বাজেট প্রতিক্রিয়া: বাস্তবায়নে সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হবে

  মুঈদ রহমান ১৬ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাজেট প্রতিক্রিয়া

১৭৩৩ সালে ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী কমন্স সভায় আর্থিক পরিকল্পনা প্রস্তাব করার সময় Budget শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন। শব্দটি ফরাসি Bougette শব্দ থেকে উত্থিত। Bougette-এর উৎপত্তিগত অর্থ হল- একটি বিশেষ থলে, যার ভেতরে আর্থিক প্রস্তাবনা থাকে।

সেদিক বিবেচনা করলে আমাদের অর্থমন্ত্রীও একটি নতুন ব্রিফকেসে বাজেট বয়ে এনেছেন- ঐতিহ্যগতভাবে কোনো ত্রুটি নেই। সমস্যা হল, নতুন ব্রিফকেসের ভেতর যে কাগজগুলো ছিল, তা আমাদের প্রত্যাশার অনেকখানিই পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এটি একটি সাদামাটা আয়-ব্যয়ের হিসাব। বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থা গত ১০ বছরের তুলনায় সবচেয়ে চাপের মুখে আছে। এরকম সংকটময় মুহূর্তে যে ধরনের বাজেট হওয়া দরকার ছিল তা হয়নি। তাই বলে ‘এই বাজেট গণবিরোধী’ কিংবা ‘এ বাজেট গণমুখী’- এ ধরনের প্রথাগত ও দায়সারা মন্তব্য করা ঠিক হবে না।

এবারে বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। অঙ্কের হিসাবে এটি বড় হলেও প্রকৃত অর্থে তা নয়। মোট জিডিপির মাত্র ১৮.১ শতাংশ, যা ২৫ শতাংশ পর্যন্ত হলেও উচ্চাভিলাষী হতো না। আমাদের আয়ের উৎস আছে, প্রয়োজন আহরণের দক্ষতা ও সক্ষমতা। অর্থনীতি সমিতির সভাপতি প্রফেসর ড. আবুল বারকাত তার বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনায় আয় করার অতিরিক্ত ২০টি উপখাতের সন্ধান দিয়েছেন, যা থেকে আমরা ১ লাখ কোটি টাকার বেশি আয় করতে পারি। তাই বাজেটের আকারটি আমার কাছে সমালোচনা করার মতো নয়।

এ স্বল্প পরিসরে বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব হবে না, যা বলার মোটা দাগেই বলতে হবে। আপাতত স্বস্তির বিষয় হল, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম স্থিতিশীল রাখা এবং করহার বৃদ্ধি না করে করের পরিধি বাড়ানো। এ দুটি বিষয় জনপ্রিয়তার ওপর সরাসরি আঘাত করে। চিনি আমদানির ওপর শুল্ক বৃদ্ধি যথার্থ। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প সংস্থার আমদানি করা ৫০০ কোটি টাকার চিনি এখন গুদামে পড়ে নষ্ট হচ্ছে। বেসরকারি চিনিকলগুলোর ৫০ শতাংশ বিদেশে রফতানি করার শর্ত থাকলেও তারা ১০০ শতাংশ বাংলাদেশেই বাজারজাত করছে। আর ১৪টি সরকারি চিনিকলে হাজার কোটি টাকার চিনি গলে-পচে যাচ্ছে। কলগুলোয় কৃষকের পাওনা ১৫০ কোটি টাকার ওপর। এত অবিক্রীত চিনি থাকতে আমদানি কেন? যদি এ বর্ধিত শুল্ক চিনিকলগুলোকে বাঁচাতে সক্ষম হয় তবে তা ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।

নতুন উদ্যোক্তাকে সহযোগিতা ও উৎসাহ জোগাতে ১০০ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। একে সাধুবাদ না জানানোর কিছু নেই। কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে আশঙ্কা থেকে মুক্ত হওয়ারও কোনো উপায় নেই। কেননা এ ধরনের বরাদ্দের মূল সমস্যা হল দুর্নীতি আর অপচয়ের আশঙ্কা। যদি ব্যয় স্বচ্ছতার সঙ্গে করা যায় তাহলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। সামাজিক সুরক্ষার আওতায় প্রায় ১৩ লাখ নতুন ভাতাভোগীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি ভালো, তবে এ নিয়ে অনেক অভিযোগ আছে। এর আগে আমরা দেখেছি অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে তৃণমূল পর্যায়ে অনেক অনিয়ম ও রাজনীতির প্রভাব রয়েছে। এর নিরসন হওয়া বাঞ্ছনীয়।

আয়করের ক্ষেত্রে টিআইএনধারীর সংখ্যা ৪০ লাখ হলেও কর প্রদানকারীর সংখ্যা ২১ লাখের বেশি নয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ছিল ১৯ লাখ আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ছিল ১৫ লাখ ৫০ হাজার। বর্তমান অর্থমন্ত্রী চাচ্ছেন কর প্রদানকারীর সংখ্যা ১ কোটিতে নিয়ে যেতে। বিগত বছরগুলোর বৃদ্ধির হার বিবেচনায় অনেকের কাছেই এটিকে ‘কল্পনাবিলাস’ মনে হতে পারে; কিন্তু আদতে তা নয়। আমাদের দেশে এখন ১০০ জন কর দিতে সক্ষম ব্যক্তির মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ কর দেয়, বাদবাকি ৯৫ শতাংশই কর দেয় না। তাছাড়া আমাদের ছোট-বড় ৯ লাখ হাটবাজারে করদাতার সন্ধান করলে এটি অসম্ভব কিছু নয়। এজন্য প্রায় ১০ হাজার লোক নিয়োগের কথা ভাবা হচ্ছে, যা কি না কর্মসংস্থানে সহায়ক হবে।

অনেকেই মনে করেন, করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি করা হলে করদাতার সংখ্যা হ্রাস পাবে; ফলে সরকারি আয় কমে যাবে। কথাটায় যুক্তি আছে। কিন্তু এ কথাও তো সত্য, তিন বছর আগের ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার প্রকৃত মূল্য এখন আর সে মাত্রায় নেই। যদি মূল্যস্ফীতি বার্ষিক ৬ শতাংশ ধরি তাহলে তিন বছর আগে যে জিনিসপত্র ১০০ টাকা দিয়ে কিনেছি, কম্পাউন্ড রেটে হিসাব করলে তার বর্তমান দাম পড়বে ১১৯ টাকা। তিন বছর আগে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়ে যে পরিমাণ ভোগ করেছি, তা এখন করতে গেলে ২ লাখ ৯৭ হাজার টাকা লাগবে। সুতরাং করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ টাকা করার দাবি থাকতেই পারে এবং তা যৌক্তিক।

অর্থমন্ত্রী তার কথামতো যদি ভ্যাট আইন কার্যকর করতে পারেন, তাহলে দীর্ঘদিনের একটি সমস্যার সমাধান হবে। ২০১২ সাল থেকে এ আইনের কথা আমরা শুনে এসেছি। আজ যদি তার বাস্তব রূপ দেখি, তাহলে ভালোই লাগবে। তবে চার স্তরের এ আইনটি এখনও অনেকের কাছেই ধোঁয়াশা হয়ে আছে, তা খোলাসা করতে পারলেই মঙ্গল।

জাতীয় আয় বৃদ্ধির স্বার্থে আমরা ‘ব্যবসা ব্যয়’ (Cost of doing business) কমানো এবং ‘ব্যবসা সহজীকরণ’ (Ease of doing business) করতে পারিনি। আমাদের মনে রাখতে হবে, বিশ্বব্যাংকের ‘ডুয়িং বিজনেস’ প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশ ১৭৬ নম্বরে আছে। তার মানে হল, আমাদের চেয়ে ব্যবসায় এগিয়ে থাকা দেশের সংখ্যা ১৭৫। ১৯৫টি দেশের পৃথিবীতে এ অবস্থান কোনোমতেই সন্তোষজনক নয়। এ বিষয়ে বাজেটে কিছু থাকলে ভালো হতো।

হালকা চোখে এবং হালকা ধারণায় বাজেটটি যথার্থ বলা যেতে পারে, তবে দর্শনগতভাবে নয়। আমাদের সংবিধানে যে সমতা ও বৈষম্যহীনতার কথা বলা হয়েছে তার প্রতিফলন এ বাজেটে নেই। এটি একটি সাধারণ আয়-ব্যয়ের হিসাব। এটি ধনিকগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা করতে বেশি উপযোগী। আমরা বারবার নৈতিকভাবে পরাজিত হয়েছি এবং হচ্ছি। কালো টাকার মালিকদের কাছে আমাদের এ পরাজয় দীর্ঘদিনের। এবারেও ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার বিধান রাখা হয়েছে। তাহলে আমরা যারা নিয়মিত কর দিয়ে থাকি তারা কি বোকা না পাপী? অপ্রদর্শিত আয় দিয়ে যে কেউ ফ্ল্যাট কিনতে পারবেন, কোনো আসুবিধা নেই, এমনকি টাকার উৎসও জানার প্রয়োজন নেই। তার মানে হল, একজন ইয়াবা ব্যবসায়ী অনায়াসেই তার অনৈতিকভাবে উপার্জিত আয় ভোগ করতে পারবেন। এটি কোনোমতেই সুশাসনের লক্ষণ নয়।

আরেকটি মহাচক্রের কাছে আমরা বারবার পরাজিত হচ্ছি, তা হল ঋণখেলাপি। মাত্র ৬ হাজার টাকার ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ দুর্বল-দরিদ্র চাষীকে আমরা কোমরে দড়ি পরাই, অথচ হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপিকে আমরা তোষামোদ করি।

এটি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পরিপন্থী। খেলাপি ঋণ এখন ১ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা। আরও ৫৪ হাজার কোটি টাকা আছে যাকে আমরা অবলোপিত বলি, অর্থাৎ তার হিসাব স্থগিত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। খেলাপিদের প্রতি অতিশয় সহমর্মিতা ঋণখেলাপিদের উৎসাহ দিয়েছে- এমন কথা বলা যেতেই পারে। কারণ গত তিন মাসে ১৬ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ বেড়েছে। অথচ ২০০৯ সালের শুরুতে ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা।

সরকার বলছে, এবারের বাজেটের ঘাটতি পূরণের জন্য ব্যাংকগুলো থেকে ৪৭ হাজার কোটি টাকা ধার নেয়া হবে। কিন্তু ব্যাংকিং খাতের অব্যবস্থাপনা দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। প্রতিদিনই বাড়ছে ‘কলমানি’র চাহিদা। শাখা ব্যবস্থাপকদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে তথাকথিত ‘টার্গেট’। এ টার্গেট মেটাতে গিয়ে সিসি লোনধারীদের নিয়ে টানাহেঁচড়া চলছে, বাড়ছে ওভার ভ্যালুয়েশনের প্রতিযোগিতা। শুধু একটি আইন করে এ সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটানো যাবে না।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী অর্থ পাচারের বিষয়টি এনেছেন। ‘ওভার ইনভয়েসিং’-এর মাধ্যমে যাতে টাকা পাচার না হতে পারে তার জন্য একটি পৃথক সেল খোলার কথা বলেছেন। এটি নিশ্চয়ই সুবিবেচকের কাজ। কিন্তু এরই মধ্যে পাচার হয়ে যাওয়া টাকার কী ব্যবস্থা হবে, তা বলেননি। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির হিসাবে গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। যদি ১ ডলার সমান ৮৪ টাকা হয়, তাহলে অঙ্কটা দাঁড়ায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা, যা আমাদের প্রস্তাবিত বাজেটের চেয়ে অনেক বেশি।

শুরুতেই বলেছি, বাজেটের আকার বিস্মিত হওয়ার মতো নয়। কেননা আয়ের উৎসগুলো আমাদের জানা আছে। কিন্তু অনেকেই মনে করেন, এ বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয়। তাদের ধারণা অমূলক নয়। আয়ের উৎস থাকলেই তো হবে না, তা আহরণের সক্ষমতাও থাকতে হবে। গত বছরের প্রাক্কলিত আয়ের লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা কম আয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তাই এবারও লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আশঙ্কা থেকেই যায়। তাছাড়া আমাদের মোট বিনিয়োগের ৭৫-৮০ শতাংশই বেসরকারি খাতে। সে খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে না, যা থেকে উত্তরণের কোনো পথ এ বাজেটে দেখানো হয়নি। ৮.২ শতাংশ জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে জিডিপির ৩৫ শতাংশ বিনিয়োগ প্রয়োজন, যার সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে কেউ যদি বলেন, এ বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষমতা বর্তমান সরকারের নেই, তাহলে তার ওপর নাখোশ হওয়া যাবে না। বরং সরকারকেই যথাযথ ও দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়নের পথ তৈরি করে তার সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হবে।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×