বাজেট প্রতিক্রিয়া

কালো টাকা সাদা করার সুযোগ অনন্তকাল দেয়া ঠিক হবে না

  এম এ খালেক ১৬ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাজেট প্রতিক্রিয়া

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ১৩ জুন জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেছেন।

৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার এ বাজেট ছিল এ যাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে বড় আকারের বাজেট। প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের সাম্প্রতিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মিল রেখে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উচ্চাভিলাষ ব্যক্ত করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেট নানা কারণেই আলোচিত-সমালোচিত হচ্ছে। বিশেষ করে বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ সাদা করার সুযোগদানের বিষয়টি অর্থনীতিবিদদের অনেকেই ভালো চোখে দেখছেন না।

বাজেটে কয়েকটি নির্দিষ্ট খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ নির্দিষ্ট পরিমাণ কর প্রদান সাপেক্ষে সাদা করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। শিল্প ও সেবা খাতে ১০ শতাংশ কর দিয়ে যে কোনো পরিমাণ অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করা হলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করবে না। এ সুবিধা প্রাপ্তির জন্য হাইটেক পার্ক অথবা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করতে হবে। এ বছর জুলাই থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ সুযোগ অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে জমি কেনার কাজেও অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যবহার করা যাবে। এলাকাভেদে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৫০০ থেকে ১৫ হাজার টাকা কর প্রদান করা হলে ক্রেতার আয়ের উৎস সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করা হবে না। অনেকেই বলছেন, অপ্রদর্শিত অর্থ সাদা করার সুযোগদানের মাধ্যমে আসলে বৈধ আয়কারীর প্রতি অবিচার করা হয়েছে। কারও কারও মতে, এ ধরনের উদ্যোগ দেশের অর্থনীতিতে সুফল বয়ে আনতে পারে, যদি সরকার সঠিকভাবে এটি ব্যবস্থাপনা করতে পারে। অনেকেই কালো টাকা এবং অপ্রদর্শিত অর্থ- এ দুটি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলছেন। বিস্তারিত আলোচনার আগে অপ্রদর্শিত অর্থ এবং কালো টাকা সম্পর্কে কিছুটা আলোচনা করা যেতে পারে। অনেকেই কালো টাকা এবং অপ্রদর্শিত টাকাকে একই অর্থে ব্যবহার করে থাকেন; কিন্তু আসলে এ দুটি শব্দের মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে।

রং বা কালারের কারণে কোনো টাকাকে সাদা বা কালো বলা হয় না; উপার্জনের প্রক্রিয়ার কারণে টাকাকে কালো বা অপ্রদর্শিত অর্থ বলা হয়। অপ্রদর্শিত অর্থ হচ্ছে সেই অর্থ বা টাকা, যা বৈধভাবে উপার্জিত; কিন্তু প্রদর্শন করা হয় না বা কর নেটওয়ার্কের বাইরে রাখা হয়। অর্থাৎ যে টাকার বিপরীতে কোনো কর প্রদান করা হয় না। যেমন কেউ একজন বৈধ ব্যবসার মাধ্যমে এক কোটি টাকা উপার্জন করলেন, কিন্তু সেই টাকার বিপরীতে সরকার নির্ধারিত ট্যাক্স বা কর প্রদান করলেন না। অন্যদিকে কালো টাকা হচ্ছে সেই টাকা, যা দেশের প্রচলিত আইনের বাইরে অসৎভাবে উপার্জিত ও কর নেটওয়ার্কের বাইরে থাকে। অপ্রদর্শিত অর্থের মালিক একটি অপরাধ করেন। তিনি দেশের প্রচলিত কর ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেন। অন্যদিকে কালো টাকার মালিকরা দুটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেন। তারা অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করেন এবং সেই টাকার জন্য সরকারকে নির্ধারিত হারে ট্যাক্স প্রদান করেন না। কাজেই কালো টাকা এবং অপ্রদর্শিত অর্থকে একই পাল্লায় পরিমাপের কোনো সুযোগ নেই। যদিও দুটোই অপরাধ।

এখন প্রশ্ন হল, অপ্রদর্শিত এবং কালো টাকা সাদা করার সুযোগ না দিলে কী হবে? কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ ধারণ করা যে কোনো বিচারেই অপরাধ। কারণ এ কারণে দেশ তথা রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিবছরই বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ সাদা করার সুযোগ দেয়া হয়েছে; কিন্তু খুব একটা সাফল্য অর্জিত হয়নি। অপ্রদর্শিত অর্থ এবং কালো টাকা সাদা করার সুযোগ না দিলে যে খুব একটা উপকার হবে, তা নয়। কারণ শুধু আইনের কারণে কেউ তার উপার্জিত কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকবে না। তারা নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ টাকাকে অর্থনীতির মূল স্রোতে নিয়ে আসবেন। যদি স্থানীয়ভাবে কালো টাকা এবং অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যবহারের সুযোগ না দেয়া হয়, তাহলে এ টাকা দেশের বাইরে পাচার করে দেয়া হতে পারে। নিকট অতীতে বাংলাদেশ থেকে ব্যাপক হারে মুদ্রা পাচার হয়েছে। এ পাচারকৃত মুদ্রার বেশির ভাগই অবৈধভাবে উপার্জিত অথবা ট্যাক্স ফাঁকি দেয়া অপ্রদর্শিত অর্থ। আমরা কি এই মুদ্রা পাচার ঠেকাতে পেরেছি? যারা কালো টাকা এবং অপ্রদর্শিত অর্থের মালিক, তারা জীবন দিয়ে হলেও এ টাকা ব্যবহার করবেন। স্থানীয়ভাবে সম্ভব না হলে তারা বিদেশে নিয়ে এ টাকা ব্যবহার করবেন।

বিশ্বে এমন অনেক দেশ আছে, যারা টাকা পেলেই বর্তে যান। তারা টাকার উৎস সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করেন না। স্থানীয়ভাবে বেশি কড়াকড়ি করলে তারা টাকা বিদেশে পাচার করে দেবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একজন সাবেক চেয়ারম্যান প্রসঙ্গক্রমে আমাকে বলেছিলেন, যতদিন পর্যন্ত আমরা কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থের উৎসমুখ বন্ধ করতে না পারব, ততদিন কালো টাকা সৃষ্টি হতেই থাকবে। তাই প্রথমেই উদ্যোগ নিতে হবে কী করে কালো টাকা সৃষ্টির রাস্তাগুলো বন্ধ করা যায়। এটি সম্ভব না হলে নির্ধারিত পরিমাণে ট্যাক্স প্রদান সাপেক্ষে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া যেতে পারে। স্থানীয়ভাবে কালো টাকা ব্যবহারের সুযোগ দেয়া না হলে টাকা দেশের বাইরে চলে যাবে। এতে দেশ আরও বেশি মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হলে দেশের টাকা দেশেই থেকে যাবে। তবে এ সুযোগ অনন্তকাল দেয়া ঠিক হবে না। কালো টাকা সাদা করার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে কালো টাকা যাতে সৃষ্টি না হয়, তার সব রাস্তা বন্ধ করতে হবে। কালো টাকা এবং অপ্রদর্শিত অর্থ উভয়ই একটি দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। কারণ কালো টাকা এবং অপ্রদর্শিত অর্থ সৃষ্টির সুযোগ অবারিত থাকলে সেই অর্থনীতিতে সামাজিক বৈষম্য ও আর্থিক বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আমরা এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করছি। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে; কিন্তু সেই এগোনোর সুফল ভোগ করছে সামান্য কিছু ভাগ্যবান মানুষ। দেশে বর্তমানে ৪ কোটি ৮২ লাখ মানুষ বেকার। প্রতিবছর ১৪ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে; কিন্তু কর্মসংস্থান হচ্ছে মাত্র ১৩ লাখ মানুষের। বেকারত্বের কারণে অসমতা বাড়ছে দ্রুতগতিতে। গিনি কোয়েফিসিয়েন্ট বা গিনি সহগের সূচক অনুযায়ী, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে আয়বৈষম্য সূচক ছিল শূন্য দশমিক ৪৮। এটি ভয়াবহ অবস্থার ইঙ্গিতবাহী। ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা ছাড়া কোনোভাবেই দারিদ্র্যদূরীকরণ সম্ভব নয়। কৃষি বা অন্য কোনো খাতের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যাবে না। এজন্য প্রয়োজন শিল্পায়নের ওপর বিশেষ জোর দেয়া। কিন্তু সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা হচ্ছে, দেশের শিল্প সেক্টরের অবস্থা তেমন একটা ভালো নয়। ২০১২ সালে দেশে বড় ধরনের শিল্পকারখানার সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৬৩৯টি; ২০১৯ সালে তা ৩ হাজার ৩১টিতে হ্রাসপ্রাপ্ত হয়েছে। একই সময়ে মাঝারি শিল্পকারখানার সংখ্যা ৬ হাজার ১০৩টি থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৪টিতে।

উচ্চমাত্রায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি আমরা অবশ্যই চাই; কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধি কীভাবে অর্জিত হচ্ছে, তা মানবকল্যাণে কতটা অবদান রাখছে- এগুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে। দেশের সাধারণ মানুষ জিডিপি প্রবৃদ্ধির সুফল ন্যায্যতার ভিত্তিতে ভোগ করতে পারছে কি না, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ আমরা জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং মাথাপিছু জাতীয় আয়ের যে হিসাব পাই, তা গড় হিসাব। সবার ক্ষেত্রে এগুলো একই মাত্রায় অবদান রাখে না। বাংলাদেশ উচ্চমাত্রায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে; কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির সুফল কি সবাই ন্যায্যতার ভিত্তিতে ভোগ করতে পারছে? অপ্রদর্শিত অর্থের মালিক এবং কালো টাকার ধারকরাও জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। কারণ টাকা যে প্রক্রিয়াই উপার্জিত হোক না কেন, তা মানি লন্ডারিং বা অন্য কোনোভাবে জাতীয় অর্থনীতিতে প্রবিষ্ট হচ্ছে। এটি কোনোভাবেই ফেরানো যাচ্ছে না। তাই আবেগের বশবর্তী হয়ে কালো টাকা সাদাকরণ বা অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগদানের বিরোধিতা করা ঠিক হবে না। কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থের মালিকরা তাদের অর্থ যে কোনোভাবেই হোক ব্যবহার করবেই। প্রয়োজনে তা বিদেশে প্রেরণ করবে। বিদেশে প্রেরণ করলে দেশ আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ এতে দেশের অর্থ বিদেশে চলে যাবে।

প্রস্তাবিত বাজেটে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। প্রয়োজনে এ সুযোগ সম্প্রসারিত করা যেতে পারে। তবে ২০২৪ সালের পর আর কোনো সুযোগ দেয়া হবে না- এটা রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা করা যেতে পারে। আর এ সময়ের মধ্যে কালো টাকা এবং অপ্রদর্শিত অর্থ সৃষ্টির সব রাস্তা বন্ধ করতে হবে। কারণ কোনো অন্যায় দিনের পর দিন চলতে পারে না। কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই যদি কালো টাকা এবং অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেয়া হয়, তাহলে দেশের বিনিয়োগ কার্যক্রমে গতিশীলতা সৃষ্টি হতে পারে। এ মুহূর্তে আমাদের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিনিয়োগযোগ্য পুঁজির জোগান নিশ্চিত করা।

এমএ খালেক : অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×