মাগুরছড়া গ্যাসকূপ অগ্নিকাণ্ড: বাইশ বছরেও মেলেনি ক্ষতিপূরণ

  পিডিশন প্রধান ১৫ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মাগুরছড়া গ্যাসক্ষেত্রে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে

আজ ১৫ জুন মাগুরছড়া গ্যাসক্ষেত্রে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ২২ বছর পূর্তি হচ্ছে। দু’দশকেরও বেশি সময় আগে ঘটা এ অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা যারা দেখেছেন, তাদের স্মৃতিতে এখনও তা জ্বলজ্বল করছে। রাতের নিকষকালো অন্ধকার ভেদ করে আগুনের সেই লেলিহান শিখা ৫০ কিলোমিটারের বেশি দূর থেকেও দৃশ্যমান হয়েছিল।

সে আগুন দেখতে প্রতিদিন হাজারও মানুষ ভিড় করত দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। মা কোলের শিশুকে নিয়ে, ছেলে বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে, জামাই নববধূকে নিয়ে এ অগ্নিকাণ্ড দেখতে আসত নিয়মিত। দেশে ওই সময়ে এটি একটি কৌতূহলের বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। অন্যদিকে অগ্নিকাণ্ডের ফলে ঘটে যাওয়া ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শনে শুধু কর্মকর্তা বা মন্ত্রীরা নন, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এসেছিলেন।

অগ্নিদুর্ঘটনা বলা হলেও অনেক বিশেষজ্ঞের এ বিষয়ে ভিন্নমত হল, খনন কাজে নিয়োজিত তেল কোম্পানির গাফিলতির কারণে এ ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার সময় খনন কাজে নিয়োজিত ছিল অক্সিডেন্টাল কোম্পানি। যদিও পরে শেভরন এর দায়িত্ব গ্রহণ করে। এখানে বলে রাখি, গ্যাসক্ষেত্রটি মাগুরছড়া খাসিপুঞ্জির কাছে হওয়ার কারণে এটি মাগুরছড়া গ্যাসক্ষেত্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল।

অগ্নিকাণ্ডে সরাসরি খাসিপুঞ্জির গির্জাসহ তাদের সাতটি বসতবাড়ি পুরোপুরি ভস্মীভূত হয়ে যায়। ছয় মাস ধরে চলা এ আগুনের ফলে তাদের চাষবাস অর্থাৎ জীবিকা পুরোপুরি বন্ধ ছিল। আগুনের লেলিহান শিখায় তাদের প্রায় পঞ্চাশ একর পানজুম প্রাকৃতিক গাছপালাসহ পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায়।

আগুনের ধোঁয়া ও ছাই বৃষ্টির কারণে তাদের বাকি ঘরবাড়িগুলো বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়লে শিশু, মহিলা, বয়স্কসহ সবাইকে উদ্বাস্তু হিসেবে আত্মীয়স্বজনের বাড়িসহ অন্যান্য স্থানে আশ্রয় নিতে হয়। তৎকালীন জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী নুরুদ্দীন খান নিজে পুঞ্জির প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি পরিদর্শন করে ক্ষতির ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেছিলেন।

আগুন দেখতে আসা হাজারও মানুষের অবাধ বিচরণ ও চলাচলের ফলে বাসিন্দাদের নিজস্বতা বলতে কিছুই ছিল না। এ সুযোগে কিছু তস্কর পুঞ্জির খালি ঘরগুলো থেকে জিনিসপত্র, গরু-বাছুর, এমনকি টেলিভিশনের জন্য ব্যবহৃত ব্যাটারিও নিয়ে যায়। পানি দূষিত হওয়ার ফলে পানের অযোগ্য হয়ে পড়ে। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, ঘরপোড়া গরুর মতো খাসিরা ওই সময়ে বাইরে থেকে আসা তাদের শুভাকাঙ্ক্ষীদের ওপরও আস্থা রাখতে পারছিল না।

বস্তুত লাউয়াছড়া বনাঞ্চলসহ পুরো এলাকার প্রকৃতি ও পরিবেশে যে ক্ষতি হয়েছিল তা ছিল অপূরণীয়। বন বিভাগের ক্ষতির সুস্পষ্ট কোনো হিসাব পাওয়া না গেলেও বিশেষজ্ঞদের মতে প্রাকৃতিক বন ও বন্যপ্রাণীর যে ক্ষতি হয় তা কখনও আর পূরণ হওয়ার মতো নয়। .

আগুনের তাপে রেললাইন বেঁকে গিয়ে রেলপথ চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ায় রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল ছয় মাসেরও বেশি সময়ের জন্য। সড়কে বিশাল গহ্বর সৃষ্টি হওয়ার ফলে বিকল্প সড়কপথে মানুষজনকে যাতায়াত করতে হয়েছে দীর্ঘদিন।

অগ্নিকাণ্ডের পরবর্তী সময়ে শুরু হয় ক্ষতিপূরণ নিয়ে তেলেসমাতি কাণ্ড। বস্তুতপক্ষে, মাগুরছড়া খাসিপুঞ্জির বাসিন্দারা প্রকৃত ক্ষতির শিকার হলেও ক্ষতিপূরণের দাবি নিয়ে সরকারি-বেসরকারি, বিশেষ গোষ্ঠী ও ব্যক্তিদের দৌড়ঝাঁপ ছিল তখন দেখার মতো।

এ অগ্নিকাণ্ডের ফলে সরকারের কৃষি বিভাগের গঠিত ক্ষতি নিরূপণ কমিটির হিসাবেই মাগুরছড়া খাসিপুঞ্জির বাসিন্দাদের তাৎক্ষণিক ক্ষতি নিরূপণ করা হয় প্রায় ৩ কোটি টাকা। তবে মাগুরছড়া খাসিপুঞ্জির বাসিন্দাদের হিসাবে ক্ষতি ছিল আরও ব্যাপক।

সরকারি সংস্থা, বন বিভাগ, সড়ক ও রেলপথ বিভাগ কোনো ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিল কি না জানা যায়নি; কিন্তু স্থানীয় কিছু গোষ্ঠী ও ব্যক্তি স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় আদায় করে নিয়েছিল তাদের তথাকথিত ক্ষতিপূরণের টাকা। জনগণ চরম ভোগান্তিসহ বিকল্প সড়কে প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হলেও ‘ক্ষতিপূরণ’ পেয়েছিল পরিবহন বা বাস-মালিক সমিতি!

ব্যক্তি পর্যায়ে অগ্নিকাণ্ডস্থল থেকে দশ বা তারও অধিক কিলোমিটার দূরের লেবু বাগানের মালিক বা আগুনের তাপে কথিত গরু-মহিষ মারা যাওয়ার মালিক ‘ক্ষতিপূরণ’ পেলেও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মাগুরছড়ার বাসিন্দাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছিল। তাদের আর্থিক বা বৈষয়িক ক্ষতির যে হিসাব তারা দিয়েছিল তার এক-পঞ্চমাংশও তাদের দেয়া হয়নি।

তাদের সামাজিক, শারীরিক, মানসিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশের যে ক্ষতি হয়েছিল, তা কোনো হিসাবের মধ্যেই আনা হয়নি। সরকারি কর্মচারী ও রাজনৈতিক টাউট, দালাল এবং তেল কোম্পানির আইনজীবী, কর্মচারী বা পরামর্শক হিসেবে থাকা এ দেশীয় দালালদের কারণে ও প্ররোচনায় তারা তাদের প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ থেকে হয়েছিল বঞ্চিত।

ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে সুশীল সমাজ, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রতিনিধি দল অগ্নিকাণ্ডের ফলে সংঘটিত ক্ষতি ও এর প্রভাব নিরূপণ করতে আসে। প্রতিনিধি দলের সদস্যদের সঙ্গে খাসি প্রতিনিধিদের বৈঠকে এসব বিষয় উত্থাপন করা হয়েছিল, যদিও তার কোনো ফল পাওয়া যায়নি। যেভাবে পাওয়া যায়নি তাদের পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া পানজুমের জন্য ভূমি।

বন বিভাগ, সরকারি প্রতিনিধি, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও খাসি প্রতিনিধিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকের সিদ্ধান্ত ছিল, খাসিদের পুড়ে যাওয়া পঞ্চাশ একর পানজুমের জন্য বন বিভাগ নতুনভাবে পঞ্চাশ একর ভূমি বরাদ্দ করবে।

বাস্তবতা হল, আজ অবধি সেই পঞ্চাশ একর ভূমি বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বেশ ফলাও করে এসেছিল। সেই সঙ্গে অক্সিডেন্টালের ওই সময়ের নয়টি দেশে গ্যাস খনন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশি টাকায় ছয়শ’ কোটি টাকারও বেশি ঘুষ হিসাবে ব্যয় করার তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার ফলে হইচই পড়ে গিয়েছিল।

অন্যদিকে এ ঘটনার ফলে দেশের কত ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সম্পদ জ্বলে নষ্ট বা নিঃশেষ হয়েছে তারও কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি বা তা জনসম্মুখে আসেনি। পরবর্তীকালে ২০০৫ সালে টেংরাটিলা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার ফলে এটি প্রমাণিত হয় যে, মাগুরছড়া ঘটনার পরও এ ধরনের ঘটনা মোকাবেলায় আমাদের সক্ষমতা বা ব্যবস্থাপনা নেই।

দেশে দেশে প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্ট করে এবং প্রাকৃতিক বন উজাড় ও ধ্বংস করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন বিপন্ন করে তেল ও গ্যাসক্ষেত্র খননের কাজ করা হয়েছে বা চেষ্টা করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা বা দুর্ঘটনার জন্য অন্যান্য দেশে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর ক্ষতিপূরণ পাওয়ার উদাহরণ আছে।

বহু দেশে এ ধরনের উদ্যোগের বিরুদ্ধে তারা রুখে দাঁড়িয়েছে; এমনকি আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে এবং আদালতের রায়ও তারা পেয়েছে। গত এপ্রিলে ইকুয়েডরের ওয়াওরানী জাতিগোষ্ঠী তেল খনন কোম্পানির কাছে তাদের ভূমি বিক্রির সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতের রায় পেয়েছে।

মেক্সিকোতে মনসানতো কোম্পানির বিরুদ্ধে জয়ী হয় আদিবাসীরা। পেরুর আছুয়ার জাতিগোষ্ঠী তালিসম্যান খনন কোম্পানির বিরুদ্ধে আট বছরব্যাপী আইনি লড়াইয়ে বিজয়ী হয়েছে। পরিবেশ বিনষ্টকারী এবং সামাজিক নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টিকারী এ ধরনের খনন কাজের বিরুদ্ধে লড়াই করে বিজয়ী হওয়ার আরও অনেক উদাহরণ আছে। অথচ আমাদের দেশে বিদেশি কোম্পানির গাফিলতির কারণে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর ক্ষতিপূরণ আদায় করা সম্ভব হয়নি আজও, এটি দুর্ভাগ্যজনক।

পিডিশন প্রধান : সভাপতি, বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী ফোরাম

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×