, গণপূর্ত ইত্যাদি বিভাগে কর্মরত ব্যক্তিরা অনেক ক্ষেত্রেই যে ভয়-ভীতির মধ্যে থেকে কাজ করেন সে কথাও সঠিক।

সব সময়ই তারা নিজেরা লাভবান হওয়ার জন্য অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন, নাকি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দ্বারা নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে তদারকি কর্মকর্তাদের মারধর বা লাঞ্ছিত করার ভয় দেখিয়ে বিল তুলে নেয়া হচ্ছে- সে বিষয়টিও এখন ভেবে দেখার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। অন্যথায় এসব কথা শোনা যাবে কেন যে, ‘সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা ওই সব নির্মাণকাজ তদারকি করতে যেতে ভয় পান?’

আসল কথা হল, বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড তদারকিতে কর্মকর্তারা যেমন মেরুদণ্ডহীনতার পরিচয় দিচ্ছেন, পাশাপাশি একশ্রেণীর ঠিকাদারও দুর্দমনীয় হয়ে উঠছেন। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে বিল উঠিয়ে নেয়াই ওই শ্রেণীর ঠিকাদারের নীতি, পেশা ও ধর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে! আর এ বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট।

এ ক্ষেত্রে দলীয় পৃষ্ঠপোষকতা বা দলবাজিও একটি বিরাট বিষয় বলে দেখা যাচ্ছে। কারণ দলীয় আনুকূল্য ছাড়া তারা এসব করতে পারতেন না। দলীয় পৃষ্ঠপোষকতাই তাদের এসব করতে শক্তি ও সাহস জুগিয়ে চলেছে এবং স্বাধীনতার পর থেকে যুগ যুগ ধরে সরকারি অর্থ অপচয়ের এ অপকর্মটি অব্যাহত রয়েছে।

সময়ে সময়ে সরকারদলীয় এমপি-মন্ত্রীরা যদি এই শ্রেণীর রাজনৈতিক ঠিকাদারদের আশ্রয়-প্রশ্রয় না দিতেন, শক্তি-সাহস না জোগাতেন, টেন্ডারবাজিসহ নিম্নশ্রেণীর মালামাল ব্যবহার করে নিম্নমানের নির্মাণকাজ করার মাধ্যমে বিল তুলে নেয়ার বিষয়গুলো কঠোর হস্তে দমন করতেন, তাহলে জনগণের ট্যাক্সের টাকা এভাবে জলাঞ্জলি দিতে হতো না।

এসব নিয়ে আর বেশিকিছু বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। কারণ বিষয়টি মন্ত্রী, এমপি-আমলাসহ সব শ্রেণী-পেশার লোকই জানেন। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নামে একশ্রেণীর ঠিকাদার-ব্যবসায়ী যে লুটপাটে ব্যস্ত এ কথা এখন আর কারও অজানা নেই। কান পাতলে যে কেউ যে কোনো স্থানে এসব কথা জানতে বা শুনতে পারবেন।

বিশেষ করে যেসব স্থানে অবকাঠামো নির্মাণে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে সেসব নির্মাণকাজের দিকে স্বাভাবিক নজরদারি করলেই বিষয়টি ধরা পড়বে। সুতরাং এসব লুটপাটের বিষয়টি ধরা কঠিন কোনো কাজ নয়।

একটি রাস্তা নির্মাণে কোন মানের পাথর বা খোয়া ব্যবহার করা হচ্ছে, কী অনুপাতে বিটুমিন বা সিমেন্ট দেয়া হচ্ছে, ফাউন্ডেশন থেকে রাস্তার উপরিভাগ পর্যন্ত গভীরতা কতটুকু বা রাস্তার প্রশস্ততাই বা কতটুকু- এ সবই ধরা একটি মামুলি ব্যাপার মাত্র।

এখন প্রশ্ন হল- এসব ধরবেন কে বা কারা? সরষে ভূত থাকলে তো সব সময়ই এসব অপকর্ম-দুর্নীতি ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে। এ বিষয়ে আগেই বলা হয়েছে যে, এসব ধরার জন্য মাঠপর্যায়ের তদারকি কর্মকর্তাদের মেরুদণ্ড যথেষ্ট শক্তপোক্ত নয়।

তাছাড়া তাদের ভয়ভীতির বিষয়টিও উপেক্ষা করার মতো নয়। সে ক্ষেত্রে অনেকেই হয়তো লাঞ্ছিত হওয়ার বা মার খাওয়ার চেয়ে চুপচাপ থেকে ভাগবাটোয়ারা থেকে কিছু বখরা নেয়াকেই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করেন!

কিন্তু এভাবে আর কতদিন? ‘সরকারকা মাল দরিয়া মে ঢাল’ অবস্থাই বা এ দেশে আর কতদিন বহাল থাকবে? একজন সুনাগরিক কষ্টেসৃষ্টে বছরে আড়াই লাখ টাকার বেশি রোজগার করে আয়কর দিতে এগিয়ে যাবেন, কেউ বা হাড়ভাঙা খাটুনি করে বছরে ৫-৭ লাখ টাকা আয় করে আয়কর দেবেন, আবার কেউ বা সৎভাবে ব্যবসা করে বছরে লাখ লাখ, এমনকি কোটি টাকা আয়কর দেবেন; অথচ তাদের কষ্টার্জিত অর্থ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নামে, অবকাঠামো নির্মাণের নামে, রাস্তাঘাট নির্মাণের নামে অন্য একশ্রেণীর মানুষ টেন্ডারবাজি, ঠকবাজি, জোচ্চুরি করে নিজেদের পকেটে ঢোকাবেন- সেটাই বা কেমন কথা! আর এসব দেখেশুনে কষ্টার্জিত অর্থ থেকে আয়কর প্রদানকারীদের মনের অবস্থাই বা কী হয়?

দেশে বর্তমানে ভেজালবিরোধী অভিযানে জনসমর্থন বেড়ে চলেছে। র‌্যাবের ডিজিসহ অনেকেই খাদ্যে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড দাবি করছেন। কিন্তু রাস্তাঘাট নির্মাণে ভেজালদ্রব্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে কাউকে তেমনটি সোচ্চার হতে দেখা যাচ্ছে না। অথচ নিম্নমানের ভেজাল মালামাল দিয়ে রাস্তাঘাট নির্মাণের ফলে রাস্তাঘাটে খানাখন্দ-গর্তের কারণে দুর্ঘটনার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় প্রাণহানির সংখ্যাও বেড়ে গিয়েছে।

এ অবস্থায় খাদ্যে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে যেমন মোবাইল কোর্ট বসানো হচ্ছে, রাস্তাঘাট নির্মাণের সময়ও তেমনটি করা যায় কি না, সে বিষয়টিও ভেবে দেখা যেতে পারে। আর গতানুগতিক তদারকি ব্যবস্থায় যেহেতু কোনো কাজ হচ্ছে না, সেহেতু বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে বের করাও দোষের কিছু নয়।

যেমনটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। রাস্তাঘাট নির্মাণের তদারকিতেও তেমন একটা কিছু করা উচিত বলেই মনে হয়। আর এ কাজটি যত তাড়াতাড়ি করা যায় ততই মঙ্গল। অন্যথায় রাস্তাঘাট, কালভার্ট, ব্রিজ ইত্যাদি নির্মাণসহ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অধিকাংশ টাকাই রাস্তাঘাট, কালভার্ট, ব্রিজ খেকোরা খেয়ে ফেলবে।

পরিশেষে বলতে চাই, বাজেটে যেহেতু উপরোক্ত খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বরাদ্দ রাখা হয়েছে সুতরাং বাজেটপ্রণেতাদেরও এসব অর্থ রক্ষার জন্য একটি রক্ষাকবচ প্রয়োজন। কাজেই বিষয়টি ‘একটি বার্নিং ইস্যু’!

মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×